উপহার বাংলাদেশ মেলার ২৭তম আসর অনুষ্ঠিত
নিউজ-বাংলা ডট কম   
বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭

বাংলা স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীদের  আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের মাঝে বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ইঙ্ক (বিসিসিডিআই) আয়োজনে ২৭তম উপহার বাংলাদেশ মেলা অনুষ্ঠিত হল গত ২১শে  অক্টোবর ভার্জিনিয়া রাজ্যের আর্লিংটনস্থ  কেনমোর মিডল স্কুল  অডিটোরিয়ামে।  ১৯৯১ সাল থেকে ধারাবাহিক ভাবে এই উপহার মেলার আয়োজন চলছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এই বছরের মেলায়  ছিল ভিন্নতা। ছিম ছাম সাজানো গোছানো এই অনুষ্ঠানের প্রান ছিল বাংলা স্কুলের আনন্দময়ী ছাত্র/ছাত্রীদের কাকলী ভরা উচ্ছ্বাস আর হৃদয় ছোঁয়া পরিবেশনা।


'Bangla school in silver screen" ভিডিও প্রদর্শনীর  মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে।  এরপর  "শিশু কিশোরদের মেধা প্রতিযোগিতা"র বিজয়ীদের মধ্যে পুরষ্কার বিতরনী অনুষ্ঠান। শতরূপা বড়ুয়া এবং শামীম চৌধুরীর উপস্থাপনায় শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব।  শুরুতেই বাংলা স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীরা পরিবেশন করে বাংলাদেশ এবং আমেরিকার  জাতীয় সংগীত।
 
এরপর দুই পর্বের পরিবেশনার প্রথম পর্বে ছিল বাংলা স্কুলের সংগীত বিভাগের ছাত্র/ছাত্রীদের অনবদ্য পরিবেশনায় "বাউল সন্ধ্যা"। শেষ পর্বে  কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপরূপ সৃষ্টি "তাসের দেশ" অবলম্বনে  গীতি নাট্য। পরিবেশনায় বাংলা স্কুলের  নৃত্য বিভাগের ছাত্র/ছাত্রীরা। মাঝে ছিল বাংলা স্কুলের  স্পন্সর এবং কমিউনিটি সার্ভিসের জন্য এওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বাংলাস্কুলের প্রিন্সিপাল   শামীম চৌধুরী, বাংলা শিক্ষক আতীয়া মাহজাবীন, বাংলা শিক্ষক তানিয়া খান, বাংলা ও পালী ভাষার শিক্ষক  নিভা বড়ুয়া, বাংলা ও আরবি বিষয়ক শিক্ষক ফারজানা সুলতানা, সংস্কৃতি ও বাংলা শিক্ষক জয়িতা দাসগুপ্ত, মিউজিক একাডেমির পরিচালক নাসের চৌধুরী, ও ড্যান্স একাডেমির পরচিালক মুক্তা বড়ুয়াকে
 তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া কমিউনিটি সার্ভিসের  জন্য সম্মাননা জানানো হয় অ্যান্থনি পিয়ুস গোমেজ, হিরা খান, তাসলিম হাসান, বোরহান আহমেদ, রেদওয়ান চৌধুরী, ও  কামরুল ইসলাম কামাল।

 আলো ঝলমল মঞ্চে বাংলা স্কুলের দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষুদে শিল্পীদের কন্ঠে পরিবেশিত গান  ছিল উপভোগ্য।  এ কথা অনস্বীকার্য যে ছাত্র/ছাত্রীদের গানের অনেক উন্নতি হয়েছে।

গুনী শিল্পী নাসের চৌধুরী  কৃতিত্ব পেতেই পারে। এই পর্বে সংগীত পরিবেশন করে সুসান, রানিতা, অহনা, তাসনুভা, আনিতা, স্বপনীল, সুন্ময়, বিজন, সৃজন, কৌশিক, তাজ, পরাগ, অনুভা, হ্রিদিতা, ফারিয়াল, ফারজান, অনুজ, মুহিত, প্রভা, নোরা এবং শ্রেয়সী। সাথে  বাঁশীতে সঙ্গত করেন মোহাম্মদ মজিদ, গিটার মোহাম্মদ হুদা অনু, মদিরায় জয় দত্ত বড়ুয়া, ঢোল হিমু রোজারিও, অক্টোপ্যাড আরিফুর রহমান স্বপন, তবলায় ওস্তাদ আশীষ বড়ুয়া ও ভায়োলিনে ছিলেন দিবিয়া ও পরাগ। অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন শিক্ষক নাসের চৌধুরী।

এরপর পরিবেশিত হয় বহুল মঞ্চায়িত নাটিকা রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’। তাসের দেশের কাহিনী  শুরু  হয় , বৈচিত্র্যহীন-যান্ত্রিক-একঘেঁয়ে বিষাদময় এক জীবনকে ঘিরে।
 এই জীবনকে মেনে নিতে পারেন না মুক্তিপ্রিয় রাজপুত্র। তাই বন্ধু সওদাগরপুত্রকে নিয়ে রাজপুত্র বেরিয়ে পড়েন বৈচিত্র্যের সন্ধানে, অজানার উদ্দেশ্যে। সাগর পাড়ি দিয়ে তাঁরা পৌঁছে যান তাসের দেশে। যেখানে সবকিছুই নিয়মমতো চলে। একেবারে শৃঙ্খলিত। রাজা হ্যাঁ বললে হ্যাঁ, না বলে সবাই না। রাজ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত কিছু নেই। নেই এগিয়ে চলার গতি। রাজপুত্রের চঞ্চল চিত্ত ও বেড়ার নিয়ম ভাঙার চিন্তাধারা সংক্রমিত করে তাসের দেশের নারী-পুরুষদের। প্রজার সঙ্গে রানিও যোগ দেন বিদ্রোহে। একপর্যায়ে রাজা জনমতকে  মেনে নিতে বাধ্য হন। ফলে রাজ্যের নিয়ম-কানুনের অচলায়তন ভেঙে মুক্তির সুরে চলে তাসের দেশ। নৃত্যনাট্যটিতে মানুষদের কঠিন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে মুখোশ।

শান্তিনিকেতনে বসে ১৩৪৫ সালে মাঘের শীতে রচিত  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাটিকাটি  উৎসর্গ করেছিল শ্রীমান সুভাষচন্দ্রকে। বলেছিলেন "স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পুণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক'রে তোমার নামে "তাসের দেশ' করলুম।"

নাটকটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করতালির ধুম পড়ে যায়। নাটকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সবাই। তবে নাটকটি বড়দের কন্ঠের রেকর্ড না বাজিয়ে ক্ষুদে অভিনয় শিল্পীদের দিয়ে রেকর্ড করিয়ে নিলে আরো ভাল হতো। আরো প্রানবন্ত হতো। প্রবাসে ছোটদের দিয়ে প্রথম তাসের দেশ মঞ্চায়ন করে নিউইয়র্কের "বিপা"। গানগুলি বাংলাতে রেখে ওরা সংলাপগুলি ইংরেজীতে উপস্থাপন করে। সম্প্রতি ওরা বাংলাদেশে শিল্পকলা একাডেমীর সাথে যৌথ ভাবে এটা মঞ্চায়ন করেছে।

নাটকে  বাংলা স্কুলের  কচি মুখগুলি তাদের সেরা পারফর্মেন্স দেখিয়ে একে একে মঞ্চে আসছিল অনুষ্ঠানের দর্শক শ্রোতারা বিপুল করতালি  আর হৃদয়ের আবেগ দিয়ে ওদের বরণ করে নিচ্ছিল।  নৃত্য পরিচালিকা মুক্তা বড়ুয়া  এ জন্য ধন্যবাদ পেতেই পারে। নাটিকটি নির্দেশনা দিয়েছেন শামিম চৌধুরী। রাজপূতের ভূমিকাতে অভিনয় করেছেন মরিয়ম, সওদাগর পূত্র-সুশান্তিকা, অন্যান্য চরিত্রে  জেসিকা, নোরা, অংকিতা, তানিশা, লাবিবা, দর্পণ, ইসরা, সাবরিনা, হ্নদিতা, নাজিলা, অদ্রিজা, অরিত্রি, অনুভা, ইয়াশা,  রাণীতা, অহনা অনিটা, নায়লা, তাসনুভা, অবন্তিকা, নাইমা, অনুশা ও বাংলাস্কুলের ড্যান্স একাডেমির ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।
 
তবে কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেয় বিগত ২৬ বছরের ধারায় উপহার বাংলাদেশ মেলা গ্রেটার ওয়াশিংটনে বাংগালী কমিউনিটির প্রানের মেলা।  প্রতি বছরে এই মেলার জন্য সবাই তাকিয়ে থাকে কিছু সুন্দরের প্রত্যাশায়। আর এখানেই নিহিত এর স্বার্থকতা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা বাঙালিদের সংযুক্ত রাখতে কাজ করছে বাংলা স্কুল।  বাংলা ভাষা শেখানোর পাশাপাশি শিখছে  নাচ-গান। এতে নিজের শিকড়টা ভুলবে না ওরা।  নিজের সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার বীজটা বুনে দিচ্ছে বাংলা স্কুল। 

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭ )