মিয়ানমার সংকটের সমাধানে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রয়াসে ডা: দীপু মনি
হাকিকুল ইসলাম খোকন , নিউইয়র্ক   
বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭

 গত ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সদরদপ্তরে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের আয়োজনে এবং “গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল (বঃযহরপ পষবধহংরহম) ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংগঠন ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট” এর সহযোগিতায় “রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতা : শুধু নিন্দা জ্ঞাপনই নয় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ (অঃৎড়পরঃরবং ধমধরহংঃ জড়যরহমুধ : ঋৎড়স ঈড়হফবসহধঃরড়হ ঃড় অপঃরড়হ)” বিষয়ক সাইড ইভেন্টে প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা: দীপু মনি এমপি। সাইড ইভেন্টটির অন্যান্য প্যানেলিস্টদের মধ্যে ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডামা ডিয়েং র্(অফধসধ উরবহম) ও জাতিসংঘে নিযুক্ত ওআইসি’র স্থায়ী পর্যবেক্ষক অ্যাম্বাসাডার আগস্হিন মেহ্দিইয়েভ (অমংযরহ গবযফরুবা)। গ্লোবাল সেন্টার ফর রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট এর নির্বাহী পরিচালক ড. সাইমন অ্যডামস্ (উৎ. ঝরসড়হ অফধসং) ইভেন্টটির মডারেরের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যান্যদের মাঝে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত মিস প্রমীলা প্যাটেন ও জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন।

    ডা: দীপু মনি এমপি তাঁর বক্তৃতায় গতমাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে মিয়ানমার সমস্যা সমাধানে যে পাঁচ দফা অ্যাকশান প্লানের কথা তুলে ধরা হয়েছে তা পুনরুল্লেখ করেন। তিনি বলেন এ সমস্যা সমাধানে দুই দফা পদক্ষেপ আশু প্রয়োজন। তা হলো: বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা প্রদান এবং শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের ব্যবস্থা করা।

    রাজনৈতিক সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিকভাবে কূটনৈতিক প্রয়াস চালিয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের গত চার দশকের অতীত অভিজ্ঞতা বলে এ প্রয়াসের সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সমর্থন, মনোযোগ ও সম্পৃক্ততা না থাকলে কাঙ্খিত সমাধান আসবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার সঙ্কট বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপ দিতে হবে এবং নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক আলোচ্য সূচিতে মিয়ানমার পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করে এই বিষয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে”।  একই সাথে জাতিসংঘ মহাসচিবের হাতকে শক্তিশালী করতে সাধারণ পরিষদের পক্ষ থেকে মহাসচিবের বিশেষ দূত বা প্রতিনিধির পদ পুন:সৃজনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ডা: দীপু মনি এমপি।

 রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর সংগঠিত সব ধরনের নৃশংস কর্মকান্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে মিয়ানমারে  জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের বাঁধাহীন প্রবেশাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে ডা: দীপু মনি মত প্রকাশ করেন।

 তিনি কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার আশ্বাসের কথা উল্লেখ করেন। কমিশনের সুপারিশমালার মধ্যে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষে মিয়ানমারের ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন পুনর্বিবেচনার কথাও তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন।

 জাতিসংঘ মহাসচিবের গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডামা ডিয়েং আবারও সুস্পষ্টভাবে বলেন, মিয়ানমারে যে নৃশংসতার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তা গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আরিয়া ফর্মুলা সভাসহ এ পর্যন্ত যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সেগুলোকে তিনি প্রাথমিক পদক্ষেপ উল্লেখ করে আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর দোষী সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর বিভিন্ন ধরনের অবরোধ আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার বিষয়টি উল্লেখ করেন।  

    জাতিসংঘে নিযুক্ত ওআইসি’র স্থায়ী পর্যবেক্ষক অ্যাম্বাসাডার আগস্হিন মেহ্দিইয়েভ আবারও এই মানবতা বিবর্জিত ঘটনার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করেন। এই সমস্যার ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষে ওআইসি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের সাথে কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মর্মে তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেন।

    যুক্তরাষ্ট্র সরকার মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও কারিগরী সহায়তার উপর অবরোধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে মর্মে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী মিশনের রাষ্ট্রদূত মিশেল সিসন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন। বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরষ্ক, সৌদি আরব, মিশর, হিউম্যান রাইটস্্ ওয়াচ ও বার্মা টাস্কফোর্সের প্রতিনিধিগণ। এ সকল দেশ ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিগণের সকলেই চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মিয়ানমার সরকার ঘোষিত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

    বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এনজিও প্রতিনিধিগণ তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের নৃশংসতা ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন এবং এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের আশু পদক্ষেপ গ্রহণের উপর জোর দেন। সাইড ইভেন্টটিতে ৩০টিরও বেশি দেশসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। 
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭ )