পটাশের কালীঠাকুর
শুভজিৎ বসাক, কলকাতা   
বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭

ছোট্ট পটাশের জ্বর হয়েছে।সে মাত্র চার বছরের শিশু তবু তার গুণের কদর কম নয়।পটাশ মায়ের লিপস্টিক হাতের কাছে পেলেই তা দিয়ে দেওয়ালে বা মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটে।মায়ের অনেকগুলো লিপস্টিক সে এভাবে নষ্ট করে ফেলেছে।মায়ের মারও কম খায়নি সে কিন্তু দুষ্টামির ছলে গুণটাও লুকিয়ে রাখেনি সে।বাবা তো ছেলের গুণ দেখে মনে মনে ভাবে, "বাবু তোর মায়ের জিনিস নষ্ট করে আঁকছিস তাতে গুণ যে তোর আছে প্রমাণ পাচ্ছি তবে জিনিসটা শেষ হলে তোর মা আমারই ঘাড় মটকাবে।তাই একটু কম খরচ কর বাবু।তোকে মোম রং এনে দিয়েছি তবু যে তোর মায়ের লিপস্টিকেই কেন নজর কে জানে!" এই বলে মনে মনে হাসে সে। জ্বর হয়েছে পটাশের তাই সে আজ ছটফট কম করছে।মা তার পাশে বসে আছে ঠাঁয়।একটু সুস্থ হলে সে উঠে বসে টেবিলের ওপর একটা খাতা আর মায়ের লিপস্টিক এবং নিজের মোম রং নিয়ে বসে পড়ল আঁকতে।মা তখন একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল কিন্তু ঘুম থেকে উঠতেই ছেলেকে খাটে না দেখতে পেয়ে ঘাড় ঘোরাতেই চোখ পড়ল পটাশের দিকে।ছেলেটা এত দুষ্টু যে শরীর খারাপেও সে দমবে না! মাথায় রাগ উঠল মায়ের আর গিয়ে কানটা মুলতে যাবে অমনি তার হাত গেল আটকে।পটাশকে আজ সে আর বারণ করল না।সে আপন ঢঙে এঁকে গেল।বিছানায় গিয়ে বসল মা।কিছুপরে মাকে আঁকাটা দেখাল সে আর তারপরে মায়ের ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে আবার সে বিছানায় শুইয়ে পড়ল।সে যে এখন সুস্থ দুষ্টামিতেই ইঙ্গিত দিল।
সন্ধ্যায় বাবা ফিরলে মা আঁকার খাতাটা তাকে দিল।বাবাও চমকে গেল।ছেলে তখন ছুটছে এঘর থেকে ওঘর।খাতায় আঁকা রয়েছে একটা কালী মূর্তি যাঁর চোখে-মুখে রাগ নয় বরং উপছে পড়ছে সারল্যতা।এই কালীরই রূপ নাকি কত ভয়ঙ্কর,এঁরই নাকি পুজো ক'দিন পরে আর সেই রুদ্রকালীই এত শান্ত রূপধারী পটাশের আঁকাতে যা দেখে হতভম্ব হল মা-বাবা দুজনেই।এই কালী পটাশের নিজের চোখে দেখা নিজের ছোটবেলা যেন।
বাবা- পটাশ এঁকেছে?
মা- হ্যাঁ।
বাবা- ছেলেটাকে বকেছো আজও?
মা- আজ আর সাহস পায়নি যেন।
বাবা- কেন?
মা- একটা অদ্ভুত মিল যেন খুঁজে পেলাম।
বাবা- কি?
মা- সতী যখন বাপের বাড়ি যেতে পারেনি তখন সে অবুঝ হয়ে রাগে মহাদেবের সামনে দশমহাবিদ্যা রূপ নিল যার মধ্যে কালীর কড়াল-কর্কটরূপটাই প্রথমে ছিল।আসলে সতীর দশমহাবিদ্যা রূপ ধারণ ছিল তখন নেহাতই ছেলেমানুষী তা পরে গিয়ে দক্ষের যজ্ঞে সে বুঝতে পারে।সেই কালীকেই আমাদের পটাশ এঁকেছে দেখো।আমরা যাঁকে এত ভয়ঙ্কর ভাবি আসলে সেই কালী শিশুর মতই নরম,বাৎসল্যপূর্ণতায় ভরা যা একটা শিশু মন বুঝে এঁকেছে।আমরা যত বড় হই তত নিজেদের নিয়ে ভেবে কুটিল হয়ে পড়ি।কিন্তু শিশু মন নিষ্পাপ তারা যা করে তা দৈবিক ক্ষমতায় করে।দশমহাবিদ্যা আসলে সতীর ছেলেমানুষী মনের থেকে উদ্ভব হয়েছিল তা আজ ছেলেমানুষ পটাশের কালী আঁকাতেই প্রমাণ পাচ্ছে।তার কাছে কালী দেবী নয় সে হয়ে উঠেছে যেন ছোটদের কোনও সুপারস্টার আর সেই কল্পনাতেই পটাশ এটা এঁকেছে।এটা দেখে একটা ইচ্ছে হচ্ছে বড়।বলব?
বাবা- কি?
মা- এই ছবিটা বাঁধিয়ে ঘরে পুজো করব।
বাবা- (হেসে মজা করে) তোমার যে এত লিপিস্টিক খরচা হল তাতে রাগ হচ্ছে না?
মা হেসে মাথা নীচু করে বসল।
আজ কালীপুজো।পটাশদের বাড়িতে এবারেও ধুমধাম করে কালীপুজো হচ্ছে প্রতিবারের মত।তবে মূর্তি আনেনি পটাশের মা-বাবা।তারা ছেলের আঁকা শৈশবমাখা কালীকেই ফটোতে বাঁধিয়ে পুজো করছে।সবাই অবাক হয়ে গিয়েছে পটাশের উপস্থিত বুদ্ধি আর গুণ দেখে।এতদিন যে লিপস্টিক খরচের জন্য বকুনি খেত সেই লিপস্টিকের রং আজ পুজো পাচ্ছে দেবীর আসনে এক ছোট্ট দুষ্টুর কবলে পড়ে।পটাশ আজও দুরন্তপনায় সামিল হয়েছে।সে বাজি পোড়াচ্ছে,ছুটছে,মা-বাবাকে ধরে টানছে আর তার আঁকা ছোট্ট কালীটা রুদ্রতা ভুলে শান্তভাবে তাকিয়ে রয়েছে যেন তারই দিকে এতদিনে শৈশবের নিজেকে খুঁজে পেয়ে।আজ সবাই ভয়ার্ত মনে ভক্তি মিশিয়ে পুজো দিচ্ছে মা কালীকে কিন্তু পটাশের বাড়িতে একমাত্র কালী পুজো পাচ্ছেন ভক্তিতে যেখানে ভয়-ডর বলে কিছুরই ঠাঁয় নেই।দুমদাম পটকা ফাটছে দীপাবলির সন্ধ্যা আকাশে আর কড়কড় শব্দে সব নিস্তব্দ্ধতা যেন খানখান করে দিচ্ছে।রাতের আকাশে আজ তারারা ঢাকছে বাজির ধোঁয়ায়।কালো আকাশে সাদা ধোঁয়া যেন আরও একধাপ শৈশব এঁকে দিল পটাশের মনে।
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭ )