শিউলির অন্তর্দাহ
আশরাফ আহমেদ. মেরিল্যান্ড   
সোমবার, ২৯ মে ২০১৭
চার পর্বের ধারাবাহিক গল্প

তিন
একবার ঘুম ভেঙে টুটুল সোজা হয়ে বসলো। শিউলির দিকে তাকিয়ে কিছুই না বলে সিটের সামনে টেলিভিশনটি চালু করলো। চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে একটি সিনেমায় চোখ আটকে গেল, কারণ নায়িকার চেহারাটি ভারতীয়। জীবনের বেশির ভাগ সময় পাশ্চাত্যে বাস করলেও স্বদেশের কাছাকাছি সংষ্কৃতির প্রতি টুটুলের টানটা যেন দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আজকাল প্রসাধন সামগ্রীর বহুল ব্যবহারের ফলে কে বাঙালি, কে ইংরেজ আর কে হিস্পানিক তা সহজে তার পার্থক্য করা যায় না। কিন্তু কারো পরনে শাড়ি দেখলে খুব সহজেই বাঙালি বা ভারতীয় চেহারার আদলটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজও তাই হলো। ফলে গল্প-সংক্ষেপটি না পড়েই টুটুল সিনেমাটি পছন্দ করলো। সিনেমাটির নাম নিরজা। ১৯৮৬ সালের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে বলিউডে নির্মিত। নিউইয়র্কের পথে বোম্বে থেকে রওনা হয়ে প্যানএম এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান করাচিতে থামে। নিরজা বিনোদ নামে চব্বিশ বছরের ভারতীয় এক যুবতী এই যাত্রার প্রধান বিমানবালা ছিল। লিবিয়ার একদল সন্ত্রাসবাদী বিমানটি দখল করে নেয়, এবং একের পর এক যাত্রী হত্যা করতে থাকে। মোট ২১ জন যাত্রী তাদের প্রাণ হারায়। নিরজার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং কর্তব্যপরায়ণতার ফলে বিমানের তিন জন আমেরিকান পাইলট এবং ৩৬০ জন যাত্রীর জীবনরক্ষা পেয়েছিল।

যাত্রীদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে মেয়েটির নিজের জীবন বিসর্জনের দৃশ্যটি টুটুলের মনে এক গভীর দাগ কাটে। মেয়েটির প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতাবোধের সাথে কষ্টও অনুভব করলো। ফলে সিনেমার বাকি অংশটুকু দেখার উৎসাহ সে হারিয়ে ফেলে। টেলিভিশনটি বন্ধ করে কান থেকে মাইক্রোফোনটি নামিয়ে সে আবার ঘুমাতে চেষ্টা করলো। অচিরেই ঘুমিয়েও পড়লো।

শিউলি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মেঘের সাথে কথা বলছে কখনো বিড়বিড় করে, কখনো মনে মনে। বিমানের মৃদু গর্জনে নিজ কানের বাইরে ওর কথাগুলো আর কোথাও যাচ্ছে না। এর মাঝে কতঘণ্টা কেটে গেছে ওর খেয়াল নেই। মাইক্রোফোনে কিছু ঘোষণা ভেসে এলো। কিছুক্ষণের মাঝেই কেবিনের নরম বাতিগুলো অলসতা ভেঙে, অনেক সময় লাগিয়ে জ্বলে উঠলো। কিছুক্ষণের মাঝেই খাবারের ট্রলি হাতে বিমানবালাদের কর্মব্যস্ততা বেড়ে গেল। ঘুম ভেঙে পাশে বসা টুটুল সোজা হয়ে বসলো। শিউলি তখনো জানালা দিয়ে বাইরের মেঘ দেখে চলেছে।

ওদের সিটটি বিমানের নীচতলার ডান কাতারের প্রায় মাঝ বরাবর। টুটুলের ক্ষিদে পেয়েছে। অনেক্ষণ থেকে সে লক্ষ্য করছে যে বিমানবালাটি ওদের কাতারে খাবার পরিবেশন করছে সে অত্যন্ত ধীর, শম্বুকগতিতে এগোচ্ছে। সেই কখন থেকে কাতারের সামনের দিকের প্রথম যাত্রীকে খাবারের ট্রেটি হাতে দিয়েছিল। আর এখনো সে তৃতীয় সারির যাত্রীদের খাবার দিয়ে শেষ করতে পারে নি। অথচ বাঁ দিকের কাতারে অনেক সারির যাত্রীরা খাবারের পর্বটি শেষ করে ফেলেছে। টুটুলদের কাতারের কোন কোন যাত্রী ওর মতোই কিছুটা অধৈর্য হয়ে সামনের দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটি তা বুঝতে পারলেও কোনমতেই ওর কাজের গতি বাড়াতে পারছে না। ওর সারা শরীরে যেন দারুণ অবসাদ। পৃথিবীর সব ক্লান্তি বিধাতা যেন ওর কাঁধেই চাপিয়ে দিয়েছেন।     

পাশ্চাত্যের একই ফ্লাইটে বিভিন্ন জাত ও ভাষাভাষী বিমানবালা পাশাপাশি কাজ করে। টুটুল জাতিভেদে বিশ্বাস না। কিন্তু লক্ষ্য করেছে যে কোন কোন জাতের বিমানবালাদের শিক্ষা ও আচরণ অন্যান্যদের থেকে অনেক উন্নত হয়ে থাকে। যেমন জাপান এয়ারলাইন্সে জাপানি বিমনবালাদের অতিথিসেবার তুলনা সে আর কারো সাথে করতে পারে না। আজ তাই উৎসুক হয়ে এই কাতারে খাবার সরবরাহকারী বিমানবালার চেহারাটি দেখতে চেষ্টা করলো।

মেয়েটির চেহারা খুব মলিন দেখাচ্ছে। দূরের আলোতে গায়ের রংটি বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু চেহারা দেখে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মনে হয়। আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মনে হলো মেয়েটি অল্প আগে সিনেমায় অভিনয় করা অবিকল নিরজার চেহারার মত। নিরজার প্রতি একপ্রকার গভীর মমতাবোধের রেশটি তখনো রয়ে গিয়েছিল। এক্ষণে তাই নিজের খিদের কথা ভুলে টুটুল আজকের বিমানবালাটিকে  ক্ষমা করে দিল।

ওর গল্পের বই পড়া হয় খুব কম, সিনেমা দেখা হয় আরো কম। তাই আলস্যভরে দেখা সিনেমাটি ওর মনে ভালই রেখাপাত করেছে ভেবে টুটুল কিছুটা লজ্জা পেলো মনে মনে। কিন্তু খিদের কথা জানাতে পাশে বসা স্ত্রীকে ডাকলো বারকয়েক। শিউলি কোন সাড়া দিচ্ছে না। জানালার বাইরে তাকিয়ে সে যেন অন্য কোন গ্রহে বিচরণ করছে।

এবার ধাক্কা দিয়ে বললো, এতো কী ভাবছো? তোমার খিদে পায়নি?

সম্বিৎ ফিরে এলেও শিউলি নিজ শরীরটি একটু সংযত করে এক গভীর দৃষ্টিতে টুটুলের দিকে তাকিয়ে রইলো। টুটুল আবার বললো, ঘুমাচ্ছিলে নাকি? সামনে তাকিয়ে দেখ। মেয়েটি সেই কখন থেকে সামনের তিনটি সারিতে খাবার দিচ্ছে। মনে হয় এরপর ওর পা আর চলছে না, খাবারের ট্রলিটি ঠেলতেও যেন পারছে না। এদিকে আমি যে খিদেয় মরি! তোমার কি খিদে পাচ্ছে না?

অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিউলি মাথা উঁচু করে সামনে তাকালো। অনেক্ষণ সেদিকেই চেয়ে রইলো। বিমানবালার সাথে ওর চোখাচোখি হলে খানিক্ষণ দুজনের কেউই চোখ সরাতে পারলো না। এই দৃষ্টিবদলের পরক্ষণেই ওরা দুজনেই যেন খুব বিব্রতবোধ করলো।  প্রায় একই সাথে দুজনে স্ব স্ব দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়েও নিল।

সাথে সাথেই মেয়েটি ওর ট্রলি ঠেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এই সময়ে সম্ভবতঃ যাত্রীদের অভিযোগের ফলে অন্য দুজন বিমানবালা ভারতীয় মেয়েটির সাহায্যে এগিয়ে গেল।

গলায় অনেক দরদ জড়িয়ে শিউলি টুটুলকে বললো, এইতো এসে গেল বলে, লক্ষ্মীটি আর একটু অপেক্ষা কর। এই বলে সে আবার জানালার দিকে মুখ ফেরালো।
(চলবে)
৭ই এপ্রিল, ২০১৬
পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ২৯ মে ২০১৭ )