নিউইয়র্কে হামলার হিসাব নিকাশ
সাহেদ আলম   
বৃহস্পতিবার, ০২ নভেম্বর ২০১৭
৩১ অক্টোবর নিউইয়র্কের শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য আরেকটি বড়ই দুঃখের দিন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার রেশ গত ১৭ বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিমরা। গত জাতীয় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম পরিচয় ভীতি বেড়ে গেছে বহুগুনে। অবস্থা এমন যে এখানে যখনই ছোট-বড় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তখনই মুসলিমরা দোয়া কালাম পড়তে শুরু করেন, যে এই ঘটনার যেন কোন মুসলিম নামের ব্যক্তির দ্বারা না ঘটে! ক্যালিফোর্নিয়ার সানবার্নাদিনোতে একটি মাতৃসদন এ হামলার পর ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে একটি সমকামী নাইট ক্লাবে হামলার ঘটনায় দুজন মুসলিমের নাম এসেছিল। সেই ধাক্কা এখনও সামলায়ে উঠতে পারেনি মুসলিমরা, এমনকি দল হিসেবে মুসলিমদের সমর্থনকারী হিলারী-ওবামার ডেমোক্রাট দলও এ নিয়ে নানান কটুক্তি শুনে আসছে।

এরই মধ্যে যদিও, আরো অনেকগুলি ঘটনা ঘটেছে, তবে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গত মাসে ঘটেছিল নেভাডার লাস ভেগাস শহরে। একটি উন্মুক্ত গানের অনুষ্ঠানে গুলি চালিয়ে অর্ধশত মানুষকে মেরে ফেলার পেছনের ব্যক্তি হিসেবে সামনে আসে, স্টিফেন প্যাডক নামের এক শেতাঙ্গ আমেরিকান এর নাম। সে সময় হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমরা। কিন্তু ৩১ অক্টোবর, নিউইয়র্কের হামলায় আবার আগের অবস্থানে চলে এসেছে, মুসলিম বিদ্বেষ প্রচারণা। এই প্রচারণার নায়ক খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।


প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কের এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর ২৪ ঘন্টাও সময় নেননি, একটি আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করতে। যদিও ধর্মের ভিত্তিতে তিনি কাউকে দোষারোপ করেননি প্রত্যক্ষভাবে, তবে তিনি পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘আমাদের রাজনৈতিকভাবে সঠিক’ (পলিটিক্যালী কারেক্ট) কথা সব সময় বলা উচিৎ নয়। সেখানে তিনি, এই ঘটনার নিন্দা জানানোর পর পরই বলেছেন, ডাইভারসিটি অর্থাৎ বৈচিত্রপূর্ন অভিবাসন শব্দটি শুনতে ভাল লাগে, তবে এটি ভাল নয়।

রিপাবিলকানরা এর আগে ডাইভারসিটি লটারী ভিত্তিক অভিবাসন এর বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু ডেমোক্রাটরা শুনেনি। আমি কংগ্রেসকে (আইনসভা) বলেছি, এখনই ডাইভারসিটি অভিবাসন বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে। এসময় তিনি ডেমোক্রাট দল যাদের সময়ে-ই পাশ হয়েছিল ডাইভারসিটি লটারী অভিবাস, তাদেরকে দায়ী করেন, এবং এককভাবে বর্তমানে সিনেটে ডেমোক্রাট প্রধান নিউইয়র্কের সিনেটর চাক শুমারকে দায়ী করে বলেন, চাক শুমার-ই নাকি সবচে বড় ভূমিকা রেখেছে এইসব সন্ত্রাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আইনি বৈধতা দিয়ে।

চাক শুমার অবশ্য বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন এবং দুঃখজনকভাবে সমস্যার আসল সমাধানে নির্দেশনা না দিয়ে তিনি তার পূর্বের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছেন। শুমার বলেন, আপনি অ্যান্টি টেরোরিজম (সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলর ফান্ড) প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ আশঙ্কাজনক ভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। এইসব রাজনীতি না করে, আসলেই সন্ত্রাসীদের উপর নজরদারী বাড়াতে আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে অ্যান্টি টেরোরিজম ফান্ডের অর্থ ছাড়ে ব্যবস্থা নিন।

স্বভাবতই, চাক শুমার এবং ডেমোক্রাট দলকে আবারও মাঠে অনেক গালি শুনতে হবে, কট্টর মুসলিম বিরোধীদের তরফে। ট্রাম্প এবং তার কর্মী সমর্থকদের লাগামহীন প্রচারণায়, অনেকটা কোনঠাসা অবস্থানে, নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও। তিনি তার রাজনৈতিক বাজি’র একটি অবশ্যই বৈচিত্রপূর্ণ অভিবাসন বা ডাইভারসিটি ইমিগ্রেশন এর পক্ষে ধরে রেখেছেন অনেকদিন ধরেই। আর সেই বৈচিত্রপূর্ণের সমতা আনতে তিনি মুসলিমদের সাথে সিটি প্রশাসনের দূরত্ব কমিয়েছেন অনেক খানি-ই। তিনি সময় করে বিভিন্ন মসজিদে যান, মুসলিমদের সাথে মত বিনিময় করেন। একই অবস্থান নিউইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর এন্ড্রু কুমোরও।

সেই অবস্থানে বড় ছেদ পড়ার শঙ্কা তৈরী হয়েছে কেননা, এক সপ্তাহের মাথায় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচন। সেখানে, ব্লাজিওর বিরুদ্ধে প্রচারণার অর্থই হলো, রিপাবলিকান প্রার্থীর ভোট বাড়া। যদিও জরিপে কোন ভাবেই রিপাবিকান সমর্থিত র্প্রাথী নিকোল মেলোটাকিস, ধারে কাছেও নেই ব্লাজিও’র তবে সেটা পরিবর্তন হতে কতক্ষণ? মনে মনে মানুষ কি ভাবছে তার হিসাব কোথাও পাওয়া মুসকিল। সেটা প্রমাণিত হয়েছে গত বছরে হিলারী-ট্রাম্পের মধ্যকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে। এর মধ্যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঢোল নিয়ে মাঠে নামতে সময় নেননি।

অবশ্য, সবাই যে একই ভাবে ভাবছে না, সেটার প্রমাণ সামাজিক গণমাধ্যমে নানান ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যাচ্ছে। ডাইভারসিটি লটারী বন্ধ সংক্রান্ত সিএনএন এর একটি সংবাদ শেয়ার করে, নোরা বার্নস নামের একজন শেতাঙ্গ আমেরিকান নারী লিখেছেন, ‘বাহ! বেশ ভাল। কিন্তু জানতে পারি কি, লাসভেগাস গণহত্যায় যেখানে অর্ধশত মানুষকে গুলি করে মেরেছিল এক সন্ত্রাসী, তার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন কি পদক্ষেপ নিয়েছে?

সব শ্বেতাঙ্গদের কি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বন্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে? এই নারী আরো লিখেছেন, আইএস এবং এর শকুনেরা, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যত মানুষের মৃতের জন্য দায়ী তার চেয়ে দ্বিগুন হারে আমাদের নিজেদের গুলিতেই মরছে মানুষ। কিন্তু সেই দিকে নজর দেবে না ট্রাম্প, বরং তার ইচ্ছা অনুযায়ী মুসলিম বিদ্বেষকে সে বাড়িয়েই তুলবে, যেটা সবার শান্তিকেই বিনষ্ট করবে বলে আমার বিশ্বাস’।

আগামি ৭ নভেম্বর নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচন। তার আগেই এমন একটি ঘটনা ঘটলো যা, নির্বাচনে সামগ্রিক কোন প্রভাব ফেলবে কিনা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে, অভিবাসন ব্যবস্থায় যে দারুন প্রভাব ফেলবে, সেটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। কেননা, ডিভি লটারীতে বাংলাদেশীয় আবেদনকারীদের কোটা পুরণ হয়ে গেলেও, এখনও বিশ্ব ব্যাপী নানান দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ আসছেন। সেই পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

তবে, তখন এই ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল অভিবাসন কমে গেলেও, মেধার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন গড়তে চান যারা, তাদের ব্যাপক সুবিধা আসতে পারে বলেই আলোচনা হচ্ছে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের জন্যেই, অভিবাসন স্রোত বন্ধ করার সুযোগ নেই। সেটা চালু রাখার পথে নিরাপদ অভিবাসন পন্থাগুলি কেমন হবে, সেটা নিয়েই হচ্ছে এখনকার বিচার বিশ্লেষণ।

১ নভেম্বর ২০১৭ নিউইয়র্ক, আমেরিকা।

সাহেদ আলম: সাংবাদিক, কলাম লেখক।
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ০২ নভেম্বর ২০১৭ )