ও মাঃ ভেতর আগে নাকি বাহির আগে?
সুমনা শারমীন   
শনিবার, ১২ মে ২০১২

 মায়ের শরীরটা ভালো না। ভালো না মানে বেশ খারাপ। বাবা দেশের বাইরে। মা তাই একাই সব সামলান। হয়তো ভেবেছিলেন, নিজের অসুখটাও সামলে নেবেন। রেখেছিলেন চেপে-চুপে। ছোট ছেলে দুটো যেন ঘাবড়ে না যায়।

 ডাক্তার খালার সঙ্গে কী যেন পরামর্শ করেন। কিন্তু মায়ের কষ্টটা বাড়ছেই...ভীষণ ইচ্ছে করছে মায়ের জন্য কিছু করতে। ভেতরের ঘর থেকে মায়ের ডাক, ‘বাবা, একটা কাজ করে দিবি?’
—বলো, বলো মা
—কিছু খেতে পারছি না। একটা হরলিক্স এনে দিবি?
—এক্ষুনি দিচ্ছি। টাকা দাও।
টাকা নিয়ে মা-পাগল কিশোর ছুটে বেরিয়ে গেল।
ঘরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন মা। এই বুঝি ছেলে ফিরে এল।
মিনিটের পর মিনিট যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যায়, ছেলে ফেরে না। মায়ের উল্টো দুশ্চিন্তা, ‘কেন যে ওকে পাঠালাম...’
অবশেষে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ছেলে ফিরল হরলিক্স হাতে। মায়ের উত্তেজনা, —কি রে বাবা? একটা সামান্য কাজ করতে এত সময় লাগে? বাড়ির পাশে দোকান। মায়ের কথা ভুলে কোথায় চলে গেলি? না খেয়ে ব্যথায় আমি অস্থির! কিরে?
ধুলো ভরা পা নিয়ে বুকে থুতনি লাগিয়ে আস্তে আস্তে ছেলেটি বলল, বাড়ির পাশে তো দোকান ছিলই। কিন্তু তোমার জন্য কষ্ট করতে ইচ্ছে করছিল, তাই অনেক দূর থেকে হেঁটে হেঁটে হরলিক্সটা আনলাম।


সাকিব আল হাসান। কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে গতবার আইপিএল খেলতে যাওয়ার পর হঠাৎ তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার এই কৃতী ক্রিকেটার কিন্তু মায়ের অসুস্থতাকেই গুরুত্ব দিলেন বেশি। ফিরে এলেন দেশে। মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত হওয়ার পরই আবার খেলার জন্য ফিরে গিয়েছিলেন ভারতে। সাকিবের এই মায়ের জন্য উড়ে আসা তখন খবরও হলো। এশিয়া কাপের পর এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসানের মা শিরিন আক্তার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘ছেলে আবার আইপিএল খেলতে যাচ্ছে, দোয়া করি আমি যেন সুস্থ থাকি।’
মা যে ছেলেকে চেনেন।
কদিন আগে পেশাদার ফুটবল লিগের খেলা ছেড়ে জাতীয় দলের ফুটবলার আমিনুল হক যখন অসুস্থ মাকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে বিদেশ গেলেন, তখন তিনিও খবর হয়ে এলেন সংবাদপত্রের পাতায়।
সন্তান তো সন্তানই। তিনি যত গুরুদায়িত্বই পালন করুন না কেন। মায়ের প্রতি দায়িত্ব, ভালোবাসার সঙ্গে তার তুলনা হয়?


এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পর প্রথম আলোর ‘নারীমঞ্চ’ পাতায় একটি খবর ছাপা হলো। ‘অনুপ পাস করেছে’। শিশু অনুপের দেহে বাসা বাঁধে ক্যানসার। দরিদ্র বাবা চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে অক্ষম। পালিয়ে গেলেন স্ত্রী-পুত্র রেখে। কিন্তু অনুপের মা হাল ছাড়েননি। দরজায় দরজায় ছেলের চিকিৎসার জন্য গেলেন। অতঃপর প্রথম আলোতে এল ফিচার। প্রথম আলোর পাঠকদের সহযোগিতায় অনুপের চিকিৎসা হলো। অনুপ নতুন করে লেখাপড়া করল। এবার সে পরীক্ষায় ‘এ’ গ্রেডে পাসও করল। এই খবর পড়ে দেশ-বিদেশ থেকে প্রথম আলোর অনলাইনের পাঠকেরা ব্যাপক হারে সাড়া দিয়েছেন। অনুপকে তাঁরা যেমন অভিনন্দন জানিয়েছেন, তেমনি অনেকেই লিখেছেন, ‘অনুপ যেন তার মাকে কখনো ভুলে না যায়, কষ্ট না দেয়...’


যুগে যুগে পাল্টে যায় মূল্যবোধ। দায়িত্ববোধ, কর্তব্যবোধ। অনেক সময় ভেতরের চেয়ে বাহির বড় হয়! আক্ষেপ করে সেদিন এক যুবক বলছিলেন, ‘বুঝলেন আপা, আমার মাকে যদি আমি সরকারি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করাই, তবে আমি দায়িত্বহীন সন্তান। আমি যদি মাকে ঝকঝকে চেহারার দামি হাসপাতালে না-ই নিতে পারি, তবে আমি মায়ের যোগ্য সন্তানই নই!’ আর সেদিন বড় কষ্ট বুকে চেপে এক মা বলছিলেন, ‘জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল আমার। বাসায় কেউ নাই। বমি করছি বারবার, ছেলে আমার পাশের ঘরে কম্পিউটারে কী যেন করে। ডাকি, আসে না। পরে ওর কাছেই শুনলাম, ও নাকি ফেসবুকে আমার অসুস্থতা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ওর মনের অবস্থা ভাগাভাগি করছিল!’


কিছু সম্পর্ক বাতাসে বেঁচে থাকার মতো। অনিবার্য, অনায়াস। যার নাই হয়তো সে-ই বোঝে, কী নাই...অতএব বাহিরের চেয়ে ভেতর হোক বড়।