ব্যালান্সের রাজনীতি চাঙ্গা হচ্ছে
শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক   
বুধবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৭
বাংলা নববর্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা। বছরের শুরুতে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সুপ্রিম কোর্টের সামনে জাস্টিশিয়া গ্রিক ভাস্কর্য নিয়ে বেশ কথাবার্তা চলছে। এমনিতে যে কোনো বিষয়ে কথাবার্তা হওয়া ভালো। আমাদের সমস্যা হলো- যত কথাই হোক, শেষ পর্যন্ত তালগাছটা মৌলবাদীরা জিতে নেন। ভাস্কর্য প্রশ্নে হেফাজত ইতোমধ্যে জিতে বসে আছে? মঙ্গল শোভাযাত্রা এ বছরের মতো শেষ, তাই জয়-পরাজয় আপাতত নির্ধারণ না হলেও আওয়ামী লীগ শোভাযাত্রা করেনি, এটা কি হেফাজতের বিজয় নয়?  প্রধানমন্ত্রী অবশ্য নতুন বছরে রিসিপশন দিয়ে খানিকটা ব্যালেন্স করার প্রয়াস পেয়েছেন। এটা হয়তো ক’দিন আগে হেফাজতকে ডেকে এনে জামাই আদর করার ‘ব্যালান্স’ও হতে পারে? দেশে নির্বাচন আসছে। ব্যালান্সের রাজনীতি তাই চাঙ্গা হচ্ছে। আগে এরশাদের কদর ছিল। এখন নাই, কারণ এরশাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। একই কারণে হিন্দু ভোটেরও কদর নেই, ‘ভোট না দিয়া যাইবা কই’? সুতরাং হেফাজতের কদর বাড়ছে। আওয়ামী লীগ ওদের টানছে, পুরনো দোস্ত বিএনপি তো আছেই!
মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ নিয়ে তেমন উল্লাস নেই। বাংলা ভাষা যখন স্থান পেয়েছিল তখন কিন্তু পুরো জাতি উল্লসিত হয়েছিল। গুগুল ডুডুল পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন করেছে। এতে পেঁচা, বাঘ ও সূর্য্য সংবলিত একটি ব্যানার স্থান পেয়েছে। এটাও সুসংবাদ কিন্তু সবাইকে খুশি মনে হচ্ছে না। কারণ হেফাজত বন্ধুকে রাগানো যাবে না? বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তি কখন হেফাজতকে এতটা জমা-খরচ দিতে শুরু করল? খবরে প্রকাশ, আফগানিস্তানে সদ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বিশাল বোমা ফেলেছে তাতে নিহতের তালিকায় একাধিক বাংলাদেশি জঙ্গি রয়েছে। প্রশ্ন হলো- মঙ্গল শোভাযাত্রা আর জঙ্গিবাদ দুটো তো পাশাপাশি চলতে পারে না? বাংলাদেশকে একটি বেছে নিতে হবে। ধরি মাছ না ছুঁই পানি বা ঠেলাঠেলিতে কাজ হবে না। প্রবাদ আছে, ‘ঠেলাঠেলির ঘর খোদায় রক্ষা কর’। ভাস্কর্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু চূড়ান্ত কী হয়েছে আমরা জানি না। শুধু জানি হেফাজত জিতেছে। ভয় হয়, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে যদি হেফাজত মুর্ক্তি বলে তা সরানোর দাবি জানায় তাহলে কী হবে? এখন না হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে যে করবে না এর গ্যারান্টি কোথায়? খেলাফত মজলিস অবশ্য বলেছে, বোরখা পরিয়ে মুর্ক্তি জায়েজ করা যাবে না। সমস্যা ভাস্কর্যের নয়, সমস্যা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির। তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেছেন, তেঁতুল হুজুর চক্র রাজাকারপন্থী। সুন্দর কথা। লোকে কিন্তু বলছে, ইনু যেই সরকারে আছেন সেই সরকারটি এখন হেফাজতপন্থী? ইনু কী করবেন? মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবেন? উহু, ওটা হবে না। সুতরাং আপস করতে হবে। ক্ষমতার জন্যই আপস, হেফাজতের সঙ্গে সখ্যতা। রাজনীতিতে অবশ্য শত্রুমিত্র চিরস্থায়ী নয়। আওয়ামী লীগ-হেফাজত বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশেষত হেফাজত ‘মতিঝিল ট্রিটমেন্ট’-এর কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে তা মনে হয় না। সুযোগ বুঝে ওরা ঠিকই ছোবল মারবে।
জাস্টিশিয়া ভাস্কর্যের সঙ্গে মোল্লাদের আরো একটি দাবি আছে, তা হলো হিন্দু প্রধান বিচারপতির অপসারণ। সরকার কি এই দাবিটি মানবেন? এমনিতে বর্তমান প্রধান বিচারপতির মেয়াদ আছে সম্ভবত বছর খানেক। ইতোমধ্যে ভাস্কর্য প্রশ্নে দায়িত্বশীল মহল তার দিকে অঙ্গুলি হেলন করেছেন। ভাস্কর্যটি সরানো বা না সরানোর কাজটি এখন তার ওপর। অবস্থা এখনো এমন নয় যে, ‘হয় ভাস্কর্য সরবে না হয় প্রধান বিচারপতি সরবেন’; কিন্তু হতে কতক্ষণ? জাস্টিশিয়া প্রশ্নে জাতি সুস্পষ্ট নির্দেশনা চায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত নিলে জাতি উপকৃত হবে। একটি ভাস্কর্য একটি জাতির জন্য কিছুই না। কিন্তু এও মনে রাখতে হবে, একটি ভামিয়ান গুঁড়িয়ে দেয়ার ফলে আফগান জাতির ধ্বংস নেমে এসেছিল। পাকিস্তান আর্মি রমনা কালীবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল; সেই রমনার পাদমূলে দাঁড়িয়েই পঁচানব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। এবারকার নববর্ষের আরো খবর হলো- চারুকলা ইনস্টিটিউট সবাইকে গরুর তেহারি খাইয়ে বছরের শুভ সূচনা করেছে। অবশ্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জাকির হোসেন এর ফলে সাময়িকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন।
বছরের শুরুতে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক ভিটা দখলমুক্ত হওয়ার শুভ সংবাদ এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ভুটানকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছেন কারণ ভুটান প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর শোনা গিয়েছিল তিনি দেশ বিক্রি করে দিয়ে এসেছেন। যারা এটা রটনা করেছিলেন, তারা কি এখন সবাই ভারতের নাগরিক? শুনেছি শেখ হাসিনা সবাইকে দিল্লির লাড্ডু খাওয়ালেও খালেদা জিয়া ঢাকাই লাড্ডু খাওয়ার কথা বলেছেন, ভাগ্যিস যে তিনি পাকিস্তানি লাড্ডুর কথা বলেননি?
নতুন বছরে আশা করি আর হিন্দুর মন্দির ভাঙবে না। যদি ভাঙে তাহলে যেন সরকারের অনুভূতিতে আঘাত লাগে? ছেলেবেলায় সবাই আমরা নিউটনের তৃতীয় সূত্র পড়েছি। এতে বলা হয়েছে : ‘প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে’। বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্ষেত্রে কিন্তু নিউটনের এই থিওরি ফেল? কারণ হাজার অত্যাচারেও এদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই! আশা করি নতুন বছরে এই থিওরি কার্যকর হবে। ওবায়দুল কাদের তো বলেই দিয়েছেন, অত্যাচারীর কালো হাত গুঁড়িয়ে দিতে। মালয়েশিয়ার মন্ত্রী ড. অসিরাফ ওয়াজদি দাসুকি একটি চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হালালের খোঁজ শুধু খাবারে, টাকার বেলায় নয়’। কথাটা কি তিনি বাংলাদেশের জন্য বলেছেন? নতুন বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের রোমেল চাকমা সম্ভবত প্রথম শহীদ, তিনি নিরাপত্তা কর্মীদের পিটুনিতে মারা গেছেন।
নিউইয়র্ক। ২২ এপ্রিল ২০১৭
শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৭ )