শিউলির অন্তর্দাহ
আশরাফ আহমেদ. মেরিল্যান্ড   
সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭
চার পর্বের ধারাবাহিক গল্প

চার
টয়লেট থকে বেরিয়ে শিউলি ভারতীয় এই বিমানবালাকেই সামনে পেয়েছিল। টয়লেটের ভেতরে সিঙ্কের পাশে চারকোণা একটি শুকনা টিস্যু পেপার অবহেলায় পড়েছিল। সেটি নোংরা ভেবে শিউলির খুব খারাপ লাগছিল। সাবধানে দুই আঙ্গুল দিয়ে ধরে সেটি ফেলতে গিয়ে লক্ষ্য করলো তাতে কিছু লেখা আছে। কাঁচা হাতের ইংরেজিতে লেখা।  শিউলি সদ্য ঘুম ভেঙে উঠে এসেছে, তার ওপর প্রকৃতির চাপে লেখাটি ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় কী মনে করে সেই টিস্যুপেপারটি ঠিকই সে সাথে নিয়ে বেরিয়েছিল। টুটুলকে দেখাতে হবে। দরজা খুলতেই সামনে পড়লো ভারতীয় চেহারার কুড়ি-বাইশ বছরের এক বিমানবালা। কী ভেবে ওর হাতে টিস্যুপেপারটি দিয়ে বলেছিল, সিঙ্কের পাশে কেউ এটি রেখে দিয়েছে। দেখতো এটি গুরুত্বপূর্ণ কোন লেখা কিনা?

লেখাটি পড়ে মেয়েটি মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। নিজেকে সামলে নিয়ে সে শিউলিকে বলেছিল, আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন। আমি আমাদের প্রধান বিমানবালাকে ডেকে আনছি।

প্রধান বিমানবালার বয়স চল্লিশের নীচে, কিছুটা লম্বা। টিস্যুপেপারটি চোখের সামনে ধরে, ভীত সন্ত্রস্ত চেহারায় সে শিউলিকে কয়েকটি প্রশ্ন করলো। এই দুই বিমানবালার উৎকণ্ঠিত আচরণ দেখে শিউলি বুঝতে পারলো কাঁচা হাতে লেখা মাত্র সাতটি শব্দ ধারণ করে এই টিস্যুপেপারটি নগন্য কিছু নয়! বিমানের সাড়ে তিনশত যাত্রীর প্রাণ কেড়ে নিতে পারে যে কোন মুহূর্তে। তাতে লেখা ‘এই বিমানে একটি শক্তিশালী বোমা পাতা আছে’।

দুই বিমানবালার প্রতিক্রিয়া দেখে শিউলি নিজের প্রাণের চেয়ে ওর তরুণ পুত্র এবং প্রিয়তম স্বামীর জীবনের জন্য বেশি শংকিত হলো। ছেলেটি এই সুন্দর পৃথিবীর কোন স্বাদই নিতে পারলো না! আর বিয়ের পর থেকে সব কিছুর জন্য শিউলিই স্বামীটির সমস্ত পৃথিবী! দুই বিমানবালার সামনে দাঁড়িয়ে শিউলির প্রতিটি মুহূর্ত একেকটি যুগ মনে হতে লাগলো। সে এই মুহূর্তেই স্বামী ও পুত্রের কাছে যেতে চায়। ওদের জড়িয়ে, আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু বিমানবালারা ওকে কিছুতেই যেতে দিল না।

প্রধান বিমানবালা অনেকটা টলতে টলতে দেয়ালের টেলিফোনটি টেনে নিয়ে কানে লাগালো। কার সাথে কথা বলে ফিরে এলো। ওদের কথাবার্তায় বুঝতে পারলো, বোমা না থাকা নিশ্চিন্ত করার মত বিমানের সাড়ে তিনশত যাত্রীর নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ক্যাপ্টেনের! এই কথোপকথনের কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা দিয়েছিল বিমানের প্রধান পাইলট, এই বিমানের ক্যাপ্টেন।

লম্বা, সুঠাম দেহ ও সুশ্রী চেহারার ক্যাপ্টেনকে দেখে শিউলি যেন কিছুটা স্বস্তি পেলো। ক্যাপ্টেন বললো, কেউ দুষ্টুমি করে ভয় দেখানোর জন্য কাজটি করেছে। আসলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই অভয়বনী শুনে শিউলির দেহে প্রাণটি ফিরে এলো। লোকটিকে দেবদূত বলে মনে হলো।

কিন্তু কম্পিত কণ্ঠে জ্যেষ্ঠ বিমানবালা জানালো যে বিমান ছাড়ার আগে লগ বইতে বিস্ফোরক-গন্ধ শোঁকা কুকুর দিয়ে বিমানটি পরীক্ষা করার নথি সে দেখতে পায়নি। সাধারণতঃ এই অবস্থায় বিমান ছাড়ার কথা নয়। ক্যাপ্টেন বললো, হ্যাঁ পরীক্ষক কুকুর দুটো সেদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তা করা হয়নি। তাই নিজ দায়িত্বে তিনি বিমানটি আকাশে উড়িয়েছেন। তবে তিনি এও মনে করেন না যে বিমানে আসলেই কোন বোমা আছে।

দুই বিমানবালা ক্যাপ্টেনের আশ্বাসবাণীতে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। তাই ভয়ে ভয়ে পরামর্শ দিল বোমার অস্তিত্ব খোঁজ করতে বিমানটির সর্বত্র খুঁজে দেখতে। প্রয়োজনে নিকটবর্তী কোন বিমান বন্দরে অবতরণ করতেও পরামর্শ দিল। শিউলিও তাদের সমর্থন করলো।

ক্যাপ্টেন বললো, এখন বোমা খোঁজাখুঁজি  করতে গেলে টের পেয়ে যাত্রীরা অহেতুক আতংকিত হয়ে পড়বে। যে কোন অঘটনও ঘটাতে পারে। তাছাড়া কাছাকাছি বড় কোন বিমান বন্দরও নেই। শুধুমাত্র কারো দুষ্টুমি করে একটি লেখার ওপর ভিত্তি করে অখ্যাত কোন স্থানে  অনির্ধারিত অবতরণ করলে বিমান কোম্পানীর নামে কলঙ্ক রটে যাবে। ফলে বহুবছর চেষ্টার পর দাঁড়ানো এই কোম্পানিটির লালবাতি জ্বলে যেতে পারে।

কাজেই সবার নিরাপত্তার কথা ভেবে টিস্যুপেপারে লেখার কথাটি এই চারজনের বাইরে আর কোন কানে যাওয়া উচিত নয় কোন মতেই। এমন কি শিউলির স্বামী এবং ছেলের কানেও নয়।

হয়তো আসলেই কাছাকাছি অবতরণযোগ্য কোন বিমানবন্দর নেই। তার সাথে নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ক্যাপ্টেনের সিদ্ধান্তই হয়তো ঠিক। কিন্তু লিওনার্দো ডি’কাপ্রিও এবং টম হ্যাঙ্ক অভিনীত ‘ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান’ নামে সত্য ঘটিনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটির কথাও শিউলির মনে পড়লো। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে অপ্রাপ্তবয়ষ্ক টিনএজার এক যুবক ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছিল নিখুঁতভাবে। এতোই নিখুঁত ছিল সেই অভিনয় যে সে নিজ হাতে বিমান চালিয়েছে। এক বিমান বন্দর থেকে আরেক বন্দরে উড়ে গেছে অনায়াসে, অনেকবার।

তাই আজকের ক্যাপ্টেনকেও শিউলির কাছে তেমনি কোন মুখোসধারী মনে হলো। প্রথমতঃ কুকুর দিয়ে পরীক্ষা না করিয়ে বিমানটিকে আকাশে ওড়ানোতে ওকে পুরোপুরি দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হলো। একই সাথে হৃদয়হীনও মনে হলো। ওর কাছে এখন মানুষের জীবন নয়, বিমান কোম্পানির সুনাম ও লাভ লোকসানের ব্যপারটিই বড় মনে হচ্ছে!

সিনেমার নায়কটির মতোই ওকে এক লম্পট ভাবতেও শিউলির কোন কষ্ট করতে হলো না। ওর সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে মনের এই ভাবটি কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না ক্যাপ্টেনের এই নির্দেশে।

ক্যাপ্টেনের নির্দেশে সবাই ছত্রভঙ্গ করে চলে গেল। কিন্তু দুই বিমানবালার মত শিউলিও যে কোন মুহূর্তে একটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণের অপেক্ষা করতে লাগলো।  

স্বাভাবিক অবস্থায় শিউলি ক্যাপ্টেনের নির্দেশ অমান্য করতো। কিন্তু গত দুই বছরে তিনবার হৃদপিণ্ডে অস্ত্রোপচার করা, এবং উচ্চরক্তচাপের রোগী স্বামীর কাছে আসন্ন মৃত্যুর কথা সে প্রকাশ করতে পারলো না। তেমনি প্রকাশ করতে পারলো না তেইশ বছর বয়সের ছেলেটির কাছে। সে এই প্রথমবারের মত বাংলাদেশে যাচ্ছে বিয়ে করতে। বিয়েটি হবে ওর পছন্দের মিষ্টি একটি মেয়ের সাথে।

 শিউলি ভাবলো যতক্ষণ প্রাণ আছে, নিস্পাপ এই ছেলেটি বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যুচিন্তায় বিধ্বস্ত না হয়েই থাকুক। প্রেয়সীর সাথে মিলনের সুখচিন্তা বক্ষে ধারণ করেই প্রাণপ্রিয় পুত্র এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিক!

বাকি পাঁচঘণ্টা আসন্ন মৃত্যুচিন্তার নরকযন্ত্রণা শিউলি একাই ভোগ করবে। এই তার নিয়তি। তা মেনে নিয়ে সে নীরবে নিজের সিটে এসে বসেছিল।    
(শেষ)
৭ই এপ্রিল, ২০১৬
পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৯ জুন ২০১৭ )