প্রবাসে বড়দিন: শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে আমরা
সুবীর কাস্মীর পেরেরা, মেরিল্যান্ড   
শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭

 

বড়দিনের কথা;

খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিন। আজ সারা বিশ্বে জাকজমকের সাথে খ্রষ্টান ধর্মাবলম্বীরা বড়দিন উৎসব পালন করছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান- গ্রীজায় প্রার্থনা, কীর্তন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় সাথে দেশীয় নানা পিঠা, কেক খেয়ে যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন উৎযাপিত হচ্ছে।

বাইবেলের বর্ণনা মতে দুই হাজারেরও বেশি বছর পূর্বে মানব জাতির ত্রাণকর্তা-মুক্তিদাতা যিশুখ্রিষ্ট বেথলেহেমের এক গোসলে জন্মগ্রহণ করেন যীশুর মাতা মারিয়ার সাথে জোসেফ নামের এক সুতোর মিস্ত্রির বাগদান সম্পন্ন হওয়ার পরেই মারিয়া অলৌকিক ভাবে গর্ভবর্তী হয়ে পড়েন ঘটনা জানতে পেরে জোসেফ তাকে গোপনে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ঠিক ওই রাতেই স্বর্গীয় দূত তাকে স্বপ্নে বলেন, মারিয়া পবিত্রার প্রভাবে গর্ভবতী হয়েছেন তিনি ঈশ্বর পুত্র  মারিয়াকে গ্রহণ করতে তুমি ভয় পেয়োনাপরে স্বর্গীয় দূতের এদেশে জোসেফ মারিয়াকে ঘরে তুলে নেয়

 খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের মতে যীশু খ্রিষ্ট এসেছিলেন, মানব জাতিকে পাপ থেকে মুক্তি দিতে  তিনি মাত্র বার বছর বয়েস থেকেই মন্দিরে মনদিয়ে শাস্ত্রীয় পন্ডিতদের সাথে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে তিনি সব শ্রেণীর মানুষের মাঝে ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতে এবং বহু মানুষকে সুস্থ করে তুলেছেন যীশু খ্রীষ্টের প্রথম আশ্বর্য কাজ ছিল, কানান নগরে এক বিয়ে বাড়িতে পানিকে দ্রাক্ষারস রূপান্তর তিনি মাত্র তেত্রিশ বছর বয়েছে ঘাতক জুদাস কর্তৃক ধৃত হয়ে মানুষের পাপের বোঝা কাঁধে নিয়ে ক্রুশীয় লজ্জাজনক মৃত্যবরণ করেন

 প্রবাসে বড়দিন :

 দেশের সীমানা পেরিয়ে এসেও বাঙালি খ্রিষ্টান সমাজ তাদের বাঙালি আচার-অনুষ্ঠান ধরে রেখেছে যেমন ধরে রেখেছে তাদের কৃষ্টি-রীতি-নীতি দেশীয় পদ্ধতিতে বড়দিনের পূর্ব হতেই ঘরে ঘরে বদিনের সাজ সাজ রব পরে যায় প্রতি ঘরে সভা পায় ক্রিসমাস ট্রি, ঝালর বাতি এবং ঘরের বাইরে গোশালা আলোকসজ্জা কারো বাড়িতে শোভা পায় বিশাল আকৃতির সান্তা ক্লজ নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ অর্থাৎ থাঙ্কস গিভিং দিনের পরদিন থেকেই চলে বাড়ি সাজানোর ধুম

অনেকে নানা পিঠা তৈরী শুরু করেও দেন প্রবাসে বাঙালি/ভারতীয় গ্রোসারি স্টোরে পাওয়া যায় চালের গুঁড়া,,গুড় নারকেলসহ পিঠা তৈরির নানা উপকরণ কুলি পিঠা, ভিবিক্ষা পিঠা,পাকন পিঠা,পাটিসাপটা পিঠা আগেই সবাই তৈরী করে রাখে

সংগঠনগুলো ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বাড়ি বাড়ি কীর্তন করে এই সময় প্রতি বাড়িতে কীর্তনীয়াদের বড়দিনের নানা ধরণের পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় আবার কারো কারো বাড়িতে রাতের খাবারে আয়োজনও করা হয় শিশু-কিশোর, যুব-যুবা, বয়স্ক সবাই কীর্তনে অংশ নিয়ে বাড়ি বাড়ি যীশুখৃষ্টের জন্মের বার্তা পৌঁছে দেয় কীর্তন বড়দিনের একটি বিশেষ অংশ কীর্তন ছাড়া বড়দিন পানসে মনে হয়

বড়দিনের দিন সবাই এক সাথে গির্জায় যায় গ্রেটার ওয়াশিংটন এলাকায় বিশেষ বাংলা খ্রীষ্টযাগ উৎসর্গ  করা হয় প্রতিবছর এই খ্রীষ্টযাগে দুই হাজার বাঙালি খ্রিষ্টান মিলিত হয়ে জিসির জন্মতিথি উদযাপন করেন খ্রীষ্টযাগ শেষে সবাই শুভেচ্ছা বিনিময় করে, ছোটরা বড়দের আশীর্বাদ নেয় এবং সবাই গির্জায় এক সাথে কীর্তন করে

 এর পর চলে বাড়ি বাড়ি কীর্তন বড়োদিনে সবার বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হয় পোলাও, মুরগির, গরু,খাসির তরকারি, ভিবিন্ন ধরণের ভর্তা এবং সাথে তো পিঠা থাকবেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করে বেড়াতে আসে যেন প্রবাসে মিলন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এভাবেই চলে যায় বড়দিনের বিশেষ আনন্দঘন মুহূর্ত

 শান্তি সম্প্রীতির বন্ধনে আমরা :

 সম্প্রতি সময়ে ক্যাথলিক ধর্মগুরু পুণ্যপিতা বাংলাদেশ সফর করে গেলেন তিনি বয়ে এনেছিলে শান্তি সম্প্রীতির বার্তা বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ ক্ষুদ্র খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুণ্যপিতার আগমন বলে দেয় বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পোপ ফ্রান্সিসকে সাদরে বরণ করে নিয়েছেন তিনি ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু হয়েও সব ধর্মের মানুষের কাছ থেকে পেয়েছে অকৃতিম আপ্যায়ন ভালোবাসা ভ্যাটিকান সিটিতে ফায়ার গিয়ে তিনি বার বার বাংলাদেশের কথা মানুষের কাছে বলেছেন এই তো শান্তি এই তো সম্প্রীতি

প্রবাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলিম হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে একত্রে এক আত্মা হয়ে শান্তিতে বসবাস করে আসছে তার বড় প্রমান মিলে এক সাথে জাতীয় উৎসব পালন সার্বজনীন ধর্মীয় উৎসব পালনের মধ্যে দিয়ে জাতীয় অনুষ্ঠানে কে হিন্দু, কে মুসলিম কে বৌদ্ধ বা কে খ্রিস্টান  আলাদাভাবে কোনো পরিচয় থাকেনা  . তখন সবাই এক কাতারের বাংলাদেশি বাঙালি  পরিচয় বুকে ধারণ করে

ধর্মীয় উৎসবে ঈদ মিলন মেলা, ঈদ পুনর্মিলনী, পূজা মন্ডবে কিংবা বড়দিন পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নেয় কেবল মাত্র প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে এখানেই প্রবাসীদের সম্প্রীতি  যেখানে সম্প্রীতি থাকবে সেখানেই বাস করবে শান্তি

বড়দিন হলো ধর্মীয় উৎসব এই উৎসব তখনই সার্থক হবে যখন আমরা মনের দিকে বড় হয়ে   সবাইকে কাছে টেনে নেই অন্যকে গ্রহণ করার মধ্যে বড়দিন লুকিয়ে থাকে অতি দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, সারা বিশ্বে আজ অশান্তির দাবানল জ্বলছে আর তা হচ্ছে শুধু মাত্র কতিপয় রাষ্ট্র প্রধানের কারণে তাদের লাগামহীন বক্তব্য এবং সিদ্ধান্ত ধর্মীয় অনুভূতিতে যেমন আঘাত হানছে আবার দেশের ভিতরে জ্বলিয়ে দিচ্ছে অশান্তির আগুন এই রাষ্ট্র প্রধানরা আবার পালন করবে বড়দিন উৎসব হাসি মুখে অতিথি আপ্যায়ন করবে শুভেচ্ছা বাণী দিবে সংবাদপত্রে এই ধরণের উৎসবকে বড়দিন বলা যায়না যীশু খ্রিষ্ট কখনো এমনও পরিবেশে মানুষের মাঝে আসতে চায়না তিনি পবিত্র মনের মধ্যে বার বার জন্মগ্রহণ করেন এবং আমরা প্রতি বারই বড়দিন উৎসব পালন করি

 এই বড়দিন হোক শান্তি সম্প্রীতির জেরুশালেমসহ সারা বিশ্বের সকল ধর্মের মধ্যে একাত্মতা বিরাজ করুক সাথে যে সকল রাষ্ট্র প্রধান বিশ্বে অশান্তির বীজ বপন করে যাচ্ছে, এই বড়োদিনে আমাদের প্রার্থনা হোক যীশু খ্রীষ্টের জন্মের মধ্যে দিয়ে যেন তাদের মন পরিবর্তন হয়

সবাইকে বড়দিনের শুভেচ্ছা আগামী বছর হোক বিশ্ব শান্তি সম্প্রীতির
সর্বশেষ আপডেট ( শনিবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭ )