ভন্ড ধর্ষক সাধু প্রসঙ্গে
শুভজিৎ বসাক, কলকাতা   
বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭
ভারতবর্ষ একটা অদ্ভুত ভন্ডামীর দেশ তাই না! এখানে মানুষকে কত সহজে বোকা বানানো যায় একটু গরম গরম কথা শুনিয়ে বা ভেল্কিবাজী ও নিম্নমানের জাদু দেখিয়ে তাই না! এখানে মানুষ নিজের বুদ্ধিতে কম আর অন্যের ধার করা বুদ্ধিতে বেশী চলে।এটা প্রজাতান্ত্রিক দেশ না হয়ে ভেকবাজী তান্ত্রিকদের দেশ হলে বোধহয় সবচেয়ে উপযোগী হত।ভারত দেশটা প্রাচীনকাল থেকে যে সম্মান বিশ্বের দরবারে অর্জন করেছিল তা কিছু মুখোশধারী স্বঘোষিত ভগবান নিমেশে মাটিতে মিলিয়ে দিচ্ছে। এই অপমান ভারত ও তার সাথে জড়িত উজ্জ্বল ইতিহাসের অপমান।
ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখতে পাবো ভারতই প্রথম সমস্ত বিজ্ঞানশাস্ত্রের আবিষ্কারক।অঙ্ক,পদার্থবিজ্ঞান,রসায়নবিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞান,চিকিৎসাশাস্ত্র,শল্যচিকিৎসা ইত্যাদি সমস্ত বিজ্ঞানের আঁতুড়ঘর ভারতভূমি।এছাড়া বিভিন্ন উন্নতমানের কলাবিজ্ঞান,শাস্ত্রবিজ্ঞান ইত্যাদিরও জন্মস্থান ভারতে এবং যার উচ্চমান ভারতকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিয়েছিল একটা সময়ে।বর্তমানে কিছু ভন্ড যোগী নিজেদের ভগবানের সমতুল্য ঘোষণা করে যেসব ব্যবসা ফেঁদে বসেছে তা সত্যিই ভারতের ঐতিহ্যের লজ্জা।
বর্তমানে ভারতের মত উচ্চশিক্ষিত দেশের সমস্যা হল না শিখে খালি নম্বরের পিছনে ছুটে নিজেকে সেরা প্রমাণ করা।এরফলে প্রকৃত শিক্ষা কম আর পুঁথিগত শিক্ষা গাধার মত আওড়ে খালি নম্বর অবশ্যই পাই তবে তা বাস্তবে মোটেই খুব একটা কাজে লাগে না।আমাদের কল্পনা,ভাবনা,চিন্তার পরিসর ছোট হয়ে পড়ছে ভারতীয় প্রাচীন শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে এবং কেবল জন্তুর মত পুঁথির শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি যারফলে বাস্তবে কোনও সমস্যায় পড়লে হীনমন্যতায় ভুগি।আমরা সত্যিই অনেকে জানি না যে ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্য,গল্প,উপনিষদ,পঞ্চতন্ত্র,গীতা খালি কল্পনা নয় সেগুলো অত্যাশ্চর্য কল্পবিজ্ঞানের ভান্ডারও বটে যা একটা কোনও সমস্যায় যে কি মহৌষধির কাজ করে তা আমাদের দাদু বা তাঁর পূর্বসূরীরা বা আমাদের বাবা-মায়েরা ভাল বোঝেন।নম্বরের যুগে নম্বর ধাওয়া করে যখন মধ্যগগনে আসি তখন যদি কোনও সমস্যায় পড়ি সেই মুহূর্তে গুরপ্রীত সিং রাম রহিম ইনসানের মত নীচ মনস্কের ভুঁয়ো ভন্ডের সান্নিধ্যে এসে তাকেই ভগবান মনে করে বসি অথচ একবারও শিক্ষার আধার বইগুলোকে খুলে দেখে নিজের ওপর বিশ্বাস অর্জন করতে পারি না।আমরা তো আসলে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র,সেখানে শকুনি হল ঐ ভন্ডের দল যা বোঝায় তাইই বুঝে অন্ধের মত চলি।কে আসল রাম আর কে আসল শয়তান তা বিচার করার নূন্যতম বুদ্ধিও হারিয়ে ফেলেছি আমরা।
কুর্নিস জানাই ঐ দুই সাধ্বীকে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েও অন্যের জীবন বাঁচাতে অন্তত পনেরো বছর আগে দুঃসাহসিক চিঠি লিখে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।হয়তো দেরী হল তবুও ন্যায়দান হল ভারতীয় আদালতে যা সত্যিই প্রমাণ করে দিল যে আইনের উর্দ্ধে কেউ নয় আর আইনই দেশের ভগবান।সেই ভগবানের কাছে আজ ঠগ,জোচ্চোর.নীচ মানসিকতার স্বঘোষিত ভগবান রাম রহিমকেও কাঁদতে হল।যদিও যে অপরাধ সে ভালমানুষের মুখোশের আড়ালে থেকে করেছে সে তুলনায় এই শাস্তি নিছকই নগণ্য তবু ভগবান আছেন সেটাই প্রমাণিত।
ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ত্যাগী হলেন শ্রী গৌতমবুদ্ধ।তাঁর মত মহাপরিনির্বান করার ক্ষমতা আর না কারও আছে আর না কারও হবে।তার অনেকটা গুণ ছিল বিবেকানন্দের মধ্যে যার একনিষ্ঠ ও একার বলে আজ মিশন ও মঠ দাঁড়িয়ে রয়েছে মানুষের স্বার্থে।এঁরা হলেন প্রকৃত দার্শনিক ও শিক্ষক।সেখানে ঐ ভন্ড গুরপ্রীত সিং মানুষের লিঙ্গচ্ছেদ,ধর্ষণ,খুন,পর্ণোগ্রাফি এসব ছাড়া আর কিছু ভন্ডামী ছাড়া কিছু কি করেছে সমাজে? তার এই ভন্ডামী কি শিক্ষা দেবে সমাজে? ভারতীয় সমাজের কাছে কলঙ্ক এই ভন্ড ধর্ষক সাধু।
সবশেষে বলি সমাজে ভগবান আইন ও শিক্ষকের সাথে আরেকজন সে হল ডাক্তার।মানুষকে ন্যায় বিচার দেয় আইন,সঠিক পথ দেখায় সঠিক শিক্ষা আর জীবন দান করেন ডাক্তার।শিক্ষা হলেন ব্রহ্মা যাঁর স্ত্রী সরস্বতী,আইন হলেন শিব যিনি সঠিক বিচার দিয়ে সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচান এবং যাঁর স্ত্রী মহিষাসুরমর্দিনী উমা বা চন্ডমুন্ডবিনাশিনী কালী আর ডাক্তার হলেন বিষ্ণু যিনি জীবন দান করেন যেমন বারবার আসুরিক শক্তি বিনাশ করে বিষ্ণু স্বর্গকে বাঁচিয়েছিলেন সেটাই করেন ডাক্তার।একজন ডাক্তার যখন প্রহৃত হন কোথায় থাকে মানুষ যেখানে ধর্ষক সাধু শাস্তি পেলে কোটি কোটি মানুষ রাস্তায় নামে! এইদেশে ধর্ষকের মূল্য আছে অথচ আইন,শিক্ষা,ডাক্তার আর মহিলাদের একফোঁটা মূল্য নেই তাই না! তা না হলে ধর্ষিতাদের জন্য না ভেবে জনসম্পত্তি নষ্ট করে ধর্ষক সাধুর ভন্ড ভক্তেরা!
যেদিন জীবনের প্রতিটা মঞ্চে নিজের বুদ্ধিকে নিজে মুক্ত করতে পারব সেদিনই ঐ ভন্ডদের বিনাশ হবে সমাজে আর তা না হলে শয়তান রাম সেজে ঘুরলেও কারও সাধ্যি নেই তাকে ধরার।সুশিক্ষা আসুক প্রকৃত জ্ঞানের মাধ্যমে যেখানে সদ্গুরু হবে নিজের মুক্ত বুদ্ধি আর যেদিন স্ত্রীশিক্ষা আরও মুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়বে সমাজে সেদিনই ভারত আসল প্রজাতান্ত্রিক দেশ বলে গণ্য হবে সুসভ্যদের কাছে।ততদিন পর্যন্ত সমাজটা টিকে থাকে কি না সেটাই লক্ষ্যণীয় বিষয় আজকের দিনে।
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭ )