এইতো আমার অহঙ্কার!
নাজমা রহমান, মেরিল্যান্ড   
বৃহস্পতিবার, ০২ নভেম্বর ২০১৭

প্রিয় শহর ঢাকা।
প্রিয় শিক্ষাঙ্গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একদা এই শিক্ষাঙ্গনের মাঠ ঘাট আলো করে ঘুরে বেড়াতাম আমি তুমি এবং আমরা। সে কবে! কতকাল আগে! পৃথিবীর পথে হেঁটে হেঁটে কোথা থেকে কোথায় চলে এলাম! তবু হটাৎ কখনো পিছনে ফিরে তাকালে মনে হয় এইত সেদিন। ওইতো, ওই দেখা যায় এক দঙ্গল বালক বালিকার সাথে আমিও বসে আছি। বসে আছে বুলি, রুবি, তুহফা জামান, সারওয়ার সুলতানা, মেভিস জেসমিন, শিরীন জাহাঙ্গীর আরো কত সহপাঠী। পলিটিক্যাল সাইন্স ক্লাস চলছে।
সামনের উঁচু ডায়াসে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছেন প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক।  লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসে স্যার হ্যারল্ড ল্যাস্কির ছাত্র ছিলেন তিনি।  ক্লাসটাও নিচ্ছেন হ্যারল্ড ল্যাস্কির ‘প্লুরেলিজম’ এর উপর। ‘দ্যা ফাউণ্ডেশন অফ সোভারিনিটি’ থেকে বোঝাচ্ছেন। থিওরি অব পপুলার সোভারিনিটি, দ্যা প্লুরেলিষ্টিক স্টেট। খদ্দরের সাদা পাঞ্জাবি পরা রাজ্জাক স্যার নরম অথচ দৃঢ়  গলায় বলছেন – Laski argued that the state should not be considered supreme, because people could and should have loyalties to local organisations, clubs, labour unions, and societies. The state should respect these allegiances and promote pluralism and decentralisation...  বলতে বলতে ‘প্রবলেম অফ সোভারিনিটি’ হয়ে গিয়ে থামলেন ‘অথরিটি ইন দ্যা মডার্ন স্টেট’ এর মাঝে। ভুলো মনের এই বিশাল জ্ঞানি মানুষটা পড়াতে পড়াতে প্রায়ই এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে সরে যেতেন।
যেমন সেদিনও সরে গিয়েছিলেন
তবু তন্ময় হয়ে শুনতাম আমরা তার অসাধারণ পর্যালোচনা।     
কতদিন আগের কথা। তবু সবই জীবন্ত মনে হয়।

আজো কত স্পষ্ট দেখতে পাই পটে আঁকা সেই ছবি।
ছবিটা নীলক্ষেতের।
পথটা আজো ঠিক তেমনি আছে। পথের দু’ধারে তেমনি করেই ফোটে কৃষ্ণচুড়ার ফুল। মনে হয় গাছে গাছে আগুন লেগেছে। আগুনের শিখার নিচ দিয়ে কলরব তুলে হেঁটে যায় কাঁচা তরুণ প্রাণ। যেন উড়ন্ত বহ্নি শিখার দল। কিন্তু ওরা আমি নই। তুমি নও। অন্য কেউ।

একদিন আমরাও অমনি করেই উড়ে বেড়াতাম। কলা ভবন, কার্জন হল আর এনেক্স বিল্ডিঙের এদিকে ওদিকে। কখনোবা লাইব্রেরী, টি এস সি অথবা  রোকেয়া হল।
ছবিগুলো গেঁথে আছে বুকের গভীরে। তাকে মাঝে মাঝে বের করে দেখতে ইচ্ছে করে। আর তাইতো গেঁথেছি এই মালিকা। “ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলামনাই ফোরাম ইঙ্ক” বা ‘ডুয়াফি’।
গ্রেটার ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এরিয়া বাসী (মেরিল্যান্ড, ডিসি ও ভার্জিনিয়া) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্যাজুয়েইট দের নিয়ে।
দেশ থেকে দশ হাজার মাইল দূরে।

আর মাত্র ক’টা দিন বাকি।
চার নভেম্বর বসবে ডুয়াফির (ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলামনাই ফোরাম ইঙ্ক)মিলন মেলা – জীবনের ছন্দে আনন্দে। হারবার্ট হুভার্ট মিডল স্কুলের বিশাল অডিটোরিয়ামে। ছন্দে আর আনন্দে আমরা আবারো হারিয়ে যাবো সেই হারানো দিনগুলিতে। মেতে উঠবো ফেলে আসা দিনের মতই গান, গল্প আর কথার মৌতাতে।    
কিন্তু এই মৌতাতের সৃষ্টি হয়েছিল কবে?

সে এক ইতিহাস।   
বাংলাদেশের প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন হয় ১৯২১ সালে। অবিভক্ত ভারতে।  
সেখানে তখন চলছে ব্রিটিশ রাজ। ব্রিটিশ রাজত্বের আরেকটু পিছনে যাই।
১৯০৫ সাল।
লর্ড কার্জন তখন ভারতের ভাইসরয়। তারি উদ্যোগে বঙ্গভঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে সৃষ্টি হলো দুটি আলাদা প্রভিন্স - পূর্ব বাংলা ও আসাম। ঢাকা হল তার রাজধানী।  
১৯১১ সালে ঘটনা চক্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়ে গেল।   
এই ঘটনায় ক্ষুব্দ হয়ে উঠলো পূর্ব বাংলাবাসী। তাদেরকে সান্তনা দিতে লর্ড কার্জন ঘোষণা দিলেন ঢাকায় একটি উচ্চ মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে।
ঘোষণার বাস্তবায়ন হোল।
আমরা পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  
 
পহেলা জুলাই, ১৯২১ সাল।
সকাল থেকে সেদিন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। কার্জন হলের লাল রঙা বারান্দা পেরিয়ে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে এলেন এক সুদর্শন ইংরেজ। ডঃ ফিলিপ জোসেফ হেরটগ। এসে বসলেন ভাইস চ্যান্সেলরের আসনে।
ধীরে ধীরে ৮৭০ জন ছাত্র ও ৬০ জন শিক্ষকের কলরবে মুখরিত হয়ে উঠলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর।  
ওরা মনের আনন্দে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আদলে তৈরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
রমনা এলাকার ৬০০ একর জমির উপর তৈরি হওয়া তিনটি ফ্যাকাল্টি, বারোটি ডিপার্টমেন্ট ও তিনটি আবাসিক হল। এত কিছু! এর সবই কি আমাদের! আনন্দে আকুল নবীন প্রাণ।
 
সেইত শুরু।
এরপর আরও কত নবীন প্রাণ এল আর গেল। একে একে কেটে গেছে প্রায় ছিয়ানব্বই বছর।
এখন ২০১৭ সাল।   
৮৭০ এর জায়গায় প্রায় ৩৫০০০ শিক্ষার্থী আজ। আরো আছে ১৩ টি  ফ্যাকাল্টি, ৭১ টি ডিপার্টমেন্ট, ১০ টি ইন্সিটিউট, ১৭ টি আবাসিক হল, ৩ টি হোস্টেল, ৪০ টি রিসার্চ সেন্টার ও ২০০০ জন শিক্ষক।

শুধু কি লেখাপড়া!
লেখাপড়ার বাইরেও আরো অনেক দিকে ছড়িয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  
অবদান। শুরুর পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল ভূমিকা রেখেছে। সঙ্কটে সংশয়ে সদাই নেমেছে তারা কাণ্ডারি হয়ে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম সবখানেই দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আধিপত্য।
 
গত পচানব্বই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। ছোট বড় হাজারো কর্মে রেখেছে আপন প্রজ্ঞা ও মেধার সাক্ষর। দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাস। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
শিক্ষায় মানে মর্যাদায় ছুটে চলছে অনাদিকালের পথে আমাদের এই মানুষ গড়ার কারখানা – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সেই আমাদের আনন্দ। সেই আমাদের অহঙ্কার।
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ০২ নভেম্বর ২০১৭ )