শিউলির অন্তর্দাহ
আশরাফ আহমেদ. মেরিল্যান্ড   
শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭
চার পর্বের ধারাবাহিক গল্পের ১ম পর্ব


এক
শিউলি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। পাইলটের জানানো তথ্য অনুযায়ী বিমানটি এক্ষণে মাটি থেকে আটত্রিশ হাজার ফুট ওপরে। নীচে ঘন সাদা মেঘের পুরু একটি আস্তরণে পৃথিবীটি ঢাকা। কিন্তু এই উচ্চতায়ও দলছুট কিছু কিছু মেঘের দলা বিমানের পাখায় ও জানালায় স্নেহের কোমল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। আর এই পরশটুকুই শিউলির হৃদয়ের ভেতর ঘটতে থাকা প্রচণ্ড ঘুর্ণিঝড়কে শান্ত রাখতে সাহায্য করছে। এই মেঘই বারো মাস ধরে স্ত্রীসঙ্গ নির্বাসিত যক্ষের রূপ ধরে মহাকবি কালীদাসের সহায় হয়েছিল।  বিন্ধ্য পর্বতের ওপর বসে শতশত ক্রোশ দূরে অলকাপুরীতে অন্তরীন স্ত্রীর প্রতি নিজ বিরহগাথা শুনিয়েছিল মেঘদূতকে। বিরহের সেই মহাকাব্য স্ত্রীর কাছে পৌঁছেছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু মেঘের সান্নিধ্য যক্ষকে দিয়েছিল বিরহ যাতনা সহ্য করার প্রেরণা। আজ বিমানের জানালা ও ডানায় ছুঁয়ে যাওয়া মেঘও হয়ে আছে পৃথিবীতে শিউলির একমাত্র বন্ধু!

পাশে শোয়া দুই যুগের বেশি যে স্বামী, আজ সে কোন উপকারেই আসছে না। স্বামীটি দেখতে সাদামাটা। আজ অনেক ছোট দেখাচ্ছে। শিউলির ইচ্ছা করছে ওকে কোলে নিয়ে, জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে অনন্তকাল। মৃত্যু যেন ওকে গ্রাস করে সেই আলিঙ্গনাবস্থায়। কিন্তু তা হবার নয়। আরেক পাশে ঘুমোচ্ছে ওর ছেলে। মনের দিক থেকে স্বামী থেকে সে দূরে ছিল না কোনদিনই। বরং কদাচ নিজের ছেলে বা মেয়েটিও যদি কোন অনভিপ্রেত কথা বলে ফেলেছে, তা স্বামীর কাছে প্রকাশ করে শিউলি মনটিকে লঘু করে নিয়েছে। বিয়ের আগে থেকেই স্বামীকে যে সমমর্মী দেখে এসেছে গত প্রায় তিরিশ বছরে তার কোন ব্যত্যয় দেখেনি। কিন্তু আজ হৃদয়ের উত্তাল অবস্থার কথা ওর কাঁধে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে থাকা স্বামীকে কিছুতেই সে বলতে পারছে না।

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে রওনা হয়েছে প্রায় ছয় ঘণ্টা আগে। বিমানের সবাই ঘুমিয়েছিল। কেবিনের সব লাইট নেভানো। দূরের সবুজ লাইটটি দেখে দুই সারি সিট হাতড়ে হাতড়ে শিউলি এগিয়ে গিয়েছিল বাথরুমের দিকে। মুখহাত ধুয়ে বেরোনোর কিছুক্ষণের মাঝেই পাইলট লোকটির দেখা পেয়েছিল।

লোকটি সুঠাম ও দীর্ঘদেহী। বাথরুমের দরজা খোলা থাকায় ভেতর থেকে উপছে পড়া আলোয় সুশ্রী চেহারাটিও শিউলির দৃষ্টি এড়ায়নি। তখন ওকে দেবদূত মনে হয়েছিল। কিন্তু বিমানের সাড়ে তিন শত যাত্রীর দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও পাইলট লোকটি যে এমন কাজ করতে পারে তা শিউলি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। বরং যেন কিছুই হয়নি, চেহারায় এক চরম নিঃস্পৃহতার ছাপ মেখে লোকটি শিউলির মুখে তালা লাগিয়ে দিল।

দুই বিমানবালাও ঘটনাটির সাক্ষী হয়ে আছে। কিন্তু পাইলটের চোখের ঠাণ্ডা দৃষ্টির সামনে ওরাও যেন বোবা হয়ে গেছে। কেউ কারো কাছে মুখ খুলছে না। শিউলির জীবনের সবচেয়ে ক্ষতিতে নারী হয়েও যেন ওদের কোন দায়দায়িত্ব নেই। বিমানবালা দুজনেই অল্প বয়সের। স্বামী-সংসার আছে কি নেই। ওরা কীভাবে শিউলির ক্ষতির কথা বুঝবে? ওর দুর্ভাবনা কী তা ওরা কীভাবে বুঝতে পারবে? সবার মুখেও তো তালা!

পাইলট বলেছিল ব্যপারটি গুরুতর মোটেই নয়।

শিউলি ভাবলো, বলে কি বদমাশটা!? ওর কি মাথা খারাপ? কোন দেশে ওর বাড়ি? ওর কি নিজের কোন সংসার, মা বোন বা স্ত্রী নেই? ইচ্ছা হয়েছিল পা থেকে জুতো খুলে ফটাস করে দুই গালে দুই ঘা লাগিয়ে দেয়!

মনের ভেতরে ঢুকতে পারে না বলে লোকটি শিউলির রাগের কথা বুঝতে পারে না। পাইলট আরো বললো, যদি জানাজানি হয়ে যায় তবে এক মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

শিউলি ভাবলো, কেলেঙ্কারির আর বাকিটা আছে কী? কেলেঙ্কারি তোমার বা তোমাদের হলে আমার কী? আমি টাকা দিয়ে টিকেট কিনে তোমাদের হাতে নিজের নিরাপত্তা সঁপে দিয়ে স্বামী ও পুত্রকে সাথে করে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলাম। আর তুমি এভাবে আমার বিশ্বাসের প্রতিদান দিচ্ছ? ঘৃণিত ও রোমহর্ষক এই দুরবস্থার কথা আমি নিজ স্বামীর কাছেও বলতে পারবো না?

পাইলট বলে চললো, আচ্ছা কেলেঙ্কারি তো পরের ব্যপার, জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর। কিন্তু যাত্রীরা একে একে জেনে গেলে কেউ হয়ে পড়বে উত্তেজিত, কেউ হবে আতংকিত। খুব সহজেই তারা এক অনর্থ ঘটিয়ে ফেলতে পারে। তাতে শুধু আমার নিজের জীবন নয়, তোমার এবং এই দুই বিমানবালার জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।

কী সহজভাবেই না কথাগুলো বলে গেল লোকটি! যে অপমাণ বোধ সে করছে তাতে শিউলি ভাবলো, এর চেয়ে বেশি জীবন বিপন্ন হওয়ার আর বাকি আছে কী?

পাইলট বলছে, তাছাড়া জেনে গিয়ে সব যাত্রী যদি একসাথে শোরগোল শুরু করে দেয় তবে বিমানটি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে। তাতে এই অন্তরীক্ষেই একসাথে সবার সমাধি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না!

বাহ কি চমৎকার যুক্তি! শিউলি ভাবলো, অন্তরীক্ষে তো ওর একপ্রকার সমাধি হয়েই গেছে বাথরুম থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই। অন্তরীক্ষে বা জাহান্নামেই তোমার সমাধি হওয়া উচিৎ। কিন্তু তোমার মত দায়িত্বহীন লোকের সাথে আবার সমাধিস্থ হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই।

তাই একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঠোঁটে তালা লাগাতে সে বাধ্য হয়েছিল। বিমানবালারাও ওর এবং পরস্পরের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। দৃষ্টি পড়তে ওরাও চোখজোড়া অন্যত্র সরিয়ে ফেলছিল।

দুঃসহ এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মৃত্যুই শিউলির একমাত্র পথ। সেই সম্ভাবনার কথা মনে হতে জন্মের পর থেকে যত ধরণের দোয়া ও মন্ত্র জানা ছিল তা পড়ে যাচ্ছিল। পড়া শেষ হলে বারবার সারা শরীরে ফুক দিয়ে দেহটিকে পবিত্র করে নিতে চেষ্টা করছিল।

স্বামীর ঘুমের যেন ব্যঘাত না হয়, ফিরে এসে খুব সাবধানে সে নিজের সিটে বসে রইলো।
(চলবে)

৭ই এপ্রিল, ২০১৬
পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৭ )