পুষ্প ও অশ্রুসিক্ত অভিষেক
নিউজ-বাংলা   
মঙ্গলবার, ২৪ জুলাই ২০১২

গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে আজ দাফন


 এ যেন শবানুগমন নয়। নয়নের জলে বরণের-বিদায়ের সমারোহ। পুষ্প ও অশ্রুসিক্ত অভিষেক। বরণের। বিদায়ের। শেষকৃত্যের আবহে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় একদিকে বরণের ঢালি আর অন্যদিকে চিরবিদায়ের আয়োজন। জনউচ্ছ্বাসের বাঁধভাঙা বেদনার্ত-কুসুমিত দ্যোতনায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চিরঞ্জীব মহাপুরুষ হুমায়ূন আহমেদ এভাবেই ফিরে আসেন স্বদেশে।

 স্বজনের প্রিয় প্রাঙ্গণে। প্রিয়তম বাংলাদেশে। তিনি এসেছেন চিরপ্রস্থানের মহাপথে চলে যাবার জন্য। ট্র্যাজিডির রাজপুত্রের মতোই তার আসা আর যাওয়ার পথরেখা নীল জোছনার মায়াবী উথাল-পাথালে ভাসিয়েছে সবাইকে।  সমগ্র জাতির অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় গতকাল সোমবার সকাল ৯টায়। ঢাকার মাটি স্পর্শ করে নিথর হুমায়ূন আহমেদকে বহনকারী বিমান। লাখো ভক্তের হাহাকার ও রোদনে ভারি হয় চারপাশের বাতাস। বুকচাপা কান্নায় তখন পুরো দেশ। বিমানবন্দর থেকে শহীদ মিনারের পথে ঐতিহাসিক শবানুগমন। মৌন, তাপিত মানুষের আদিঅন্তহীন পদধ্বনি।  রমনার সবুজে বিষাদের নীলজলে স্নাত লাখো মানুষের মাঝে জাতির সাংস্কৃতিক আত্মার প্রতীক শহীদ মিনার। জনতা সাগরের ঊর্মিমালায় সফেদ দ্বীপের মতো স্নিগ্ধ, শান্ত, সমাহিত হুমায়ূন। তারপর জাতীয় ঈদগাহ ময়দান। সর্বজনীন মানুষের সম্মিলিত প্রার্থনায় শেষতম বিদায়ের করুণতম সুর। মাটির গভীর টানে তখন এ মৃত্তিকার আদি, অকৃত্রিম ও শ্রেষ্ঠতম সন্তান। শ্রাবণের রাত নেমে এলে সঙ্গে আসে হিমঘরের সযতন অপেক্ষা। বাংলাদেশের হৃদয়ের ঠিকানায় চলে যাওয়ার অপেক্ষা হুমায়ূনের। আর হুমায়ূনের জন্য মানুষের অপেক্ষা। দেশ-বিদেশের তিরিশ কোটি বাংলাভাষীর অন্তহীন অপেক্ষা। ইতিহাস কি কখনও দেখেছে মানুষের উন্মাতাল শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও কষ্টের এমনই বরণ আর বিদায়? নিয়তির নির্মম ইঙ্গিতে হুমায়ূনকে বরণ করা হয়েছে বিদায় জানানোর জন্যই। পৃথিবীর বুকে নিজের কয়েকটি শেষ ঘণ্টা তিনি বরণ আর বিদায়ের মেরুকরণে জনসমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাটিয়ে দিলেন। বাংলাদেশের মানব-হৃদয়ে বিষাদের মগ্ন-সুরে তিনি যাপন করলেন তার অন্তিম যাত্রা। পুরো যাত্রা পথটিকেও অঙ্কন করে রাখলেন ইতিহাসের বুকে। জীবনের মতোই মৃত্যু ও বিদায়ের কালেও তিনি ইতিহাসের জনক। অখণ্ড বাংলা সাহিত্যে আর কাকে নিয়ে রচিত হয়েছে এমন বিষাদের-বিদায়ের গৌরবদীপ্ত ইতিহাস? মাইকেল মধুসূদনের অন্তিম যাত্রা হয়েছিল নীরবে, অলক্ষ্যে। সত্যজিতের শেষযাত্রা পথ নিজের শহরকে স্পর্শ করলেও তার পুরো দেশবাসীকে নাড়াতে পারেনি। হুমায়ূন একটি আস্ত জাতিসত্তাকে আন্দোলিত করে চলে গেলেন। চলে গেছেন মানবসত্তার হৃদয়ে একটি কোমল পরশের ব্যথা-জাগানিয়া মরমী সংগীত হয়ে। তুলনারহিত রবীন্দ্রনাথের কথা আনা যাবে না স্থান, কাল, প্রেক্ষাপট ও অতিমানবীয় আবেগের স্পর্শকাতরতার কারণে। কিন্তু মানুষ রবীন্দ্রনাথকেও প্রকৃতি ও অগ্রযাত্রার শর্ত মেনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিক্রমের পথ করে দিতে হয়। উত্তরণের দিশা জাগাতে হয়। মানব ইতিহাস একজন থেকে আরেকজনে উত্তীর্ণ হতে হতে গড়ে তোলে নতুন ইতিহাস। এভাবেই সভ্যতার মুকুটে যুক্ত হয় নতুন নতুন সোনার পালক। হুমায়ূন সোনার পালক নয়, কোহিনূর-খচিত আস্ত একটি হীরকদীপ্তিমান মুকুট সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শিরে স্থাপন করে গেছেন। বাংলা সাহিত্যের আদি থেকে অন্তের সামগ্রিক ইতিহাসে তিনি হয়ে আছেন বহুমাত্রিক জ্যোতির নান্দনিক বলয়; দ্যুতিমান নক্ষত্র।
সর্বশেষ আপডেট ( শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১২ )