ভাষা-রেনেসাঁস ধর্ম-রেনেসাঁসের চেয়ে উন্নত ঘটনা
আবুল বাশার   
মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

অন্নদাশঙ্কর রায় দুটি রেনেসাঁসের কথা বলেন। একটি শহর কলকাতাকেন্দ্রিক বিদ্যাসাগরীয় রেনেসাঁস। অন্যটি ঢাকাকেন্দ্রিক মুক্তবুদ্ধির আন্দোলন (রেনেসাঁস)। বিদ্যাসাগরীয় রেনেসাঁস প্রধানত বাঙালি হিন্দু জীবনের রেনেসাঁস। সেই রেনেসাঁস সব স্তরের হিন্দু জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। উচ্চবর্ণ-উচ্চবর্গের হিন্দুই তাতে লাভবান হয়েছেন। নিম্নবর্ণ-নিম্নবর্গের হিন্দুর জীবনে ওই রেনেসাঁস তেমন কোনো কাজে লাগেনি। বলাবাহুল্য বাংলার মুসলমান জীবনে ওই আন্দোলন সামান্যও রেখাপাত করেনি। করবার হেতুও কিছু ছিল না। বিদ্যাসাগরের যে সমাজ সংস্কার আন্দোলন, তা বস্তুত ধর্ম সংস্কারও বটে। বিধবা বিবাহ প্রচলন করার যে বিদ্যাসাগরীয় আন্দোলন, সেই আন্দোলন বাংলার মুসলমানকে স্পর্শ করবে কোন যুক্তিতে?

মুসলমান জীবনে ‘বিধবা সমস্যা’ বলে কোনো সমস্যা কোনো কালে ছিল না। কোনো কালেই নেই। মহানবী হযরত মহম্মদ (স.) তাঁর দাম্পত্য জীবন শুরুই করেছিলেন বিধবা মহামানবী খদিজাকে বিয়ে করে—মহাত্মা হযরত মহম্মদের তুলনায় আলোর মহিলা খদিজা অন্তত ১৫ বছরের বড় ছিলেন।

আরবে বিধবা কোনোকালেই সমস্যা নয়। মুসলমান জীবনে সতীদাহ নামে কোনো প্রথা কোনোকালে ছিল না। দেখা যাচ্ছে এই দুই সমস্যাও সর্বস্তরের হিন্দু জীবনের সমস্যা ছিল না। অথচ সারাটা বাংলা সাহিত্য এই বিধবা সমস্যা ও বিধবা প্রেমেই জর্জরিত। বাংলা সাহিত্যের বাঁক বদল হয়েছে এই বিধবার প্রেমে (চোখের বালি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

শরত্চন্দ্র বিরাট আক্ষেপ করেছেন এই বলে যে, বিধবা সমস্যা নিয়ে সাতিশয় একা লড়তে হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে—কেউ তাঁর পাশে ছিল না। কোনা লেখক বিদ্যাসাগরকে সমর্থন করেননি। এমনকী শরত্চন্দ্র এ কথাও বলছেন যে, ধর্মীয় সংস্কারের বিরোধিতা করে কিছু লিখলে তাতে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়, তা মানুষ নিতে পারে না। বিধবা প্রেম কতজন হিন্দুর ভালো লাগত, তা ভাববার কথা।

তবু দেখা যাচ্ছে, বিদ্যাসাগরই জিতলেন, শরত্চন্দ্রের সাহিত্য কালজয়ী হলো। হিন্দু সমাজের অগ্রবর্তী বর্ণ ও বর্গকে ঘিরে গড়ে উঠল একটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ। পরে মধ্যবর্গ মধ্যবর্ণ এগোল। এখন ভারতবর্ষে এগোচ্ছে দলিত হিন্দু। কিন্তু অনগ্রসর মুসলমান ‘ফৌত’ হচ্ছে দিনকে দিন।

ভারতবর্ষে মুসলমান মধ্যবিত্ত গড়ে ওঠার কোনো সুদূর সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। মুসলমানের জন্য অর্থাত্ ভারতীয় মুসলমানের জন্য কোনো রেনেসাঁস অপেক্ষা করে নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমান জীবনে রেনেসাঁ হয়েছে সীমাবদ্ধ আকারে হলেও হয়েছে। খুব শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে না উঠলেও একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে।

এই ব্যাপারটি এই মুক্তবুদ্ধির আন্দোলন ‘শিখা’ পত্রিকাগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, গড়ে উঠেছিল মুসলমান রায়তের টাকায় গড়ে ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার প্রেক্ষাপটে। এ নিয়ে বাংলাদেশে বৃহত্-চর্চা হয়েছে। আমি আর সে কথায় যাব না।

বাংলাদেশের রেনেসাঁস শুধু মুসলমানের রেনেসাঁস নয়, ভাষা সংস্কৃতি রেনেসাঁস সেখানে হিন্দুু সমাজেরও নবজাগরণ বটে। হিন্দুু জীবনে সেই ভাষা জাগরণের মহত্ দীপ্তি আসুক আমি চাই।

খোলা মনে বিচার করুন পাঠক, কোন রেনেসাঁসের চরিত্র ঠিক কী? একটির উদ্দীপক শক্তি ভাষা। অন্যটি ধর্ম সংস্কারমূলক সংবেদনা। নারীশিক্ষা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এই সংবেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সত্য, কিন্তু মুখ্য আন্দোলন বিধবা বিবাহ প্রত্যক্ষত সেটাই হয়েছে রেনেসাঁসের এজেন্ডা।

শরত্চন্দ্র কী চোখে দেখছিলেন এই বিধবা বিবাহ, তারই ভাষায় পেশ করা যাক—

‘মানুষ তার সংস্কার ভাব নিয়েই ত মানুষ; ... সংস্কার ও ভাবের বিরুদ্ধে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা যায় না,... একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলি। বিধবা বিবাহ মন্দ, হিন্দুর ইহা মজ্জাগত সংস্কার। গল্প বা উপন্যাসের মধ্যে বিধবা নায়িকার পুনর্বিবাহ দিয়ে কোনো সাহিত্যিকেরই সাধ্য নাই, নিষ্ঠাবান হিন্দুর চক্ষে সৌন্দর্য সৃষ্টি করবার। পড়বামাত্রই মন তার তিক্ত বিষাক্ত হয়ে উঠবে। গ্রন্থের অন্যান্য সমস্ত গুণই তার কাছে ব্যর্থ হয়ে যাবে। স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন গভর্নমেন্টের সাহায্যে বিধবা বিবাহ বিধিবদ্ধ করেছিলেন, তখন তিনি কেবল শাস্ত্রীয় বিচারই করেছিলেন, হিন্দুর মনের বিচার করেননি। তাই আইন পাস হলো বটে, কিন্তু হিন্দু সমাজ তাকে গ্রহণ করতেই পারলে না। তার অতবড় চেষ্টা নিষ্ফল হয়ে গেল। নিন্দা গ্লানি, নির্যাতন তাকে অনেক সইতে হয়েছিল, কিন্তু তখনকার দিনের কোনো সাহিত্যসেবীই তার পক্ষ অবলম্বন করলেন না। হয়ত এই অভিনব ভাবের সঙ্গে তাদের সত্যই সহানুভূতি ছিল না, হয়ত তাদের সামাজিক অপ্রিয়তার অত্যন্ত ভয় ছিল, যে জন্যই হোক, সেদিনের সে ভাবধারা সেইখানেই রুদ্ধ হয়ে রইল। সমাজদেহের স্তরে স্তরে গৃহস্থের অন্তঃপুরে সঞ্চারিত হতে পেলে না। কিন্তু এমন যদি না হত এমন উদাসীন হয়ে যদি তারা না থাকতেন, নিন্দা, গ্লানি, নির্যাতন—সকলই তাঁদিগকে সইতে হত সত্য, কিন্তু আজ হয়ত আমরা হিন্দুর সামাজিক ব্যবস্থার আর একটা চেহারা দেখতে পেতাম। সেদিনের হিন্দুর চক্ষে যে সৌন্দর্য-সৃষ্টি কদর্য নিষ্ঠুর ও মিথ্যা প্রতিভাত হত, আজ অর্ধ শতাব্দী পরে তারই রূপে হয়ত আমাদের নয়ন ও মন মুগ্ধ হয়ে যেত।’ [শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় / স্বদেশ ও সাহিত্য]

এটাই রেনেসাঁসের কণ্ঠস্বর। কিন্তু এই রেনেসাঁস তো হিন্দু সমাজের সর্বাংশের রেনেসাঁস নয়। হিন্দুর বর্ণবাদকে বিদ্যাসাগর অতিক্রম করতে পারেননি। ফলে বর্ণবাদ সুরক্ষিতই থেকে গেছে।

আমার মূল্যায়ন এ রকম—পাকিস্তানে মুসলমান একটি জাতি। বাংলাদেশে মুসলমান একটি সম্প্রদায়। ভারতবর্ষে মুসলমান একটি বর্ণ মাত্র—নিম্নবর্ণ। কারণ মুসলমান এখানে নিম্নবর্ণ থেকেই ধর্মান্তরিত হয়েছে। নিম্নবর্ণ থেকে বৌদ্ধ হয়ে তারপর মুসলমান হয়েছে—এমনও হয়েছে। বাংলাদেশে তার নিম্নবর্ণত্ব ঘুচে গেছে ভাষাজাতি হিসেবে নিম্নসত্তার ধর্মনিরপেক্ষ উত্তরণে; সে হয়ে উঠেছে যথার্থ বাঙালি, তার সঙ্গে মিশে আছে হিন্দু সম্প্রদায়েরও সমান উত্তরণ; ভাষা-প্রত্যয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য জাগরণ (রেনেসাঁস)। এ জিনিস ভারতবর্ষে লক্ষ লক্ষ বছরেও হবে না কারো—কোনো বর্ণ বা সম্প্রদায়ের—দলিতের বা মুসলমানের। ভারতবর্ষে যথার্থ রেনেসাঁস আসতে হলেও বর্ণবাদের অনড় জগদ্দল সরাতে হবে—এ কাজে কোনো কারো স্পৃহা দেখা যায় না।

অথচ ভারতবর্ষে অন্য চর্চাও তো ছিল; ধর্ম-সমন্বয়ের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য তো ছিল; বাঙালি হিন্দুর মুখে বহুত্ববাদের গালভরা মননশীল চমক ছিল, ধর্মবেত্তা ঠাকুরের মুখে ছিল ‘যত মত তত পথ’—বাণী। সবকে চমকে দিয়েছে নতুন এক হিন্দুযুগ শুরু হয়েছে ভারতবর্ষে। বল্লাল সেনের হিন্দুত্ব এই সুপ্রাচীন নবত্বে ভরা হিন্দুত্বের কাছে নস্যি মাত্র।

অথচ হিন্দু ও মুসলমান এখনও আমরা একসঙ্গে রয়েছি। যদিও ভারতের মুসলমান প্রকৃত প্রস্তাবে আদিবাসীদের চেয়েও গরিব, অসহায়, নিরাপত্তাহীন।

আমি একজন নিম্নবর্ণেরই লোক। আমার দাদা সাহেব (ঠাকুরদা)’র নাম সুবরাতি মন্ডল। তার বাবার নাম গোলাপ মন্ডল। আমার বাবার নাম কলিমউদ্দিন আহমেদ (মন্ডল)। আমার পদবি আসলে মন্ডল; নিম্নবর্ণের মন্ডল। ভারতবর্ষে মুসলমানের চাকরি (সরকারি) তিন শতাংশেরও কম। পশ্চিমবঙ্গে পাঁচ শতাংশ—উচ্চপদে কোনো চাকরি নেই। রেলে চার শতাংশ—অত্যন্ত নীচু পদে নিযুক্ত।

মোদীভাই কলকাতার জনসভায় প্রকাশ্যেই বলে গেছেন, যারা দুর্গাপূর্জা করেন সেই সব হিন্দুর জন্য ভারতের দরজা উন্মুক্ত রয়েছে।

কিন্তু ভারতবর্ষে, বিশেষ এই বাংলায় মুসলমানের উদ্যোগেও তো দুর্গাপূজা হয়। মুর্শিদাবাদের লোক আমি, সেখানে পূজা কমিটির সম্পাদক-সভাপতি মুসলমান; কলকাতায় নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম একাই একটি দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দিন পনের আগে খুঁটি পূজা হলো এক জায়গায়, এই কলকাতার বুকে—উদ্বোধক ফিরহাদ; তত্সহ আমিও ছিলাম। আমার লেখা ‘জমিজিরেত’ নামে একটি ছোটগল্প প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-তে পাঠ্য—তার নায়ক একজন শিব-উপাসক মুসলমান—কাশ্মিরের যে ইসলাম, তা আসলে শৈব ইসলাম। আমরা শিব-কৃষ্ণের উপাদান ইসলামে নিয়েছি। তবু ভারতে জায়গা হচ্ছে না কেন? কোন রেনেসাঁস হলে এদেশে মুসলমান বাঁচে, আনিসুজ্জামান কি বলতে পারেন?

n লেখক :ভারতের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক
সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭ )