অপু-মানিক কথপোকথন (কাল্পনিক চিত্রপট)
শুভজিৎ বসাক,কলকাতা   
সোমবার, ০১ মে ২০১৭


(সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর ত্রয়ী নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রিবেদনটি শুনতে ছবিটিতে ক্লিক করুন)
২রা মে (সিনেমা জগতের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ সত্যজিৎ রায়ের ৯৬তম জন্মবার্ষিকী । গতানুগতিক সিনেমার ধারায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি
কৌশল উদ্ভাবন এবং নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র জগতে নিজের আসন পোক্ত করে গেছেন। ‘অপুর ত্রয়ী (পথের পাচালী, অপরাজিত এবং অপুর সংসার)’র এই সেলুলয়েড স্রষ্টা মেধা আর কীর্তির গুণে বাংলা পেরিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও অমর হয়ে আছেন। )

*****
বড় হলঘরে মুখোমুখি বসে আছে অপু এবং সত্যজিৎ রায়।তখন অপু মাঝ বয়সী।অপর্ণাকে সে ততদিনে হারিয়ে ফেলেছে জীবন থেকে।ভীষণ ভালবাসত সে অপর্ণাকে তাই সহজে তার চলে যাওয়া মানতে পারেনি অপু।মানিকবাবু তার সামনে বসে আছেন।বলিষ্ঠ গলায় প্রশ্ন করলেন, "অপু,তোমার কি হয়েছে?"
অপু: (ধীর গলায় বলল) আপনারা লেখকরা এমন নির্দয় কেন হন?
সত্যজিৎবাবু: (ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে) কেন বলো তো অপু?

অপু: সারাজীবন কি দিলেন আমাকে?একরাশ দুঃখ!
সত্যজিৎবাবু: ভুল।তুমি চরিত্র।তুমি শিক্ষা কারও জীবনের।
অপু: (অবাক হয়ে) ছোটবেলায় দিদি,পরে স্ত্রী এভাবে আমার সব ভাল লাগা একে একে কেড়ে বলছেন এসব কারো জীবনে শিক্ষা?
সত্যজিৎবাবু আর অপেক্ষা করেননি।তিনি অপুকে নিয়ে গেলেন ছাদে।তখন কলকাতায় সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে গিয়েছে।আকাশে তারার মেলা বসেছে।পঞ্চমীর চাঁদ খানিক আলো ছড়াবার চেষ্টা করছে।তাতে অবশ্য তারাদের সমস্যা হচ্ছে না প্রতীয়মান হতে রাতের আকাশে।তিনি অপুকে আকাশ দেখিয়ে বললেন, "অপু,এই হচ্ছে আকাশ যা আমরা দেখতে পাই তা মহাকাশের কিছুটা অংশ মাত্র।এই মহাকাশে কত এমন পৃথিবীর মত গ্রহ,সূর্যের মত নক্ষত্র,তোমার-আমার মত জীব আছে জানো কি? জানো না।কারণ আমার-তোমার জ্ঞান সীমিত।সীমা যা দেখা যায়,এখন তুমি তোমার সীমায় হতাশা ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছো না।কিন্তু চোখ খোলো একটু দেখবে তোমার গল্পের মধ্যে দিয়ে আরও অপু-অপর্ণারা বেঁচে থাকার স্বাদ পাবে"।
অপু: (সাথে সাথে মানিকবাবুকে থামিয়ে) দুঃখের কথা বাঁচার স্বাদ দেবে!
মানিকবাবু: (গম্ভীর গলায় হেসে) তুমি যেমন কোনও লেখকের সৃষ্টি তেমনিই মানুষও ঈশ্বরের সৃষ্টি।লেখক যিনি সৃষ্টি করেন,ভগবানও মহান স্রষ্টা পৃথিবীর।তুমি যেমন প্রতিকূলতার সাথে ভেসে অতর্কিতে দেখা পেয়েছিলে অপর্ণার এবং সেখান থেকে খুঁজে পেয়েছিলে সুখ সেরকম সম্পর্ক দিন-দিন লুপ্তপ্রায় হচ্ছে অপু।
অপু চুপ করে মানিকবাবুর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মানিকবাবু: (মৃদু হেসে) হ্যাঁ গো অপু বিশ্বাস করো।আজকাল তোমার-অপর্ণার মত সাধারণ প্রেম সরে গিয়ে "ভাল রাখতে আর থাকতেই হবে" এমন শর্তসাপেক্ষ শৃঙ্খলাবদ্ধ সম্পর্কে মানুষ ধরা পড়ছে।সাধারণ সম্পর্ক দড়ির বাঁধনে ধরা পড়ে একঘেঁয়ে হচ্ছে।মুক্তমন শরীরী ভাষা বোঝে আজকাল খালি।সেখানে অপর্ণা বা তুমি পরস্পরের প্রতি যতটা দায়বদ্ধ ছিলে সেটা আজকাল শর্তে পরিণত হচ্ছে।সম্পর্ক গড়ে উঠতে ভয় পায়।অপরিণত ইমারতের মত সেই সম্পর্ক মাঝপথেই ভেঙ্গে পড়ছে।তোমাদের সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে তোমায় কষ্ট দেওয়া নয়,তোমাদের সম্পর্ক আরও কিছু মজবুত সম্পর্ক জন্ম দিক সেটাই শিল্পী হিসাবে আমি চেয়েছি।
অপু: (ধীর গলায়) পরিবর্তে আপনি কি পেলেন?
মানিকবাবু: (হেসে দূরে বটগাছটা দেখিয়ে) তুমি-আমি ঐ বটগাছটাকে কি দিতে পেরেছি যে ও এখনও বেঁচে আছে?
অপু চুপ করে রইল।
মানিকবাবু: ঐ গাছ আমার তোমার কত বিষগ্যাস সংগ্রহ করে নিজের দেহে তা বোধহয় তুমি জানো না।পরিবর্তে ওর কত অক্সিজেন তুমি পাও তার হিসেব রাখো না।তেমনি শিল্পী হয়ে যদি লাভ-লোকসানের বিচার করি অপু,তবে দেখব যে জীবনে কিছু পুরস্কার-কাগজ এসব ছাড়া তো কিছুই পাইনি আর! যেরকম একা পথ চলতে শুরু করেছিলাম সেরকম একা পথই হাঁটছি এবং তা দেখলে তো থেমে যেতে হবে অপু! শিল্পীর জীবন ধ্রুবতারার মত পথ নির্দেশ করে সবাইকে কিন্তু সে একাই থাকে আজীবন।
অপু শান্ত হল মানিকবাবুর কথা শুনে।আবার তিনি বলে উঠলেন, "আমার জীবনে আমার বাবার প্রভাব অনেকটা।তিনি যে আবোলতাবোলে খুশী ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন তাকে বাস্তবে একটু রূপ দিতেই মানুষের অন্তঃকঙ্কালটা বেরিয়ে আসে।বুঝলে না তাই তো?"
অপু বুঝল না বলে ঘাড় নাড়ল।
মানিকবাবু: (সহাস্যে বলে ওঠেন) রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা,
হাসির কথা শুনলে বলে,
“হাসব না-না, না-না!”
সদাই মরে ত্রাসে— ওই বুঝি কেউ হাসে!
এক চোখে তাই মিটমিটিয়ে
তাকায় আশে পাশে।
ঘুম নাহি তার চোখে আপনি ব’কে ব’কে
আপনারে কয়, “হাসিস যদি
মারব কিন্তু তোকে!”
এই হাসিটাকে একটু তোমার জীবনে গল্প করে মেলালাম তো দেখো তুমি এভাবে ভেঙ্গে পড়েছো।বাবা হাসির কথা লিখতেন আর আমি বাস্তবে সেই কথা লিখি।বাবার অনুপ্রেরণা না থাকলে আমি তোমাদের সত্যজিৎ হয়ে উঠতে বোধহয় পারতাম না।
সেদিনের দীর্ঘক্ষণের কথা অপুকে অনেক পরিণত করেছিল।সত্যজিৎ মিশিয়েছিলেন তার পিতৃসুখ বঞ্চনার কথা অপু-অপর্ণার না পাওয়া প্রেমের মধ্যে।সাধারণ মানুষ সেই প্রেমটা দেখেছিল, হয়তো কেউ পরিণত প্রেম শিখে নিয়েছিল আর স্রষ্টা সত্যজিৎ তাঁর না পাওয়া স্নেহকে অন্যরূপে রূপ দিয়েছিলেন যা কেবল একজন দুঃখ পাওয়া শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব যিনি জানেন একমাত্র না পাওয়াকে কিভাবে সুখে রূপান্তরিত করতে হয়।অপু পরে তার ছেলেকে ফিরিয়ে আপন সংসারে গা ভাসিয়েছিল কিন্তু এরপরে আর অপুকে মানিকবাবু লেখেননি কারণ যে মানুষ ছোট থেকে কষ্টই পেয়েছে সে কিছুটা তো পরিণত হয়েছিল পরে।মানিকবাবু খুঁজেছেন এরপরে অন্য চরিত্র কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে সেই অপু-দুর্গার ভালবাসা অস্কার হয়ে তাঁর সম্মানের ডালি ভর্তি করেছিল।সেই সময়ে অপুকে একবার পাশে চেয়েছিলেন তিনি ভেজা চোখে।চোখে ভেসেছিল সেই তিলোত্তমা সন্ধ্যার কথা যা একান্ত ব্যক্তিগত হয়ে থেকে গিয়েছে মানিকের কোণে।
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ০১ মে ২০১৭ )