একটি অনুপম গল্প : নীল নক্ষত্রের অক্ষভূমি ঘিরে
মনিরুজ্জামান   
শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭

সমাজবিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সপ্তসপ্ততিতম বর্ষীয়ান (১৯৪০– ২০১৭) প্রফেসর অনুপম সেনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। ১, অবসর গ্রহণ২০০৬ সালের কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চার জন প্রফেসর প্রায় একই সাথে আমরা অবসর গ্রহণ করি। তাঁদের মধ্যে আমি (বাংলা বিভাগের) ছাড়া বাকি তিন জন হলেন অধ্যাপিকা হামিদা বেগম (পদার্থবিজ্ঞান),অধ্যাপক সিকানদার খান(অর্থনীতি) এবং অধ্যাপক অনুপম সেন (সমাজতত্ত্ব)। আমরা যারা কাগজে কলমে সমবয়সী, সরকারি হিসাবে একই সমান, তারা আগের বছর এলপিআর ভোগ করে এ বছর বিদায় নিলাম।  বলে রাখা যায়, আমাদের আবার সবারই আলমামেটারও এক, মানে আমরা সবাই ছাত্র ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের । সেই অর্থে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আমাদের সতীর্থ ও সাথী ছিলেন আরও কেউ কেউ, যেমন প্রয়াত এখলাসউদ্দিন (পদার্থ বিজ্ঞান),প্রয়াত মোকাদ্দেসুর রহমান (ইতিহাস), প্রয়াত জিয়া হায়দার (নাট্যকলা), মাহফুজুর রহমান (অর্থনীতি), মুহাম্মদ ইউনূস (পরে গ্রামীণ ব্যাংক), হারুন–উর রশীদ (ইংরেজি), এবং গোলাম মোস্তফা (পরিসংখ্যান)। তাঁরা আগেই অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন বা গত হন।আমাদের অবসরগ্রহণকালে তখন সদ্য হওয়া উপাচার্য ছিলেন ড. বদিউল আলম। চারটি বিভাগ থেকে চারজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষকের বিদায়ের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ যেন একটা শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল তখন। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এটাও একটা বড় রকম ধস বটে! যাঁদের কারণে এই দুর্ঘটনা, বা যাঁরা এর অনুঘটক, সেই চার জনের অন্যতম সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড.অনুপম সেন সমকালীন শিক্ষক–রাজিনীতির অন্যতম নক্ষত্রও। উল্লিখিত নটকূলের মধ্যে জস্ম মাসের হিসাবে সম্ভবত তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর দিন (১লা অক্টোবর, ২০০৬) থেকেই তিনি আবার প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি একাধারে সমাজবিদ, রেনেসাঁ–বিশেষজ্ঞ, অনুবাদক–কবি এবং সংগঠক। সমাজতত্ত্ব ছাড়া এসব দিকেও তাঁর বহু কাজ আছে। তাঁর প্রধান গ্রন্থ : The State, Industrialisation And Class Formations in India (1982)। তাঁর অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা ও পুরস্কারেও ভূষিত হন।
তিনিই আমাদের আজকের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব ও এই গল্পের লক্ষ্যবিন্দু।
২.স্পর্শ–প্রভাব : গোর্কির স্বাতন্ত্র্য লাভের সৃষ্টিশীল দর্শন
এ গল্পের নায়ক অনুপম সেন হলেও এ কাহিনীতে নারদ কিংবা গণেশের মতো লিপিকারের ভূমিকায় আমিও যেন অনেকখানিই মিশে গেছি এখানে। সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে তিনি যে সমকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকের মত আমার কাছেও প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন সে গল্পটা আগে করে নিতে হয়। সব মানুষই তার পরিবেশের কাছে কোনোও না কোনোও ভাবে ঋণী থাকে, ঋণী হয়। আমার বেলায়ও তার কোনও ব্যতিক্রমতো হয়ইনি, বরং আরও কিছুটা বেশিই ঘটেছে। বলতে দোষ নেই আমি ছিলাম বেশ অনুকরণপ্রবণ। আজও বেশ মনে পড়ে. এক এক সময় আমি একএক জনকে অনুকরণ করতে চাইতাম । কারও হাঁটা, কারও কথার ভঙ্গি নকল করা এসব ছিল আমার এক একটা বিশেষ সময়ের বিশেষ খেয়াল। যেমন ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আমাদের সিনিয়র ছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথের হাফেজ’ বলে খ্যাত কায়কোবাদ ভাই (পরে অধ্যাপক), ছিলেন বহুভাষী সিনিয়র বন্ধু নেয়ামাল বাসির(এখন প্রয়াত)- এঁদেরকে খুব পছন্দ করতাম,অনেক কিছু শিখেছিও তাঁদের কাছ থেকে। তেমনি আনিস স্যারের (প্রফেসর আনিসুজ্জামান পদ্মভূষণ)হাতের লেখা ও গদ্যের ঢং আমি নকল করতে চাইতাম। অবশ্য আজও তাঁকে আমার আদর্শ মনে করি। এমনি আরও কারও কারও কথাও আজ মনে পড়ে। অন্য বিভাগেও আমার বন্ধুসংখ্যা কম ছিল না। তাদের মধ্যে অর্থনীতির অধ্যাপক সিকান্দার খান, ড. ইউনূসের কথা বলে থাকি অনেক সময়। স্বাধীনতার ঠিক আগেআগে বা সত্তুরের দিকে অনুপমকেও পেলাম সামনে। আমি সস্ত্রীক তাঁর নালাপাড়ার বাসাতেও বেড়িয়েছি এবং সে স্মৃতি মনে হলে এখনও আনন্দ পাই।চিন্তা–ভাবনার দিক থেকে তিনি অনেক উঁচুতে ছিলেন সত্য, তবে সমাজচিন্তার দিক থেকে মনে হয়েছিলো আমরা কাছাকাছি। তাছাড়া আমাদের সহকর্মীদের গণ্ডিতে তিনি ছিলেন যেমন ধৈর্যশীল তেমনি গতিশীল।একটু আগে বয়সের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু তবু অনুপম সেন তাঁর শান্তস্বভাব আর উচ্চ চিন্তার কারণে আমাদের, বিশেষত আমার কাছে ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠলেন। এই অনুকরণটা অনুসরণ নয়, এটা আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা। তাতে পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যই বোঝায়। মানুষ ও পণ্ডিত হিসাবে অনুপমের গুণ আমাকে যে টেনেছে তাতে আমার ক্ষতি হয় নি। রুশ সাহিত্যে এই স্বাত্যন্ত্র সূচক সৃষ্টিশীল প্রভাবের কথা বা তত্ত্বটা দেখা যায়। গোর্কি পড়তে গিয়ে আমি তা বুঝেছি। এটাকে ‘অনুকরণ’ বা ‘ঋণ’ বা প্রভাব যাই বলা যাকনা কেন, নিজেকে তৈরি করার লগ্নে এই দিকটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে প্রসঙ্গে গোর্কির একটি উক্তি আমার মধ্যে কাজ করেছে। সে কথাটাও বলা দরকার।
গোর্কির প্রসঙ্গটা এজন্য বলছি যে, ছাত্রজীবনেই সমাজ–চিন্তায় মন মজেছিলো আমার ।এর জন্য মনে হয় সে সময় পড়া মার্ক্সবাদী সাহিত্য ও পত্রিকাদির (‘নতুন সাহিত্য’ প্রভৃতি) প্রভাবই দায়ী । আমাদের সময় ঢাকার বাংলাবাজার– সদরঘাট এবং গুলিস্তানের সামনের ফুটপাতগুলিতে রুশ সাহিত্যের অনুবাদ, লাল চীনের সাহিত্য প্রভৃতির যেন হাট বসতো। বিশেষত ’৫৪–র যুক্তফ্রন্ট গঠনের দিনগুলিতে। তারই ফল হলো ঊনসত্তরের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমচিন্তকদের প্রতি মনোযোগ ঘটা। আর সেই সময়ই সামনে এলো অনুপম সেন। বিচিত্র কি, পূর্বজীবনের রেশ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ গ্রহণকারী অনুপমের সমাজ–চিন্তা আমাতেও ভর করলো।
আমাদের সময়ের যাঁরা শিক্ষকতায় এসেছেন, প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁদের জীবনটা তাঁদের ছাত্রজীবনেরই এক রকম বর্দ্ধন। বায়ান্নর প্রায় পরপর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সে দুর্মদকালও উদ্ধত সময়ের যুবকদের মধ্যে প্রগতির প্রভাবটা চারিয়ে উঠেছিল বেশ। আলাউদ্দিন আল আজাদ–গাফ্‌ফার চৌধুরী থেকে ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ও তাঁদের উত্তরসূরিরা তখন সাহিত্যে এবং পথসভা বা পথসংগ্রামে তরুণদের মাতিয়ে রেখেছিল। কুমিল্লা–চট্টগ্রামেও এগিয়েছিলেন কলিম শরাফী, আসহাবউদ্দিন– ডা: কামালদের সাথী ও অনুবর্তীগণ. ঢাকা থেকে আগত ভাষা–আন্দোলনের প্রতিনিধি খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, রুহুল আমিন নিজামী প্রমুখ এবং পাশাপাশি সক্রিয় থাকা ‘সুকান্ত–কবি’ মাহবুবুল আলম চৌধুরী ও তাঁর সহযোদ্ধাগণ যেমন,হরিখোলার মাঠের সাংস্কৃতিক কর্মী ও ‘প্রান্তিক নবনাট্য সঙ্ঘের’ শিল্পীবৃন্দসহ আরও অনেকে।
অনুপম–এর বেড়ে ওঠার সময়টা ছিল এটাই এবং চট্টগ্রামের এই বর্ণিত পরিবেশে। তাঁর ঢাকার ছাত্রজীবনও ছিল আমাদের সমান্তরাল সেই উত্তাল কালেরই। বাকিটা (পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড) সূর্যসেন–বিনোদ বিহারী চৌধুরী–কম্যুনিস্ট নেতা নির্মল সেন এবং কবি–ভাস্কর শশাঙ্কমোহন সেন প্রমুখের প্রভাব–পরিবৃত্তে। তাঁর স্বাতন্ত্র্য এমনিতেই তাই প্রঃস্ফুটিত হওয়ার কথা। তাঁর প্রতি আমাদের আকর্ষণটা এ দিক থেকেও ছিল স্বত:স্ফূত । বলেছি আমার স্বাতন্ত্র্য তাতে ক্ষয়িত হয় নি। কারণ ’প্রভাব’ যতখানি প্রয়োজন, তাকে গ্রহণ করার বা কাজে লাগাবার সৃজনশীলতাও ততখানি আবশ্যক । দুয়ের সমন্বয়েই ঘটে সৃষ্টি । গোর্কির কথায় তা লক্ষ্য করা যাবে।
গোর্কির কথা আগে উল্লেখ করেছি, সেটি তাঁর ‘জবানবন্দি’তে আছে। সেক্সপীয়ারের সমকালীন কবি রবার্ট গ্রীনের একটি গল্পের অংশ এটি। তা এই রকম।– এক রাজা তার কোনও প্রজাকে উচ্চ মর্যাদা দিয়ে বড় করতে চাইলে সে বললো, আমরা চাষী–মজুর শ্রেণী, বাপদাদাদের মতই বেঁচে থাকতে চাই। যদি তাতে সামান্য কিছুও করে যেতে পারি তাই হবে সম্মানী মানুষদের কৃতিত্বের তুলনায় ঢের।– ’tis more credite to men of base degree, / To do great deeds,than men of dignitie.– বড় হবার ইচ্ছায় সাধারণ মানুষ (‘Man of base degree’) কারও না কারও আদর্শকে সামনে রেখেই হয়তো জীবনের পথে এগোয়। সেই অনুসৃত আদর্শটি নিজের যোগ্য হলে, তার এগিয়ে চলার পথে তা–ই তাকে আত্মনির্ভরও করে তোলে। তখন তা সামান্য হলেও অসামান্যতা পায়। গোর্কি এ জন্যই ‘প্রভাবে’র কথা বলেছেন জোর দিয়ে।এবং তার ফল কোন দিক দিয়ে কিভাবে ফলবে তার ইঙ্গিতও দিয়েছেন এইচরণে। বিস্তৃত করে বলেছেন, ‘আমি গোগোল,টলষ্টয়, টুর্গেনিভ, গনচারভ, ষ্টয়ভস্কি এবং লেসকভের লেখা রুশসাহিত্যের শ্রেয় বইগুলি পড়ি। লেসকভের বিস্ময়কর জ্ঞান ও ভাষার সমৃদ্ধি আমায় নিঃসন্দেহে প্রভাবান্বিত করে।… শেকভ বলেছেন, লেসকভের কাছে তিনি গভীরভাবে ঋণী। এই সম্পর্ক ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করছি তার কারণ যে এ কথাই আবার আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, একজন লেখকের পক্ষে রুশ ও বিদেশী সাহিত্যের ইতিহাস জ্ঞান একান্ত প্রয়োজন।’ তিনি এও বলেছেন,’ তরুণ লেককদের আমি ফরাসি ভাষা শিখবার পরামর্শ দিই, যাতে তারা এই সব সাহিত্যিক (বালজাক, জোলা, আনাতোল ফ্রাঁস)মহারথীদের মৌলিক লেখা পড়তে পারেন এবং তাঁদের কাছ থেকে ভাষাবিন্যাসের কলাকৌশল শিখতে পারেন।’ অনুপম সেন মননী লেখক, সৃষ্টিশীল লেখক হযতো নন। গোর্কির বয়ান সেই অর্থে এখানে সেভাবে প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রভাবেরও দিক থাকে। আমি গোর্কির প্রসঙ্গটা সেখানেই টেনে আনতে চাই। আদর্শ অনুসরণের ক্ষেত্রে আমি কারও জীবনচিন্তা বা ধারাকে রক্ষা–বৃত্ত ভেবে তার মাঝেই নিজেকে উপস্থাপন করেছি, তা বলি নি। এখানে আমার ভূমিকা শুধু সেই নিচুতলার মজুর শ্রেণীর, মানে ‘বেজ ডিগ্রি’র মানুষের মত।তবে গোর্কির ভাষায় বা তাঁর চিন্তানুসারে যাকে বলা যায়, ক্রমশ: যে আত্মসচেতন হয়ে নিজেকে চিনে নিতে পারে।
গোর্কির মতই সেক্সপীয়রী যুগের এই গল্পটা আমিও বহু জায়গায়ই ব্যবহার করি, তবে অন্য ভাবে । আমার মধ্যেও এ বিশ্বাস জন্মালো যে, কাউকে অনুকরণ করে বড় কিছু করে দেখানোতে বাহবা নেয়ার কিছু নেই। নিজের সাধ্যের মধ্যে থেকে সামান্য কিছু করার তৃপ্তিটাই বড়, অন্তত অনেক। এ দুয়ের মাঝে সুখ ও সার্থকতার তাই পার্থক্য আছে। অনুপমের অনুকরণীয় আকর্ষণীগুণ থেকে আবার আমি গোর্কির দর্শনের দিকে ফিরে গেলাম। তবে মাঝখানে একটা ঘটনা ঘটে গেল। সে গল্পটা বললে বিষয়টা পুরো বোঝা যাবে। যদিও একই সময় মানুষের ওপর একাধিক ব্যক্তির প্রভাব থাকাও অসম্ভব নয়। কখন কে কার ওপর কোন প্রভাব ফেলে, সেটা সচেতনভাবে ও নিশ্চিতভাবে সব সময় কি বলা যায় ? তবে হয়তো তার একটা স্পর্শ–প্রভাব দূর থেকেও অনুভব করাই যায়। আমার কাহিনী বা গল্পটা সে ভাবেই গড়ে উঠলো।একটা সাজানো বাগান রইলো স্বপ্নের ভিতরে আর অনুপম রইলো আমার কাহিনীর নটে গাছটি হয়ে। সেটা পেছন থেকে এই রকম।–
৩. কবিতা, সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতির দূরত্বে সেবারে অগ্রহায়ণেই আবহাওয়ার বেশ পরিবর্তন দেখা গেল। সকালের হাওয়াটা পল্টনের ঝালমুড়ি বিকেলের মাঠেও বেশ লাগছিলো গায়। একটা পাতলা মাফলার পেঁচিয়ে নিলাম গলায়। ঢাকা স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে মনে পড়লো কিছুদিন আগেও এখানে একটা গাছের নিচে সম্পাদক–কবি আহসান হাবিবকে বাদামওয়ালা ছোকরাটার কাছ থেকে এক ডিবি বাদাম আর ঝালমরিচ নিয়ে একা একা বসে বসে খেতে দেখতাম। হয়তো এখানে এভাবেই তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলি লেখা হতো। তার উল্টো দিকে ডিআইটির ঘড়িটা। সে আর কত আগে? কিন্তু সময় মুছে গেছে এরই মাঝে । এখন আর দৈনিক পাকিস্তানের সেই কবি নেই, পাকিস্তানও নেই, নেই পণ্টনের মাঠও। ঘড়িটা অন্যরকম সাজে সময় দেখিয়ে যাচ্ছে এখন। আহসান হাবিব আমাদের দেশের একজন বড় কবি ছিলেন। আমিও ভেবে ছিলাম কবিই হবো। ‘অধ্যাপক–শাসিত সাহিত্যে’র কথা তো শোনাই যায়। তেমনিভিন্ন পেশার লোকেরও তো কবি হতে তো বাধা নেই। কত রাজনীতিবিদ (সত্যেন সেন), কত ব্যারিস্টার–আইনজীবী (প্রমথ বিশী, অতুল প্রসাদ), অর্থনীতিবিদ (সানাউল হক), কত বিজ্ঞানী বা পদার্থ বিজ্ঞানী (রাজশেখর বসু, সুকুমার রায়), কত ইঞ্জিনিয়ার (যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত) বাংলা সাহিত্যকে উজালা করে গেছেন ! আমিই বা ব্যতিক্রম হবো কেন? তেমনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন শুনেছি ছাত্রদের লিটল ম্যাগে অনুপম সেনও লেখেন, তার মানে সমাজবিজ্ঞানী হয়েও অনুপম তাহলে একজন চমৎকার কবিও। (তিনি যে সৃষ্টিশীল চিন্তারও অধিকারী, সৃজনশীল প্রকৃতির মানুষ,-এটা অবশ্য পরে আরও সত্য করে জেনেছি তাঁর কবিতার বই দেখে। বাঙালি মাত্রেই কবি কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়,তবে কাব্যসাধনই অনুপম সেনকে সমাজবিজ্ঞানী হতে প্রেরণা জুগিয়েছে কি না এই রহস্য ভেদের কৌতূহল ছিল আমার বহুদিন ।)
যখন কলেজের চাকরিতে ছিলাম,গান লিখতাম প্রচুর। ফাঁকেফুঁকে গল্পও। কোনটাকে প্রাধান্য দেব সেই চিন্তা মাথায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জানলাম পিএইচ.ডি. করতে হবে। বন্ধুরা ডিগ্রি করে ফিরছে . অনেকে থেকেও যাচ্ছে নানান বিদেশে। আহসান হাবিবের মেঠো দৃশ্যটা কৃষ্ণনগরের হুঁকো হাতে মাটির বুড়ো পুতুলের মত মাথা নাড়তো স্বপ্নের ভিতর। এখন ক্রমে দূরে সরে যেতে লাগলো। কি করি? তাঁর অফিসেই কাজ করেন হাসান হাফিজুর রহমান। তিনিও কবি। তাঁর বন্ধু আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক–সহকর্মী আনিসুজ্জামান পিএইচ.ডি. করেছেন, কিন্তু জগন্নাথ কলেজে থাকতে বা এখনও হাসান ভাই তা করেন নি। কবিতা বা গল্প নিয়ে পিএইচ.ডি করা যায় না? আমি তাঁর কাছে প্রায়ই যেতাম। সেদিন থিসিস নিয়েই কথা বলতে গেলাম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাহিত্যপত্রিকা’র জন্য তিনি কবিতার বিষয়েই একটা দীর্ঘ লেখা লিখছিলেন। লেখা থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বুঝিবা একটা উন্মনা ভাব লক্ষ্য করেই বল্লেন. ‘কবিতা বোঝা এবং বোঝানো দুইই কঠিন।’ ব্যস, তাঁর কথায় আমার চিন্তাটা একটা সমাধানহীন সমস্যার মত মাথার ভেতর বোঁ বোঁ চক্কর খেতে লাগলো। কোথায় যেন ছেদ ঘটলো আমার ভেতর। সর্বক্ষণ তাড়া করা আহসান হাবিব আর সেই পণ্টনের গাছতলাটা ফাঁকা হয়ে যেতে লাগলো কেমন, এবং শেষে আর দৃশ্যমান থাকলোনা। আমি পড়লাম বিপাকে, কি করবোএথন ?
এসে গেল ঊনসত্ত্‌র। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে (চট্টগ্রাম) শিক্ষকদের সরগরম সভা। আসছেন আবু সাঈদ চৌধুরী। আসছেন শামসুল হক। চাপ আসছে আয়ুবী দশকের নানা হুল্লোড়ের। তখন সিনিয়র শিক্ষকদের ব্যস্ততার ফাঁকে সেই সব সভায়, সেমিনারে এবং বিশেষ করে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে এক তরুণ অধ্যাপক তাঁর দ্রোহী আচারে, বক্তব্যে এবং উদার ব্যবহারে, আপ্যায়নে প্রগতি দলের সকলকে আকৃষ্ট করলো; এবং আরও তীব্রতরভাবে আমাকেও । প্রথম থেকেই তাঁর সংস্কৃতি–চর্চার ধরন ও পড়াশোনার ধাঁচটা বুঝতে আমার দেরি হলো না। শুনলাম তিনি সমাজবিজ্ঞানের।খুব পরিচিত নন, মনে হলো সদ্যই এসেছেন। আমি এসেছি (৬৮–তে) চিটাগাং কলেজ হয়ে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে চাকরি আর জীবনের উন্নতির জন্য, আর বুয়েট ্‌এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অনুপম এসেছেন স্বভূমির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেবা দিতে। অর্থাৎ তিনি স্থানীয়, মানে এখানকারই। ভাবলাম তাঁর সাথে মিশতে হবে। কিন্তু তিনি গায়ে পড়ে মেশার লোক নন। আমার মধ্যে যেমন একটু ‘তরলপনা’র ভাব আছে, তাঁর মধ্যে তেমনি দেখতামবন্ধ–বাৎসল্যের মাঝেও একটা দার্ঢ্য–রূপ. যাকে বলা যায় ‘অয়োময়তা’ (অবশ্য ঠিক গাম্ভীর্যও নয়)। ফলে একটা নৈকট্যের মাঝেও কেমন দূরত্ব থেকে গেল । রাজনীতি আমার ’দূরের বাদ্য’, তিনি তার বিপরীত। আর আমি তো গাল্পিকও নই, তাই হলাম আমি ‘অপরিচয়ের বান্ধব এক সঙ্গবিহীন সঙ্গী’।পরের নহন্যতির গল্পই এখন তবে বলা যাক।
৪. গবেষণার অন্ধ গলিতে ও মঞ্চে
স্বাধীনতার পর কলকাতা থেকে ফিরে অনুপম চলে গেলেন কানাডায় উচ্চ ডিগ্রির জন্য। আমরা একজন বুদ্ধিমান ও দীপ্ত তরুণ সহকর্মীর অভাব বোধ করলাম। অবশ্য শীঘ্রি মশাররফ হোসেন,হাসানুজ্জামান, ইমাম আলি এবং আরও অনেকেই ততদিনে এসে গেছেন ঐ বিভাগে এবং বিশেষত: প্রফেসর আনিসুজ্জামানের কারণেই আমাদের বাংলা বিভাগের সাথে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা জন্মাতেও বিলম্ব হয়নি।
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭ )