চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী নেই!
আশরাফ আহমেদ, মেরিল্যান্ড থেকে   
মঙ্গলবার, ০৮ মে ২০১২

ইবনে বতুতা মিথ্যা কথা লিখেছেন, চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী নেই 

নামাজ শেষে সালাম ফেরানোর সময় মুসলমানেরা যেভাবে ঘাড়ের দুদিকে মাথা ঘোরায়, ঠিক সেভাবে কিন্তু অনেক তাড়াতাড়ি কয়েকবার মাথাটি এপাশওপাশ করে, ঝাঁঝালো স্বরে কথাগুলো বলেছিলেন তৃতীয় স্বামীটি। লেখাপড়া জানা লোক, সর্বোচ্চ শিক্ষাগত ডিগ্রি ধারণ করা ছাড়াও নিত্যই অনেক কঠিন কঠিন সব বিষয়ের বই নাড়াচাড়া করেন।

 তা সত্ত্বেও প্রায় সাতশ’ বছর আগে যে বিশ্ব-বিখ্যাত পর্যটকের লেখার ওপর ভরসা করে আজ বাংলার গৌরবের ইতিহাস লেখা হচ্ছে ও হয়েছে, এক কথায় তাঁকে মিথ্যুক বলে ফেলায় গাড়ির আর বাকি পাঁচটি প্রাণী হঠাৎ করেই চুপ করে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ চিন্তা করে যুগপৎ সবাই যখন ইবনে বতুতার পক্ষ নিয়ে কিছু বলতে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, ঠিক তার আগেই তৃতীয় স্বামীটির আরেকটি কথায় গাড়ির অন্যান্য আরোহীর কেউই আর সেকথার প্রতিবাদ করার তাগিদ অনুভব করেননি। বরঞ্চ ইবনে বতুতা যে আসলেই মিথ্যা বলেছিলেন আপাততঃ বিনা বাক্যে তা মেনে নিতে বাধ্য হলেন!

 

(২)

গতবছর নভেম্বরের সেই দিনটি শুরু হয়েছিল ঝকঝকে রোদ নিয়ে। তিনটি স্বামীকে সাথে নিয়ে রওনা হয়েছে তিন রমণী বল্টিমোরের দিকে একটি ভ্যানগাড়িতে চড়ে। উদ্দেশ্য সেখানে ‘ওয়াল্টার আর্ট মিউজিয়ামে’ প্রাচীন গ্রিক অংকবিদ-বিজ্ঞানী আর্কিমেডিসের কাজের ওপর একটি মূল পাণ্ডুলিপি (খাতা বা বই) দেখা। কোন কিছু নতুন আবিষ্কার করে “ইউরেকা ইউরেকা” বলে আনন্দে চিৎকার করার একটি প্রকাশভঙ্গি পৃথিবীতে বিগত আড়াই হাজার বছর থেকে চালু হয়ে আছে। বাথটাবে গোসল করার সময়  একটি বিখ্যাত আবিষ্কারের চিন্তা আর্কিমেডিসের মাথায় এলে  তাঁর দুবার উচ্চারিত সেই শব্দ থেকেই আমরা তা শিখেছিলাম।

হাতের কাছে লেখার কিছু না পেয়ে অথবা হয়তো সেই আর্কিমেডিসকে কাফের সাব্যস্ত করে ১২২৯ খৃষ্টাব্দে জেরুজালেমের জোহানেস মাইরোনাস নামে এক ধর্মযাজক একটি বই বেছে নিয়েছিলেন। সেই বইয়ের প্রতিটি পাতার অক্ষর মুছে তার ওপর লম্বালম্বিভাবে নিজে ‘আদর্শ নামাজ শিক্ষা’ জাতীয় এক প্রার্থনা-পুস্তক রচনা করেন। ফলে পৃথিবীর মানুষের জন্য রেখে যাওয়া আর্কিমেডিসের সেই অসামান্য দান আমাদের জ্ঞান থেকে হারিয়ে যায়। প্রার্থনার বইটির এ ইতিহাস প্রায় একশত বছর থেকে জানা থাকলেও কিভাবে আর্কিমেডিসের কাজের ওপর প্রাচীন লেখাগুলো উদ্ধার করা যায় সে পদ্ধতি কারো জানা ছিল না। ঘটনার প্রায় আটশত বছর পরে, ২০০০ সনে শুরু করে আন্তর্জাতিক একদল বিজ্ঞানী একজোট হয়ে এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেন কিছুদিন আগে। তাঁরা কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করে আর্কিমেডিসের সেই গবেষণাকর্ম আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারে সংযোজন করেছেন আজ তা জানতেই এই তিনজোড়া লোক ওয়াল্টার মিউজিয়ামে যাচ্ছেন। বইটির লেখাগুলো পুনরুদ্ধারের ফলে আর্কিমেডিসের ‘গোপন কৌশল’, ‘অংকের ইতিহাস’ এবং প্রাচীন পৃ্থিবীর অনেক ‘সম্পূর্ণ নতুন তথ্য’ আমাদের সামনে আজ উন্মুক্ত হয়েছে। ওয়াল্টার মিউজিয়াম তাদের সম্পূর্ণ দুটো গ্যালারিতে বইটির সেই সব অজানা ইতিহাস ও তার পুনরুদ্ধারের কাহিনী আড়াই মাসের জন্যে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে ঙ্খুলে দিয়েছেন। তা দেখা ও জানার উদ্দেশ্যেই এই তিন জোড়া স্বামী-স্ত্রী আজ রওনা হয়েছে।

 

 

(৩)

বিভিন্ন কারণে পথে দেরি হওয়ায় যথাস্থানে পৌঁছে দেখা গেল মিউজিয়াম বন্ধ হওয়ার আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি। মাথাপিছু পনের ডলার দিয়ে ঢুকলেও পয়সার তুলনায় “আর্কিমেডিসের পালিম্পেসেষ্ট (বইয়ের লেখা মুছে তার ওপর অন্য নতুন কিছু লেখা)” এর বিশেষ কিছুই দেখা ও জানা যাবেনা বলে ওরা ছয়জন বিনামূল্যে দেখার গ্যালারিগুলোতে যাওয়া ঠিক করলো। এখানে ছবি, মুর্তি, মৃৎপাত্র, ও অলঙ্কার মিলিয়ে রয়েছে প্রাচীন মিশর, গ্রিস, ভারত, চীন ও আরো অনেক এলাকার অমূল্য সব সংগ্রহ। 

  

গ্রিক গ্যালারিতে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবী এবং হোমারের “ইলিয়াড” ও “অডিসি”তে বর্ণিত বিভিন্ন চরিত্রের অপূর্ব সব মূর্তি। দেয়ালের একটি ছবিতে দেখা যায় যে ‘এরিস’ নামের “ক্রোধ ও গন্ডগোল লাগানো”র দেবী তিন  সুন্দরীর দিকে একটি আপেল ছুঁড়ে মারছেন। গ্রিক উপাখ্যানের বিখ্যাত “ট্রয়ের যুদ্ধের” কারণ হিসেবে যদিও হেলেন অপহরণের ঘটনাকেই সাব্যস্ত করা হয়, যুদ্ধের আসল কারণ আরো পেছনে, এই এরিস দেবীকে নিয়ে। অনেকটা আধুনিককালের ‘গণতন্ত্র প্রবর্তনের’ ছলে ‘তেল দখলের’ আসল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ইরাক আক্রমণ করার মত! 

(৪)

একবার হোল কি এক ‘রাজকীয়-দেবতীয়’ বিয়ের আসরে এই এরিস দেবীকে ঢুকতে দেয়া হোল না। হয়তো তাঁর রুক্ষ-তিরিক্ষি মেজাজ বিয়ের পুরো আসরটিই নষ্ট করে দেবে ভেবে মুরুব্বিরা এই ভাল সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন যে এরিস নিজেও বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী একজন দেবী। রাগে ক্ষণিকের জন্য কাণ্ডজ্ঞানহীন হলেও তা সামলে অচিরেই এরিস তাঁর অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার কথা চিন্তা করে ফেললেন। বিয়েতে দেবার জন্যে সাথে করে যে একটি উপহার নিয়ে এসেছিলেন, সেই আপেলটির ওপর সুন্দর করে লিখলেন, (এটি) “সবচেয়ে সুন্দরীর জন্যে”। লেখা হয়ে গেলে তিনি তা বিয়েবাড়ির দেয়াল টপকে ভেতরে ছুঁড়ে মারলেন। 

দেয়ালের ওপাশে আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে ছিল সুন্দরীদের মেলা। আধুনিক বিয়ের মজলিশে বিবাহিত এবং অবিবাহিত যুবতী-রমণীরা ঢাকা-কলকাতা-বোম্বে-করাচী-সিঙ্গাপুরের সবচে দামি ও ফ্যাসনের শাড়ি ও অলঙ্কার পরে নিজেকে সুন্দরী বানানোর যে চেষ্টায় মগ্ন হন, প্রাগৈতিহাসিক সেই যুগেও তার কোন ব্যতিক্রম ছিলনা। তেমনি এক পরিবেশে হেরা, এথেনা এবং এফ্রোডাইটিস নামের তিন সুন্দরী দেবী বসেছিলেন। তাঁরা (হয়তো) গল্প করছিলেন কার পরিধানটি কোন দুস্প্রাপ্য জানোয়ারের চামড়া দিয়ে বানানো হয়েছে, আর কোন দেশের কোন নামকরা শিকারি সে জন্তুটিকে বধ করেছে। মীরপূরের হাতের কাজ বা বেনারসীর শাড়ির তখনো তো প্রচলন হয়নি, ধারণা করা যায় পশুর চামড়া দিয়ে বানানো পরিধানই সুন্দরীদের মাঝে তখন কথোপকথনের বিষয় ছিল। আবার কোন পুরুষ কোন সুন্দরীর দিকে আড়চোখে তাকালো সেসব বিষয়ে মুখরোচক আলাপ হওয়াও হয়তো অসম্ভব ছিলনা। “একেতো নাচনে বুড়ি তার ওপর ঢোলের বাড়ি” এই প্রবাদ বাক্যটির মতোই সেই মুহূর্তে তাঁদের মাঝে দেয়ালের ওপর দিয়ে এসে পড়লো বাইরে থেকে ছুঁড়ে দেয়া সেই আপেলটি।  

একজন সেটি হাতে নিয়ে তার ওপরের লেখাটি পড়ে “আমিই সবচেয়ে সুন্দরী” বলে ফলটিকে পেছনে লুকিয়ে ফেললেন। অন্য দুজন কাছে এসে বললো না না, একটা জিনিস আকাশ থেকে এসে পড়লো আর অমনি সেটা তোমার হয়ে যাবে তা হতে পারেনা, আগে আমাদের দেখতে তো দাও জিনিসটা কি! একে একে আপেলটি হাতে নিয়ে লেখাটি পড়ে সেই দুজনেও বলে উঠলেন “না, আমিই সেরা সুন্দরী, তাই এই আপেলটি আমার”।

 নিজেরা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে সব সময় যা হয় এক্ষেত্রেও তাই হোল, খোঁজ কর এক নিরপেক্ষ ব্যক্তির। কিন্তু মনে মনে তিনজনেই কামনা করলেন সেই নিরপেক্ষ ব্যক্তিটি যেন তাঁর নিজের লোক হয়, অনেকটা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ‘কেয়ারটেকার গভর্ণমেণ্ট’ থেকে যেরকম সুবিধা পেতে চান অনেকটা সেইরকম। তিন সুন্দরী অবশ্য এব্যপারে আমাদের রাজনীতিবিদদের থেকে একটু এগিয়েই ছিলেন! তাঁরা যদিও ‘সুদর্শন কিন্তু মেষপালকের ঘরে বড় হওয়া’ রাজপুত্র প্যারিস’কে নিরপেক্ষ বিচারক বলে সামনে সামনে মেনে নিলেন, তিনজনেই কিন্তু গোপনে তাঁর কাছে ঘুসের মূলোটি সামনে ঝুলিয়ে দিলেন। 

এথেনা বললেন, আমার পক্ষে যদি তোমার রায় যায় তা’হলে ‘ক্ষমতায় গিয়ে’, (মানে ‘সেরা সুন্দরী’) হয়ে ‘আমি তোমার জ্ঞান চক্ষু খুলিয়া প্রজ্ঞা (উইসডম) দান করিব’। দেবী হেরা বললেন ‘তোমাকে আমি সমগ্র এশিয়ার অধিপতি বানিয়ে দেব’, আর দেবী এফ্রোডাইটিস বললেন ‘আমাকে সেরা সুন্দরী দেবী ঘোষণা করলে মিস ইউনিভার্সকে (মানে পৃথিবীর সবচে সুন্দরী নারীটিকে) তোমার হাতে তুলে দেব’। প্যারিস তো আর “পাগল বা শিশু” ছিলেন না যে নিরপেক্ষ হবেন! তার ওপর এতোদিন গরিবের ঘরে মানুষ হয়ে হঠাৎ রাজপ্রাসাদের ভালমন্দ খেয়ে শরীরে যার যৌবনের তুফান বইছিল, কল্পনায় অপরূপ সজ্জায় সজ্জিত মোহনীয় রমণীর লোভ সম্বরণ করে সে নিরপেক্ষ থাকে কি করে? সে যুবক যে পৃথিবীর সেরা সুন্দরীকে সঙ্গিনী হিসেবে পেতে চাইবে তাতে আর আশ্চর্য কি? এফ্রোডাইটিসকেই সেরা সুন্দরী বলে রায় দিয়ে প্যারিস আদালতের এজলাস থেকে নেমে গেলেন। আজকের দিনে হলে বাংলাদেশের আধুনিক কোন যুবক প্যারিসকে অনুকরণ করতেন কিনা হলপ করে বলা যায়না, কারণ সৌন্দর্যের চর্চায় আমাদের এক নেত্রী সুন্দরী হলেও কথার দিক দিয়ে অন্যজন তো একেবারে ফেলনা নন! 

যাইহোক সেরা সুন্দরী দেবী এফ্রোডাইটিস তাঁর কথা রেখেছিলেন। প্যারিসকে পৃথিবীর সবচে সুন্দরী রমণীটি মিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু হায়, হেলেন নামের সেই সুন্দরী রাজা আগামেমনন এর কলেমা পড়ে বিয়ে করা স্ত্রী ছিলেন যে! শুধু আজকের যুগে নয়, পরস্ত্রী অপহরণ যে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগেও ছিল এক গর্হিত অপরাধ! ফলে যা হবার তাই হোল, ট্রয়ের সেই যুদ্ধের কাহিনীতো সবার জানা। হেলেন অপহৃত হলেন, দীর্ঘ দশ বছর ধরে যুদ্ধ চললো, বহু বীর অযথাই প্রাণ হারালো, ট্রয় নগরী ধ্বংস হোল... 

(৫)

খুব অল্প সময়ের মাঝে প্রাচীন গ্রিসের ছবি ও মূর্তির অমূল্য সেইসব শিল্পকর্ম দেখতে দেখতে কেমন একটা সম্মোহিতের ভাব নিয়ে আজকের স্বামী-স্ত্রীর তিনটি জোড়া বেরিয়ে এলো। প্রচণ্ড বাতাস ও মানুষের ভিড়ের বিরুদ্ধে প্রায় আড়াই মাইল পথ হেঁটে, কয়েকবার পথ হারিয়ে পার্ক করা গাড়িটির কাছে ওর পৌঁছে গেল।  

সকালে বল্টিমোরে রওনা হওয়ার সময় তৃতীয় স্বামীটি যদি ট্রয় নগরী ধ্বংসের কথা স্মরণ করে চট্টগ্রামকে বাচাঁনোর জন্য “চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী নেই” বলে থাকতেন তবে নিশ্চিন্তভাবে তাঁকে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক বলা যেতো। কিন্তু ছাত্রাবস্থায় কখনো কখনো দেশপ্রেমের নমুনামূলক দুয়েকটি স্লোগান দিয়ে থাকলেও, বিগত বছরগুলোতে তাঁকে আওয়ামি লিগ বা বিনপি’র পক্ষ নিয়ে কখনো আসর গরম করতে দেখা যায়নি। ফলে আর যাই হোক, তাঁকে তো অন্ততঃ দেশপ্রেমিক বলা যায়না! তাই তাঁর চট্টগ্রাম-প্রীতি নিয়ে এতো উত্তেজিত হওয়ার কোন কারণ গাড়ির আরোহীরা খুঁজে পাননি। সেই কারণে ফেরার পথে সবাই আবার কয়েকঘণ্টা আগের সকালের সেই কথপোকথনে ফিরে গেল।

 পাশে বসা দ্বিতীয় স্বামীটি জিজ্ঞেস করেছিলেন, তা মিউজিয়ামটি বল্টিমোরের কোথায় জানেনতো? 

চালকের আসনে প্রথম স্বামীটি উত্তর দিয়েছিলেন, জানি, এটি নর্থ চার্লস ষ্ট্রিটে। 

দ্বিতীয় স্বামীটি উৎসাহের সাথে বলে উঠেছিলেন, তাই নাকি? জানেন আমি শুনেছি এই নর্থ চার্লস ষ্ট্রিটেই একটি পুরনো দালান আছে, যেখানে দাস কেনাবেচা হোত এই দেড়’শ বছর আগের আমেরিকার গৃহযুদ্ধের (সিভিল ওয়ার) সময় পর্যন্ত। 

গাড়ি চালাতে চালাতে রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়েই প্রথমজন বলেছিলেন, তা’হলে চলুন না এই সুযোগে সময় পেলে সেটিও একটু ঘুরে দেখে আসা যাবে। 

সেসময় গাড়ির মাঝের সারিতে বসে থাকা তৃ্তীয় স্বামীটি বলে উঠেছিলেন, হ্যাঁ সেটা খুব ভাল হবে। আমার খুব আশ্চর্য লাগে মানুষ কিভাবে মানুষকে পণ্য জ্ঞান করে দাস বানিয়ে রাখতো। তার ওপর নিজেদের সভ্য পরিচয় দিয়ে পাশ্চাত্যের লোকেরা কিভাবে মানুষকে কেনাবেচাও করতো! 

কথাটির লাগাম হাতে নিয়ে গাড়ির চালক এবার বলে উঠেছিলেন, দাস প্রথার জন্য শুধু পাশ্চাত্যের লোকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। পৃথিবীর প্রায় সব জাতের, সব ধর্মের লোকদের মাঝেই দাস প্রথার প্রচলন ছিল। আমাদের ইসলাম ধর্মে দাসদের প্রতি সুব্যবহার করার কথা বলা হলেও একেশ্বরবাদী কোন ধর্মেই দাসপ্রথাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়নি। 

দ্বিতীয় স্বামীটি স্বভাবসুলভ শান্তভাবেই বলেছিলেন, তা ঠিকই বলেছেন কিন্তু আন্তর্জাতিক বানিজ্যিক ভিত্তিতে দাস কেনাবেচার জন্য বোধহয় পাশ্চাত্যের লোকেরাই বেশি দায়ি। 

হঠাৎ করে কোথা থেকে দৈত্যাকার একটি মাল পরিবহনের ট্রাক সামনে চলে এলে মেজাজ বিগড়ে যাওয়ায় প্রথম স্বামীটি একটু রুক্ষস্বরেই বলে উঠেছিলেন, আমি তাতে একমত নই। এই ধরুন মার্কো পোলো’র ভ্রমণ কাহিনীতে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে আমরা দাসদাসীর বাজারের অস্তিত্বের কথা জানতে পারি। এমনকি আমাদের খোদ বাংলাদেশেই দাস ব্যাবসার বাজার ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত আমাকে বলেছিলেন যে প্রায় চার’শ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে অনেক দাস সেখানে রফতানি হয়েছিল। তাঁদের মাঝে বাঙালি তিনটি দাসীর নামে সেদেশে তিনটি সড়কের নামাকরণ করা আছে।  

একটু থেমে আবার বললেন, আর বাংলাদেশের দাসপ্রথা জানার জন্য তো দক্ষিণ আফ্রিকায়ও যাবার প্রয়োজন নেই। কথা শেষ করতে গাড়ির পেছনের সারির দিকে মাথাটি কিছুটা ঘুরিয়ে বললেন, আপনাদের চট্টগ্রামেই যে দাসের বাজার ছিল তাতো ইতিহাসেই লেখা আছে। 

উত্তরে তৃ্তীয় স্বামীটি বলেছিলেন, সেটা কি রকম? কোথায় লেখা আছে? 

সামনের মাল পরিবহনের গাড়িটিকে পাশ কাটিয়ে (ওভারটেক) এগিয়ে যেতে যেতে ‘হেহ হে..হেহ হে’ শব্দ করে প্রথম স্বামীটি একটু নাটকীয় ভংগি করে বলে উঠলেন, বাল্যকালে শেখা এই ছড়াটি কি আপনার মনে নেই যে, ‘ধৈর্য ধর ধৈর্য ধর, রাস্তাঘাটে চলতে গেলে অনেক কিছু শিখতে লাগে’... 

তৃ্তীয়জন বেশ অধৈর্যের সাথেই বলে উঠলেন, আমাদের এতো ধৈর্য নেই, যা বলার চটপট বলে ফেলুন দিকি... 

চালক তখন কিছুক্ষণ রাস্তার সামনের দিকে তাকিয়ে, আয়নায় পেছনে এবং গাড়ির দুই পাশে দেখে নিয়ে বললেন, শুনুন তবে। ইবনে বতুতা’র কথা জানেনতো? সাতশ’ বছর আগে তিনি ছিলেন আফ্রিকার মরোক্কো’র এক মহাজ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজকও ছিলেন। পায়ে হেঁটে ও জাহাজে করে তিয়াত্তর হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তিনি তখনকার জানা বিশ্বের প্রায় সবটাই ঘুরে দেখেছেন।  

তৃ্তীয় স্বামীর ধৈর্যের বাঁধ আবার ভেঙ্গে যাওয়ায় বললেন, ইবনে বতুতা যে মধ্যযুগের একজন অন্যতম বিশ্বপরিব্রাজক ছিলেন তা আমরা খুব ভাল করেই জানি। আপনি না জেনে আমার মনে আজন্ম লালিত, পবিত্র জন্মস্থানের নামে একটি কলঙ্ক এঁকে দেবেন তা আমি কোন মতেই হতে দেব না। না জেনে না শুনে মানুষ এভাবেই নিস্পাপ লোককে অপরাধি বানিয়ে ফেলে, বানানো গল্পকে ইতিহাস বানিয়ে ফেলে! আপনি এবার চট্টগ্রাম কিভাবে দাস ব্যবসার বাজার ছিল সেটি আমাদের বলুন তাড়াতাড়ি। 

প্রথম স্বামীটি তখন হাসতে হাসতে বলেছিলেন, আপনার রাগ দেখে ভালই লাগছে কারণ অনেক দিন থেকে দেশছাড়া হলেও আপনার দেশপ্রেম যে একেবারে লোপ পেয়ে যায়নি তা বেশ বুঝতে পারছি। তবে এখানে আপনার রাগ করার কিছু নেই। স্থানটি আপনার চট্টগ্রাম না হয়ে আমার কিশোরগঞ্জও হতে পারতো। তা অবশ্য সাতশ’ বছর আগে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা কিশোরগঞ্জ যদি পৃথিবীর জঘন্যতম কাজটিও করে ফেলতো, তাতে আমার বা আপনার তো কিছুই করার ছিলনা।  

এবার এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় ঢোকার জন্য গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটি ঘুরিয়ে, একটু দম নিয়ে বলে চললেন, ইবনে বতুতা বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং জাহাজে করে আপনাদের এই চট্টগ্রামেই এসে নেমেছিলেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি যে বর্ণনা লিখে গেছেন তাতে দেখা যায় খারাপ আবহাওয়া-পরিবেশ এর দিক থেকে পৃথিবীর এই “নরক”টি দ্রব্যমূল্যের স্বল্পতার জন্য “সর্বোত্তম পণ্যে পরিপূর্ণ”। বিভিন্ন জিনিষের মূল্যের ফিরিস্তি দিতে গিয়ে তিনি যে একটি বিশেষ “দ্রব্যের” বা “পণ্যের” কথা লিখেছেন তা হচ্ছে অত্যন্ত রূপসী একটি দাসী। “মাত্র একটি স্বর্ণমুদ্রায়” তিনি “অত্যন্ত সুন্দরী একটি (ক্রিত)দাসী” ক্রয় করেছিলেন এই চট্টগ্রামের বাজার থেকেই! 

ঠিক এই সময়েই তৃ্তীয় স্বামীটি উত্তেজিত স্বরে বলে উঠেছিলেন, ইবনে বতুতা মিথ্যে কথা বলেছিলেন, আমি জানি চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী নেই, আর আমি বিশ্বাস করি আগেও ছিলনা।     

চালকের আসনে বসা প্রথম স্বামীটি আয়নায় (রিয়ার ভিউ মিরারে) পেছনে বসা বক্তার মুখের প্রতিটি ভাঁজ, এবং তুমুল বেগে মাথা দোলানোর দৃশ্যটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। স্বরে উত্তেজনা থাকলেও মুখে কপট একটা গাম্ভীর্যের সাথে সামান্য হাসির একটু ছোঁয়াও যেন লেগেছিল! কিন্তু তার গলার জোর এতোটাই ছিল যে মূহুর্তেই গাড়ির বাকি পাঁচটি প্রাণীর গুঞ্জরণ মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়ে তাঁর দিকে ঘাড় ফিরিয়ে ব্যপারটি বুঝতে চেষ্টা করছিল। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হোল, আপনার এতো উত্তেজিত হওয়ার কারণ কি? 

তড়িৎ গতিতে উত্তর এলো, চট্টগ্রামে যদি কোন সুন্দরী মেয়ে থাকবেই তবে স্ত্রী খুঁজতে চট্টগ্রামের শহর-জনপদ ছাড়িয়ে, পাহাড়-জঙ্গল-নদী এবং বহুদূরের সীমানা পেরিয়ে, আমাকে অন্য জেলায় যেতে হোল কেন? 

পাশে বসা তৃ্তীয় স্ত্রীটির সারাটি মুখ জুড়ে প্রশস্তি ও পরিতৃপ্তির অপূর্ব এক হাসি এসে এই কিছুক্ষণ পূর্বের থমথমে ভাবটিকে হালকা করে দেয়ার সাথে সাথে গাড়ির সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। বল্টিমোরে যাবার বাকি পুরোটা পথে ক্ষণে ক্ষণে ফিরে আসা সেই অট্টহাসির মাঝে তারা বারবার স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, ইবনে বতুতা আসলেই মিথ্যা কথা লিখেছেন, চট্টগ্রামে আসলেই কোন সুন্দরী নেই!  

(৬)

এখন ইবনে বতুতাকে এই যে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেয়া হোল, তাঁর কোন বংশধরের তা জানার কোন সম্ভাবনা নেই যে এসে গাড়ির আরোহিদের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। তিনি নিজে কবর থেকে উঠে এসে জবাবদিহি চাইবার প্রশ্নই ওঠেনা। আর হাশরের দিনে মিথ্যা বলা ও স্বার্থপর হয়ে অপরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করার যে বিচার হবে সে দিনটি আসতে তো অনেক দেরি। তাই নিজ স্ত্রীকে খুশি করতে তৃ্তীয় স্বামী যে ইবনে বতুতাকে আজ মিথ্যাবাদী বানিয়েছেন, তাতে সায় দিয়ে গাড়ির বাকি চারজনের কোন অপরাধবোধও ছিলনা। কিন্তু বল্টিমোরের মিউজিয়াম থেকে ফেরার পথে সকালের সেই অট্টহাসির কথা মনে পড়ার সাথে সাথে একটি বিপদের কথা চিন্তা করে ভয়ে তাদের সবার বুকের পানি শুকিয়ে গেল! এ বিপদ তারা কি করে সামাল দেবেন? 

বিপদটি হোল যে, এই তিনজোড়া স্বামী-স্ত্রীর বাইরে আরো একটি জোড়া আজকের বল্টিমোর যাত্রায় যোগ দিতে পারেননি। সেই চতুর্থ স্ত্রীটি চট্টগ্রামেরই সন্তান। তার ওপর তিনি যে সুন্দরী তা সবাইতো বটেই নিজেও সম্ভবতঃ ভাল করেই জানেন। এখন ‘ইবনে বতুতা মিথ্যা কথা লিখেছেন’ কথাটির অর্থ দাঁড়ায় এই যে চতুর্থ স্ত্রীটি সুন্দরী নন। বন্ধুদের মাঝে কে বেশি সুন্দরী তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় না নামলেও, এবং প্রত্যেকে নিজেরা যে পরম সুন্দরী তা নিজেরা মুখে না বললেও নিজ-স্বামীর মনে তো এনিয়ে কোন সন্দেহই নেই! কিন্তু কোন মেয়ে বা মহিলাকে ‘তুমি সুন্দরী নও’ একথা বলার মত কোন পাষণ্ড কি ভদ্রসমাজে জন্ম হয়েছে? সে অবস্থায় কোনক্রমে ‘চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী নেই’ কথাগুলো যদি কেউ বলে ফেলে বা বা চতুর্থ স্ত্রীর কানে পৌছে যায়, তাহলে সেই ভয়াবহ ট্রয়ের যুদ্ধের মত আরেকটি যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা কি একেবারেই নগণ্য? 

অথচ একবার যখন চট্টগ্রামেরই একজন শিক্ষিত-বিজ্ঞজনের মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে যে ‘চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী নেই’ আর পাঁচজন লোক তা শুনে ফেলেছে, বিপদটি হয়েছে সেখানেই। আজকের ছয়জনের কেউ নিজ থেকে যেচে না বললেও কাণাঘুষা হয়ে কথাটি যে অনুপস্থিত চতুর্থ স্ত্রীটির কানে পৌছাবেনা তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? নিজে যে আসলেই সুন্দরী সেকথাটি জানা না থাকলে, “চট্টগ্রামে কোন সুন্দরী ছিলনা বা নেই” সেই বচন শুনলে তার কিছুই মনে হোত না। দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার আগেই যদি নিজ সম্পর্কে এমন গর্হিত একটি কথা শুনতে হয় সেটি তিনি কিভাবে সহ্য করবেন? তার ওপর সেই কথাটি যদি এক বন্ধুর মুখ থেকে বের হয়ে আরো পাঁচটি বন্ধুর অট্টহাসিতে পরিণত হয়ে থাকে, সেই চতুর্থ স্ত্রী কি তা সহ্য করতে পারবেন? এর ফলে কি হতে পারে? আত্মীয়-স্বজনহীন এই বিদেশ বিভুঁয়ে বহু বছরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বে তো অচিরেই ফাটল ধরবে। আর একজনকে দিয়ে এই ফাটল শুরু হলে তা যে পুরো এই চারটি পরিবারের মাঝেই ছড়িয়ে পড়বে তাতে কি আর সন্দেহ আছে?

সবাই তখন তৃতীয় স্বামীটিকে ভর্ৎসনা করলেন। নিজ স্ত্রীকে কে না তোষামোদ করে চলে? বাসর রাতে বা নির্জনে একাকি স্ত্রীকে আপনি যে বিশেষণেই ভুষিত করুন না কেন আমাদের তাতে কোন আপত্তি নেই। তার পরেও আপনি নিজ স্ত্রীকে বিশ্বসুন্দরী বানাতে চাইলে কি আমরা বাধা দিতাম? দিতাম না, বরং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য কঠিন কঠিন সব ধাঁধার সঠিক উত্তর শিখিয়ে দিতাম। তা হলে ইবনে বতুতাকে মিথ্যুক বানিয়ে এমন কথা আপনি কেন বলতে গেলেন? চট্টগ্রামের আর দশটি সুন্দরী বিশেষতঃ আমাদের এতো আপন এক সুন্দরীর শত্রু আমাদের বানিয়ে ছাড়লেন কেন?

যাই হোক মুখ থেকে একটি কথা যখন বেরিয়েই গেছে, তা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায়না। এই ছয়টি প্রাণী তাই পরস্পরের সাথে প্রতিজ্ঞা করলেন যে কথাটি কোন ভাবেই যেন চতুর্থ সুন্দরীর কানে না যায়। ট্রয়ের যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে তাঁরা এও সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কথাটি যদি কোনভাবে চতুর্থ স্ত্রীর কানে চলেও যায়, অবস্থা সামাল দিতে আজকের উপস্থিত তিনজন স্ত্রী তাঁকেই সর্বসুন্দরী বলে মেনে নেবেন। তা সত্বেও আশু বিপদের দুশ্চিন্তা লাঘবে এই ছয়জন রাতে শোয়ার আগে ঘুমের বড়ি ও পরম করুণাময় মা’বুদের আশ্রয় নেবেন বলে স্থির করে ফেলেছেন। 

 

১৫ই জানুয়ারি, ২০১২

মেরিল্যান্ড, আমেরিকা

 

লেখকের পুরো নাম সৈয়দ আশরাফউদ্দিন আহমেদ, বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাজ্যে

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ০৯ মে ২০১২ )