“আমার অনেক বাঁশের বাঁশী আছে, মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ...”
ফারুক ওয়াহিদ, ক্যানেটিকাট থেকে   
শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭

বিশিষ্ট মরমী কণ্ঠশিল্পী ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী- পূর্ণ নাম আবদুল বারী সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলায় এক সঙ্গীতজ্ঞ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি একাধারে কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার, ও বংশীবাদক। তাঁর জন্ম মাসেই তিনি ৬৩ বছর বয়সে জন্ম-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অনেকদিন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন- অবশেষে তাঁর মুত্যু ঠেকানো যায়নি বাংলাদেশ সময় ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে অর্থাৎ রাত বারোটার পর হওয়াতে ২৪ অক্টোবর আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে চিকিৎসকরা তার ছেলেকে মৃত্যুর সংবাদ দেন। ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে আর অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিচালক ও মুখ্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বারী সিদ্দিকীর গান ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর বাউল গানের সুরে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। একটি অনন্য গানে তিনি গেয়েছিলেন- “শুয়া চান পাখি আমার শুয়া চান পাখি,/ আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি?/   তুমি আমি জনম ভরা ছিলাম মাখামাখি,/ আজি কেন হইলে নীরব, মেল দুটি আঁখি রে পাখি;/ আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি?” অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাস হাসপাতালে তিনি চিরদিরে জন্য নিরব হয়ে গেলেন- আর কোনোদিন তাঁর ঘুম ভাঙবে না। 
অতি শৈশবেই পরিবারের কাছে গান শেখায় হাতেখড়ি হয় এই বিশিষ্ট গায়কের। মাত্র ১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু। তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ অসংখ্য গুণীশিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন।
সত্তরের দশকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাথে যুক্ত হন। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও বাঁশির ওপর নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সাথে ক্ল্যাসিক  মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন। এছাড়াও তিনি গোপাল দত্ত ও ওস্তাদ আমিনুর রহমানের কাছ থেকে লোক এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাঠ নিয়েছেন। বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী ১৯৯৫ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘রঙের বাড়ই’ নামের একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এরপর ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে ৭টি গানে কণ্ঠ দেন। এর মধ্যে ‘শুয়া চান পাখি’ গানটির জন্য তিনি অতি দ্রুত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে- ‘শুয়াচান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’ এবং আরো অসখ্য গান। তিনি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন- তাঁর গানের অসংখ্য অডিও অ্যালবাম বের হয়েছে।
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে বাঁশির সুরে সবাইকে বিমোহিত করেন। তিনি চলচ্চিত্রে কণ্ঠদান ছাড়াও একাধিক গান রচনা করেছেন। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে সিদ্দিকী ফেরারী অমিতের রচনা ও পরিচালনায় পাগলা ঘোড়া নাটকে প্রথমবারের মতো অভিনয় করেন। তার গানের একাধিক অ্যালবাম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দুই বাংলায় বিশেষ করে গ্রাম-বাংলায় বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর বাউল গানের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী- মানুষ তন্ময় হযে তাঁর গান শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় এবং নীরবে চোখের জল ফেলে এবং তাঁর গান গাওয়ার সময় প্রকৃতিওে একধরনের নীরবতা চলে আসে। 
বিখ্যাত একটি আবেগ মাখানো গানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী অত্যন্ত দরদ দিয়ে গেয়েছেন- ‘আমার অনেক বাশের বাঁশি আছে, মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ’- এ গানটি শুনে অশ্রুশিক্ত হননি দুইবাংলায় এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না- এমন কি বারী সিদ্দিকী নিজেও গানটি পরিবেশন করার সময় স্বাভাবিক থাকতে পারেন না। 
https://youtu.be/zEQbcsMieIo

“আমার অনেক বাশের বাঁশি আছে,
মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ।।
আমি বারী বাঁশরিয়া
বাঁশি যে মোর প্রাণপ্রিয়া।।
তা না হলে বাঁশির ভেলায় ভাসাইয়া দে লাশ
আমার অনেক বাঁশের বাশি আছে,
মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ।।
ছোট বড় মধ্যম চিক্কন অনেক বাঁশি আছে
খাটিয়াটা বাঁশির হবে আরজ তোদের কাছে।।
আমি বারী বাঁশরিয়া
বাঁশি যে মোর প্রাণপ্রিয়া।।
লেখাপড়া করছি আমি করছি ডিগ্রি পাস
আমার অনেক বাঁশের বাশি আছে,
মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ।
আমার মনের অন্তিম ইচ্ছা তোরা মেনে নিবি
যেখানেতে বাঁশেরই ঝাঁড়, সেথায় কবর দিবি।।
শোন সবাই মন দিয়া, জন্ম নিব বাঁশী নিয়া।।
পুনঃজন্মে বিশ্বাসী না, তবু মনের আশ
আমার অনেক বাঁশের বাঁশী আছে
মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ।।
আমি বারী বাঁশরিয়া
বাঁশি যে মোর প্রাণপ্রিয়া।।
তা না হলে বাঁশির ভেলায় ভাসাইয়া দে লাশ
আমার অনেক বাঁশের বাঁশি আছে,
মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ।”
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা [২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া]
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭ )