এভাটার ফ্লাইট প্যাসেজ
নাজমা রহমান, মেরিল্যান্ড   
মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

পিছন থেকে কে যেন আমাকে ঠেলে দিল। সবল ধাক্কায় আমি সামনে ঝুঁকে গেলাম। যে ধাক্কা দিয়েছে সে কিন্তু মানুষ নয়। ধাতব বেল্ট। ঝুঁকতেই দেখি কাঁচের ভিতর ফুটে আছে আজব এক চেহারা। এটাই কি আমি? ওরাতো তাই বলছে! আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করলাম।  এই রুমটা বেশ ছোট। চারিদিকে ধাতব দেয়াল। মাঝখানে বসে আছি আমরা আটজন মানুষ। মানুষ বলাটা আসলে ঠিক হবেনা।  কারন, আটটি প্রাণীর কেউই এখন আর পুরোপুরি মানুষ নেই। যদিও মানসিক ভাবে ঠিক আগের মতই আছি আমরা। কিন্তু বদলে গেছে শরীর। সামনের এই ছবিটি তারি প্রমাণ।  

একটু আগেই অন্য একটি কক্ষে ঢুকিয়ে আমাদেরকে স্ক্যানিং, ম্যাচিং ইত্যাদির পর সবাইকে যার যার ম্যাচিং ‘এভাটার’ এর সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এরপর, পাশের রুমে এসে আটটি যন্ত্রযানে বসতে বলা হয়েছে।      
আদেশ শিরোধার্য করে আমরা বসে আছি।
এই এলাকাটা সংরক্ষিত।
এখান পর্যন্ত এসে পৌছাতে সময় লেগেছে দীর্ঘ। অনেক দূর হেঁটে এদের সীমানায় ঢুকতে হয়। তবে হাঁটা পর্ব এতো সহজে শেষ হবার নয়। সীমানায় ঢোকার পরেও আরও দুই ঘণ্টা উঁচু নিচু পথে হাঁটতে হয়েছে। পাহাড়, জংগল, পেরিয়ে, আঁকাবাঁকা গুহার ভিতর দিয়ে, নাভী এলিয়েন দের ব্যাবহারের জিনিসপত্র পিছনে ফেলে, এভাটার ল্যাব ঘুরে, বিশাল কাঁচের ট্যাঙ্কের তরল পদার্থে ভাসমান এভাটারের দোলায়িত শরীর দেখতে দেখতে তবে আসা।   
আর আসা মাত্রই বুঝে গেছি, এসেছিলাম যদিও নিজের ইচ্ছেয় কিন্তু এবার থেকে চলতে হবে ওদের ইচ্ছেয়। নইলে ফল হবে  ভয়ানক!
কে চায় জীবনের উপর ঝুঁকি নিতে! অতএব সবাই বিনা বাক্যব্যায়ে যার যার যন্ত্রযানে এসে বসেছি। জিনিসটা দেখতে অনেকটা মোটরসাইকেলের মত। এই জিনিস কি করে আমাদের এতদূর নিয়ে যাবে বুঝতে পারছিনা।
   
এতক্ষণ দেয়ালের বড় স্ক্রিনে কালো কোট পরা এক ভদ্রলোক   আমাদের উদ্দেশ্য কিছু কথা বলেছেন।
কথা বলার সময় তার মুখটা হাসিহাসিই ছিল। কিন্তু শোনামাত্র আমাদের মুখের হাসি দপ করে নিভে গেছে। নিজের নাম এবং পরিচয়ও তিনি শুরুতেই দিয়েছেন। তবে এতসব মনে রাখার মত মনের অবস্থা কারো নয়। তার বক্তব্য শোনার পর থেকেই আত্মারাম খাঁচা ছাড়া।           
কিন্তু কি আশ্চর্য! আমার অবস্থার দিকে কারো কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। যন্ত্রযান তার কাজ করে যাচ্ছে। বসা মাত্রই সে খপ করে পিছন থেকে ঠেলে আমাকে একটু ঝুঁকিয়ে দিল সামনে। আঁটসাঁট করে পরিয়ে দিল পাকাপোক্ত বেড়ি। বেড়ি খুলে বেরিয়ে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই।

এই রুমে আঁটটি যন্ত্রযানে বসে আছি আমরা আটজন যাত্রী।  সামনের পথ গেছে অজানার দিকে বেঁকে। সেই পথটুকু পাড়ি দিতে হবে একা একা। যে যার মত করে। আমার সাহস খুব কম। কিন্তু কৌতূহল অপার। সেই কৌতূহলেই এতদূর আসা।   
(একটা কথা আড়ালে বলে রাখি, বেড়ি যে শুধু আমাকে পরানো  হয়েছে তা কিন্তু নয়। এখানে আমার পরিবারের সদস্যরাও আছে। তারাও পরেছে বেড়ি। রুমটা অন্ধকার। ওদের কাউকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা।। আসে পাশে আরো রুম আছে। সেখানে বসে আছে অসংখ্য অচেনা জন। এই মুহূর্তে বিশাল এই বিল্ডিঙের চারিদিকে অজস্র খোপে খোপে এইভাবে কত মানুষকে যে আটকে ফেলা হয়েছে কে জানে! ওদের অবস্থাও কি আমারি মত!      

দুরু দুরু হাতে আমি ফ্লাইট গগলসটা চোখে পরে নিলাম। পরতে  না পরতেই প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল ধরণী। চোখের পলকে বদলে গেছে দৃশ্যপট! কি ভয়ঙ্কর! কি ভয়ঙ্কর! কি ভয়ঙ্কর!
সামনের দেয়ালটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।       
খোলা আসমানে ছিটকে বেরিয়ে গেছি আমি।
বদলে গেছে আমার বাহন। আমি এখন বসে আছি অতিকায় এক পাখি অর্থাৎ মাউন্টেইন ব্যানশীর পীঠে। নাভী এলিয়েনদের ভাষায় এর নাম ইকরা।  

ইকরা নামের পাখিটা আমাকে নিয়ে উড়াল দিয়েছে আকাশে। এ এক ভয় ধরানো অচেনা আকাশ। উঁচু পর্বতের চুড়া থেকে উড়তে উড়তে সোজা নিচমুখো হয়ে নামছে ইকরা। অকল্পনীয় দ্রুত তার গতী। কি ভয়ঙ্কর অবিশ্বাস্য পাতাল যাত্রা! চারিদিকে আকাশ ফাটানো শব্দ, ঝড় ঝঞ্ঝা পাগল বাতাস।
আমি ভয়ে নিথর!  
গলা শুকিয়ে কাঠ।  
ব্যানশীর পিঠে বসে টালমাটাল দুলছি। কাঁপছি। পড়ি পড়ি করেও কোনমতে সামলে নিচ্ছি। অথবা ব্যানশীই আমাকে সামলে রাখছে। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই বুঝি পাতাল পুরীতে ঢুকে গেলাম! এই বুঝি মরে গেলাম! একি ভয়ানক বিপদ! আমি প্রাণপণে চেপে ধরে রাখি ব্যানশীর পালক। ব্যানশী কি তাতে আরো ক্ষেপে গেল! তীব্র থেকে তীব্রতর হল তার গতী।

আমি আর পারছিনা। হৃদপিণ্ডটা বুঝি ঠিকরে বেরিয়ে যাবে বাইরে।
চলতে চলতে চকিতে কখনো আমার সহ যাত্রীদের দু’একজনকে এক পলকের জম্য দেখেছি। বাকিরা কোথায় কে জানে! কিন্তু চারিদিকে শোনা যাচ্ছে তাদের গগন ভেদী চিৎকার। ভয়ঙ্কর এই যাত্রার  সমস্ত যাত্রীরা ভয়ে আর বিস্ময়ে আর্তনাদ করছে।
আমিত শুধু মূর্ছা যাওয়ার অপেক্ষায়।      
ব্যানশী ছুটছে বহু নিচের এক উপত্যকা লক্ষ্য করে। পাড়ি দিচ্ছে অবিশ্বাস্য বিপদসঙ্কুল পথ! চারিদিকে ভয়াল অরণ্য। প্রকাণ্ড সব দানবাকৃতি গাছপালা। পর্বতের ভয়ঙ্কর বিপদজনক খাঁদ।  
এরি মাঝ দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে মোড় নিচ্ছে ব্যানশী।
এক বিপদ না পেরোতেই ঝাঁপ দিচ্ছে আরেক মহাবিপদে। আমার মত ভীতুকে  নিয়ে একি মরণ খেলা খেলছে সে!
আগে জানলে কি আর আসতাম!
হটাৎ অরণ্য পেরিয়ে ঢুকে গেল সে পঙ্গপালের মত তেড়েফুঁড়ে ছুটন্ত একদল অতিকায় বন্য পশুর মাঝখানে।
আমি ভয়ে বিস্ফারিত চোখ মেলে দেখছি আমাদের মাত্র এক ইঞ্চি নিচ দিয়ে ক্ষিপ্র বেগে ধাবমান বিদঘুটে ভয়ানক বন্য পশুর দল। একবার আমাদের ধরে ফেললে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে দিবে।
আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করলাম।

