শান্তি কুটির
যুথিকা বড়ূয়া, টরন্টো থেকে   
বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

ধারাবাহিক পর্ব-এক
দিব্যেন্দু আর মালবিকা, ওরা নিঃসন্তান। দুজনেই অর্থ উপার্জন করে। স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ছোট্ট ছিমছাম নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার দিব্যেন্দুর। ও পেশায় একজন মেডিক্যাল ডাক্তার, চাইল্ড্ স্পেশালিষ্ট।  স্ত্রী মালবিকা নার্সারীস্কুলের শিক্ষয়িত্রী। শহরের নিরিবিলি রেসিডেন্সি এলাকায় শ্বেতপাথরের মোজাইক করা অট্টালিকার মতো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সদর দরজার একটু উপরে নেইম প্লেটে বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখা, “শান্তি কুটির।” কিন্তু তাদের মনের ঘরে বিগত এগারো বছর যাবৎ এতটুকু সুখ, শান্তি নেই বললেই চলে। কর্মজীবনে মানব সেবাতেই দিব্যেন্দুর দিন যায় রাত পোহায়। দিনের শেষে ক্লান্ত সূর্য্য কখন অস্তাচলে ঢলে পড়ে, কখন সন্ধ্যে পেরিয়ে বাইরের পৃথিবী অন্ধকারে ছেয়ে যায়, মালুমই হয়না। উদয়াস্ত রুগীর সেবা-শুশ্রূষা করতে করতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে একেবারে ভাটা পড়ে গিয়েছিল।

এবার ১৫তম বিবাহ বার্ষিকীতে দিব্যেন্দু মনস্থীর করে, প্রিয়তমা স্ত্রী মালবিকাকে সারপ্রাইজ দেবে। মনে মনে প্ল্যান করে, বাইরে দূরে কোথাও সস্ত্রীক বেড়াতে যাবে। সেই সঙ্গে সামার ভেকেশনও কাটিয়ে আসবে। রুটিনমাফিক একঘেঁয়ে কর্মজীবন থেকে কিছুদিনের জন্য বিরতি নিয়ে সমুদ্রসৈকতে যাবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, বৃদ্ধা মা রমলাদেবীকে নিয়ে। তিনি বাতের ব্যথায় কোথাও নড়তে পারেন না। সারাদিনে বেশীরভাগ সময় শুয়ে বসে কাটান। সকাল সন্ধ্যে দুইবেলা পালা করে লোক আসে ওনাকে মাসাজ করতে। ওনাকে দেখভাল করার জন্য একজন বিশ্বস্থ কাউকে দরকার। কিন্তু স্বেচ্ছায় দিব্যেন্দুর এতবড় একটা দায়িত্ব নেবে কে! তা’হলে?

শুনে দিব্যেন্দুর বাল্যবন্ধু ভাস্কর বলল, -“আরে এয়ার, ডোন্ট ওরি! ম্যায় হুঁ না!”
প্রভুভক্তের মতো আনুগত্য হয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলে,-“বান্দা হাজির হ্যায় দোস্ত। বিপদের সময়ই বন্ধুর পরীক্ষা হয়। মাসিমাকে নিয়েই তোদের ভাবনা তো, নিশ্চিন্তে থাক্। ওনার দেখাশোনা আমিই করবো। তুই শুধু বাড়ির চাবিটা আমায় সঁপে দিয়ে যা, ব্যস কেল্লাফতে!”  

অপ্রত্যাশিত বন্ধুর আশ্বাস পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে দিব্যেন্দু। চোখমুখ থেকেও ঝড়ে পড়ছে উচ্ছাস। হঠাৎ পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে নজরে পড়ে, আবেগের প্রবণতায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চোখের তারাদুটি অশ্রুকণায় চিক্চিক্্ করে উঠেছে মালবিকার। যেন কালো মেঘের আড়াল থেকে একফালি সূর্য্যরে রস্মি উদ্ভাসিত হওয়ার মতো। হওয়াটাই স্বাভাবিক! চল্লিশের উর্দ্ধেঃ বয়স মালবিকার। জীবনের প্রায় অর্ধেকটা পেরিয়ে এসেছে কিম্বা তার চেয়ে বেশী বা কম, কে বলতে পারে! জীবনে কিইবা পেয়েছে! কিছুই তো পায়নি। অর্থ-ঐশ্বর্য্যই কি সব! আর যাই হোক, পয়সা কড়ি দিয়ে কখনো মনের সুখ, শান্তি কেনা যায় না। সুখী হওয়া যায় না। হিসেব করলে দেখা যায়, যোগ-বিয়োগ দুই-ই শূন্য। কত স্বপ্ন ছিল জীবনে। কত আশা ছিল, কত সাধ-আহাল্লাদ ছিল। কিছুই পূরণ হয়নি। পূরণ করতে পারেনি মালবিকা। যেদিন প্রসবকালীন জটিলতার অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একটি মৃত কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পরই চিরদিনের মতো হারিয়ে যায়, সন্তান ধারণের ক্ষমতা। আর সেই থেকে নারীজাতির পরম আকাক্সিক্ষত মধুচন্দ্রিমার সেই আবেগে সোহাগে অনুরাগে আনন্দময় মধুর রজনী আর ফিরে আসেনি মালবিকার জীবনে। যেন একই পথের দুই মোসাফির। একই ছাদের নীচে বসবাস করেও দুজনার মন-মঞ্জিল ছিল দুইপ্রান্তে। এতকাল নার্সারী স্কুলের বাচ্চাদের হৃদয় নিঃসৃত ¯েœহ-মমতা-ভালোবাসা বিতরণে নিমজ্জিত হয়ে মালবিকা বেমালুম ভুলে ছিল, সন্তানহীনতার যন্ত্রণা, মাতৃত্বহীনতার যন্ত্রণা। পূরণ করতো মা হবার সাধ।
ভাগ্যবিড়ম্বণায় একবুক অভিমান নিয়ে বিগত দিনগুলির প্রতিটি মুহূর্ত একেবারে নিরস, নিরুচ্ছাস, নিস্প্রেম, নিরানন্দে কেটেছে মালবিকার। যেখানে ইচ্ছা, আবেগ, অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনা কিছুই ছিলনা। অন্যদিকে দিব্যেন্দুও ইচ্ছাকৃতভাবে উদয়াস্থ রুগী সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রেখে দিন অতিবাহিত করতো। যখন ওর কোনো পিছুটানই ছিল না।

সূর্য্য আজ পশ্চিম দিকে উঠছে না কি! মন-মানসিকতার কি অদ্ভুদ বৈপরীত্য দিব্যেন্দুর! আচমকা এতখানি পরিবর্তন ওর! এ্যমাজিনই করা যায়না। পুরো উদ্যাম উদ্দীপণায় মন-প্রাণ ওর স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিনা নোটিশে দিব্যেন্দুর সমুদ্রসৈকতে যাবার পরিকল্পনায় ভাবনার সাগরে ডুবে গেলেও চকিতে মনের পূঞ্জীভূত সমস্ত গ্লানি, মান-অভিমান, অভিযোগ, নালিশ সব অপসারিত হয়ে চোখেমুখে খুশীর ঝিলিক দিয়ে ওঠে মালবিকার। মন-প্রাণও সতেজ সজীব হয়ে ওঠে। আবেগের প্রবণতায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চোখদুটো আশ্রুকণাতে ছল্ছল্ করে উঠেছে। মনকেও বিকাশত করে। পুলক জেগে ওঠে। যেন শুস্ক মরুভূমির বুক একপশলা বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে চুপসে গেল।

নজর এড়ায় না দিব্যেন্দুর। সুদীর্ঘ এগারো বছর পর প্রিয়তমা মালবিকার ঠোঁটের কোণে তড়তাজা হাসির ঝিলিকটা ওকে আরো উদ্ধত করলো, উৎসাহিত করলো। হঠাৎ মালবিকার অলক্ষ্যে অদৃশ্য এক আকর্ষণে উন্মুক্ত অন্তর মেলে ওর মুখপানে চেয়ে থাকে। চোখের পলক পড়েনা। যেন নতুন দেখছে। ইতিপূর্বে দৃষ্টি বিনিময় হতেই চোখ সরিয়ে নেয়। একগাল হেসে ভাস্করের পৃষ্ঠদেশে আলতোভাবে একটা চড় মেরে বলল,-“আরে এয়ার, ইয়ে হুই না বাত। দোস্ত হোতো এ্যায়সা। আমায় বাঁচালি মাইরি। গিভ মি ফাইভ।” বলে প্রসন্ন মেজাজে ভাস্করের সাথে হাতে হাত মেলায়। সেক্হ্যান্ড করে।

কি বলবে ভাষা খুঁজে পায়না মালবিকা। আনন্দে একেবারে আত্মহারা। হৃদয়ের দুকূল জুড়ে খুশীর বন্যায় প্লাবিত করে চোখমুখ উজ্জ্বল দীপ্তিময় হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হচ্ছিল, দ্রুত ছুটে গিয়ে দিব্যেন্দুকে প্রেমালিঙ্গনে জড়িয়ে ধরতে। ওর উষ্ণ বক্ষপৃষ্ঠে আঁছড়ে পড়ে ওর বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের বন্ধনে পিষ্ঠ হয়ে যেতে। ইচ্ছে হচ্ছিল, দিব্যেন্দুর ঘন পশমাবৃত প্রশ্বস্ত বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ওর পুরুষালী দেহের উষ্ণ অনুভূতিতে বুদ হয়ে থাকতে। একেবারে লীন হয়ে যেতে। অনুভব করে, এতকাল হৃদয়প্রাঙ্গনে অবহেলায় পড়ে থাকা ওর ভালোবাসার ফুল এখনো শুকায় নি। মূর্ছা য়ায নি। দীর্ঘদিনের মানসিক বিচ্ছিন্নতায় ওর ভালোবাসায় কোনো প্রভাব পড়েনি। এতটুকুও কমে যায়নি। তাই বুঝি দুটি মানব-মানবীর প্রেম-ভালোবাসা কোনদিন মরেনা। যার কোনো বয়স নেই। সময় অসময় নেই। যে কখনো কারো দোহাই মানে না। কোনো বাঁধা মানে না। সুযোগ এলেই সে আপন গন্তব্যে পৌঁছে যাবেই। যেভাবে আজ ও’ দিব্যেন্দুকে নতুন করে আবিস্কার করে। ওকে নতুন করে একান্তে নিঃভৃতে নিবিড় করে কাছে পেতে ক্রমশ উদগ্রীব হয়ে ওঠে, উতলা হয়ে ওঠে। সবুর সয়না মালবিকার। কিন্তু তাই বলে ভাস্করের সামনে! ছিঃ, তা  কি কখনো হয়! শিক্ষয়িত্রী বলে কথা!
                               
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭ )