চেতনা ও প্রেরণায় চির অমর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু
স্বপন কুমার সাহা   
মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭
 ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ বাঙালি জাতির জীবনে বঙ্গবন্ধুর মহিমা বোঝাতে কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার এ চরণটিই যথেষ্ট। বাঙালি জাতিসত্তা বলতে যা বোঝায়, বাঙালি জাতির প্রেরণা ও চেতনা বলতে যা বোঝায়, তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব শুধু একটি নাম নয়, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইহিতাসেরও এক চিরন্তন প্রদীপ। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ, বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধু- এটাই চিরন্তন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর এই ২৪ বছরের প্রায় ১৩ বছর (৪ হাজার ৬৭৫ দিন) কারাগারের অন্ধ প্রোকোষ্ঠে থাকতে হয়েছিল বাঙালি জাতির কারিগর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। এর আগে ব্রিটিশ আমলে ছাত্র জীবনেও সাত দিন কারা ভোগ করেছিলেন তিনি। যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি, সেই তিনি কেন পাকিস্তান সরকারের আমলে জীবনের এতগুলো দিন কারাগারে ছিলেন, তা জাতির অজানা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ ও নির্যাতন থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করতেই নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম করেছিলেন তিনি ’৭১ এর ২৬ মার্চ থেকে ’৭২ এর ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানি কারাগারে বন্দী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই সময়ের প্রতিটা দিন ছিল তার শেষ দিন। তাকে হত্যার সব পরিকল্পনাই সম্পন্ন করেছিল পাকিস্তানি শাসকরা। এমনকি তার জন্য কবর পর্যন্ত খোড়া হয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয়- পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করতে পারল না, যেটা করলো কতিপয় বাঙালি মীরজাফর।

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ বাঙালি জাতির জীবনে বঙ্গবন্ধুর মহিমা বোঝাতে কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার এ চরণটিই যথেষ্ট। বাঙালি জাতিসত্তা বলতে যা বোঝায়, বাঙালি জাতির প্রেরণা ও চেতনা বলতে যা বোঝায়, তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব শুধু একটি নাম নয়, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইহিতাসেরও এক চিরন্তন প্রদীপ। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ, বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধু- এটাই চিরন্তন। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানি প্রেতাত্মা ও তাদের এ দেশীয় দোসররা বঙ্গবন্ধুকে মেনে নিতে পারেনি। তাই তাকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করে খুনি-ঘাতকের দল। ইতিহাসের সেই কালো দিন আজ, ১৫ আগস্ট। আজ জাতীয় শোক দিবস। বঙ্গবন্ধুর ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী। এদিনই জাতির পিতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার মাটি। কলঙ্কিত হয়েছিল বাংলার ইতিহাস।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে আগস্ট আর শ্রাবণ যেন মিলেমিশে শোকে একাকার। এ দেশের রোদ-বৃষ্টি, আলো-বাতাস নিসর্গ প্রকৃতি যেন বিনম্র শ্রদ্ধায় তার নামের ওপর ঢেলে দেয় রৌদ্র-জ্যোত্স্না, আকাশের চোখে জল ঝরে তারই বিয়োগব্যথায়। বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে স্বদেশের মাটি আর মানুষকে এমন গভীর ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধেছিলেন, যে বন্ধন কোনোদিন ছিন্ন হওয়ার নয়। ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুর নশ্বর শরীরকে বুলেটবিদ্ধ করলেও তার অবিনশ্বর চেতনা ও আদর্শ আজও জীবন্ত। তার আদর্শ ও চেতনাই আজকের তরুণ সমাজের চলার পাথেয়। যে আদর্শকে বুকে ধারণ করে সুখি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এগিয়ে চলছে তারা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিনই তিনি বেঁচে থাকবেন কোটি বাঙালির হূদয়ে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য বাঙালি নেতাদের বিশেষ করে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদান থাকলেও তারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেননি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন সংগ্রাম ও আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেই হয়েছিল। তিনি ঘুমন্ত বাঙালিকে জাগিয়ে তোলে ঐক্যবদ্ধ ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি যেমন বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, তেমনি বাঙালির জাতির জনক।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর এই ২৪ বছরের প্রায় ১৩ বছর (৪ হাজার ৬৭৫ দিন) কারাগারের অন্ধ প্রোকোষ্ঠে থাকতে হয়েছিল বাঙালি জাতির কারিগর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। এর আগে ব্রিটিশ আমলে ছাত্র জীবনেও সাত দিন কারা ভোগ করেছিলেন তিনি। যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি, সেই তিনি কেন পাকিস্তান সরকারের আমলে জীবনের এতগুলো দিন কারাগারে ছিলেন, তা জাতির অজানা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ ও নির্যাতন থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করতেই নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম করেছিলেন তিনি। আর এ কারণেই তার এই দীর্ঘ কারাবরণের শাস্তি! এ দেশের মানুষকে মুক্তি দিতে, স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জীবনে এতবড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এই নেতা। কারাগারের অন্ধকার প্রোকোষ্ঠে বসে বসেই বাংলার স্বাধীনতার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ কারণে শুধু তিনি নিজেই আত্মত্যাগ করেননি, তার স্নেহ, ভালোবাসা ও সহচর্য থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত হয়েছেন তার স্ত্রী-সন্তানরা।

বাংলার ইতিহাসে শেখ মুজিবের অবদান কী, তা বলে শেষ করা অসম্ভব। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বঙালি জাতির প্রত্যেকটি স্বাধীকার আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ’৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬৬ এর ছয়দফা, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ’৭০ এর নির্বাচন এবং সর্বশেষে একাত্তরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা- সবকিছুই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার পথে বঙ্গবন্ধুর এক একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

ইয়াহিয়া খানের হানাদার বাহিনী ’৭১ এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং একই রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারও করলো। তবে গ্রেফতারের পূর্বেই বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শত্রুকে মোকাবিলা করার দিকনির্দেশনা ও স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। এ ঘোষণা ছড়িয়ে পড়লো সারাদেশে। এর আগে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামে সমগ্র জাতিকে জাগ্রত এবং ঐক্যবদ্ধ করে। যে ভাষণে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত হয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

’৭১ এর ২৬ মার্চ থেকে ’৭২ এর ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানি কারাগারে বন্দী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই সময়ের প্রতিটা দিন ছিল তার শেষ দিন। তাকে হত্যার সব পরিকল্পনাই সম্পন্ন করেছিল পাকিস্তানি শাসকরা। এমনকি তার জন্য কবর পর্যন্ত খোড়া হয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয়- পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করতে পারল না, যেটা করলো কতিপয় বাঙালি মীরজাফর।

স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পুনর্গঠনে নেমে পড়েন। কিন্তু ওই সময় দেশে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও ভ্রান্ত কিছু রাজনৈতিক দল অস্বস্তিকর পারিস্থিতির সৃষ্টির পাঁয়তারা করলো। তারাই দেশব্যাপী লুটপাট করতো এবং তারাই আবার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অপপ্রচারণা চালাতো। এসবই ছিল বঙ্গবন্ধুর শাসনব্যবস্থাকে অকার্যকর করতে তাদের অপকৌশল।

তবে দেশের পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু যা করেছিলেন, তার ছিটেফোঁটাও কেউ সামনে আনেনি তখন। এ বিষয়ে শামসুজ্জামান খানের (মহাপরিচালক- বাংলা একাডেমি) সঙ্গে এক আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধু, বলেছিলেন- ‘তোমরা তো অনেক পড়াশোনা করেছো, অনেক কিছু বোঝো। কিন্তু নিজ দেশের কতগুলো বাস্তব ব্যাপার তোমরা যেন দেখতে পাও না। দেশে এতবড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধ মানুষের মূল্যবোধ আমূল বদলে দেয়। মানুষকে বেপরোয়া, লাগামহীন করে। আমাদের দেশেও সেটা হয়েছে। হাইজ্যাক, ডাকাতি বেড়েছে, ‘চাটার দল’ বেড়েছে। এসব একদিনে দমন করা যাবে না। এটা একটা নতুন পরিস্থিতি। অনেকে অস্ত্র জমা দেয় নাই। ইসলামী দলগুলো আগাগোড়া আমার বিরুদ্ধে গোপন প্রচার করছে, বেনামা পুস্তিকা ছাপছে। জাসদের বিভ্রান্ত অংশ বিপ্লবের নামে কি না করছে? ...থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুটে নিচ্ছে। আমার লোকেদের হত্যা করছে। অথচ তিন বছরে আমরা যা করেছি আমাদের মতো বিধ্বস্ত অন্য কোনো দেশ তা পারতো না। এজন্য আমাদের প্রশংসা করে না। কী অবস্থা করে রেখে গেছে পাকিস্তানি হানাদাররা? দেশটা ছিল ভাঙাচুরা; একটা শ্মশান যেন। কি আর বলবো, হুজুর(মওলানা ভাসানী) মুরব্বি মানুষ, তিনি যেসব বক্তৃতা বিবৃতি দিচ্ছেন তাকে লুফে নিচ্ছে       সাম্প্রদায়িক দল ও ব্যক্তিরা। তারা তাকে শিল্ড হিসাবে ব্যবহার করে শয়তানের হাসি হাসছে। এই সব দেখেশুনে মনে হয় তাজউদ্দীনের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ভোলা বা মনপুরায় গিয়ে ছোট ঘর বানিয়ে থাকি।’ (সূত্র : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ/শামসুজ্জামান খান/ বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল/পৃষ্ঠা ১৩০)। এক কথায় বঙ্গবন্ধুর ধ্যান-জ্ঞান বলতে যা কিছু, সবই ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি। তবে বঙ্গবন্ধু যাতে সফল না হতে পারেন, তাই স্বাধীনতাবিরোধী ও সুযোগসন্ধানীরা তাদের অপতত্পরতা বাড়াতেই থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। তাই দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থাকার পরও আধুনিক সাজ-সজ্জার সরকারি বাসভবনের রাজকীয় জৌলসপূর্ণ জীবন পরিত্যাগ করে পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি বসবাস করেছিলেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ৬৭৭নং সাদামাটা বাসভবনে। তখন ৩২ নম্বরের ওই বাড়িটি দেখার কৌতূহল ছিল অনেকের মধ্যেই। আর ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়িটির দরজাও সাধারণ মানুষের জন্য ছিল সবসময় খোলা। এমনকি কেউ সাহস করে বাড়িতে না ঢুকে উঁকিঝুঁকি মারলেই বঙ্গবন্ধু ডেকে নিতেন সেই আগন্তুককে। পাশে বসিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইতেন তাদের অভাব অভিযোগের কথা। এমনকি সেই আগতন্তুককে আপ্যায়ন করতেন নিজ হাতেই। এভাবেই বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসতেন, ভালোবাসতেন বাংলাদেশকে। কিন্তু এই বাঙালি যে আত্মঘাতী হয়ে তাকে হত্যা করবে, তা তিনি কখনোই ভাবতে পারেননি।

ধানমন্ডির ওই বাড়িতেই আত্মীয়-পরিজনসহ শহীদ হন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী তথা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীসাম্রাজ্যবাদী শক্তির এদেশীয় দোসরদের চরম বিশ্বাসঘাতকতার কাছে জাতির জনকের বিশ্বাসের দৃঢ় প্রত্যয় ভেঙে পড়েছিল ১৫ আগস্টের সেই নৃশংস কালরাতে। বঙ্গবন্ধু ও তার স্বজনদের রক্তে সেদিন পুরো বাড়িটি হয়েছিল প্লাবিত। অস্তমিত হয়েছিল জাতীয় গৌরবের প্রতীক সূর্যের মতো একটি অনন্য অধ্যায়। ১৫ আগস্ট ভোররাতে পবিত্র আজানের ধ্বনিকে বিদীর্ণ করল ঘাতকদের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলি। বিদীর্ণ করল বাংলাদেশের বুক। শহীদ হলেন জাতির জনক। নিহত হলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার এক অপূর্ণ মহত্ স্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করল অন্ধকার এক সাম্প্রদায়িকতার কানাগলিতে।

ওইদিন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিয়েছিল তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিলের প্রাণ। দেশের বাইরে থাকায় ঘাতক চক্রের হাত থেকে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

’৭৫ এর ওই দিনে শুধু বঙ্গবন্ধু শহীদ হননি, খুন হয়েছিল বাঙালি জাতির চেতনা ও প্রেরণা। সেদিন খুন হয়েছিল এদেশের মেহনতি ও স্বাধীনতাকামী মানুষের হূদয়। স্বাধীনতার প্রাণপুরুষকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো জাতি। শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধীতাকারী ও তাদের দোসরদের মুখে সেদিন হাসি ফুটেছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এদেশে শুরু হয় অপরাজনীতির চর্চা। শুর’ হয় সামরিক শাসনের জাতাকল। তবে একটি কথা না বললেই নয়- বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ভেবেছিল যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই বোধহয় তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর চেতনা-প্রেরণা ও অদর্শ এদেশের মানুষের রক্তের সঙ্গে প্রবাহমান। তার আদর্শকে বাস্তবায়ন করে চলছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে স্বপ্ন আজ বাস্তবায়ন করে চলছে আওয়ামী লীগ সরকার। এছাড়া এ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তার খুনিদের বিচার হওয়ায় বাঙালি জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। তবে এজন্য ৩৫টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রতি পদে পদে খুনিদের দোসর ও মদদদাতাদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বেড়াজালে আটকে থেকেছে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাযজ্ঞের বিচার। তবে এ বেড়াজাল ছিন্ন করে ২০১০ সালের শুরুতেই ২৮ জানুয়ারি মধ্যরাতে মানবতার শত্রু নরপিশাচ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এখনও পালিয়ে রয়েছে আরও কিছু খুনি। তাদের ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার সচেষ্ট রয়েছে, এটাই সন্তুষ্টির বিষয়। যেদিন সব খুনিদের বিচার এ দেশের মাটিতে সম্পন্ন হবে, সেদিনই কলঙ্কমুক্ত হবে জাতি।

সবশেষে দুটি কথা বলতে চাই- বাংলার স্বাধীনতা, বাংলার ইতিহাস ও প্রেরণা বলতে যা বোঝায়, তা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ নামটিই বাঙালি জাতির চিরদিন প্রেরণা হয়ে থাকবে। আর এ প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশকে যদি আমরা বিশ্বের বুকে একটি সুখি-সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিকামী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ হবে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে মেহনতী ও শোষিত মানুষের। পরিতৃপ্ত হবে জাতির জনকের বিদেহী আত্মা। জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। চিরঞ্জীব হোক বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি।

লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক- দৈনিক বর্তমান;

সাবেক প্রেস মিনিস্টার- বাংলাদেশ দূতাবাস, যুক্তরাষ্ট্র; সাবেক সাধারণ সম্পাদক- জাতীয় প্রেসক্লাব।
সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭ )