বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর বনাম নিশান-ই-হায়দার মিনহাজঃ কে আসল বীর?
আরিফ রহমান   
বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মৃত্যুদিন, একই সাথে মতিউরের খুনি পাকিস্তানী তথাকথিত বীর রশিদ মিনহাজেরও মৃত্যুদিন। বীরদের যেই বীর, বাংলার ঈগল মতিউর রহমানের বিমান নিয়ে পালিয়ে আসার রোম খাঁড়া করা গল্প আমাদের সবার জানা। মতিউর রহমানকে নিয়ে কিছু অজানা তথ্যের কথা বলবো আজ। তারপর নির্মোহ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে দেখবো কাকে বীর বলা যায় আর কেন বলা যায়। লেখাটা সম্পূর্ণ পড়ে দেখার অনুরোধ রইল। একাত্তরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর সপরিবারে দুই মাসের ছুটিতে আসেন ঢাকা। ২৫ মার্চের ভয়াবহতা দেখে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলেন মতিউর। বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন । মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুললেন একটি প্রতিরোধ বাহিনী ৷ ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানী বিমান বাহিনী এফ-৮৬ স্যাবর জেট থেকে তাঁদের ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে ৷ মতিউর রহমান আগেই আশঙ্কা করেছিলেন ৷ তাই ঘাঁটি পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তাঁর বাহিনী ৷

এরপর, ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকা আসেন ও ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান। সিদ্ধান্ত নেন বিমান নিয়ে ভারতে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করবেন। ২০ আগস্ট শুক্রবার ফ্লাইট শিডিউল অনুযায়ী রশিদ মিনহাজের উড্ডয়নের দিন ছিলো। মতিউর পূর্ব পরিকল্পনা মতো অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে। সামনে পিছনে দুই সিটের প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩। শিক্ষানবিশ রশিদ মিনহাজ বিমানের সামনের সিটে বসে স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসতেই তাঁকে ক্লোরফরম অজ্ঞান করে ফেলে দিয়ে বিমানের পেছনের সিটে লাফিয়ে উঠে বসলেন।

জ্ঞান হারাবার আগে মিনহাজ রেডিওতে বলে ফেললেন, তিনি সহ বিমানটি হাইজ্যাকড হয়েছে। ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ তাদের দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার শুনতে পেল তা। বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতিউর বিমান নিয়ে ছুটে চললেন। রাডারকে ফাঁকি দেবার জন্য নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে অনেক নিচ দিয়ে বিমান চালাচ্ছিলেন তিনি। রেডিও বার্তা শুনে চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশীদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশীদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন এবং বিমান উড্ডয়নের উচ্চতা কম থাকায় রশীদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

মতিউরের সাথে প্যারাসুট না থাকাতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃতদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়। রশীদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে মিনহাজের মৃত্যুর জন্য গর্ববোধ করে ৩০ আগস্ট, ১৯৭১ এ ‘আমরা গর্বিত’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে আল্লামা মতিউর রহমান নিজামীর বয়ানে। পরবর্তীতে, ১ সেপ্টেম্বর ‘শহীদ মিনহাজের জীবনের শেষ কয়েকটি মূহুর্ত’ শিরোনামে পরিবেশিত সংবাদে মতিউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক ও মিনহাজ রশীদকে শহীদ বলে আখ্যায়িত করে। ৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ছাত্র সংঘের প্রধান নিজামী মিনহাজের পিতার কাছে একটি শোকবার্তা পাঠান। সেই শোকবার্তায় নিজামী বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে ভারতীয় এজেন্ট বলে উল্লেখ করে। সেখানে নিজামী আরো বলেছিল যে পাকিস্তানী ছাত্রসমাজ তার পুত্রের মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হানাদার ও এজেন্টদের মোকাবেলায় মহান মিনহাজের গৌরবজ্জল ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর।

সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে পাকিস্তান সরকার রশিদ মিনহাজকে শহীদের মর্যাদা দেয়। তাকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘নিশান-ই-হায়দার’ এ ভূষিত করা হয়। তার নামে পাকি বিমান বাহিনীর একটা ঘাঁটির নামকরন করা হয়, করাচীর একাধিক রাস্তার নামকরন হয়। ২০০৫ সালে তার ছবি সংবলিত দুই টাকার একটি ষ্ট্যাম্পও বের হয়।

সম্ভবত এটা পৃথিবীতে এক বিরলতম ঘটনা- যেখানে একই ঘটনার দুই পক্ষের দু’জন লোক দুটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব প্রাপ্ত হয়েছিলো এবং বল বাহুল্য আজকে রশিদ মিনহাজেরও মৃত্যু দিন।

আলোচনাটা এখানেই শেষ করে দেয়া যেতো।
কিন্তু না আজ এখানে শেষ হবে না-
বলবো আরও কিছু কথা।

অনেকের মন প্রশ্ন আসতে পারে মতিউর যেমন দেশের জন্য, সত্যের জন্য জীবন দিয়েছে একই ভাবে রশিদও তার দেশ পাকিস্তানের জন্য জীবন দিয়েছে। দুটো ঘটনা ব্যালেন্সের চিন্তা মাথায় আসার আগেই একটা শব্দ চিন্তায় আনা কর্তব্য বোধ করি। শব্দটা হচ্ছে “কনসাসনেস” বা “সচেতনতা”।

যুক্তির বিচারে আসুন দেখি দুইজনই এক সাথে সঠিক হওয়া সম্ভব কি না?

আজ যদি কেউ বলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কোন ব্যাক্তি জানতেন না যে বাংলাদেশের সাথে তাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধ করছে এমন কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। এখন সেই যুদ্ধটার কথা জানার পর একজন সাধারণ অবস্থান কি হওয়া উচিত। রাষ্ট্র যেটা করে সেটাকে অন্ধ সমর্থন দেয়া?

নিশ্চয়ই না; একজন মানুষ হিসবে তার উচিত যুদ্ধের যৌক্তিকতা যাচাই করা। আসলে কার ভুল কার ঠিক সেটা চিন্তা করা। ধরে নিন আজকের দিনে আমাদের সরকারের নির্দেশে বিনা কারণে বিনা উসকানিতে সেনবাহিনী যদি রাজশাহীতে লাখ লাখ মানুষের ওপর গনহত্যা চালায়, ইচ্ছামত মা-বোনদের খুন-ধর্ষণ করে তাহলে আমার করনীয় কি সরকারকে বাহবা দিয়ে অফিস করতে যাওয়া? নিশ্চয়ই সেটা যৌক্তিক না। একজন আর্মি পারসন হিসেবে আমার চেষ্টা থাকবে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে রাজশাহীর আপামর জনতার পক্ষে দাঁড়ানো, একজন লেখক হিসেবে আমার চেষ্টা থাকবে এই বর্বরতার কথা পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়ার। আর সেটা না করে আমি যদি সেই গণহত্যার অংশ হই তাহলে আমাকে বীর বলা হলে বীরদের অপমান হবে।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় একজন পাকিস্তানী সাংবাদিকের কথা ।

৭১ এর প্রথম দিকে একাত্তরে আসলে কি ঘটছিল পূর্ব-পাকিস্তানে সেটা পৃথিবীর মানুষ খুব একটা জানত না। টুকটাক নিউজে হয়ত দেখা যেত খানিক গণ্ডগোলের কথা, কিন্তু পুরো চিত্রটা মানুষের কাছে পরিস্কার ছিল না। পরিস্কার করেছিলেন যে মানুষটি বিস্ময়কর হলেও সত্য তিনি ছিলেন একজন পাকিস্তানী। পাকিস্তানী সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাস ছিলেন প্রথম মানুষ যিনি সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন। ৭১ এর এপ্রিলে যখন সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষদের ওপর নির্বিচারে নিপীড়ন চালাচ্ছিল হত্যা করছিলো, ঠিক তখনই পাকিস্তানী সরকার সংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাসকে যুদ্ধাবস্থার প্রতিবেদন তৈরির জন্য সেখানে আমন্ত্রণ জানায়। শাসক শ্রেণী ধারণা করেছিল মাসকারেনহাস তাদের মিথ্যা প্রচারণায় সায় দেবে। কিন্তু তারপরে ঘটনা ইতিহাস, এন্থনি মাসকারেনহাস সেই কাজটাই করলেন যেটা একজন বিবেকবান মানুষের করা উচিত মানুষেরঃ

১৯৭১ সালের ১৮ মে মঙ্গলবার তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে এসে হাজির হন লন্ডস্থ দি সানডে টাইমসের কার্যালয়ে। জানালেন, পূর্ব বাংলা ছেড়ে ৫০ লক্ষ লোককে কেন চলে যেতে হয়েছে তার পেছনের কাহিনী তিনি জানেন। এবং এও বললেন এই কাহিনী লেখার পর তার পক্ষে আর করাচি ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। তিনি জানালেন তিনি পাকিস্তানে আর ফিরে না যাবার ব্যাপারে মনস্থির করেছেন; এজন্য তাকে তার বাড়ি, তার সম্পত্তি এবং পাকিস্তানের সবচেয়ে সম্মানীয় একজন সাংবাদিকের মর্যাদার মায়া ত্যাগ করতে হবে।

তার মাত্র একটি শর্ত ছিলঃ পাকিস্তানে গিয়ে তার স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তানকে নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত যেন তার রিপোর্ট প্রকাশ না করা হয়।

সানডে টাইমস রাজি হয় এবং তিনি পাকিস্তানে ফিরে যান। দশ দিন অপেক্ষা করার পর সানডে টাইমসের এক নির্বাহীর ব্যক্তিগত ঠিকানায় একটি বৈদেশিক তারবার্তা আসে। তাতে লেখা ছিল, ‘আসার প্রস্তুতি সম্পন্ন, সোমবার জাহাজ ছাড়বে।’ দেশত্যাগ করার ব্যাপারে স্ত্রী ও সন্তানদের অনুমতি পেতে ম্যাসকারেনহাস সফল হন। তার দেশত্যাগের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে তিনি কোনোরকমে একটা রাস্তা পেয়ে যান। পাকিস্তানের ভেতরে যাত্রার শেষ পর্যায়ে তিনি প্লেনে একজন তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে দেখতে পান যাকে তিনি ভালোমতোই চিনতেন। এয়ারপোর্ট থেকে একটি ফোনকল তাকে গ্রেফতার করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তবে কোনো ফোনকল হয়নি এবং তিনি মঙ্গলবার লন্ডনে এসে পৌঁছান।

মাসকারেনহাসের পাশে রশিদ মিনহাজকে দাঁড়া করানো হলেই বোঝা যাবে ‘বীর’ কিংবা ‘শহীদের’ মত সম্মানের শব্দ রশিদ মিনহাজের হাস্যকর হাঁটু-বুদ্ধির, অবিবেচক, অথর্ব সামরিক অফিসারের সাথে বড়ই বেমানান, গোটা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জন্য অসম্মানের।

কারণ ইতিহাস দেশ বিচার করে না, ইতিহাস বিচার করে সত্য। সত্যের বিচারে একজন দেশপ্রেমিক মতিউরের হত্যাকারীকে কেবল পশু বলা যেতে পারে… বীর নয়… কখনো নয়…।

হায় মতিউর!
তুমি মিনহাজকে মারতে চাও নি…
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ )