না ফেরার দেশে চলে গেলেন বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী কাজী আরিফ
নিউজ-বাংলা ডেস্ক   
সোমবার, ০১ মে ২০১৭

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের মাউন্ট সিনাই সেন্ট লিওক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৯শে এপ্রিল আবৃত্তিশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফ মারা গেছেন।  
নিউইয়র্ক  সময় শনিবার  দুপুর  ১টার দিকে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দিলে  চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন । এর আগে ২৮শে এপ্রিল “চিকিৎসকরা তাঁকে , তিনি ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষনা করেছিলেন।  গত ২৪ এপ্রিল তার বাইপাস সার্জারির পর থেকেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছিল। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হয়। পেশায় স্থপতি কাজী আরিফের বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তার স্ত্রী প্রজ্ঞা লাবণীও একজন আবৃত্তি শিল্পী। দুই মেয়ে রয়েছে তাদের।লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়ার সময় তার কন্যা অনুছোঁয়া এবং দুই বোনসহ ঘনিষ্ঠজনেরা হাসপাতালে ছিলেন। কাজী আরিফের অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী তার লাশ বাংলাদেশে উত্তরায় তাঁর মায়ের কবরে সমাহিত করা হবে। যতদ্রুত সম্ভব লাশ পাঠানোর চেষ্টা চলছে ।
তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে ডাক্তার আনুষ্ঠনিক মৃত ঘোষণার পর হাসপাতালের ছয় তলার কানায় কানায় পূর্ণ অভ্যর্থনা  কক্ষে আরিফ ভাইয়ের ছোট মেয়ে আনুসূয়া বিনতে আরিফ মিনতি কণ্ঠে বললেন, আমার বাবাকে আপনারা ভুলে যাবেন না...
স্থানীয় সময় শনিবার বাদ মাগরিব জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন কাজী আরিফের বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক এই বাঙালির আত্মার মাগফেরাত কামনায় সকলের দোয়া প্রার্থনা করেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশের ভাইস কন্সাল জেনারেল শাহেদ আহমেদ মুক্তিযোদ্ধা কাজী আরিফের লাশ রাষ্ট্রীয় খরচে বাংলাদেশে প্রেরণের যাবতীয় ব্যবস্থা গৃহিত হয়েছে বলে জানাযায় অংশগ্রহণকারি সকলকে জানান। তিনি বলেন, এখানে যেমন তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হচ্ছে, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের সকল প্রস্তুতি চলছে।

জানাযার পর কাজী আরিফের লাশ বহনকারি কফিন এই মুসলিম সেন্টারের সামনে রাখা হয়। সেখানেই সর্বস্তরের প্রবাসীরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। সেই সময় জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত কাজী আরিফের প্রতি প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধারা স্যালুট দিয়ে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। গতকাল ৩০শে এপ্রিল নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় আমিরাতে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেটার ওয়াশিংটনেও তার মৃত্যুর সংবাদে শোক নেমে আসে। উল্লেখ্য যে ২০১৬ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর কাজী আরিফের একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় অনেকেই তাঁর সান্নিধ্যে আসার সূযোগ পান।

কাজী আরিফের জন্ম ১৯৫২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, রাজবাড়ী সদরের কাজীকান্দা গ্রামে। বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রাম শহরে। পড়াশোনা, রাজনীতি,  শিল্প-সাহিত্য এসব কিছুরই হাতেখড়ি হয় সেখানে। আবৃত্তির পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন তিনি, সক্রিয় ছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যাওয়ার পর বাংলাদেশে মুক্তমনা লেখক হত্যার প্রতিবাদে প্রবাসীদের মানববন্ধনে অংশ নেন তিনি। কলেজ জীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাজী আরিফ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন তিনি।

১৯৭১ সালে ১ নম্বর সেক্টরে মেজর রফিকুল ইসলামের কমান্ডে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন কাজী আরিফ। এরপর যুদ্ধ শেষে বুয়েটে লেখাপড়া শুরু করেন আর সাথে সমান তালে এগিয়ে যেতে থাকে তার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের আবৃত্তিশিল্পের অন্যতম রূপকার কাজী আরিফ। তিনি মুক্তকণ্ঠ আবৃত্তি একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।
কাজী আরিফের আবৃত্তির শুরু বুয়েটে পড়ার সময়। ১৯৭৩ সালে তিনি প্রথম বিটিভি ও বেতারে আবৃত্তি করলেও তার প্রথম অ্যালবাম ‘পত্রপুট’ বের হয় ১৯৮০ সালে। মোট ১৭টি কবিতার অ্যালবাম বেরিয়েছে তার। বিভিন্ন রেডিও, টেলিভিশনে নিয়মিত আবৃত্তি করতেন কাজী আরিফ। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি স্টেটে, থাইল্যান্ডে তার একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান হয়েছে। কলকাতায় বিভিন্ন আসরে আবৃত্তি করেছেন তিনি।

আবৃত্তির জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন থেকে পুরস্কারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের থেকে ফোবানা পুরস্কার এবং কলকাতা থেকে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন কাজী আরিফ।
সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ০১ মে ২০১৭ )