| ডিজিটাল দাপ্তরিক কার্যক্রমঃ ২টি কেস স্টাডি |
| জাহাঙ্গীর হোসেন | |
| মঙ্গলবার, ০৭ আগস্ট ২০১২ | |
|
কেস স্টাডি-১ঃ শিক্ষকের এমপিও করণ জিনাত সুলতানা কাকন নামের বরিশালের গ্রামীণ একটি গ্রাজুয়েট মেয়ে বিএড ডিগ্রী পড়ার শেষ সময় হঠাৎ ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলো বহুল কাংখিত ‘ডিভি ভিসা’। ভিসা কার্যক্রম সম্পন্নের সাথে সাথে তার বিএড ডিগ্রী এবং ‘শিক্ষক নিবন্ধন’ কার্যক্রমও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের ইচ্ছেয় অবশেষে পাড়ি দিলো সুদূর প্রবাসে সমৃদ্ধশালী দেশ আমেরিকায় গত বছর। কিন্তু আমেরিকাতে শিক্ষকতার পরিবর্তে ছোট খাটো সব কাজ শেষে কিছুদিন আগে ফিরে এলো দেশে, চলে গেলো বরিশালের নিজ গ্রামে। ঘরে বসে থাকার মেয়ে নয় সে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো, নিজ বাড়ির নিকটবর্তী স্কুল মানে লেঙ্গুটিয়া মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন ‘সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকা ও যুগপতভাবে ইন্টারনেটে। স্কুলটিতে গেল বছর সরকারি একটি প্রকল্প থেকে প্রদান করা হয়েছে ‘সোলার পাওয়ার সিস্টেম’ সম্বলিত বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার, যে কারণে স্কুলটি এখন ইন্টারনেট-ইমেইল ব্যবহারেও সক্ষম। আমেরিকা ঘুরে আসা কম্পিউটারে দক্ষ মেয়ে জিনাত সুলতানা কাকন ই-মেইলে পাঠিয়ে দিল সরাসরি তার দরখাস্ত প্রধান শিক্ষক বরাবরে দরখাস্তের শেষ দিন মানে ১৫.৬.২০১২ তারিখ। একটি হার্ডকপিও সে হাতে হাতে দিয়ে এলো পরদিন স্কুলে গিয়ে। অবাক বিস্ময়ে মেয়েটি দেখতে পেলো, ২-দিন পর মানে ১৭ জুলাই তার ইমেইলে ডাকা হয়েছে তাকে ইন্টারভিউতে, যার তারিখ ২০ জুলাই বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। ডিজিটাল ইন্টারভিউ কার্ডটি তাকে পাঠানো ছাড়াও কপি পাঠানো হয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রধান শিক্ষক বরিশাল জেলা স্কুলকে। অজ পাড়াগাঁয়ের গ্রামীণ একটি স্কুলে সোলারে কম্পিউটার চালানো, তাতে ইন্টারনেট-ইমেইলের ব্যবহার দেখে সত্যিই ভাল লাগলো মেয়েটির। যথাসময়ে আরো ৫-জন প্রার্থীর সঙ্গে ইন্টারভিউ দিয়ে বাড়ি ফিরলো প্রার্থী মেয়েটি। অবাক বিস্ময়ে সে লক্ষ্য করলো, ইন্টারভিউর পরদিন তাকে তার ইমেইলে পাঠানো হয়েছে সকল পরীক্ষার্থীর ফলাফল, যাতে সে-ই প্রথম স্থান অধিকার করেছে ৫-জনের মধ্যে। যার কপিও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীসহ সকলকে পাঠানো হয়েছে একই পদ্ধতিতে। প্রথম স্থান অধিকারী জিনাত সুলতানা কাকন মনে করেছিল, নিয়োগপত্র পাওয়ার জন্যে তাকে হয়তো আরো ২-১ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে কিংবা যোগাযোগ করতে হবে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে। কিন্তু ডিভি ভিসা প্রাপ্ত আমেরিকা ফেরত মেয়েটির সব চিন্তায় ছেদ টেনে ২৪ তারিখ মানে ৩-দিনের মাথায় ইমেইলে চলে এলো তার নিয়োগ পত্র। মূল কপিটি স্কুল থেকে সংগ্রহের অনুরোধ করা হয়েছে তাকে। একুশ শতকের ভিশন ২০-২১ বাংলাদেশের স্কুলগুলোর এ চমকপ্রদ কার্যপদ্ধতি দেখে সত্যিই ভাল লাগলো নব্য শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মেয়েটির। দেরী না করে পরদিনই সে যোগদানপত্র নিয়ে হাজির হলো স্কুলে। সকলে তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো। প্রধান শিক্ষক বললেন, “স্কুলে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার থাকাতে, আমরা এখন সব কাজই কম্পিউটারে করে থাকি”। এ ক্ষেত্রে জিনাত সুলতানা কাকনের এমপিও সংক্রান্ত কাগজপত্রও সে কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে পাঠাতে চায় সময় বাঁচানোর জন্যে। ২-দিনের মধ্যে নব্য শিক্ষক তার এমপিও করণের সকল কাগজপত্র প্রস্তুত ও স্কান করে প্রধান শিক্ষকের ইমেইল থেকে কম্পিউটারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলেন জেলা শিক্ষা অফিসার, বরিশাল বরাবর। সঙ্গে জেলা শিক্ষা অফিসারকে ‘এসএমএস’ যোগে জানালেন কাগজপত্র পাঠানোর খবরটি। ২৭ জুলাই জেলা শিক্ষা অফিসার প্রধান শিক্ষককে ফিরতি মেইলে জানালেন ২টি কাগজপত্রের ত্র“টি ও তা সংশোধনের কথা। ২৮ তারিখ প্রধান শিক্ষক সংশোধিত কাগজপত্রসহ পুন. প্রেরণ করলেন জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর। ২৯ জুলাই জেলা শিক্ষা অফিসার “সকল কাগজপত্র ঠিক আছে, এমপিও করণের অনুরোধ করা হলো” মন্তব্যসহ ইন্টারনেট যোগে পুরো সেট অগ্রায়ণ করলেন মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বরাবর, সঙ্গে সিসি দিলেন সংশ্লিষ্ট এডি, ডিডি, পরিচালক (মাধ্যমিক) ও প্রধান শিক্ষককে। ২৯ তারিখই এডি তার “সঠিকতা যাচাই” মন্তব্যসহ ভাগ্যবতী নব্য শিক্ষিকা মেয়েটির কেসটি ফরোয়ার্ড করলেন ডিডি(মাধ্যমিক)-এর মেইলে। ৩০ তারিখ ডিডি “পজেটিভ” মন্তব্যসহ পাঠালেন পাশের কক্ষের পরিচালক মহোদয়ের মেইলে। ৩০ তারিখ সন্ধ্যায় ফরোয়ার্ড করা কেসটি নানা ব্যস্ততায় ৩১ তারিখ খুলতে পারলেন ডিজি মহোদয়। দেরী না করে ঐদিনই তিনি এমপিও করণের চূড়ান্ত নির্দেশনাসহ ভাগ্যবর্তী নব্য শিক্ষক মেয়েটির কেসটি ফরোয়ার্ড করলেন “আইটি” শাখায়। আগস্টের ০১ তারিখ জিনাত সুলতানা কাকনের নামে নতুন এমপিও নম্বর পড়লো, মানে যোগদানের ৭-দিনের মধ্যে এমপিও-তে যুক্ত হলো মেয়েটি। ‘আইটি শাখা’ থেকে এমপিও করণের খবরটি যথাযথ পদ্ধতিতে ‘অন-লাইনে’ ঐদিনই জানানো হলো শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সকল শাখায়, ব্যানবেইসে, জেলা শিক্ষা অফিসে, প্রধান শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এবং বেতন প্রদানকারী ব্যাংকে। ভিশন ২০-২১ এর ডিজিটাল বাংলাদেশের এ অভাবনীয় পরিবর্তন দেখে শিহরিত হলো শিক্ষক জিনাত সুলতানা কাকন। কেস স্টাডি-২ ঃ দলিল সম্পাদন করণ প্রথম কেসে বর্ণিত শিক্ষকের বাবার নাম মো. দলিল উদ্দিন। তার মেয়ে স্কুলে নিয়োগ পাওয়ার ৫-দিন পর একটি দলিল সম্পাদনের জন্যে নিজ উপজেলাস্থ মেহেন্দিগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গিয়েছিলো সে। একটি উপজেলা শহরের সাবরেজিস্ট্রি অফিসের চমৎকার ‘ডিজিটাল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’ তাকেও চমৎকৃত করেছিলো, যা সে শেয়ার করলো তার মেয়ের সঙ্গে বাড়ি এসেই। বাপ-দাদার আমল থেকে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের প্রচলিত হয়রাণীমূলক সিস্টেমের পরিবর্তে বর্তমান সিস্টেমে সত্যিই সে অবাক হলো। প্রথমেই সে অফিসে গিয়ে দেখলো পুরণো ছাউনি দেয়া টং ঘরে দলিল লেখকরূপী লোকজন আর নেই। সরাসরি সাব রেজিস্ট্রারের কক্ষে কম্পিউটার সজ্জিত সহকারী বসে আছে কয়েকটি কম্পিউটার নিয়ে। তাকে প্রস্তাবিত বিক্রয়যোগ্য জমির কাগজপত্র ও দাতা-গ্রহিতার নাম ঠিকানা ইত্যাদি দেয়ার পর তিনি ৫-মিনিটের মধ্যে ডিজিট্যাল ফরম্যাটে বসিয়ে দিলেন “রূপকল্প-২০২১” প্রত্যাশিত বাংলাদেশের মতো। পরবর্তীতে বর্ণিত নির্দিষ্ট ‘ফরম্যাটে’ অনলাইনে কম্পিউটার অপারেটর জমির দাতা, গ্রহিতার নাম-ছবি-টিপসহি, জমির পরিমান-বিবরণ-দাম ইত্যাদি লিপিবব্ধ করে তা ফরোয়ার্ড করলেন ‘সাব রেজিস্ট্রার’ মহোদয়ের কম্পিউটারে। তিনি ওপেনকৃত ফাইল দেখে দাতা-গ্রহিতার ছবি-স্বাক্ষর-জমির বিবরণ মিলিয়ে ২-৩টি কথা দাতা-গ্রহিতাকে জিজ্ঞেস করে ‘ওকে’ করলেন। হয়ে গেল দলিল সম্পাদন, যা সম্পাদনের সাথে সাথেই ঢাকা কেন্দ্রীয় সার্ভারেও সংরক্ষিত তথা “রেকর্ড” হয়ে গেলো অটো পদ্ধতিতে। কর্মদক্ষ ও সৎ সাব-রেজিসট্রার আরো জানালেন যে, কম্পিউটারে প্রোগ্রাম থাকার কারণে দলিল নম্বর, নকল, জমা খারিজ, নতুন খতিয়ান নং পড়বে অটোমেটিক। দলিল দাতা ও গ্রহিতা নিজ প্রয়োজনে ও প্রমাণ হিসেবে নিয়ে যাবেন একটি কম্পিউটার প্রিন্ট ও নম্বর (যেভাবে বর্তমানে শেয়ার ক্রেতারা কেবল শেয়ার ক্রয়ের প্রমাণ হিসেবে একটি কম্পিউটার প্রিন্ট পান)। পরবর্তীতে যে কোন প্রয়োজনে দাতা গ্রহিতা কিংবা সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি কম্পিউটার থেকেই প্রিন্ট করে নকল নিতে পারবেন বাংলাদেশের যে কোন অফিস থেকেই, যার সত্যতা যাচাই করা যাবে সহজেই। বছর ভিক্তিত প্রত্যেকটি সাব রেজি. অফিসের হার্ডডিস্ক সংরক্ষণ করা হবে সংশ্লিষ্ট অফিসে এবং জেলা ও ঢাকা কেন্দ্রীয় অফিসে। কম্পিউটারে ক্লিক করে বছর ভিত্তিক সম্পাদনকৃত সকল দলিলের ‘নাড়ি-নক্ষত্র’ তথা চৌদ্দ গোষ্ঠীর তথ্য পাওয়া যাবে এক মিনিটে। এ জন্যে প্রত্যেকটি সাব রেজি. অফিসে বর্তমানে কর্মরত নকল নবীশ জাতীয় লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ বানানো হয়েছে। এতে কমেছে মানুষের কষ্ট, আমলাতন্ত্র তথা দুর্নীতি। এ জন্যে সরকারি ফি ইত্যাদি আগাম জেনে তা দলিল সম্পাদনের আগে জমা করে আসতে হয় নির্দিষ্ট ব্যাংক একাউন্টে। চমৎকার তথ্যভিত্তিক সরল স্বীকারোক্তি সাব-রেজিস্ট্রারের। আসলে উপরের দুটো কেস-স্টাডিই কাল্পনিক, যা বাস্তবায়ন করার কথা প্রত্যেকটি কম্পিউটার নির্ভর দফতরে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এখনও আমাদের অধিকাংশ স্কুল ও দফতরগুলোর কম্পিউটারগুলো (২-১টি বাদে) কেবল টাইপ মেশিনের বিকল্প হিসেবে টাইপিং কাজে ব্যবহৃত হয়, আর ইন্টারনেটগুলো ব্যক্তিগত ফেইসবুক বা চ্যাটিংয়ের কাজে ব্যবহার করি আমরা। ১৬-কোটি মানুষের কাংখিত ভিশন-২০২১ এর ডিজিটাল বাংলাদেশে কখন বাস্তবায়ন ঘটবে উপরের রূপকল্পটি? যাতে মানুষের কষ্ট লাঘব হবে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে!
|