রংখেলা
শুভজিৎ বসাক, কলকাতা   
মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ ২০১৭
বাইরে সবাই ব্যস্ত দোলের রং মাখতে।একমাত্র সোমালী নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে কাজে।ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটা ওর প্রথম দোল বিয়ের পরে।একটা মেয়ের সাধ তার বরের থেকে রং মেখে বিয়ের পরে দোলযাত্রা শুরু করে,অথচ সোমালী সেক্ষেত্রে সাবলীল এবং নিরুত্তাপ। জীবনে প্রথম ভালবাসা কোনও মানুষই ভুলতে পারে না। ভোলা সম্ভবও নয়।তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে জীবনে প্রথম প্রেমে পড়েছিল সে ঋজুর।বন্ধুরা বলত প্রথম প্রেমে পড়লে নাকি উন্মত্ততার শেষ থাকে না।অথচ সোমালীর ক্ষেত্রে সেসব বালাই ছিল না।সে উন্মত্ততাকে প্রশ্রয় না দিয়ে মন বুঝতে আর ঋজু এবং নিজের মনের মেলবন্ধন কিভাবে সম্ভব তাতে জোর দিয়েছিল।ঋজুটাও পাগলা গোছের ছেলে।একটু বাচ্চা স্বভাবের সে।তাই শরীরী প্রেমের থেকে সোমালীর মত সেও সাধারণ মন বুঝতে তৎপর ছিল।চারাগাছও একটা সময়ে বড় হয়।তার ডালপালা জন্মায় আরও এবং জীবনের প্রথম পাতাদুটোও একটা সময়ে ঝেরে ফেলে দেয় ঐ বাড়ন্ত চারাগাছ।সেবারে ঋজুর ভীষণ জ্বর হয়েছিল এবং ঋজুর বাড়ি বেশ স্বচ্ছল ছিল না।বাবা বন্ধ কারখানার মজুর,ঘরেই থাকেন এখন।আর মা ঝিয়ের কাজ করে ঘর চালায়।বড় হতে নিজে কিছু টিউশানী করে ঘর চালায় ও সংসারে সাহায্য করে ঋজু।সোমালী সে তুলনায় সামান্য বেশী স্বচ্ছল তার থেকে।ঋজুকে একদিন কলেজে ডাকে সে এবং জ্বর কমলে সে যায়।সোমালী বেশ কিছু ফল-হর্লিক্স কিনে দেয় ঋজুকে।ঋজু অভিমান করে সেগুলো নিতে কিন্তু সোমালী বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাকে সেগুলো নিতে বাধ্য করায়।ঋজুর মাথায় কি যেন একটা মতলব খেলে যায়।সে হাত ধরে সোমালীকে নিয়ে যায় তার কলোনীর পাশের বস্তিতে।সেখানে তারা যেতেই কিছু বুড়ি-বাচ্ছা ছেয়ে ধরে তাকে।তখন সে তাদের শান্ত করে বলে, "আজ তোমাদের জন্য এই দিদি ফল আর হর্লিক্স এনেছে দেখো।তোমরা কষ্ট পাও এখানে,আমি তো করি তোমাদের জন্য,আজ এই দিদি তোমাদের যা দেবে বলো ভাগ করে নেবে?" সবাই হ্যাঁ বলে চেঁচিয়ে উঠল।ঋজুকে প্রথম দিনও দেখেছিল সোমালী একটা রাস্তার বাচ্চার সর্দিতে নিজের রুমাল বের করে তার নাক-মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে।একজন বাধা দিলে তাকে সে বলে, "এভাবে থাকলে নাকের সর্দি আর রাস্তার ধূলো মিশে তাদের কত রোগ ছড়াতে পারে জানিস? সেই রোগ আমাদের মধ্যেও যে ছড়াবে না কে বলতে পারে!" চুপ করে গিয়েছিল সেই বন্ধু।আর তাকে পরিষ্কার করে সেই রুমালটি তাকে দিয়ে আসে ঋজু।সোমালীর মেয়েমানুষী মন ঋজুকে চিনে নেয়।যদিও ঋজু ছোট তার থেকে দেড় বছরের তবুও কথাবার্তা,আলাপচারিতায় ভালবেসে ফেলে তাকে।কলেজ পাশ করে একটা কাজে ঢুকেও নিয়মিত খবর রাখত,দেখা করত সোমালী তার সাথে।বিপত্তি ঘটল ঐ বস্তিতে গিয়ে।সোমালীর বাবা PWD অফিসার এবং মেয়েকে ঐ ছেলেটির সাথে হাত ধরে আসতে দেখে তিনি সন্দেহ করেন।সোমালীর খেয়াল ছিল না যে তার বাবার অফিসটি এখানেই।তখন মেয়েকে তিনি কিছু বললেন না।এদিকে সোমালী ঐ ফল-হর্লিক্স ওদের দেয় এবং তারা ভাগ করে নিজেদের মধ্যে খায়।ঋজুর মত ছেলের কছু নেই তবু ওর আত্মমর্যাদা,মানুষের কাছে ওর গ্রহণযোগ্যতা সোমালীকে আরও দুর্বল করে দেয় তার প্রতি।
ঘরে এলে সোমালীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিষয়ে তার বাবা জানতে চাইলে সে অবাক হয় এবং বাবার ওপরে যেহেতু কথা বলেনি তাই পাসবইটা এনে দেয়।যা মায়না তার সাথে মজুত টাকার সামঞ্জস্য খুঁজে না পেয়ে বাবা রেগে তাকে টাকা কিভাবে ওড়াচ্ছে তা বলে অপমানিত করে।সোমালী মাথা নিচু করে অপ্রস্তুত সময়ের জন্য সবটা শুনে গেল।এরপর বাবার গাড়ি করে সে কাজে যেত আর আসত।একমাসের মাথায় ঠিক হল তার বিয়ে।পাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী কেন্দ্রীয় সরকারী ইঞ্জিনিয়ার।বাবা-মায়ের ওপর কথা না বলেই নিজেকে বলি দিল সে।বসল বিয়ের পিড়িতে পঁচিশ বছর বয়সী সোমালী কোনও দোষ না করে সামান্য একটু সরল মনকে ভালবেসে।সে চেয়েছিল আরও একটু পরে বিয়ে করতে।শুনল না পরিবার।ছাদনাতলায় পরিপাটী সাজে,কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সিঁদুর তুলল অপছন্দের কারও হাত থেকে।কাঁদল না বিদায়ের দিনও সোমালী।যেন মনে হয় সব চোখের জল জমে ঠান্ডা বরফ হয়ে গিয়েছে তার মধ্যে এবং সেই বরফ তাকে স্থির ও ঠান্ডা রেখেছে।
বিয়ের পরে এটা প্রথম দোল সোমালীর।সে ইচ্ছে করেই দোলের দিনও নিজের কাজের দিন বেছে নিয়েছে।যদিও অফিসে বেশী কেউ নেই তবুও সে এল।বেলা বাড়তে দাঁড়ালো দশতলা অফিসের কাঁচের জানলার পাশে।রাস্তায় সবাই রং মেখে ভূত হয়ে গিয়েছে।মনে পড়ল ঋজুও প্রথম দোলে কি এক বেখেয়ালে তার মাথা আর সিঁথি বরাবর লাল আবীরে ভরিয়ে দিয়েছিল আর সেদিন থেকেই সে ঋজুকে স্বামী হিসাবে মেনে এসেছে।এখন সে নিজেই মনে মনে নিজেকে সহ্য করতে পারে না।মজবুর হয়ে সে যেন সহবাস করছে বিত্তবান বরের সাথে।চোখ ভরে ওঠে সোমালীর।খবরের কাগজটা নিজের টেবিলে গিয়ে খুলে বসে সে।অবাক হয়ে যায় খবরটা পড়ে। "নিজের জীবনের প্রথম মাইনে দিয়ে রং চড়ালেন বস্তিতে ঋজু"-শিরোনামটা পড়ে চমকে গেল সে।পড়ে দেখল তাতে লেখা আছে- "সফ্টওয়্যার কোম্পানীতে কাজ পেয়ে জীবনের প্রথম মাইনে বস্তিতে রং খেলে দোল উদযাপন করলেন ঋজু"।আর কিছু পড়তে হল না সোমালীকে।ঋজু যে সরল-সহজ আর সে যে দাম্ভিক নয় তা আবারও বোঝালো নিজের কাজ দিয়ে।একজন মেয়ে একবারই কারোও স্ত্রী হয় এবং মন থেকে তাকেই মেনে নেয়,তাই ঋজুর জন্য গর্বিত পরস্ত্রী হয়ে নয়,ঋজুর আসল স্ত্রী হয়ে।দোল এতক্ষণ ছিল ম্যাড়ম্যাড়ে,কিন্তু খবরটা তাকে মুখে হাসি ফোটালো।সিঁথির সিঁদুর থেকে সামান্য সিঁদুর আঙ্গুল দিয়ে তুলে ঋজুর ছবিতে মাখালো সে।সাদা-কালো ছবিটা রাঙা আবীরে ভরল সে।ঋজু থাকুক এভাবে আন জগতে সেটাই মন থেকে চায় সোমালী।বসন্তের ফাল্গুনী হাওয়ার মত খবরটা সোমালীকে যে কি অক্সিজেন দিল তা একজন স্ত্রী ছাড়া কারও পক্ষেই বোধহয় ব্যাখা করা সম্ভব নয়,বসন্তও সেখানে ব্যর্থ বোধহয়।
সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ ২০১৭ )