পর মুহূর্তে চোখ খুলেই অবাক!
সামনে দিগন্ত জোড়া রহস্যময় এক নিশীকালিন জগত! যেন পটে আঁকা ছবি। শান্ত সুন্দর! এতো শান্ত যে আমার বাহন পাখিটির নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও শুনতে পাচ্ছি। মাঝ আকাশে থমকে থেমে আছে মাউন্টেইন ব্যানশী। পায়ের নিচে, কোমল মসৃণ তৃণলতা! ঠিকরে আলো বেরুচ্ছে তাদের গা থেকে। বায়লুমিনিসেন্ট এলিয়েন ওয়ার্ল্ড! লাস্যময় ফুল আর ফল! বাতাসে ভেসে আসা পুস্প সৌরভ। এদিকে ওদিকে উড়ন্ত পর্বতমালা। ভাসমান নদী। নয়নাভিরাম জলপ্রপাত। সারি সারি বৃক্ষমালা। একেবারেই অন্যরকম। এবং ভয়ঙ্কর সুন্দর!  
ভয়ঙ্কর      
   এবং    
      সুন্দর!
এরকমই হওয়ার কথা।  
আমরাতো এখন আর পৃথিবীতে নেই। সে কথা কি বলেছি আগে! বলিনি। এইবার বলি।
আমরা এসে গেছি সাড়ে চার আলোকবর্ষ দূরের ভিন্ন এক জগতে - দ্যা ফ্লোটিং আইল্যান্ড অব প্যান্ডোরা। দ্যা ওয়ার্ল্ড অব এভাটার!   
যেখানে ছুটে চলে ভাসমান পর্বতমালা। দিনের আলোয় সবুজ দেখালেও রাতের বেলায় ঝলমল করে জ্বলে বায়োল্যুমিনেসেন্ট অরণ্য।
এ এমন এক জগত, যা পৃথিবীরই মত তবু প্রায় সব দিক দিয়েই সম্পূর্ণ সতন্ত্র।      
আজগুবি অথচ কি অবিশ্বাস্য সুন্দর!   
এখানে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ করেনা। তাই শূন্যে ভেসে বেড়ায় পর্বতমালা, জল টলমল নদী নালা হ্রদ।
অবাক করা এক চন্দ্র।   
সেই চাঁদের দেশের আকাশে আমাকে নিয়ে উড়ছে মাউন্টইন ব্যানশী। ডানা মেলা অতীকায় এক পক্ষী। কি অসাধারণ শক্তি এই পাখির। ছড়ানো ডানায় সূর্যের তেজ! আলোর চেয়েও ক্ষিপ্র তার গতি। আমি তাজ্জব হয়ে দেখি। আর দেখি।
মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত!
অথবা তারো কম।
আচমকে ঝড়ের গতীতে আবারো ছুটল ব্যানশী। উড়ে গেল পান্না সবুজ ভয়ঙ্কর সুন্দর এক সাগরের বুকে। কি বিশাল তার ঢেউ!  পাহাড় সমান। ঢেউয়ের উপর দিয়ে বাতাসের বেগে ছুটছে ইকরা। উতরোল হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছি আমি। আমার দু’পায়ে ধাক্কা দিচ্ছে বাতাসের চাবুক। হাতে মুখে গায়ে ছিটকে এসে লাগছে জলের ছিটা।  
এই বুঝি ডুবে গেলাম অথই সাগরে!
বাঁচবার আশা নেই।
নেই কোন ভরসা।    
আমাকে ডানায় নিয়ে ভয়ঙ্কর সেই সবুজ সাগরে নাগর দোলার মত দুলছে ব্যানশী। বনবন করে ঘুরছে আমার মাথা। ব্যানশীর যেন কোন ভাবনাই নাই। সে চট করে আকাশ ছোঁয়া প্রকাণ্ড এক পান্না সবুজ ঢেউয়ের মোড়কে ঢুকে গেল। শরীরে প্রচণ্ড ঝাপটা তুলে ঢেউয়ের মোড়ক ভেঙ্গে শূন্যে ঘূর্ণির মত উপরে উঠছে ইকরা। একি মরণ খেলায় মেতেছে ও!
আমাকে কি আর বাঁচতে দিবেনা!
সর্বগ্রাসী ভয়ের কবলে দিশাহারা আমি।  
চোখ বন্ধ করলাম ভয়ে।

আমার আধমরা অবস্থা দেখেই কিনা জানিনা, মাউন্টেইন ব্যানশী এসে ল্যান্ড করলো ফ্লোরিডার অরল্যাণ্ডো শহরের ডিজনি আনিম্যাল কিংডমে। বারো একর জোড়া প্যাণ্ডোরা ল্যান্ডে।  
ঝলমলিয়ে জলে উঠল রুমের আলো।  
যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল সবাই।
প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিলাম আমরা। যাক! কোনক্রমে ভয়াল সুন্দর জগতটা পেরিয়ে আসতে পেরেছি!
আমরা আটজন বিস্ময় বিমোহিত যাত্রী একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলাম।
মাথাটা এখনো ঘুরছে সবার।
পা দুটো টলমল।    
তবু আনন্দে বিহ্বল।
 
ডিজনির সর্ব শেষ সংযোজন - সদ্য আসা রাইড – ‘এভাটার ফ্লাইট প্যাসেজ ’ এর  কথা  বলছিলাম আমি এতক্ষণ। এটি একটি  flying augmented reality E-ticket simulator attraction, যেখানে অতিথিরা মাউন্টেইন ব্যানশীর পিঠে চেপে অচেনা এক আকাশে উড়ে বেড়ান।
 
সংক্ষিপ্ত এই রাইডে সশরীরে ঘুরে এলাম অবিশ্বাস্য সেই চাঁদের দেশ। যেখানে বাতাসে হিল্লোল তুলে লীলাময় প্রকৃতির ম্যাজিক। ডিজনির এযাবৎকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ রাইড।  

একরাশ মুগ্ধতা আর ঘোরলাগা বিস্ময়! এ বিস্ময় কোনদিন শেষ হওয়ার নয়।  
 
সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭ )