বাংলা নববর্ষ বরণে বাই'র আনন্দময় বৈশাখী জলসা
নিউজ-বাংলা ডট কম   
শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭


বাংলা নববর্ষ-১৪২৪ কে  বরণ করতে গত ২২শে এপ্রিল বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা (বাই) আয়োজন করে  হৃদয় ছোঁয়া বর্নাঢ্য বৈশাখী জলসার । হল ভর্তি দর্শক শ্রোতাদের আনন্দময়  উপস্থিতিতে মেরিল্যান্ডের পটোমেকস্থ কেভিন জন মিডল স্কুলের অডিটোরিয়ামে উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এই বৈশাখী জলসার। বাংলা নব বর্ষকে ঘিরে গত দুই সপ্তাহ গ্রেটার ওয়াশিংটনের বাংলা কমিউনিটি ছিলো উৎসব মুখরিত। হাজার কাজের ভিড়েও বাঙালী সাজে, নানা আয়োজনে নববর্ষ  বরণে ব্যস্ত ছিলো  প্রবাসী বাঙালীরা ।

আর এরই সর্বশেষ সংযোজন ছিল  হল ভর্তি দর্শক শ্রোতাদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা (বাই) আয়োজিত বর্নাঢ্য বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। "বাই"  আয়োজিত এই  বৈশাখী জলসাতে বিকেল থেকেই  প্রবাসী বাংগালী দর্শক শ্রোতাদের  স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎসব স্থল মুখরিত হয়ে উঠে। এই বৈশাখী জলসা সাজানো হয়েছিল একেবারে বৈশাখী রঙ মেখে। বাংলা নব বর্ষ বরণের শ্বাশত রূপটিই তুলে ধরার প্রয়াস ছিল পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে।  

বিকেল  সাড়ে ছয়টায় "বাই" এর  সভাপতি সফি দেলোয়ার কাজল তার পর্ষদের সকল সদস্যদের নিয়ে মঞ্চ থেকে নতুন বাংলা বর্ষকে স্বাগত জানিয়ে উপস্থিত শ্রোতা, দর্শক এবং বিশিষ্ট অতিথি বর্গকে বাংলা নব বর্ষের শুভেচ্ছা জানান।

এই সময় তিনি পরিচয় করিয়ে দেন উৎসব স্থলে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি হিসাবে  উপস্থিত "বাই"এর সাবেক সভাপতি আবু সোলায়মান, বশির আহমেদ, আজমত আলী, আনিস খান এবং ইনারা ইসলামকে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন  হয়  প্রবাসে বাংলাদেশীদের অভিভাবক হিসাবে বিবেচিত ওয়াশিংট ডিসিস্থ  বাংলাদেশ  দূতাবাসের   মিনিষ্টার (পলিটিক্যাল) তৌফিক হাসান। বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি প্রবাসে বাংলা ভাষা এবং সংষ্কৃতি  চর্চার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এই বিষয়ে নিজ ঘরে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত মোহম্মদ জিয়াউদ্দিনের পক্ষে গ্রেটার ওয়াশিংটন প্রবাসী বাংলাদেশীদের বাংলা নব বর্ষের শুভেচ্ছা জানান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর অদিতি সাদিয়া রহমান এবং রায়হান এলাহীর উপস্থাপনায় "বৈশাখী জলসা"র সূচনা ঘটে সৃষ্টি নৃত্যাংগনের তরুন তারুণ্যের শিল্পীদের মনমুগ্ধকর নৃত্য দিয়ে।

শুরুতেই তারা নতুনের আবাহনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরায়ত সুর ‘এসো হে, বৈশাখ এসো এসো" অনুরণনের সাথে প্রদীপের আলোক শিখায় নৃত্যের ছন্দে  বৈশাখী জলসার বর্নাঢ্য সূচনা ঘটায়। পরপর তিনটি  মনমুঘকর নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে প্রবাসী বাংগালীদের দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা মঞ্চে ঝংকার তোলে।  সৃষ্টির নৃত্য পরিবেশনায় অংশ গ্রহন করে ক্রিস্টিন, স্টেফিনী, ক্যাথেরিন, অনিমা, পুস্পিতা, ইভানা, লাবিবা, নায়শা, নোরা, নিধি, মৌমিতা, রিধা, অনুপমা, ক্যারিনা, আনামিকা। কোরিওগ্রাফী এবং পরিচালনায়ঃ রোজমারী মিতু গনজালভেজ।

এরপর "আনন্দ এবং তার ছোট্ট বন্ধুরা" বৈচিত্রময়ী  উপস্থাপনায় পরিবেশন করে লোকজ ধারার বাংলা গান।  অংশ গ্রহন করে নোরা আহসান, ফারিয়েল আহসান, লাবিবা রহমান,  লাবিবাহ খন্দকার, মাধবী কবীর, জারা মজুমদার, মনিষা গোমেজ, সেহেরীন, হুসেইন, নিথিন রাহমান।  হারমোনিয়েমেঃ দিনার মনি, গিটারঃ ডেভিড সমাদ্দার, হারমোনাইজ ডরথী বোস।

এরপর ছিল ধ্রুপদের শিল্প শোভিত নান্দনিক পরিবেশনায়  গীতি আলেখ্য- "মেঘ মল্লারে বিভোর বৈশাখ"। হিরণ চৌধুরীর পরিচালনায় এবং প্রভাতী দাসের গ্রন্থনা এবং ধারা বর্ণনায় শৈল্পিক সম্ভারে নাচে-গানে তুলে ধরে বাংলা সংষ্কৃতির সৃজনশীল ধারাকে।

গুনী শিল্পীদের বৈচিত্রময়ী এই পরিবেশনায় বাংলা সংষ্কৃতির দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠানে আগত দর্শক শ্রোতাদের অন্তরে।

 তাদের পরিবেশিত নৃত্য গ্রেটার ওয়াশিংটনের প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে মুগ্ধতা ছড়িয়ে বার বার । গীতি আলেখ্যের সমবেত সংগীতে অংশ গ্রহন করেন ক্লেমেন্স গোমেজ স্বপন, কোলিন্স গোমেজ, দিনার মনি, ফয়সল কাদের, কুমকুম বাগচী, রাজদ্বীপ ভাদুরী, সারা রুদ্মিলা, তনুশ্রী দত্ত, দোরা গোমেজ, এবং তাপস গোমেজ, তবলাতে পল গোমেজ, বাশিঃ আব্দুল মজিদ, কি বোর্ডঃ হিরণ চৌধুরী,  গীটারে রুবাব খালেদ সেতারেঃ রাজদ্বীপ ভাদুরী। নৃত্যেঃ কাউরী, মিসকা, শ্রী, আদিতি, আদৃতা, জাহানবী, সামারা, লিয়া, সানিকা, বেনু, নন্দিনী, রোকেয়া হাসি, আরিফিন হায়দার এবং জয় গোস্বামী।

অন্যতম ছিল নিউইয়র্ক থেকে আগত নাট্য গোষ্ঠীর বাংলার কিংবদন্তী জমিদার দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীর জীবনী নির্ভর নাটক ‘হাসন রাজা’। দর্শকরা মুগ্ধ চোখে দেখেন হাসন রাজা’কে।

 দর্শকদের চোখের সামনে ফোটে ওঠে জমিদার দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরীর বর্ণিল জীবনের এক জীবন্ত ক্যানভাস। ‘হাসন রাজা’ নাটকটি রচনা করেছেন সিলেটের তরুন নাট্যকার মোস্তাক আহমেদ এবং নির্দেশনায় দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক, নাট্যজন ইশরাত নিশাত। কোরিওগ্রাফারঃ বিপার এনী ফেরদৌস, নাটকে হাসান রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেন সীতেশ ধর।  


সূত্রধরঃ মিজানুর রহমান বিপ্লব, দিলারামঃ এজাজ আলম, চন্দ্রাঃ শাম্মী আখতার  হ্যাপী, মাঃ জান্নাতুল আরা জলি, নায়েবঃ রাসেল কবীর, গোবিন্দঃ নজরুল কবীর, আয়াতঃ আশীষ রায়, গোমস্তাঃ আনোয়ারুল হক লাভলু সংগীতায়োজনে ছিলেন লুসি হাসান, মুক্ত ধর, হামিদ ইকবাল, সুব্রত দত্ত এবং সুতিপা চৌধুরী শম্পা, ঢোলঃ মোহম্মদ শফিক , নৃত্যেঃ শাহীন, পম্পী, আলি হাসান, নিশাত ফারজানা এবং সংগীতা।


বৈশাখী জলসার  নজর কড়া আকর্ষন ছিল "বাই" এর নিজস্ব পরিবেশনায় "পালা গানের আসর"।

 চিরায়িত বাংলার রূপ রস গন্ধ ও ঢংকে ধারণ করে "হাসি-কান্নার আবরণে কিষান আর কিষানী" হয়ে উঠে দর্শক-শ্রোতাদের আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাদের মনমাতানো  পরিবেশনা  দর্শক শ্রোতাদের হৃদয়ে দোল খেয়ে যায় বারে বারে। মুহু মুহু করতালিতে দর্শক শ্রোতারা বার বার প্রকাশ করেছে তাদের ভাললাগার অনুভূতি। এতে অংশ গ্রহন করে কৃষানঃ আবীর, কুদ্দুস, কাইয়ুম, মিজান খান, স্বপন, মিজানুর ভুইয়া, দল নেতা সফিকুল ইসলাম। কৃষানীঃ তানিয়া, কুলসুম, মিতা, লায়লা, শারমিন, হোসনে জাফরুল।

হারমোনিয়ামে তানিয়া, প্রিকিউশনে স্বপন, বাশিঃ আব্দুল মজিদ, ঢোলঃ হিমু রোজারিও, পরিকলপনাঃ সফি দেলোয়ার কাজল, ধারাবর্ননাঃ  এ কে এম জামান, গ্রন্থনা এবং পরিচালনায়  সফিকুল ইসলাম। 

বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব আমেরিকার পরিবেশনায় আগামী ১৯ এবং ২০শে আগষ্টে  অনুষ্ঠতব্য নাটক "পাল্কী" এর শুভ প্রচারনা  অনুষ্ঠিত হয়  এই বৈশাখী জলসার অবসরে। মঞ্চে রীতিমত পর্দা উন্মোচন করে এই বর্নাঢ্য মহরতে মঞ্চে বক্তব্য রাখেন নাটকের স্ক্রীপ্ট  রাইটার সফি দেলোয়ার কাজল এবং পরিচালক কামরুল খান লিংকন।  এর আগে  পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও প্রদর্শনের মাধ্যমে "পাল্কী"  এর তথ্য চিত্র তুলে ধরা হয়। দর্শক-শ্রোতারা আগ্রহ ভরে তা দেখেন। এ ছাড়া "পাল্কী"র  স্টুডিও তে ছবি তুলে আগত দর্শক শ্রোতারা একাত্ম হয় "পাল্কী"র সাথে।

বিকাল চারটায় শিশু-কিশোরদের চিত্রাংকন এবং বৈশাখী সাজ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এর পাশাপাশি ছিল  পিঠা এবং বৈশাখী ভোজের আয়োজন। পান্তা-ইলিশ, ডালের চর্চরী আর সুস্বাদু ভর্তায় আপনার রসনা তৃপ্ত হয়।
 

অনুষ্ঠানের  সার্বিক পরিকল্পনায় ছিল সফি দেলোয়ার কাজল, ইভেন্ট কো-অর্ডিনেটর সাবিহা চৌধুরী তনিকা,  মঞ্চ সজ্জাতে আরিফ ইখতেখার, মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় আরিফুর রহমান এবং আরিফুর রহমান স্বপন, সাংষ্কৃতিক টিমে ডঃ পল ফেবিয়ান গোমেজ, সফিকুল ইসলাম এবং আনন্দ খান, বিভিন্ন দায়িত্বে সালেহ আহমেদ, কামরুল খান লিংকন ,মিজানুর রহমান ভুইয়া, রেহানা কুদ্দুস শিখা, বিপ্লব দত্ত  নুরাইন জামিল চমন এবং নাসিমা সালাউদ্দিন ঝর্না। অনুষ্ঠানে ভিডিওগ্রাফী শাহেদুজ্জামান এবং আরিফুর রহমান, ফটোগ্রাফীঃ রাজীব ভুঁইয়া এবং কচি খান। অনুষ্ঠান পুস্তিকাঃ সোয়েব চৌধুরী । শিশু-কিশোরদের চিত্রকলা প্রতিযোগিতাঃ মিজানুর রহমান খান, বৈশাখী সাজ প্রতিযোগিতাঃ তৌফিক হাসান।
অনুষ্ঠানের শব্দ নিয়ন্ত্রনে শান্তুনু বড়ুয়া ।
 
 অনুষ্ঠানে  সবার মধ্যেই একটা উৎসব মুখর  অনুভুতি কাজ করছিলো, বাই  আয়োজিত বৈশাখী জলসায় বাংলা ঐতিহ্যের বাঙালিয়ানা স্বাদের রস নিতে  আসা  দর্শক শ্রোতায় পরিপূর্ণ  স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি যেমন ভালো লেগেছে তেমনি ভালো লেগেছে প্রবাসে বেড়ে উঠা নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোর তরুন-তরুনীদের কাকলী মুখর উচ্ছ্বাস। আয়োজকদের সৃজনশীলতা,  শিল্পীদের  অনবদ্য পরিবেশনা, সর্বপরি দর্শক শ্রোতার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি "বাই" র এই আয়োজন  গ্রেটার ওয়াশিংটনে বইয়ে দেয় নববর্ষের আনন্দধারা। এভাবে আনন্দে কাটুক পুরোটা বছর-এই শুভ কামনাই করেছে "বাই" পক্ষ থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালীর জন্য।
 
 বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা (বাই) এর এই জমজমাট "বৈশাখী জলসা"র স্পন্সরঃ আইটি প্রশিক্ষন এবং জব রিপ্রেসমেন্ট প্রতিষ্ঠানঃ ডাটা গ্রুপ। অনুষ্ঠানটি স্পন্সর করার জন্য "বাই" এর পক্ষ থেকে ডাটা গ্রুপের সিইও জনাব জাকির হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয় ।

সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ০১ মে ২০১৭ )