খারাপটা বাদ দিয়ে কি ভালোবাসা হয়?
সারা বুশরা   
বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭
  
দেশের মানুষদের প্রায়ই আক্ষেপ করে একটা কথা বলতে শুনি। সেটি হলো দেশটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। খাবার দাবার থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসাক্ষেত্র থেকে শুরু করে ওষুধ পথ্যি সবকিছুতেই দুই নম্বরি। তার ওপর আছে ঢাকা শহরের অসহনীয় ট্রাফিক জ্যাম। পালানোর উপায় থাকলে পালাতাম। যারা দেশের বাইরে থাকে তারা কতই না ভালো আছে! যখন এগুলো শুনি আমি ভীষণভাবে দুঃখিত হই। নিজের মতো করে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করি, সব জায়গায়ই প্লাস মাইনাস দুটোই থাকে। হ্যাঁ, এটা সত্যি অনেক ক্ষেত্রেই দেশের অবস্থা খারাপ এবং আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি তারা খাবার দাবারের ভেজাল থেকে মুক্ত। সুচিকিৎসা ও সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমাদের সন্তানরা বঞ্চিত হয় না। ক্যারিয়ারও যেকোনো বয়সে শুরু করা যায়। কাজ না পেয়ে কেউ বেকার থাকে না। ইত্যাদি নানাবিধ সুবিধা পেয়ে আমরা প্রবাসীরা এখন অভ্যস্ত। তবু কেন জানি এখনো আমার কাছে উন্নত বিশ্বের সকল লোভনীয় সুযোগ, মানসম্মত ও নিরাপদ জীবনযাত্রার থেকে বাংলাদেশের সবকিছু হাজার গুণ বেশি অভিপ্রেয়।

আমি প্রায়ই বলি, কেন আমাদের সময় কি এসব অরাজকতা ছিল না? তবুও তো আমরা ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই তো কাগজে রোজ কোনো না কোনো খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, সন্ত্রাসের খবর দেখেছি। তবুও তো কখনো দেশকে খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা মাথায় আসেনি। রাস্তায় জ্যাম তো তখনো ছিল। এর মধ্যেই তো আমরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। ওই ধুলোবালি, ময়লা, কড়কড়ে রোদ, ভ্যাপসা গরম এসবের মধ্যেই তো আমাদের বেড়ে ওঠা। কই আমরা তো কখনো অসুস্থ হইনি।

অনেকে হয়তো এখন বলবেন, একটি ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির নাগরিকত্ব নিয়ে নিশ্চিন্তে বসে দেশের প্রতি এ রকম আলগা ভালোবাসা দেখানো খুব সোজা। যারা প্রতি মুহূর্তে দেশে বিভিন্ন কষ্ট, অসুবিধা ও হেনস্তার শিকার হচ্ছে তারাই জানে তাদের জন্য এভাবে টিকে থাকা কত কঠিন। কথাটি হয়তো যারা ভুক্তভোগী তাদের জন্য সত্যি কিন্তু তার মনে এই নয় যে, আমাদের ভালোবাসায় খাদ আছে। দেশের সন্তানদের একটা বড় অংশ যদি দেশের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থাকে তাহলে দেশের নাম, দেশের সংস্কৃতি দেশের ভাষা পুরো পৃথিবীর মধ্যে বিস্তৃত করবে কারা? দেশকে ভালোবাসি বলেই না দেশকে কিছুটা ভার মুক্ত করার কথা ভাবি। আমাদের ছোট্ট সুন্দর দেশটায় যখন প্রয়োজনের অধিক এবং আশঙ্কাজনকভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকে তখন কাউকে না কাউকে তো জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে। না হলে ভারসাম্য রক্ষা করা কি আদৌ সম্ভব?

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, দেশের বাইরে থাকলেই দেশের প্রতি আসল টানটা অনুভব করা যায়। যখন দেশে ছিলাম তখন এত গভীরভাবে কখনোই অনুভব করিনি। অথচ এখন প্রতি মুহূর্তে দেশের কথা ভাবি। ব্যাপারটা হয়তো অনেকটা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বোঝার মতো। দূরে গেলেই আমরা কোনো কিছুর সঠিক মূল্য অনুধাবন করতে পারি যেটা কাছে থেকে করা হয়ে ওঠে না। তাই যখন দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলি, আর তাদের কাছ থেকে দেশ নিয়ে বিভিন্ন নেগেটিভ কথা শুনি তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। যত অসুবিধাই হোক, যত সমস্যাই থাকুক তবু ওটাই আমাদের জন্মভূমি, সবচেয়ে আপন জায়গা, আমাদের অস্তিত্ব, ওখানে আমাদের শেকড় এ কথা কি করে ভুলি?

আমি আমার জন্মভূমি, আমার দেশকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসা কখনো খারাপটুকুকে বাদ দিয়ে শুধু ভালোটুকু নিয়ে হয় না। ভালোবাসতে হয় পুরোটা মিলিয়ে। আমিও ঠিক তাই করি। হাজারো দোষে গুনে, সমস্যায় গড়া ওই বাংলাদেশটাকেই আমি ভালোবাসি। নিজে বাসি আর নিজের সন্তানকেও সেভাবেই ভালোবাসা শেখাতে চেষ্টা করি। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ আমার তিন বছরের কন্যাকে নিয়ে এবার যখন আমি দেশে গিয়েছিলাম তাকে আমি দেশের কাদামাটি দিয়ে খেলতে দিয়েছি। পয়লা বৈশাখে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পুরোটা রাস্তায় আরও শত শত শিশুর সঙ্গে ধুলোর মধ্যে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়েছি। তাকে আর দশটা দেশে বসবাসরত শিশুর মতোই স্থানীয় সস্তা আইসক্রিম থেকে শুরু করে জুস, নুডলস আরও অনেক খাবার খেতে দিয়েছি। সে বাংলাদেশে গিয়েই প্রথম মশা দেখেছে এবং মশার কামড় খেয়েছে। প্রচণ্ড গরমে দরদর করে ঘামতে ঘামতেও হাসি মুখে মামা খালাদের সঙ্গে বসে বাংলা কথা বলা শিখেছে। তাকে আমি রিকশায় চড়া শিখিয়েছি। নীলক্ষেত, নিউ মার্কেটেরের ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা দিয়ে তাকে নিয়ে আমি রিকশায় চড়ে একাধিকবার পরিবাগ পর্যন্ত গিয়েছি।

এই প্রতিটা ব্যাপার সে অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, কোনো রকম অসুখ বিসুখ বা অন্য কোনো সমস্যা তার হয়নি। হলেও আমার সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হতো না। আমি আবার যখন দেশে যাব আমার কন্যাকে আমি সেইভাবেই রাখব যেভাবে তার সমসাময়িক বাকি শিশুরা থাকে। তাকেও সেটাই ফেইস করতে হবে যেটা অন্যরা করে। যত প্রতিকূলতাই থাকুক তবু সে বাংলাদেশকে ভালোবাসবে যেমন তার মা বাসে। ইংল্যান্ডে ফিরে এসে সেও ততটাই বাংলাদেশকে মিস করবে যেরকম করে তার মা করে। এটুকুই আমার আকাঙ্ক্ষা। যেন আমি বলতে পারি অন্য একটি দেশে জন্মগ্রহণ করে এবং তার নাগরিক হয়েও যদি বাংলাদেশকে বাংলাদেশের দোষ–ত্রুটি, দুর্বলতাসহ গ্রহণ করে তাকে অন্তর থেকে আপন ভাবা যায়। তাহলে দেশে বাস করে দেশের প্রতি অবজ্ঞা ভাবটা বাদ দিয়ে অভিযোগগুলো একটু কম করে আনা যায় না?

সারা বুশরা: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী।
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ )