শিউলির অন্তর্দাহ
আশরাফ আহমেদ. মেরিল্যান্ড   
বুধবার, ১০ মে ২০১৭
চার পর্বের ধারাবাহিক গল্প: পর্ব-দুই

নীচে, অনেক নীচে, দূর থেকে বিশাল একটি সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে ধীর গতিতে। ভেলাটি ছোট ছোট কতগুলো পাহাড়ের অনেক ওপর দিয়ে যেতে যেতে এবার বড় একটি পাহাড়কে প্রায় গিলে ফেলছে। মনে হচ্ছে বড় পাহাড়ের কালো চুড়াটি পৃথিবীর সাদা বক্ষের ওপর বিন্দু হয়ে রয়েছে। যেন মাতৃবক্ষ হয়ে অমৃতের ও জীবনের সন্ধান দিচ্ছে, বেঁচে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। স্ত্রীবিরহে কাতর, অলকাপুরী থেকে শতক্রোশ দূরের বিন্ধ্য পর্বতের ওপরে নির্বাসিত যক্ষ এমন দৃশ্যই দেখেছিলেন। কিন্তু আজকের দৃশ্যটিতে শিউলি বেঁচে থাকার কোন ইংগিতই পাচ্ছে না। বরং পাহাড়ের চূড়াটি যেন তীরের তীক্ষ্ণ ফলার মত ওকে বারবার বিদ্ধ করে চলেছে।

কোনভাবে বিমানের বদ্ধ কুঠুরি থেকে যদি মুক্তি পেতো তবে সে মেঘের এই ভেলায় বসে যক্ষের নির্ধারিত পথ পাড়ি দিতো। এভাবে হিমালয়ে পৌছে যেতো ক্রন্দনরতা যক্ষবিরহিনীকে দেখতে। সেই সতী কি শিউলি থেকে বেশি বিরহিনণী ছিল? শুধু দূরত্ব দিয়েই যদি বিরহের পরিমাপ মাপা যায় তবে যক্ষের প্রেয়সী কি স্বামীর পাশে বসা শিউলির থেকেও বেশি বিরহিণী ছিল?

ওর গায়ে নিশ্চিত হেলান দিয়ে শুয়ে থাকলেও স্বামী থেকে ওর দূরত্ব আজ শতকোটি আলোকবর্ষ দূরে। আর কোনদিন ওকে অনেকবার উচ্চারণ করা ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ কথাটি বলা হবে না। বলা হবে না ‘জীবনে তোমার কাছ থেকে আমি কিছুই লুকোই নি, শুধু আজকের এই অসম্ভব, অসহনীয় অবস্থাটি ছাড়া’। স্বামী যদি বেঁচে থাকে আরো লক্ষ কোটি বছর, সে কোনদিন জানতে পারবে না মনের কোন হাহাকার বুকে আগলে রেখে শিউলি ওকে ছেড়ে গেল।

শিউলি এবার নিজেই যক্ষের স্থান দখল করে নিল। মেঘদূতকে অনুরোধ করলো খুব সাবধানে পেছনে ফিরে যেতে, আজ থেকে তিরিশ বছর আগের ঢাকায় যেতে। বললো, তুমি ছায়ানটের শুক্রবারের বিকেলের ক্লাশে যেও। কাউকে জিজ্ঞেস না করেই বুঝতে পারবে এক ওস্তাদ একটি ঘরে গান শেখাচ্ছেন। ওখানে দেখবে হারমোনিয়াম ও তবলা নিয়ে উচ্ছ্বল অনেক কিশোর কিশোরী গান শেখার চেষ্টা করছে।

ঝলমলে পোষাক পরা সবচেয়ে সপ্রভ কিশোরীটি মনযোগ দিয়ে গান শিখছে। বেশ কিছুটা দূরে গোবেচারা চেহারার এক কিশোর আরো অপরাধের দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে সেই কিশোরীর দিকে তাকাচ্ছে। গান শেখার বিরতিতে আত্মবিশ্বাসহীন কিশোরটি মেয়েটির কাছে এলো। পকেটে হাত রেখে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো, আমার এক বন্ধু আপনাকে ভালবাসে। আমাকে অনুরোধ করেছে আপনাকে ওর চিঠিটি পৌঁছে দিতে। বলেই মাটির দিকে তাকালো।

ওকে দেখে মেয়েটির মায়া হলো। মৃদু হেসে কপট ভর্তসনার ছলে বললো, আপনি ক্লাশের ভাল ছাত্র। পাশ করে খুব সহজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা বড় কোন কোম্পানীতে ভাল চাকুরি পেয়ে যাবেন। কিন্তু মনে হচ্ছে এখনই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পিওনের চাকুরি নিয়ে নিয়েছেন? কিশোর উত্তর দেয়নি এ প্রশ্নের। মেয়েটি তাই বলে চললো, চিঠি দিচ্ছেন তা ভাল। কিন্তু আপনি বন্ধুর চিঠি দিতে এলেন কেন? নিজে চিঠি লিখতে পারেন না বুঝি? অপরের চিঠি বয়ে না বেড়িয়ে নিজে বরং চিঠি লিখুন। সে চিঠি আমি নেব।

লাজুক ছেলেটি লজ্জায় মাথাটি আরো নীচু করে ফেলেছিল।

হে আমার প্রিয় মেঘদূত, কালিদাসের মেঘদূত, যক্ষের মেঘদূত, সেদিনের সেই লাজুক ছেলেটিকেই আমি বিয়ে করেছিলাম। আমার কাঁধে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে শুয়ে আছে যে লোকটি, তিরিশ বছর আগে সে ছিল সেই লাজুক ছেলেটি। তারপর থেকে সে প্রতিটি দিন ও রাত্রি আমার ওপর ওর জীবনের আস্থা রেখেছে, বিশ্বাস করেছে। কিন্তু আমি সেই আস্থার মূল্য আজ দিতে পারছি না। আমার জীবনের কঠিনতম বাস্তবতার কথা ওকে বলতে পারছি না।  

প্রিয় বন্ধু, তুমি পৃথিবীর আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াও কত। কখনো তুমি হয়ে যাও নিকষ কালো, কখনো সাদা, কখনো লাল, হলুদ বা কমলা। কখনো তুমি গ্রাস কর দেশ ও মহাদেশ, কখনো হয়ে যাও ছোট, যেন প্রবেশ কর আমাদের নাসিকা ও কর্ণকুহর। জগত অন্ধকার করে একাধারে আন তুমি প্রলয়, খেয়াল হলে আবার তুমি ভান কর মৃত। তোমার বজ্রনিনাদ পরাজিত করে আনবিক বোমার হুঙ্কার, আবার মৃদু, গুরু গুরু শব্দ তুলে প্রকৃতির হৃদয়ে আন তুমি শত রাগের ঝংকার। ধনী-নিঃস্ব, শিক্ষিত-নিরক্ষর, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবার দেহ, সবার হৃদয় তুমি ছুয়ে যাও অবিরত। তাদের কাউকে কি দেখছো আমার মত আজকের হৃদয়ের হাহাকার নিয়ে বেঁচে থাকতে?

আমার হৃদয়ে আজ শিবের প্রলয়ঙ্করী নৃত্য! অন্তরে প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলেছে বিগ ব্যাং এর এক একটি মহাবিস্ফোরণ। আমার ব্রহ্মাণ্ড আজ হয়েছে লণ্ড-ভণ্ড। হিমালয় আজ চূর্ণ। আমার হৃদয়ের রক্তস্রোতের কাছে প্রমত্তা রেবা ও যমুনা আজ মাথানত, লজ্জিত। মস্তিষ্কের শতকোটি নিউরোন একসাথে চিৎকার করে পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি করে হারিয়ে ফেলেছে ভাষা ও শব্দ।  কিন্তু হৃদয় আমার কথা বলতে চায়। নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। প্রকাশ করতে চায় কাঁধে হেলান দিয়ে বসা ওর নিজের চেয়েও প্রিয় স্বামীটির কাছে। কিন্তু আমার মুখে তালা দিয়ে দিয়েছে, পাইলট বেশের ঐ লম্পট।

আরেক পাশে বসা কিশোরটি আমার ছেলে। প্রিয়তমের সাথে আমার যখন প্রথম চোখাচোখি হয় তখন ওর বয়স ছিল আজকের আমার এই ছেলের মতোই। চোখে আজ তার রংধনুর স্বপ্ন। পৃথিবী ওর রঙিন। ভবিষ্যৎ ওর গন্তব্য। জীবন ওর সামনে। পৃথিবী তার রূপ-রস-গন্ধের পসরা সাজিয়ে আহ্বান জানাচ্ছে ওকে। আমি কী করে মানুষের কুৎসিত রূপটি ওর কাছে তুলে ধরি? কী করে ওর ভবিষ্যতের সুন্দর, মোহনীয় রূপের ধারণাটি বদলে দেই?

আজ আমার বিপদ, মহাবিপদ। পরিত্রাণের পথ আমি দেখি না। কথা না বলতে পেরে আমি মরে যাচ্ছি। কাউকে তো বলতে হবে। কিন্তু আমার মুখ বন্ধ, ভাষা আমার হারিয়ে গেছে। যক্ষ তোমার যাত্রাপথের বর্ণনায় ওর বাগানের অশোক, বকুল, বেলী ও পদ্মফুলের উল্লাস ও সুগন্ধের কথা বলেছে। তুমি আমার বাগানটিও একবার দেখে যেও। দেখবে আমার বাগানের চেরিফুল অকালেই ঝরে গেছে। বকুল ফুল ফুটছে না। কাঞ্চন ও পদ্মফুল মাথা নুইয়ে আছে। পদ্মফুল ওর ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলেছে। টিউলিপের কলির মাথাটি উঁকি দিয়েও থমকে গেছে। ম্যাগনোলিয়া ফুলের সাদা-বেগুনি উজ্জ্বল রঙটি নিস্প্রভ হয়ে গেছে।

যক্ষ তোমাকে সন্নাসী-অধ্যুসিত বিন্ধ্য পর্বতের গায়ে আছড়ে পড়া প্রমত্তা রেবা নদী দর্শন করতে বলেছে। সুন্দরী উজ্জয়িনী-অবন্তী-বিদিশার পাশে যৌবনবতী সরস্বতীর সুমিষ্ট পানি পান করতে বলেছে। বলেছে পবিত্র প্রয়াগে যমুনার উন্মত্ত ঘোলাটে পানি, এবং অলকাপুরীর কৈলাশ পর্বতে সিল্কের মত প্রবাহিত গঙ্গার জলধারার সৌন্দর্য দেখে যতে। কিন্তু আজ আমার পৃথিবীর সব নদী শুকিয়ে গেছে। শিশুবাল্যকালের স্ম্রিতিতে থাকা খরস্রোতা ও যৌবনে ভরপুর যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, তিস্তা ও তিতাস আজ যেন ক্লান্ত, শ্রান্ত। এককালের শরীর জুড়ানো বুড়িগঙ্গার পানি আজ জহরের চেয়েও বিষাক্ত। সবাই মৃত্যুর প্রহর গুনছে যেন।

যদি পূর্ব দিকে তোমার যাওয়া হয়, তবে পতিত হয়ো তাদের ওপরে, নিবারণ করো তাদের তৃষ্ণা, ভাসিয়ে দূর করে দিও সব কলঙ্ক।  তোমার ছোঁয়া না পেয়ে আমার আকাকুয়ান এবং পটোম্যাক নদীগুলোও আজ হাহাকার করছে। ওরা যেন আমার হৃদয়ের হাহাকারকেই প্রকাশ করছে। তুমি কি পারবে আমাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে?

মেঘুদূত বন্ধু আমার, নির্বাসিত যক্ষ বিরহের দিন সহ্য করতে গিয়ে ওর চারটি সান্ত্বনামূলক দৈনন্দিন কাজের বর্ণনা দিয়েছে তোমাকে। সে প্রথমে প্রেমিকার পছন্দের লতা ও ঢেউ এর মৃদু নাচনের  প্রতি তাকিয়েছে, যা ওর প্রেয়সী পছন্দ করতো। এরপর প্রেমিকার ছবি এঁকেছে পাথরে। বিরহিনী প্রেয়সীকে স্বপ্নে দেখেছে। আর সবশেষে উত্তরে হিমালয় থেকে ভেসে আসা বায়ুর ঘ্রাণ নিয়েছে, স্পর্শ করেছে, যে বায়ু ওর প্রেয়সীর পা ছুঁয়ে এসেছে।  

কিন্তু বন্ধু আমার, আমার প্রেমিক এবং প্রেমের ফুল আমার ঠিক পাশেই বসে আছে। ওদের পছন্দের জিনিস বা নিঃশ্বাস শুধু নয়, ওদের দেহ আমাকে স্পর্শ করেই আছে। চোখের সামনে বসে আছে বলে যক্ষ-প্রেমিকার মত পাথর বা কাগজে ছবি আঁকার প্রয়োজন আমার নেই। অথচ কী আশ্চর্য! ওদের জন্য আমার বিরহ আজ যক্ষের চেয়ে মোটেই কম নয়। মাত্র চার মাস পর যক্ষের সাথে ওর প্রেয়সীর মিলন হবে। সেই আশায় ওরা বেঁচে আছে। কিন্তু প্রিয়জনের সাথে আমার মিলন ইহজীবনে আর হওয়ার নয়। আমার বিরহ চলবে অনন্তকাল, মৃত্যুর পরও।

মেঘদূত বন্ধু আমার, প্রেমের দশটি রাগের মাঝে যক্ষ তার প্রেয়সীর প্রেমার্ততার নয়টির এক চমৎকার বর্ণনা দিয়েছে। দ্রিষ্টি-বদল (Glances), প্রিয়সান্নিধ্য কামনায় নিঃসঙ্গতাবোধ (Wistfulness), কামনা (Desire), নিদ্রাহীন রাত্রিজাগরণ Wakefulness), শুকিয়ে যাওয়া (Emaciation), দৈনন্দিন কাজে অনীহা (Loss of interest in ordinary pleasures), যৌবনসুলভ কমনীয়তার অভাব (Loss of youthful bashfulness), ভুলে যাওয়া (Absentmindedness), এবং শারিরীক-মানসিক বিদ্ধস্ততা (Prostration)। সেই নয়টির স্বাদ আমি নিজেও আস্বাদন করেছি বিভিন্ন সময়ে এই জীবদ্দশায়। কিন্তু দশ নম্বর রাগ, যা যক্ষ তোমাকে বলেনি, আমি তোমাকে তার কথা বলবো।

দশ নম্বর রাগটি মৃত্যু। বিরহের শেষ রাগ হচ্ছে মৃত্যু। মৃত্যুই বিরহকে চিরস্থায়ী করতে পারে। আমি এখন সেই মৃত্যুর অপেক্ষাই করছি। শুনেছি আত্মার মৃত্যু নেই। যদি তাই হয় তবে বিরহ হবে আমার অনন্তকালের সাথী! আমার প্রেমিককে, প্রিয়জনদের ছেড়ে যেতে না চাইলেও আমি সেই অনন্ত বিরহের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এ আমি চাই না।

দ্বিধান্বিত এই বিরহ-মৃত্যুচিন্তা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে প্রতিটি ক্ষণ। যে কোন মুহূর্তে আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বো। তখন কিন্তু তুমি দূরে সরে যেও। কারণ কাছে থাকলে সেই দৃশ্য, সেই বেদনা তুমি সহ্য করতে পারবে না। সেই দুঃখ জলপ্রপাতসম তোমার অশ্রু কণাকে নিমেষে বাস্প বানিয়ে ফেলবে। মহাকালের গর্ভে বিলীন করতে দিতে চাইবে আমার সাথে।

অথচ এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকতে হবে তোমাকে। তাই দূরে গেলেও তুমি খুব বেশি দূরে যাবে না, প্লিজ। মেঘদূত তুমি দূরে যেও না। কাছে থেকো। অন্ততঃ যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ থাকে। ক্ষণে ক্ষণে তুমি যে বিমানের জানালায় ও পাখায় ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছ, তাই আমাকে স্থির থাকার সাহস যোগাচ্ছে।

আর হিমালয়ে যখন অলকাপুরীতে যক্ষের প্রেয়সীর দেখা পাবে, ওকে আরেকটি সংবাদ দিতে ভুলো না। ওকে বলবে, পাশাপাশি বসেও আমি আমার জীবনের প্রেমিক থেকে শতকোটি আলোক-বর্ষ দূরে বসে বিরহের দিন কাটাচ্ছি। কিন্তু আমার বিরহ ওর মত বারো মাসের নয়। গন্তব্যে পৌঁছাতে আর মাত্র পাঁচ ঘণ্টা হাতে থাকলেও আমার বিরহ-জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড ওর লক্ষ বছরের চেয়েও বেশি!  
(চলবে)
৭ই এপ্রিল, ২০১৬
পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ১০ মে ২০১৭ )