ফেরারি পাখি
মেরিনা রহমান, মেরিল্যান্ড   
শুক্রবার, ১২ মে ২০১৭

ওরা এসেছিলো হঠাৎ করেই। কাউকে না জিজ্ঞেস করেই ওরা  থাকার ব্যবস্থা করে নিলো। আমি ভাবলাম থাক, স্বামী স্ত্রী দুজনে থাকবে অসুবিধে কি ? মাঝে মাঝেই ওদের সংসারে গিয়ে খোঁজ খবর নিতাম। ওরা অবশ্য ওসব কিছুই নজর করতো না।  সারাক্ষন নিজেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।  আমার কিন্তু ভালোই লাগতো।  ভাবতাম আহা নতুন সংসার, ব্যস্ত তো থাকারই কথা।  এখন কি আর  অন্যদিকে নজর দেবার সময় আছে ?  সময় গড়িয়ে যায়।  আমারও  যখন তখন ওদের ওখানে হানা দিয়ে সময় কেটে যায়।  একদিন ভাবলাম একা একা দুজনে কি খায় না খায় একটু কিছু দেয়া দরকার। বাসায় কেউ ছিল না তখন।  তাই ওদের চোখে পড়ে  এমন জায়গায় কিছু খাবার রেখে এলাম। পরদিন খোঁজ নিয়ে দেখি ওমা যেমন খাবার অমনি পড়ে আছে।  একটা দানাও যেন দাঁতে কাটে নি।  খুব রাগ হলো আমার, মনে মনে বললাম 'ইস খুব মান তোমাদের।  আমার খাবারটা মুখে তুললে জাত যেতো ' আবার মনে মনে একটু অবাকও হলাম কেন খাবার গুলো খেলো না? খাবারটা তো ওদের খাবারের মতোই ছিল।  এর পরও অবশ্য আমি যথারীতি ওদের খোঁজ রাখছিলাম। কারণ ওদের সম্পর্কে জানার জন্য খুব কৌতূহল হচ্ছিলো।   
কোনো কোনো সময় দুজনকেই বাসায় দেখা যেত , কখনো একজনকে।  আমি কথা বলতে ভালোবাসি তাই নানা কথা জিজ্ঞেস করতাম কিন্তু ওরা আমার কথা শুনলো কি না বুঝতে পারিনি কোনোদিন,  কারণ তাকাতোই না উত্তর তো দূরের কথা।  তবু আমার খুব ভালো লাগতো ওদের।  কি সুন্দর ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতো। আমিও ঠিক ওদের কথা বুঝতাম না দূর থেকে। তার উপর ওরা  নিজেদের ভাষায় কথা বলে।  হয়তো ভবিষ্যতের কোনো প্ল্যান, কি হবে এরপর।  অন্য কোথাও যাবে কি না।  আরো কত সাংসারিক কথা থাকে, তো সেগুলোই হয়তো বলাবলি করতো।  আমি ভাবতাম ওরা কি ভেবে আমার বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্তটা নিলো? আমি যদি ওদের থাকতে না দিতাম? এইসব নানা চিন্তা করতে করতেই আমার দিন কিন্তু ওদের নিয়ে ভালোই কাটছিলো।  আমার কর্তা  বাড়িতে আসলেই আমি সারাদিনের সব খুঁটিনাঁটি  গল্প করতাম যার মধ্যে অর্ধেকটাই থাকতো ওদের গল্প।  কর্তা আমার মোটেই কম যান না।  উনিও ওদের খোঁজ রাখতেন।  অফিসে যাবার আগে পরে ওদের দেখতে যেতেন।  এমনকি ছবি আর ভিডিও তুলতেন ওদের।  বিশেষ করে ওদের থাকার জায়গা টা তার ভারী ভালো লাগতো।
একদিন এরকম খোঁজ করতে গিয়ে করতে খবর আনলো ওদের বাচ্চা হবে।  আমি তো খুশিতে বাগ বাগ যেন আমাকেই বেবী সিটিং করতে হবে। আর তাতে  আমার সময়টা আরো ভালো কাটবে।  এরপর থেকে অধীর আগ্রহে প্রতিদিন খোঁজ করি কবে সে শুভক্ষণ আসবে, বাচ্চা দেখবো।  প্রায়ই দেখে আসি কিন্তু দুজনকে একসাথে পাইনা।  ওরাও দেখা হলে কিছু বলে না , এমন একটা ভাব যেন আমাকে চেনেই না।  চুপচাপ বাসায় বসে থাকে।  ভাবলাম থাকতে দিলাম বিনা পয়সায় তারতো একটা কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। কিন্তু কি আর করা জোর করে তো কিছু পাওয়া যায় না। এরপর আরো কিছুদিন কেটে গেলো এভাবেই।  হটাৎ একদিন দেখলাম ওদের বাচ্চা হয়েছে, মা বাবা দুজনই খুব ব্যস্ত ওদের পরিচর্যা নিয়ে। বাচ্চা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। হাত নাড়তে পারে।  কদিন পর দেখলাম পাও নাড়তে শুরু করেছে।  মা বাবা কাছে আসলেই খাবার জন্য মুখ খোলে।  খুব ভালো লাগে এসব দেখতে।
আরো কদিন পর সেদিন ছিল শনিবার।  আমি রোজকার মতো সকাল সকাল উঠে পড়লেও পরে দেখবো বলে ওদের কাছে আর গেলাম না। নাস্তা বানালাম ধীরে সুস্থে। ওদিকে আমার কর্তাও ইতিমধ্যে উঠে পড়লো, আর নিচে নেমেই ছুটলো বিনে পয়সার ভাড়াটিয়ার খোঁজে।  কিছুক্ষন পর এসে খবর দিলো ওরা চলে গেছে।  খবর পেয়ে আমিও ছুটলাম।  গিয়ে দেখি সত্যিই তাই। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।  ইস যাবার মুহূর্তে আমি ওদের দেখতে পেলাম না।  এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলো। হঠাৎ মনে হলো তাইতো অনেকদিন থাকবে বলে তো ওরা  আসেনি। ওরা তো নীড় বাঁধেই  অল্প কিছুদিনের জন্য, বাচ্চাগুলোকে স্বাবলম্বী করে তুলবে বলে। এবারও তার অন্যথা ঘটেনি। আর সেজন্যইতো আমার উঠোনের ওই গাছটিকে তারা বেছে নিয়েছিল  নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে। যখন ওদের শিশুরা স্বাবলম্বী হয়েছে তখনি শূন্য নীড় ফেলে উড়ে গেছে দূরে কোন এক অজানার পথে। আমার উঠোন কোণের শাখা-প্রশাখা পল্লবিত গাঢ় সবুজ ছোট্ট ঝোপালো গাছটির ঠিক মাঝখানে পড়ে  আছে অপূর্ব শিল্প নৈপুণ্যে তৈরী তাদের শূন্য ছোট্ট  নীড়টি তাদেরই স্মৃতিটুকু নিয়ে।  
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ১২ মে ২০১৭ )