ডায়েরির পাতা - পচিশে মার্চ
শাহ হাবিবুর রহমান, ভার্জিনিয়া থেকে   
মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০১৭

দুই
সন্ধ্যে ছয়টায় কারফিউ মাথায় রেখে বেলা তিনটার দিকে বেরিয়ে পড়তে প্রস্তুত হলাম। কলাবাগানে  আপার বাসা থেকে আপা ও তিন ছেলেকে  কলাবাগানেই  ভাই এর বাসায় রেখে দুলাভাই এবং আমি বের হয়ে গেলাম।  উদ্দেশ্য ময়মনসিংহ যাব। কি ভাবে যাব তার কোন ঠিক নাই। রাস্তার অবস্থাও জানা নেই। কলাবাগান বসিরুদ্দিন সড়ক ধরে এগিয়ে চললাম। গ্রীন রোডে উঠে কাঠালবাগান  রোড  ধরে চললাম ময়মনসিংহ রোড এর দিকে।

পথে অনেকের সাথে দেখা হল। আমরা সালম জানিয়ে এগিয়ে চললাম। চারটা বাজে আর দুই ঘন্টা পর আবার কারফিউ। এর মধ্যে আমাদের অন্তত ঢাকা শহর ছাড়তে হবে। ময়মনসিংহ রোড এ উঠলাম।
কিন্ড কোন রিকশা পাওয়া ষাচ্ছে না। কেউ যেতে চায় না। সবাই রিকশা জমা দিয়ে ঘরে ফেরা নিয়ে ব্যস্ত। এখন আমরা কি করব বা কোন দিকে যাব। হেটে চললাম মগবাজার রোড দিয়ে। হঠাৎ মনে হল জুবের ভাই দিলু
 রোডে এ থাকেন। তার বাসায় কয়েকবার গিয়েছি। জুবের ভাই মেজ ভাই এর সাথে আই সি আই তে চাকরি করেন। তারাও ভাই এর বাসায় এসেছেন । আমি দুলা ভাইকে জুবের ভাই এর কথা বললাম। দুলা ভাই রাজি হয়ে
গেলেন। আমরা চললাম দিলু রোড এর দিকে। জূবের ভাই পরে সিনেমায় খল নায়কের ভুমিকায় অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন। তখন ছয়টা বাজতে পনের মিনিট বাকি। অমি জুবের ভাই এর দরজায় কড়া নাড়লাম।
জূবের ভাই এসে দরজা খুললেন। আমাকে ওই অবস্থায় দেখে হতবাক। বললেন একি হাবিব তুমি। সাথে উনি কে। অমি বললাম আমার বড় দুলাভাই। বল্লেন ভিতরে আস। দুজনেই ভিতরে ঢূকলাম। ইতিমধ্যে ভাবি ও এসে
 যোগ দিলেন। আমি আমাদের কাহিনী তাদের বললাম। আর বললাম ভোর হবার সাথে সাথে কারফিউ  উঠে গেলে আমরা চলে যাব। জূবের ভাই বললেন ‘যতক্ষন আমার জীবন আছে ততক্ষন কোন চিন্তা নাই।
আপনারা এখানেই থাকুন। এদিকে ভাবি চলে গেলেন রান্না ঘরের দিকে। রাতের খাবার তৈরি হয়ে গেল খিচুরি ডিম আর মুরগির মাংশ। কাপড় বদলে হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসে পরলাম। খুব একটা কথা বললাম না।
বাচ্চাদের সাথে একটু গল্প বলে শোয়ার ঘরে চলে গেলাম আমরা দুজন। আলাদা ঘর আমাদের জন্যে ] ছেলে ও মেয়ে বাবা মার সাথে চলে গেল। কিছূক্ষনের মধ্যে দুলা ভাইয়ের নাক ডাকার আওয়াজ শুনলাম।
আমিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

ভোরে মোয়াজ্জেন এর আজান শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমরা দুজনেই উঠে গেলাম। হাত মুখ ধুয়ে জামা কাপড় পরে নিলাম। দুলা ভাই ফজর নামাজ সেরে নিলেন। আমরা এদিক ওদিক তাকালাম।
রাস্তায় কোন গাড়ী নেই। দুবার মিলিটারি ট্রাক দেখলাম একেবারে মেশিন গান তাক করা। ভাবি ও জুবের ভাই উঠে গেলেন এ্বং আমাদের কামরায় আসলেন। আমাদের দেখে ভাবি চলে গেলেন রান্না ঘরে। আমরা
জানালায় তাকিয়ে দেখছি এবার দুই একটা রিকশা দেখলাম। হয়ত কারফিউ উঠে গেছে। দু একটা বেবি টেক্সিও দেখলাম। খানিক বাদে ভাবির ডাক নাস্তা তৈরি। জুবের ভাই তখনও বাথ্ররুমে। একটু পরে তিনিও খাবার
 টেবিলে আসলেন। এদিকে ছেলে ও মেয়ে টেবিলে আসল। ভাবি বললেন গত ২৬ তারিখ থেকে  ওরা সকালেই ঘুম থেকে উঠে যায়। রাতেও ভাল করে ঘুমায় না। অস্থির থাকে সব সময়।

নাস্তা খেয়ে তৈরি হয়ে গেলাম। খাবার টেবিলে  অনেক আলাপ হল। এখন যাবার পালা। জুবের ভাই জিজ্ঞেস করলেন কিভাবে যাব। অমরা বললাম জানি না। রাস্তায় বেরিয়ে ঠিক করব কোনদিকে যাওয়া যায়।
অনেকে মুনশিগঞ্জ হয়ে মনহরদি দিকে যাওয়া যায়। আমরাও মানিকগঞ্জ বা মনহরদি হয়ে যাব সেটা রাস্তায় বের হয়ে পরে ঠিক করব। আমরা বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। জুবের ভাই ভাবি ও বাচ্চারা সবাই দরজা
 দিয়ে তাকিয়ে থাকল যতক্ষন আমাদের দেখা যায়। কারফিউ ততক্ষনে উঠে গিয়েছে। রাস্তায় গাড়ীর আনাগোনা বাড়ছে। আমরা চলেছি হেটে।  এক রিকশাকে ডাকলাম। জিগ্যেস করলাম কোথায় বাস পাওয়া যাবে।
সে বলল ফার্ম গেটে বাস পাওয়া যেতে পারে। আমরা উঠে গেলাম । ফার্ম গেটে আসতেই দেখলাম কয়েকটা বাস। তখন সাড়ে নয়টা বাজে । একটি বলল মিরপুর যাবে। আমরা ভেবে নিলাম মিরপুর হয়ে সাভার হয়ে
 চলে যাব। আবার ভাবলাম মিরপুর এ বিহারিদের পাল্লায় পড়ি নাকি। বাসে এ দেখলাম অনেক লোক। সবাই বাঙ্গালি। আমরাও উঠে গেলাম। বাস চলল একসময়। সেকেন্ড  ক্যাপিটেল হয়ে সোজা মিরপুর রোড এ উঠে
 গেলাম। বাসে খুব একটা কেউ কথা বলতে চাচ্ছে না। কয়েক জায়গায় থেমে বাসটি মিরপুর গাবতলীর কাছে আমাদের নামিয়ে দিল। আমরাও নেমে সবার সাথে হেটে চল্লাম । একটূ পরেই মিরপুর সেতু উপরে উঠে গেলাম।

সেতু থেকে যখন নিচে নদীর দিকে তাকালাম হায় একি  দৃশ্য। হাজার হাজার লাশ পানিতে ভেসে চ্লেছে। আর দুই পাড়ে প্রচুর লাশ আটকা পরে আছে। প্রচুর শকুন আর শিয়াল।
এক একটা শকুন  চার পাচটা লাশ নিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর মাংশ খাচ্ছে। অনেক শিয়ালও আছে সেখানে । শিয়ালগুলি লাশ নিজের কাছে টেনে এনে খেতে চেস্টা করছে। শকুন গুলো তা দিতে চাচ্ছে না।
আমরা দুইজনে এই  দৃশ্য দেখে দাড়াতে পারছিলাম না। এমন ধারণা হয়নি যে এই ভাবে মানুষকে মেরেছে। মনে পড়ে গেল দাদির কথা । সপ্তাহ  তিন আগে আকাশে অনেক শকূন দেখে বলতে শুনেছিলাম আকাশে  
অনেক শকুন নিশ্চয় অনেক লোক মারা যাবে । হঠাৎ দেখলাম তিনটা যুবক হাতে স্টেন গান নিয়ে এগিয়ে আসছে। আর একটূ কাছে আসতেই মনে হল ওরা বিহারি।
আমরা মাথা নিচু করে একটূ দূরে থেকে সাভারের দিকে হাটা শুরু করলাম।

চলেছি হেটে সাভার এর দিকে। একটু পর একটি বাস এল বাস ষ্টপে। আমরা কিছু না বলে বাস এ উঠে গেলাম। এবার বাস এ লোকজন কথা বলছে। একজন আমাদের জিজ্ঞেস করল আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং
কোথায় যাব। আমরা বললাম ময়মনসিংহ যাব। বাস থেকে বলা হল বাস কালিয়াকৈর যাবে। ওখান থেকে টাঙ্গাইল এর বাস পাওয়া যেতে পারে। আমরাও সম্মতি দিলাম।  বাস খুব জোরে চলছিল না। কালিয়াকৈর
পৌছাতে  সন্ধ্যা  হয়ে গেল। দুই তিন জন লোক এসে আমাদের জিজ্ঞেস করল আমরা কোথায় যাব। আমরা বললাম ময়মনসিংহ যাব । জিজ্ঞেস করলাম এখানে কোন হোটেল আছে নাকি। একজন এসে বলল চলুন
আমার সঙ্গে। আমরা তার সাথে রওনা হলাম। সাথে আরও দুজন সাথি হল। একটি বেশ বড় বাড়িতে এলাম। একজন ভিতরে গিয়ে বাড়ির মালিককে নিয়ে আসল। তাকে দেখে মনে হল তিনি বেশ অবস্থাপন্ন এবং ক্ষমতাবান। পরিচয়ে জানতে পারলাম তিনি গায়ের চেয়ারম্যান। আমরা আমাদের পরিচয় দিলাম। ইতিমধ্যে বেশ অনেক লোক জমা হয়ে গেছে। আমাদেরকে বৈঠক খানায় নেয়া হল। আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল ঢাকার আবস্থা কি।আমি যা দেখেছি তা সবিস্তারে বললাম। দুলাভাই বললেন এখন আর স্বাধীনতা ছাড়া আর বিকল্প নাই। সবাই একমত। ওনেক আলাপ আলোচন্রার পর খাবার চলে এল। ভাত, মুরগির মাংস, ভাজি এবং ডাল। প্রায় দশ বার জন খেতে বসে গেলুম। ক্ষুদাও ছিল প্রচুর। একে একে প্রায় সবাই চলে গেল। রাতে ঘুমাবার ব্যবস্থা হল বৈঠক খানায়। সবাই চলে গেলে আমরাও ঘুমালাম।

ভোরে আজান শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। পাশেই মসজিদ। দুলাভাই মসজিদ এ নামায পরে এলেন। আমি কিছুক্ষন পর ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুতে গেলাম। টূথ পেস্ট ও ব্রাশ সাথেই ছিল। হাত মুখ ধুয়ে বৈঠক খানায় এলাম।
 আস্তে আস্তে বেশ কয়েকজন জমা হল। নাস্তাও চলে এল। নানা রকম পিঠা।রাজনীতির আলাপের সাথে নাস্তা চলল। এখানে মোটামুটি সবার একই কথা। ঢাকার অবস্থা কি। দেশের অবস্থা কি হবে।
 সবাই একমত স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কিছূ চিন্তার আবকাশ নাই। লক্ষ্য করলাম জনমত তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এবার আমাদের বিদায় এর পালা। সকাল নয়টা বাজে। চেয়ারম্যান সাহেব আমাদের সাথে দুইজন লোক দিয়ে
 দিলেন  কিছু দুর এগিয়ে দেয়ার জন্যে। বললেন মাইল দুয়েক গেলে টাঙ্গাইলের বাস পাওয়া যেতে পারে। আমরা আথিথেয়তার জন্যে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিয়ে আবার পায়ে হেটে চললাম আর দুজন সঙ্গির সাথে।
ঘন্টা খানেক  হাটার পর একটা বাজারে  এলাম। কিছূক্ষন পর একটি বাস এসে হাজির। বাসটি টাঙ্গাইল যাবে। ভাবলাম ভালই হল। সঙ্গী  দুই জন কে বিদায় দিয়ে আমরা বাসে চাপলাম। কে একজন এসে বলল আপনারা
সামনে বসুন। সিট পরিস্কার করে আমাদেরকে বসতে বলা হল। মনে হল ভি আই পি এর সুবিধা। দু একজন যাত্রী  কাছে এসে ঢাকার আবস্থা জানতে চাইল। আমরাও অতি বিনয়ের প্রতিটি  প্রশ্নের একই জবাব দিলাম।

আধ ঘন্টা পর বাস চলা শূরু করল। তবে গতি খুব কম। প্রায় চার ঘন্টা পর আমরা করটিয়া এসে পরলাম। বাস থেমে গেল। ইঙ্গিন খারাপ আর যাবে না। সবাই নেমে পড়লাম। একজন এসে বলল একটূ পরে আর একটি বাস আসবে। পাশেই একটি দোকান। সিঙ্গারা আর চপ ভাজা হচ্ছে। চপ আর সিঙ্গারা এবং চা খেয়ে বাস এর অপেক্ষায় বসে রইলাম। বাস এর যাত্রি সবাই আমাদের ঘিরে ঢাকার আবস্থা জানতে চাইল। আমাদের যা তথ্য ছিল সব বললাম। এখানে সবাই  স্বাধীনতা  স্বাধীনতা  বলে শ্çোাগান দিল। একটি বাস চলে এল টাঙ্গাইল যাবে। বেশি দুর না ১৫/১৬ মাইল হবে। বাস এ উঠলাম আমরা সবাই। বাস চলল। প্রায় পাচটার দিকে আমরা টাঙ্গাইল পৌছে গেলাম। আকুর টাকুর আমার পরিচিত জায়গা। দুই তিন জন এসে জিগ্যেস করল। আমরা কোথায় যাব। আমরা বললাম ময়মনসিংহ। তারা বলল আজ আর কোন বাস নাই। ওরা আমাদের একটি হোটেলে নিয়ে এল। বলল হোটেলের  বিলের  কোন চিন্তা না করতে । কিছুক্ষন পর আপনাদের রাতের খাবার চলে আসবে।ঘন্টা খানেক পর রাতের খাবার চলে এল। ভাজি, খাসীর মাংশ এবং ডাল। বলা হল আপনারা খেয়ে ঘুমাবেন হোটেল এর লোকজন পরে সব পরিশ্কার করবে এবং সকালে দোকানে গিয়ে নাস্তা করব। আমরা কিছুক্ষন গল্প করে ঘুমাতে গেলুম। এক কথায় আমরা বললাম লোকজনের আথিথেয়তা। এতো ভুলার নয়। পাকিস্তান শেষ। লোকজন তৈরী হচেছ মুক্তি যুদ্ধের। আবার তিনজন লোক এল এবং আমাদের একটি রেস্তরায় নিয়ে গেল। সেখানে পরটা, গরুর মাংস, মিস্টি দেয়া হল। আমরাও সবার সাথে নাস্তা করলাম।

কিছুক্ষন গল্প চলল। বিষয় একই। আমরা স্বাধীন। আর পাকিস্তান নয়। এখানে কোন মিলিটারী নেই। সাভার থেকে এখান পয`ন্ত কোন মিলিটারী দেখি নাই। কোন পাকিস্তানি পতাকাও নাই। সবাই বাংলাদেশ খচিত পতাকা উড়াচেছ। শুনলাম যুদ্ধের জন্যে ট্লেনিং হচেছ। এতক্ষন যা দেখলাুম মানুষের একাত্ততা। সবার একমত পাকিস্তানীদের তাড়াতে হবে যেমন করেই হোক। কিছুক্ষন পর একটি বাস এল। মধুপুর যাবে। আমরাও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসে উঠলাম। বাস ভরে গেলে চলতে শূরু করল। টাঙ্গাইল থেকে মধুপুর ত্রিশ মাইল। আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হল না। বলা হল আমরা ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাচিছ। যাত্রিদের কেŒ কেŒ আমাদের সাথে কথা বলল। জানতে চাইল ঢাকার অবস্থা। আমরা সবিস্তারে বললাম। সবাই একমত যুদ্ধ সমাসন্ন। এর মধ্যে বাস মধুপুর এসে গেল । বেলা আড়াইটা। আমরা মধুপুরে বাস থেকে নামলাম ] রাস্তায় অনেক  লোকজন মনে হোল আজ বাজারের দিন ] দূলাভাইও তাই বললেন । আমরা একটু সামনে হেটে গেলাম একটি চ্ায়ের দোকানে । দেখলাম ডালপূরিও ভাজা হচেছ।  দূএকজন আমাদের যোগ দিল। আলাপ প্রসঙ্গ একই ঢাকার অবস্থা। এখানেও কোন মিলিটারি নাই। জানা গেল ময়মনসিংহের বাস পাওয়া যাবে। এখান থেকে ময়মনসিংহ  মাত্র ত্রিশ মাইল ] আগের মত আর উত্তেজনা নাই ] কিছুক্ষন কথাবার্তা চলল পুরি আর চা খেতে খেতে । লক্ষ্য করলাম পাকিস্তান আর কারও মধ্যে নেই । স্বারই এক কথা স্বাধীনতা। খানিক বাদে একটি বাস এল ময়মনসিংহ যাবে । মনে হলো এখান থেকে বিভিন্ন
 জায়গার বাস পাওয়া যাচ্ছে] আমরা বাসে উঠে গেলাম। বাস প্রায় ভর্তি` হয়ে গেল এবং বাস চলল ময়মনসিংহের দিকে। এবারই প্রথম বাসের ভাড়া দশ টাকা হিসাবে দিলাম। দুলা ভাই ও আমাকে  কয়েকজন  জানতে  
চাইল আমরা ঢাকা থেকে আসছি কিনা । ঢাকার অবস্থা নিয়ে কয়েকজনের সাথে  কথা হলো। বাস চলছে ঘন্টা  দু একের মধ্যে ময়মনসিংহের কাছে চলে এল । তখন সন্ধ্যার কাছাকাছি। বাসটিকে থামান হল
খাগডহর ইপিয়ার ক্যাম্প এর কাছে। এটা আমাদের পরিচিত জায়গা। ময়মনসিংহ শহর থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দুরে। শুনলাম বাঙ্গালী সেনারা বিহারি ও পাকিস্তানি বাহিনীকে ঘিরে রেখেছে। গোলাগুলি ও নাকি হচ্ছে।
দুপুরের দিকে ভারী যুদ্ধ হয়েছে নাকি। অবস্থা এখন অনেকটা শান্ত। কিছু বাঙ্গালী সেনা দেখলাম। কিছুক্ষন পর যানবাহন চলতে দেয়া হল। তখন সন্ধ্যা হয়েছে। পনের মিনিটের মধ্যে আমরা কাচিঝুলি
মোড়ে এসে গেলাম যা আমাদের বাসার খুব কাছে। বাস থেকে নামার সাথে সাথে দু একজন আমাদের চিনে ফেলল। একজন উচ্চ ম্বরে বলে উঠল ঢাকা থেকে হাবিব ও মফিজ ভাই এসেছে। সাথে সাথে শত খানেক লোক
আমাদের ঘিরে ফেলল। একই কথা। ঢাকায় কোন দালান দাড়িয়ে আছে কিনা। বুঝলাম আমরাই প্রথম ঢাকা থেকে এসেছি ] ঘটনা বলতে বলতে বাসার দিকে চললাম। বাসায় যখন পৌছি তখন বাসার সামনে হাজার মানুষ।
 আব্বা ও মার সাথে দেখা করে বাইরে এসে আমি আর দুলাভাই সবাইকে আমরা যা দেখেছি সব বললাম। রাত নয়টা পর্যন্ত লোকে লোকারন্য। চেনা ওচেনা সবাই আসছে জানার জন্যে। একজনকে দেখলাম খাবার নিয়ে
এসে হাজির। রাত দশটার দিকে আমাদের পরিচিত ও প্রতিবেশি কয়েক জন হিন্দু পরিবার আসল ] দেখলাম তারা বেশ চিন্তিত। জগন্নাথ হলের আক্রমন নিয়ে তারা আতঙ্কিত। একটি কথাই আমাদের বলল হিন্দুদের উপর
আক্রোশ বেশি। আমিও তাদের কথায় সায় দিলাম।  তারা আরো চিন্তিত হয়ে গেল। জানলাম ময়মনসিংহ স্বাধীন। মেজর শাফিউল্লাহ ময়মনসিংহের দায়িত্বে।

খাওয়া দাওয়া সেরে আব্বা মার সাথে কথা বলে বিছানায় চলে গেলাম। ভাই ও বোনদের মধ্যে এক ভাই কুমিল্লায় আর এক বোন রংপুরে। তাদের কোন খোজ নেই। ঘুম আসছিল না [ বার বার মনে আসছে ঢাকায় ফেলে
আসা ভাইবোন এবং বন্ধুদের করহা । এছাড়াও গত তিনদিনের যাত্রা। মানুষের একাত্ততা এবং আথিথেয়তা। গত তিন দিন লোকজন আমাদের যে ভাবে সাহায্য ও আথিথেয়তা করেছে তা ভুলবার নয়। এই তিন দিনে
অনেক কিছুই হতে পারত। মনে হল লোকজনই আমাদের পৌছে দিয়েছে। মানুযের মাঝে এত একতা। স্বাধীনতা ছাড়া আর বিকল্প নাই। এখন পাকিন্তানকে  পরাজিত করে দেশ মুক্ত করতে হবে।

 শাহ হাবিবুর রহমান, সিপিএ

সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০১৭ )