হলি আর্টিজান থেকে আজিমপুর
নিউজ-বাংলা ডেস্ক   
বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০১৭
কিশোর জঙ্গী  ॥ তাহরীমের জবানবন্দীতে জঙ্গী জীবনের পুরো কাহিনী

বাংলাদেশের ইতিহাসে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ ও বেকারিতে স্মরণকালের ভয়াবহ আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে মাইলস্টোন স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্র আত্মঘাতী কিশোর জঙ্গী তাহরীম কাদেরী। তার জবানবন্দীতে প্রকাশ পেয়েছে হামলার নেটওয়ার্ক সম্পর্কিত নানা তথ্য। গত বছরের ১ জুলাই ওই হামলায় জঙ্গীরা দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও সতের জন বিদেশী ও তিন নারীসহ মোট ২২ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যার দায় স্বীকার করে ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের নামে বিবৃতি প্রকাশিত হয়। তাহরীম কাদেরীর জবানবন্দীতে সেছাড়াও তার মা, তার যমজ ভাই ও পিতার আত্মঘাতী জঙ্গী হওয়ার কাহিনীও প্রকাশ পেয়েছে। জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়ার কারণে পিতা তানভীর কাদেরী পুলিশের হাত থেকে গ্রেফতার এড়াতে আত্মহত্যা করেন। আর মা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এখন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী। আর একমাত্র ভাইয়ের কোন হদিস নেই। জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর তাহরীম কাদেরীও এখন কিশোর কারাগারে বন্দী। অথচ সুখী সুন্দর সচ্ছল জীবনযাপন ছিল তাদের। দৈনিক জনকণ্ঠের কাছে একাধিক জঙ্গীর ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দীর কপি রয়েছে। তার মধ্যে রাজধানীর আজিমপুর থেকে গ্রেফতারকৃত কিশোর আত্মঘাতী জঙ্গী তাহরীম কাদেরীর জবানবন্দীতে ওঠে এসেছে বহু বিষয়।

হলি আর্টিজানের ঘটনার পর সারাদেশে চলমান সাঁড়াশি অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট রাজধানীর আজিমপুরের লালবাগ সড়কের ২০৯/৫ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালায়। অভিযানের সময় আত্মহত্যা করে নব্য জেএমবির আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্য তানভীর কাদেরী। গ্রেফতার হয় তার স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা আশা ওরফে খাদিজা ও তার ছেলে তাহরীম কাদেরী ওরফে আবির ওরফে রাসেল ওরফে অনিক ওরফে মুয়াজ ওরফে ইসমাইল, পলাতক নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা জামান ওরফে বাসারুজ্জামান ওরফে চকলেটের স্ত্রী শায়লা আফরিন ও গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার মাস্টারমাইন্ড নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি। ইতোমধ্যেই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নুরুল ইসলাম মারজান, তামিম চৌধুরী ও মেজর জাহিদসহ অনেক জঙ্গী নিহত হয়েছে। আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া তিন শিশুকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আজিমপুর থেকে এক বছরের শিশুপুত্র নিয়ে পালিয়ে যায় মেজর মুরাদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা। গ্রেফতারকৃত তিন নারী ও এক কিশোর সবাই নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য।

গ্রেফতারকৃত আবেদাতুল ফাতেমা এক মাস পর গত বছরের ১০ অক্টোবর ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক মোঃ নূর নবীর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন। এর আগে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর আশার ছেলে আজিমপুরের আস্তানা থেকে গ্রেফতারকৃত আত্মঘাতী কিশোর জঙ্গী তাহরীম কাদেরী ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক মোহাঃ আহ্সান হাবীবের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়।

জবানবন্দীতে তাহরীম কাদেরী (১৪) জানায়, আমার প্রকৃত নাম তাহরীম কাদেরী আবির। আমার সাংগঠনিক নাম রাসেল ওরফে অনিক ওরফে মুয়াজ ওরফে ইসমাইল। আমি উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল এ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আমার আফিফ কাদেরী আদর (পরবর্তীতে রাজধানীর আশকোনায় জঙ্গী আস্তানায় পুলিশের অভিযানকালে নিহত) নামে একজন যমজ ভাই আছে। সেও জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আফিফের সাংগঠনিক নাম নাবিল। সেও আমার সঙ্গে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল এ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। আমরা রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর ৬তলা বাড়ির চতুর্থ তলায় অবস্থিত বি/৩ নম্বর ফ্ল্যাটের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলাম।

আমার পিতার নাম তানভীর কাদেরী। তিনি জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তার পিতার সাংগঠনিক নাম জামশেদ ওরফে আব্দুর করিম ওরফে তৌসিফ আহম্মেদ ওরফে সিপার। ঢাকা কলেজ থেকে এমএ পাশ। আমার পিতা পেশাগত জীবনে ডাচ বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং, রবি ও কল্লোল গ্রুপে চাকরি করতেন। চাকরি ছেড়ে উত্তরায় আস-সাকিনা নামক প্রতিষ্ঠান খুলে হোম ডেলিভারি ব্যবসা শুরু করেন।

আমার মায়ের নাম আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে আশা। মা জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। মায়ের সাংগঠনিক নাম খাদিজা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস। মা সেভ দি চিলড্রেন ও মুসলিম এইডে চাকরি করেছেন। আমরা ছিলাম খুবই সুখী পরিবার।

২০১৪ সালে পিতামাতা হজ করে ফেরেন। তারপর থেকেই দু’জনের আচার আচরণ পরিবর্তিত হতে থাকে। আমরা উত্তরার বাসায় থাকতাম। মেজর জাহিদ (বন্দুকযুদ্ধে নিহত) ও মাইনুল হাসান ওরফে মূসার (গুলশান হামলা মামলার অন্যতম পলাতক আসামি) সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই পিতার পরিচয় ছিল। তারা একত্রে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি মসজিদে নামাজ পড়তেন। এছাড়া আব্বু, মেজর জাহিদ ও মূসা উত্তরার লাইফ স্কুলের মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। এরপর হাঁটতেন।

পিতার মাধ্যমে মেজর জাহিদ ও মূসা আংকেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি ও আমার যমজ ভাই আদর লাইফ স্কুলের মসজিদে আছরের নামাজ পড়তাম। এরপর মূসা আংকেলকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতাম। তিনি আমাদের দুই ভাইকে অংক, ইংরেজী ও সাইন্সের বিষয়গুলো পড়াতেন। আমাদের বাসায় মেজর জাহিদের সঙ্গে রাশেদ ওরফে র‌্যাশ আসতেন।

এক রাতে হজের পর আব্বু স্বপ্নে দেখেন এক মরুভূমির মধ্যে তিনি অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আব্বু স্বপ্নের বিষয়টি নিয়ে একজন হুজুরের সঙ্গে কথা বলেন। ওই হুজুর স্বপ্নের কথা কাউকে বলতে নিষেধ করেন। পরবর্তীতে উত্তরা বাসা থেকে হিজরত করার পর আমরা জানতে পারি মেজর জাহিদ প্রথমে আব্বুকে জিহাদ করার ব্যাপারে প্রথম দাওয়াত দিয়েছিলেন।

মেজর জাহিদ, তার স্ত্রী ও মেয়ে জুনায়রা ওরফে পিংকি এবং স্ত্রীসহ মূসা প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। মেজর জাহিদের বাসা উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরেই ছিল। তাদের বাসায়ও আমরা ছাড়াও স্ত্রী নিয়ে মূসা আংকেল যাতায়াত করতেন।

২০১৬ সালের এপ্রিলে আমরা উত্তরা থেকে প্রথম হিজরত করি। প্রথমে আম্মু রাজি ছিল না। পরে একদিন হঠাৎ রাজি হয়। পরে আমরা মালয়েশিয়া যাবার কথা বলে বের হই। হিজরতের আগে প্রায়ই আব্বু বলতেন, আমরা যেখানে যাব, যেখানে হয়ত বন জঙ্গল বা আমাদের আবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হবে। হিজরতের পর আমরা রাজধানীর পল্লবী আফিফাদের পাঁচতলা বাড়ির চতুর্থ তলায় বসবাস শুরু করি। হিজরতের আগে আমরা উত্তরার বাসায় পিতামাতা ও আমরা দুই ভাই বায়াত (খেলাফতের জন্য আনুগত্য) নেই। এই বলে বায়াত নেই ‘আমরা এই খলিফার কাছে বায়াত দিলাম। তার আনুগত্য করব ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে কুফরী না দেখা যায়’। আমরা আমাদের পিতার হাতে হাত রেখে বায়াত নেই।

পল্লবীর বাসায় থাকার সময় বাসারুজ্জামান চকলেট, মূসা ও রাশেদ ওরফে র‌্যাশ আসত। র‌্যাশকে উত্তরার বাসা থেকে চিনতাম। র‌্যাশ পল্লবীর বাসায় থাকার সময় বাসারুজ্জামান ও কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গী আকিফুজ্জামানের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। কল্যাণপুরের অপারেশনের দিন আব্বুকে বলেছিলাম, এরা আমাদের ভাই নাকি? তখন আব্বু বলেছিল হ্যাঁ।

মূসা আংকেলের বয়স ৩৮ বছরের মত। মুখে দাঁড়ি। স্বাস্থ্য মাঝারি। দেখতে শ্যামলা। সে শার্ট প্যান্ট পরে। মূসা, চকলেট ও র‌্যাশ প্রায়ই আমাদের বাসায় আব্বুর সঙ্গে জিহাদ, ইমান, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। তারা প্রায়ই আমাদের বাসায় যাতায়াত করতেন। তারা সিরিয়ার যুদ্ধের ভিডিও দিতেন। আমরা দেখতাম। দাবিক ম্যাগজিন পড়তে দিত। দাবিক ম্যাগাজিনের কয়েকটা বাংলাতেও ছিল।

রমজানের সময় র‌্যাশ আব্বুকে পল্লবীর বাসার পাশাপাশি অন্য জায়গায় বাসা নিতে বলেন। তাদের কথামতো আব্বু বসুন্ধরায় বাসা নেন। টেনামেন্ট-৩ নম্বর বাড়ির ৬তলার এ/৬ নম্বর ফ্ল্যাটে উঠি। বাসাটি এ্যাপোলো হাসপাতালের পাশে। ওই বাড়িতে ওঠার ৮/১০ দিন পর চকলেট, প্রথমে দুই জন এরপর তিনজনকে নিয়ে ওই বাসায় যান। এই পাঁচজনের সাংগঠনিক নাম ছিল সাদ, মামুন, উমর, আলিফ ও শুভ। এর কয়েকদিন পর তামিম চৌধুরী ও মারজান ওই বাসায় যান। একই দিন জাহাঙ্গীর, তার স্ত্রী, তার ছেলে শুভ এবং হৃদয় আংকেল চকলেট আংকেলের সঙ্গে ওই বাড়িতে যান।

জাহাঙ্গীর আংকেল তার সঙ্গে গল্প করত। গল্প করতে করতে বলেছিল, সে দুইটি ডাকাতি করেছে। যার কাছ থেকে টাকা নিত তাকে আহত করত। ডাকাতি, ছিনতাই করা টাকা সংগঠন চালানোর জন্য দিত। একদিন তামিম, মারজান ও চকলেট তাদের বাসায় ব্যাগ নিয়ে যায়। ব্যাগ ভর্তি অস্ত্র ছিল। তামিম, সাদ, মামুন, উমর, আলিফ ও শুভ ওই বাসাতেই থাকত। তারা বাইরে বের হতো না। দরজা লাগিয়ে কথাবার্তা বলত।

বাসায় ৪টি বেডরুমসহ মোট ৭টি রুম ছিল। তামিমসহ ৫ জন এক রুমে থাকত। আমি, আমার ভাই আদর ও আব্বু ড্রইং রুমে থাকতাম। আম্মু ও শুভর এক রুমে থাকত। এদের মধ্যে আলিফ ও উমর অনেক অপারেশন করেছে বলে তার কাছে গল্প করত। এ দু’জন কুষ্টিয়ায় একজন খিস্টান বা হিন্দুকে মেরে রক্তমাখা প্যান্ট খুলে পালিয়ে আসে বলে গল্প করেছিল। তারা আমাদের জিহাদের কথা বলত। তারা ট্রেনিং নিয়েছে বলে জানায়।

আংকেলরা জানায়, তারা একটি বড় অপারেশন করবে। তবে কি ঘটাবে তা গুলশান হামলার আগে জানতাম না। হলি আর্টিজানে যেদিন হামলা হয়, সেদিন বিকেল পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার দিকে সাদ, মামুন, উমর, আলিফ ও শুভ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হয়। তারা বের হওয়ার সময় আমাদের সঙ্গে কোলাকুলি করে বলে, ‘জান্নাতে গিয়ে দেখা হবে ইনশাল্লাহ’।

পাঁচজন বের হওয়ার পর তামিম আর চকলেট বের হয়ে যান। যাওয়ার সময় চকলেট আংকেল আব্বুকে দ্রুত বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। এমনকি সন্ধ্যার আগেই চলে যাওয়ার কথা বলেন। এর ২/১ দিন আগে জাহাঙ্গীর আংকেল তার পরিবার ও হৃদয় আংকেল বের হয়ে যান।

আমরা ইফতার করে ব্যাগে কাপড়-চোপড় নিয়ে দ্রুত ট্যাক্সিক্যাবে করে পল্লবীর বাসায় চলে আসি। পল্লবীর বাসায় গিয়ে আব্বু খুব দুশ্চিন্তা করছিলেন। বলছিলেন, এতক্ষণ হয়ে গেল অথচ কোন নিউজ পাচ্ছি না। আব্বু আমাদের বলে, দোয়া কর যেন ওরা ধরা না পড়ে এবং ভাল একটা অপারেশন যাতে হয়। আব্বু আমাদের বেশি বেশি ইফতেগফার করতে বলেন। কিছুক্ষণ পর আমি বিডি নিউজে দেখতে পাই, হলি আর্টিজানে গোলাগুলি হচ্ছে। তখন বুঝতে পারি, হলি আর্টিজানে অপারেশন হচ্ছে। সকাল পর্যন্ত নিউজ দেখলাম। সকালে অপারেশনকারীদের ছবি প্রকাশিত হয়। আব্বু আমাদের বলেন, অনেক ভাল অপারেশন হয়েছে এবং তোমার ভাইয়েরা শহীদ হয়েছেন। তখন আমরা সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলি।

পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়ায় অপারেশনকারীদের ছবি প্রকাশিত হয়। ওই সময় জানতে পারি সাদ হচ্ছে মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র নিবরাস ইসলাম, মামুন হচ্ছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, উমর এর আসল নাম খায়রুল ইসলাম পায়েল বাঁধন, আলিফের প্রকৃত নাম শফিউল ইসলাম উজ্জ্বল ও শুভর মূল নাম স্কলাসটিকার ছাত্র মীর সালেহ মোবাশ্বের।

হলি আর্টিজানের পর আমরা খুবই খুশি ছিলাম। কয়েক দিন পর র‌্যাশ জানায়, চকলেটকে পাওয়া যাচ্ছে না। র‌্যাশ দ্রুত আমাদের বাসা পরিবর্তনের কথা বলেন। এরপর আমরা রূপনগরে চলে যাই। আব্বুকে আজিমপুরে বাসা ভাড়া নিতে বলা হয়। এমনকি দুই বাসায়ই থাকতে বলা হয়। ১ আগস্ট (গতবছর) আমরা আজিমপুরের বাসায় আসি। এরপর থেকে দুই বাসাতেই থাকতাম। কয়েকদিনের মধ্যে রূপনগরের বাসায় যাতায়াত বন্ধ করে আজিমপুরের বাসাতেই বসবাস শুরু করি। স্ত্রীসহ মারজান এবং স্ত্রীসহ চকলেট আমাদের আজিমপুরের বাসায় যাতায়াত করতেন।

নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় অপারেশনের পর (পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তামিম আহমেদ চৌধুরী দুই সহযোগীসহ নিহত হন) মেজর জাহিদ ব্যাগসহ আমাদের বাসায় আসে। সে জানায়, নারায়ণগঞ্জের অপারেশনের সময় একজন পালিয়েছে। এরপর থেকে মেজর জাহিদ ও তার স্ত্রী পিংকি তাদের বাসায়ই থাকত। রূপনগরে যেদিন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জাহিদ আংকেল মারা যান, সেদিনই তিনি বাসা থেকে সন্ধ্যার আগে বেরিয়ে ওই বাসায় গিয়েছিলেন। তারা যথারীতি আজিমপুরের বাসাতেই বসবাস করতে থাকেন।

গত ১০ অক্টোবর (গতবছর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাসায় কারা যেন দরজায় নক করে। আমি ঘরের ভেতর থেকে দরজার বাইরে দেখা যাওয়ার জন্য দরজায় লাগানো কাচ দিয়ে দেখি অনেক লোক। আব্বুকে বলার পর তিনিও দেখেন। এরপর আব্বু আম্মুকে একটি পিস্তল ও একটি বটি হাতে দেন। দিয়ে বলেন, কাছে রাখো। আব্বু বাইরের লোকদের পরিচয় জানতে চান। তারা পুলিশ বলে জানান। আব্বু পুলিশের পরিচয়পত্র দেখতে চান। পুলিশ বাইর থেকে পরিচয়পত্র দেখায়। আব্বু দরজা খোলে।

পুলিশ দেরিতে দরজা খোলার কারণ জানতে চায়। তারা পরিবারের সবাইকে একত্রিত হওয়ার জন্য বলেন। তারা আমার নাম জিজ্ঞাসা করলে আমি রাসেল বলে পরিচয় দেই। আব্বুর নিজেকে জামশেদ বলে পরিচয় দেয়। পুলিশ আব্বুর মোবাইল নিয়ে নেয়। পিংকির নামও জানতে চায় পুলিশ। পুলিশ পুরো বাসায় তল্লাশি চালাতে চায়।

এ সময় আব্বু ডানদিকের একটি কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ ধরে ফেলে। আমি পুলিশকে ধাক্কা দেই। এ সময় প্রিয়তি আন্টি চাকু দিয়ে একজন পুলিশকে আঘাত করে। আমিও চাকু দিয়ে এক পুলিশকে আহত করি।

পরে তিন পুলিশ আমাকে ধরে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে যায়। পুলিশ বের হওয়া মাত্রই আব্বু রুমের দরজা লাগিয়ে দেন। তখন পুলিশ আমাদের কাছে অস্ত্র আছে বলে জোরে জোরে বলতে থাকে। পুলিশ দরজা ভেঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আব্বু বের হয়ে বটি দিয়ে এদিক ওদিক ঘুরাতে থাকে। তখন পুলিশ আমাকে আব্বুর সামনে ধরে। আব্বু আমার গলায় বটি ধরে। আমি আব্বুকে বলি, আমার লাগছে। তখন আব্বু বলে, মরলে শহীদ হবা। না মরলে আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দেবে।

এ সময় এক পুলিশ আমাকে বারান্দায় নিয়ে যায়। এরই মধ্যে আম্মু ও আন্টিরা মরিচের গুঁড়ো পুলিশের দিকে ছিটিয়ে দেয়। পুলিশ তোশক দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। পরে অনেক গোলাগুলি হয়। খবর পেয়ে অনেক পুলিশ সেখানে যায়। তারা দরজা ভেঙ্গে আমাকে এবং আমার সঙ্গে থাকা পুলিশদের উদ্ধার করে। আমাকে উদ্ধার করার সময় আব্বুকে গলাকাটা রক্তাক্ত অবস্থায় রুমে পড়ে থাকতে দেখি। প্রিয়তি আন্টি ও আম্মুকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। আব্বু সম্ভবত আত্মহত্যা করেন। কারণ আব্বু আমাদের আগেই বলেছিল, আমি যদি কোন সময় ধরা পড়ি, তখন সুইসাইড করব। পুলিশ আমাদের বাসা থেকে চারটি পিস্তল ও গুলিসহ অন্যান্য জিনিসপত্র উদ্ধার করে। আজিমপুরের বাসায় আমার যমজ ভাই আফিফ কাদেরী আদর আমাদের সঙ্গে থাকত না। আব্বু তাকে রাজধানীর রূপনগরের বাসা থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। তবে কোথায় পাঠিয়েছিল তা জানি না।
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ ২০১৭ )