নায়ক না, গায়ক না, ছায়াপথের অজানা নক্ষত্র জাফর ইকবাল
শায়ের খান   
বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭
(২৫ সেপ্টেম্বর আমাদের ঢালিউড কিংবদন্তি রাজপুত্র জাফর ইকবালের জন্মদিন)

 তখন অনেক ছোট। ক্লাস টু কি থ্রিতে পড়ি। পাশের বাসার ক্লাস টেনের লিনা আপার বিনোদনের জগৎ ‘চিত্রালী’ আর ‘পূর্বাণী’। তার ছোট ভাই পাপ্পু লুকিয়ে লুকিয়ে তা পড়ে আর নায়িকাদের ছবি দেখে। বিকেলে খেলার মাঠে এসে কানে কানে বলল, ‘শুনছিস, জাফর ইকবাল আর ববিতা প্রেম করছে। পেপারে উঠেছে।’ চমকে উঠে বলি, ‘প্রে-ম?’ পাপ্পু হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘শুধু প্রেম-ই না, জঙ্গলেও গিয়েছিল। দুপুরে পাবদা মাছের ঝোল দিয়া দুজন জঙ্গলে ভাত খেয়েছে!’

ছোট্ট আমি প্রেম মানে বুঝি ছেলেমেয়ের লুকিয়ে মেলামেশা। কিন্তু জঙ্গলে পাবদা মাছের ঝোল, আমার কাছে এক অপার বিস্ময়। জঙ্গলের পানিতে পাবদা মাছ সাঁতার কাটতে পারে, কিন্তু তার ঝোল তো ডাইনিং টেবিলের জিনিস।

বাসায় এসে আম্মাকে বললাম, ‘আম্মা, জাফর ইকবাল আর ববিতা নাকি জঙ্গলে পাবদা মাছের ঝোল খেয়েছে?’

আম্মা ডান কানটা ধরে মুচড়িয়ে বললেন, ‘খবরদার, আর কোনো দিন যেন এই কথা না শুনি!’

বুঝে নিলাম, জাফর ইকবাল হচ্ছে এমন এক চিজ, যে কিনা ঘরে-মাঠে-পত্রিকা-জঙ্গলে একসঙ্গে অবস্থান করে দাপটের সঙ্গে।

ক্লাস টেনে পড়ি। বড় ভাইয়ের বন্ধু কাওসার ভাই জাফর ইকবালের মহাভক্ত। তার পোশাক সব জাফর ইকবালের স্টাইলে। চাপাবাজ, তবে হাফ চাপা মারে। হয়তো মামার সঙ্গে হোটেল সোনারগাঁওয়ে কফি খেয়েছে, এসে সিরিয়াসলি বলল, ‘আজকে রাস্তায় খুব খিদা লাগায় বাসায় গেলাম না, সোনারগাঁওয়ে লাঞ্চটা সাইরা নিলাম।’ কিন্তু কাওসার ভাইয়ের আজকের চাপাটা চাপা মনে হলো না। বলল, ‘তোরা তো জানোস আমি ঢাকা ক্লাবে রেগুলার। আজকে ক্লাবের সামনে রিকশা থেইকা নাইমা টের পাইলাম মানিব্যাগ ফালায় আসছি। দেখি জাফর ভাই (জাফর ইকবাল) আসতেসে। বললাম, জাফর ভাই, ১০ টাকা দেন তো। জাফর ভাই ২০ টাকা দিল। দুইজন ক্লাবে ঢুইকা গেলাম।’ তখন ২০ টাকা অনেক। স্কুটারে গুলশান থেকে ধানমন্ডি আসা যায়। বুঝলাম জাফর ইকবাল একজন নিরহংকারী উদার মানুষ।

স্কুলে পড়া অবস্থায় আম্মাকে না বলে বলাকা হলে গেলাম জাফর ইকবালের ‘এক মুঠো ভাত’ দেখতে। হাউসফুল। ছবিতে জাফর ইকবালকে মনে হলো পারস্যের কোনো রাজপুত্র বাংলাদেশের হাইওয়ে মুড়ির টিন বাসের ছাদে বসে নেচে নেচে গান গাচ্ছে, ববিতার সঙ্গে দুষ্টুমি আর শয়তানদের সঙ্গে মাস্তানি করছে। বাসায় ফেরার পর আম্মা যখন আবার ডান কান ধরেছেন, আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’ আম্মা বললেন, ‘না বলে “এক মুঠো ভাত” দেখতে গিয়েছে।’ আব্বা হো হো করে হেসে বললেন, ‘ওকে শাওয়ার করিয়ে পাবদা মাছের ঝোল দিয়ে চার মুঠো ভাত খাওয়াও।’ পাবদার ঘটনা আব্বাও জানতেন। বুঝে নিলাম, আমার স্পোর্টিং আব্বারও পছন্দের জিনিস জাফর ইকবাল।

আমরা যখন ছোট, তখন জাফর ইকবাল একধরনের ছোট হাতা টি-শার্ট গায়ে চড়িয়ে প্রথম দেশের মানুষকে সেই ফ্যাশন চেনান। সেটি তখন এন্ডি গিবদের মতো পশ্চিমা সেলিব্রিটিরা পরে। আমি আবদার ধরায় আব্বা নিউমার্কেট থেকে কিং কং গরিলার ছবিওয়ালা জাফর ইকবাল মার্কা চমৎকার টি-শার্ট কিনে দেন।জাফর ইকবালসোনিয়ার সঙ্গে জাফর ইকবালের বিয়েটা ছিল আলোচিত। এক সাক্ষাৎকারে জাফর ইকবাল বলেন, তিনি সোনিয়ার চোখ দুটো দেখে প্রেমে পড়েছিলেন। আমি তখন বুঝিনি, শুধু চোখ দেখে কীভাবে মানুষ প্রেমে পড়ে? বুঝেছিলাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়। তখন জাফর ইকবাল আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। এক পার্টিতে দেখি, এক অপরূপা সুন্দরী অচেনা আমকে দেখে মিষ্টি হাসল। আমি এত সুন্দর চোখ খুব কম মেয়ের দেখেছি। আমাকে এক বন্ধু কানে কানে বলল, ‘ও হচ্ছে সোনিয়া জাফর, জাফর ইকবালের বউ।’

টের পেলাম চোখ চিনতেও জাফর ইকবাল ভুল করেননি। জাত রোমান্টিক জাত চোখ না চিনলে রোমান্স যে কর্পূর হয়ে যাবে। জাফর ইকবাল যে রত্নগর্ভা মায়ের সন্তান ছিলেন, তা জানতাম না। শুধু জানতাম কোকিলকণ্ঠী সম্রাজ্ঞী শাহনাজ রহমতুল্লাহর ভাই। তিনি যে লিজেন্ড সুরকার আনোয়ার পারভেজেরও ভাই, তা জানলাম তাঁর ভাবি অভিনেত্রী জেসমিন পারভেজকে আমার নাটকে কাস্ট করে। সেটা ২০০০ সাল। ঘনিষ্ঠ হলাম এই পরিবারের সঙ্গে। ভাবির কাছে আবদার ধরলাম কচুর লতি-চিংড়ি লাঞ্চের। উদ্দেশ্য, প্রিয় জাফর ইকবাল সম্পর্কে আরও কিছু জানা।

নয়াপল্টনে আনোয়ার পারভেজ ভাইদের চমৎকার একতলা বাসার জানালায় মেহেদিগাছের ঝিরিঝিরি বাতাসে দস্তুরখান পেতে খাচ্ছি আর শুনছি জাফর-উপাখ্যান। খুব ইমোশনাল আর জাত্যভিমানী ছিল জাফর ইকবাল। জাত থাকে যার, জাত্যভিমান থাকে তার। দুই হাতে টাকা ওড়াত, দান করত অকাতরে। দিল দরিয়া। দুর্বলতা ছিল ব্র্যান্ডেড ড্রেস, দামি সিগারেট আর পারফিউমে। দিনে ছয়বার ড্রেস পাল্টাত আর সাত ধরনের পারফিউম মাখত।

বললাম, ‘তা না করলে রাজপুত্র হয় কীভাবে?’

প্রচলিত জীবনযাপনের ধার ধারতেন না জাফর ইকবাল। ক্রিয়েটিভ মানুষেরা তা করেও না। পারিবারিকভাবেই গানের গলাটা পেয়েছিলেন। চর্চা করা লাগত না। গড গিফটেড। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, এ দেশের মিডিয়া বা চলচ্চিত্র অঙ্গনে রত্নগর্ভা রাজপুত্ররা অকালেই আমাদের ছেড়ে চলে যায় কেন? চলে না গেলেও কেন বেশির ভাগ আমাদের মাঝে থেকেও নীরবে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে?

আজ সে উত্তর তোলা থাক।

২৫ সেপ্টেম্বর আমাদের ঢালিউড কিংবদন্তি রাজপুত্র জাফর ইকবালের জন্মদিন। জাফর ইকবাল, তোমাকে শৈশবে চিনেছি ববিতা আর জঙ্গলের পাবদা মাছের ঝোলে, আর জানার পূর্ণতা পেয়েছে তোমার ভাবির কচুর লতি-চিংড়িতে। তুমি বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া এলভিস প্রিসলি। ছায়াপথে অসময়ে খসে পড়া উজ্জ্বল নক্ষত্র। তোমাকে জন্মদিনের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।

লাভ ইউ প্রিন্স জাফর ইকবাল। মিসিং ইউ ডিয়ার!

শায়ের খান : লেখক, নাট্যকার ও পরিচালক
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ )