বুদ্ধ পূর্ণিমায় বুদ্ধের সাথে আলাপ
ইমতিয়াজ মাহমুদ   
শুক্রবার, ১২ মে ২০১৭

বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন কি করবেন? বুদ্ধ পূর্ণিমা কি জানেন তো? বুদ্ধ পূর্ণিমা দিনটিকে ধরা হয় তথাগত বুদ্ধ সিদ্ধার্থ গৌতম বা শাক্যমুনির জন্মদিন, ওঁর আলোকপ্রাপ্তি বা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির দিন এবং ওঁর মহাপরিনির্বাণের দিন। আপনি বৌদ্ধ ধর্ম মানেন বা না মানেন দিনটি উদযাপন করতে অসুবিধা নাই। গৌতম বুদ্ধ ভালো মানুষ ছিলেন, ওঁর জন্মদিন তো পালন করা যায়ই। আর এইদিনে আমাদের দেশে তো সরকারী ছুটি আছেই, চলুন বৌদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন করি। কিভাবে করবেন? আপনার আশেপাশের কোন বৌদ্ধ বিহারে চলে যাবেন? যেতে পারেন। আমি বৌদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বা এরকম বিশেষ কোন দিনে বিহারে যাইনি কখনো, শুধু কঠিন চীবর দানের সময় যেতাম। এর পিছনে বিশেষ কোন কারণ নাই, যাওয়া হয়নি আরকি। এমনিতে সাধারণ দিনে গিয়েছি বিহারে- তবলছড়িতে আনন্দ বিহার ছিল, সেখানে আমার ভান্তে বন্ধু ধর্মালঙ্কার ভিক্ষু থাকতো, সেখানে অনেকবার গিয়েছি। কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানকার বৌদ্ধ মন্দির থাকলে সেখানেও মাঝে মাঝে ঢু মেরে আসি। অনেক জায়গায় বৌদ্ধ মন্দিরগুলি আরকিওলজিকাল সাইট হিসাবেও প্রসিদ্ধ। এমনিই মানুষ দেখতে যায়।

বৌদ্ধ মন্দিরে গেলে তো গেলেনই, ভান্তেদের ধর্মোপদেশ শুনলেন, ঘুরে ফিরে দেখলেন, খারাপ না। আমাদের এখানে হয় কিনা জানিনা, অনেক জায়গায় চক্রের পূজা হয়। চক্র মানে হচ্ছে বিশাল এক চাকা, তার আটটি স্পোক থাকে। একেকটা স্পোক বুদ্ধের অষ্টাঙ্গিক মার্গের একেকটা পথের প্রতীক। এটাও ইন্টারেস্টিং।

সবচেয়ে ভাল হয় আপনি যদি সিদ্ধার্থের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করেন। সিদ্ধার্থের সাথে আলাপ? মানে কি? মানে হচ্ছে তথাগত বুদ্ধের সাথে আলাপ আলোচনা। এটা কিভাবে সম্ভব? বুদ্ধের কথাগুলি লেখা আছে বিভিন্ন গ্রন্থে- ত্রিপিটকের বিভিন্ন খণ্ডে ও সূত্রে। ত্রিপিটক হচ্ছে আনন্দের নেতৃত্বে কম্পাইল করা বুদ্ধের কথাগুলির সংকলন। এছাড়া পরবর্তীতে নানারকম বইতে নির্বাচিত অংশ আলাদা করে সঙ্কলিত করা হয়েছে। ধর্মপদ এরকম একটা। এগুলি বুদ্ধের কথা, বুদ্ধ বলেছেন বিভিন্ন সময় তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে, এগুলি কোন ঐশী বানী নয়। মানবপুত্র বুদ্ধের কথা মানুষের মুক্তির জন্যে- এইগুলি পাঠ করার মানেই হচ্ছে বুদ্ধের সাথে আলাপচারিতা।

বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন বুদ্ধের সাথে আলাপচারিতার চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে!

(২)

বুদ্ধের সাথে আলাপচারিতা কি ইন্টারেস্টিং কিছু? আপনার তো মনে হতে পারে যে সকল ধর্মগ্রন্থই শেষ পর্যন্ত মানুষকে ভয় দেখানো আর লোভ দেখানোর জন্যে নানাপ্রকার ঐশী বানীর সমাহার। এগুলি পড়তে কি আগ্রহ হয়? হওয়ার কথা না। তাইলে বুদ্ধের কথা কেন পড়বেন?

বুদ্ধের সাথে আলাপচারিতা আসলেই ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার। কারণ, ঐ যে আগেই বলেছি, এগুলি কোন ঐশী বানী নয়। একজন মানুষ, মানবপুত্র বুদ্ধ, তাঁর অনুসারীদের সাথে আলাপচারিতায় এই কথাগুলি বলেছেন। আপনি দেখবেন যে পোড়ার সময় আপনার মনে হবে যেন সিদ্ধার্থ গৌতম স্মিত হাস্যে আপনার সামনে বসে আছেন আর আপনার প্রশ্নের সব উত্তর দিচ্ছেন। এবং সিদ্ধার্থের এইসব কথায় কোন ভীতিপ্রদর্শন নেই, সেই অর্থে পাপ বা পুণ্যের লোভ বা ভয় সেগুলি নেই, কোন মহাশক্তির কাছে নতজানু হওয়ার কথা নেই।

তিনি আপনাকে শুধুই বলছেন যে, জগত দুঃখময়। এই কথাটি তো সত্যি। জগত তো আসলেই দুঃখময়। মানুষের জীবনে জরা ব্যাধি মৃত্যু এইসব লেগেই আছে, দুঃখ এসে পদে পদে আপনাকে আঘাত করে। এইসব আঘাতে ভুগতে ভুগতে একসময় আপনার মৃত্যু হবে।

এরপর তিনি আপনাকে বলছেন, এই যে দুঃখময় জীবন, এর কারণ আছে। আপনার বাসনা, আপনার লোভ আপনার কামনা এইসবই আপনাকে দুঃখের মধ্যে টেনে নামায়। তৃষ্ণা, তৃষ্ণাই আপনার দুঃখ ডেকে আনে। আপনার তখন মনে হবে, তবে কি এই দুঃখ থেকে মুক্তির কোন পথ নেই?

তিনি আপনাকে বলবেন, অবশ্যই দুঃখ থেকে মুক্তির পথ আছে। দুঃখের যেহেতু কারণ আছে, সেই কারণটা দুর করতে পারলেই তো দুঃখ দুর হয়ে যাবে। সহজ। তখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগবে দুঃখ থেকে তাইলে মুক্তির পথ কি?

তিনি আপনাকে বলবেন, দুঃখ থেকে মুক্তির পথ আটটি আচরণ- সম্য দিটঠি, সম্য সঙ্কপ্প, সম্য বাচ, সম্য কম্মট, সম্য আজিবা, সম্য ব্যায়ামা, সম্য স্বাতি আর সম্য সমাধি। মানে কি? মানে হচ্ছে সঠিক দৃষ্টি, সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক ভাষা, সঠিক আচরণ, সঠিক জীবনযাপন, সঠিক প্রয়াস, সঠিক চেতনা ও সঠিক সমাধি।

আর পাঁচটি নিষেধাজ্ঞা মানতে হবে, এগুলি হচ্ছে হত্যা থেকে বিরত থাকা, চুরি থেকে বিরত থাকা, যৌন অনাচার থেকে বিরত থাকা, মদ্যপান থেকে বিরত থাকা আর মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকা।

ব্যাস, এইটাই বৌদ্ধের কথা। এটাকে আপনি ধর্ম বলেন তো ধর্ম, দর্শন বলেন তো দর্শন বা মুক্তির পথ বলেন তো মুক্তির পথ।

(৩)

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন তথাগত বুদ্ধ কিন্তু বলছেন না যে আপনি কোন ঈশ্বরের কাছে মুক্তির জন্যে প্রার্থনা করুন বা কোন ঈশ্বর বা ঐশ্বরিক দ্রবা আপনার বিচার করবে আর বিচার করে আপনাকে শাস্তি বা পুরষ্কার দিবে। বুদ্ধের কথা অনুযায়ী আপনার মুক্তি আপনাকেই অর্জন করতে হবে, এটা পাপ বা পুণ্যের ব্যাপার না, আপনার দুঃখময় জীবনের অবসান আপনি করতে পারবেন কি পারবেন না এইটাই হচ্ছে কথা। এক বন্ধু একদিন আমাকে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন- পাপ পুণ্য নেই স্বর্গ নরক নেই এটা আবার কিরকম ধর্ম?

পাপ পুণ্যের ব্যাপারটা একটু বলি। পাপ পুণ্য মানে কি? মানে ধর্মীয় বিধান মেনে চলা বা ভঙ্গ করা। নিয়ম ভাঙলেন তো আপনার পাপ হবে আর মেনে চললে পুণ্য হবে। এরপর? এরপর আপনার মৃত্যুর পর বিচার হবে। ঈশ্বর বিচার করে হয় পুরস্কার দিবেন, অথবা শাস্তি দিবেন অথবা আপনার দোষী সাব্যস্ত করার পরেও আপনাকে ক্ষমা করে দিবেন। বিচার করতে হলে তো একজন বিচারক থাকতে হবে যিনি তাঁর তৈরি নিয়মাবলীর আলোকে আপনার বিচার করবেন। তথাগত বুদ্ধের কথায় তো আপনি এই বিচারককে খুঁজে পাবেন না। সেরকম কেউ নেইই।

তাইলে aপনার সদাচরণ বা অসদাচরণের কি অর্থ? এগুলি করে কি হবে? কে বিচার করবে? কেউ বিচার করবে না। আপানর কর্মের ফলাফল আপনি নিজেই পেয়ে যাবেন। ভাল কাজ করবেন তো পরিণতি ভাল হবে মন্দ কাজ করবেন তো দুঃখময় জন্মের পর আরেক জন্ম এই চক্রে ঘুরতে থাকবেন। এটা অনেকটা ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মতো।

তাইলে কি দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা? আপনি মানুষ হিসাবে জন্মেছেন এবং মানুষ হিসাবেই মরবেন। এই যে দেখছেন চারপাশের জগত, এটাই আপনার জগত। এই জগতেই সকল প্রাণীর পাশে আপনি দাঁড়াবেন, কোন প্রাণীর প্রতি অন্যায় করবেন না, নিজের বাসনাকে দমন করবেন। সকল মানুষই মানুষের সাথে এবং জগতের প্রাণীর সাথে এই আচরণ করবে। তাইলেই সকল প্রাণী সুখে বাস করবে।

(৪)

কোটেশন দিতে আমার ভাল লাগে না। তবু ম্যাক্স ওয়েবারের কথা না বলে পারছি না। সমাজবিজ্ঞানের জনক বলে পরিচিত এই ভদ্রলোক বলছেন, বৌদ্ধ ধর্ম একটি রাজনীতি বিবর্জিত এবং অনেকাংশে রাজনীতি বিমুখ একটি মুক্তির পথ। প্রচলিত অর্ধে এটাকে আপনি ধর্ম নাও বলতে পারেন, কেননা ধর্মের মতো এখানে ঈশ্বর দেবতা এইসবের কোন অস্তিত্বই নেই। এখানে কোন প্রার্থনা নেই বা অনিবার্য গন্তব্য এইসবও নেই। এইসব কথা তিনি বলছেন বৌদ্ধ ধর্মের মুল বা আদি রূপের ভিত্তিতে। পরবর্তীতে যেসব বিভক্তি বৌদ্ধ ধর্মে হয়েছে, সেগুলির কথা অবশ্য আলাদা।

এবং এই যে আপনারা রাষ্ট্র ও ধর্মকে আলাদা করে দেখতে চান, গৌতম বুদ্ধ কিন্তু সেটাই দেখেছেন। তিনি নিজে রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেননি বা সঙ্ঘকেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেননি। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও এর কাজ সম্পর্কে গৌতম বুদ্ধের চিন্তা অনেক আধুনিক। কিভাবে সেটা বলছি।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে আপনার সামাজিক চুক্তি মতবাদ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরি পড়েছেন না? ঐ যে লক, হবস ও রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদ। যদি না পরে থাকেন তাইলে কোন ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের পৌরনিতি বই বা ডিগ্রী ক্লাসের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বই খুলে পড়ে নিতে পারেন। রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদই মোটামুটিভাবে রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতবাদ। আপনি কি জানেন খৃস্টের জন্মেরও ছয়শ বছর আগে সিদ্ধার্থ গৌতম নামের এই যুবক রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে সামাজিক চুক্তি মতবাদের ক্তহা বলে গেছেন? ত্রিপিটকের ভাষায় এটা ‘মহাসম্মতি’।

ত্রিপিটকের অজ্ঞন্ন্য সুত্ত অংশে এই মহাসম্মতির বর্ণনা আছে। শ্রাবস্তিতে অবস্থান কালে প্রথম রাজা কিভাবে এলো সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন, যখন মানুষের মধ্যে লোভ, দ্বেষ, হিংসা এইসব বেড়ে গেল, তখন সকলে মিলে একটা পন্থায় সম্মত হলো যে ওরা ওদের মধ্যেই একজনকে নির্বাচন করবে শাসক হিসাবে। এই নির্বাচিত লোকটির হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা হবে যেন তিনি সকলের সুরক্ষা করেন, যাকে শাস্তি দেওয়ার তাকে শাস্তি দেবেন আর যাকে তিরস্কার করার তাকে তিরস্কার করবেন। বিনিময়ে সকলেই তাদের নিজ নিজ শস্য থেকে একটা অংশ শাসককে দিয়ে দিবে।

আমি এখানে সংক্ষেপে এক বাক্যে বললাম। সুত্তের মধ্যে পুরো ব্যাপারটা বিস্তারিত বলা আছে। যারা সামাজিক চুক্তি মতবাদ জানেন, ওরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে চেঁচিয়ে উঠেছেন, আরে এইটাই তো রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে সামাজিক চুক্তি মতবাদ।

তাইলে দেখেন, বুদ্ধ কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংঘের হাতে রাখলেন না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর রাষ্ট্রের শাসক হয়ে গেল সম্পূর্ণ আলাদা। তবে আদর্শ শাসক কিরকম হবে, যেহেতু শাসকও একজন মানুষ, বৌদ্ধ ধর্মের বিধানাবলি তাঁর জন্যেও প্রযোজ্য। সেটা শাসকের ব্যক্তিগত মুক্তির পথ।

(৫)

আজকে বৌদ্ধ ধর্মের দিকে তাকালে আপনি বেশ কিছু ভাগ দেখতে পাবেন। হীনযান, মহাযান, থেরবাদি, টিবেটান নানারকম ভাগ হয়েছে। কোন কোন ভাগের বৌদ্ধরা ধম্মের মধ্যে কিছু কিছু দেবতাও যুক্ত করেছে। কোন মতের বৌদ্ধরা ঠিক আর কোন মতের বৌদ্ধরা ভুল সেটা আমি জানিনা। সেই পর্যায়ের জ্ঞান বুদ্ধিও আমার নাই। আমি তো বেওকুফ ধরনের মানুষ, নিজেকে আনন্দ মনে করি আর আলোকপ্রাপ্ত তথাগত বুদ্ধকে আমার বন্ধু মনে করি। বন্ধু ভেবে সিদ্ধার্থকে আমি ‘আমার বন্ধু সিড’ বলে ডাকি আর ওর সাথে কথা বলি।

এখানেও আমি কিজেকে আনন্দ মনে করেই আমার বন্ধু সিড এর জন্মদিনে ওর হয়ে আপানদের সকলকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর সাথে আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণও জানাচ্ছি, আজকে এই দিনটা ছুটির দিন আছে, এক বেলা একটু আমার বন্ধু সিডএর সাথে একটু আলাপচারিতা করেন। এ এক আনন্দময় জগত।

সবাই বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা নিন। ভালো থাকুন আপনারা সকলেই।

বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি, ধম্মং শরনং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরনং গচ্ছামি। জগতের সকল স্বত্বা সুখী হোক।

লেখক: আইনজীবি, কলামিস্ট।
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ১২ মে ২০১৭ )