আশ্চর্যের এক অনন্য রূপ
মোহা. আশরাফুর রহমান, জাপান থেকে   
রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩

            

সময়টা  শরতের মাঝামাঝি। কয়েকদিন  হলো মাত্র দেশ থেকে এসেছি। মনটা তাই বিষণ্ন এবং বিক্ষিপ্ত। দেশের ভাদ্র মাসের গরমের অস্বস্তিকর অনুভূতি এখনো ভুলতে পারিনি। তার মধ্যে আবার এখানকার কয়রকদিন  ধরে বিচ্ছিরি গরম। একদম  হাঁপিয়ে উঠার মতো অবস্থা।

যখন এই গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার অপেক্ষায় আছি তখন কেই বা জানতো প্রায় ৯০ কিমি দূরে প্রকৃতির নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা সারি সারি বড় গাছ, কখনো লাল আবার কখনো সবুজ উঁচু শান্ত পাহাড়। তার বুক চিরে বয়ে চলা ঝরনা কিংবা কিছুক্ষণ পর পর অযত্নে বেড়ে ওঠা জংলি প্রাণিগুলোর কখনো একা আবার কখনো দলবেঁধে রাস্তা পারাপারের দৃশ্য অবলোকন। এ সব আমার মনকে টেনে নিয়ে যাবে প্রকৃতির সুশীতল তলে। এনে দিবে মনে নির্মল স্বস্তি। অনেকটা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেন মনের মণিকোঠায় অবস্থানরত স্নায়ুগুলো যেন বার বার অনুরণিত হচ্ছিল। আমার শহর থেকে প্রায় ৯০ কিমি উত্তরে তাকায়ামার কথা বলছি। উদ্দেশ্য ল্যাবসদস্যদের নিয়ে ব্রেনস্টমিং করা অতপর প্রকৃতিকে উপভোগ করা। কিছুটা একঘেঁয়েমি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই প্রফেসরের এই ভিন্ন উদ্যোগ। প্রায় দুই ঘন্টা পর সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে এমন সময়ে আমরা পৌঁছলাম। মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম একটু আগে পৌঁছাতে পারলে হয়তো আশপাশে ঘুরে দেখা যেত। কিন্তু সেটা আশায় গুড়ে বালি। যাহোক, প্রায় মধ্য রাত পর্যন্ত চলল ব্রেনস্টমিং পর্ব। শেষে সবাই যখন নিজ নিজ কামরায় যেতে ব্যস্ত তখন আমার বাইরে যাবার জন্য তর সহ্য হচ্ছিল না। পাহাড়ে আছড়ে পড়া ঝরনার পানির ঘর্ষণ থেকে উদ্ভুত নান্দনিক শব্দে আমার কর্ণকহরে বারবার আন্দোলিত করছিল। সেই শব্দের উৎস দেখার জন্য আমি এগিয়ে যেতে থাকলাম। কোনো ভয়ই আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি। প্রায় মিনিট দশেক হাঁটার পর আমি সেই কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছলাম। দিনের বেলায় ঝরনাকে আমি দেখেছি কিন্তু রাতে ঝরনাকে পাহাড়ের ওপর এভাবে আছড়ে পড়ে প্রচন্ড শব্দ করতে দেখিনি।

ক্ষণিকের জন্য মনে হলো রাত্রিবেলা একেবারে সুনসান এই নিরিবিলি জায়গাটাকে মাতিয়ে রাখাটাই এই ঝরনার কাজ। এর বিশাল গর্জন অথবা দূর থেকে ভেসে আসা বন্য প্রাণীর অদ্ভুত ডাক সত্যি আমাকে মোহিত করেছিল। রাত গভীরতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আমার রোমাঞ্চকর যাত্রা। হঠাৎ করে এক অদ্ভুত বাড়ি খেয়াল করলাম। কিছুটা মঙ্গোলীয় ধরনের। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই এক বৃদ্ধাকে দেখতে পেলাম। বোঝা যাচ্ছিল এত রাতে আমাকে দেখতে পেয়ে উনি বোধ হয় খুবই বিরক্ত হয়েছেন। আমি দুঃখিত বলতেই উনি আমাকে ভেতরে যেতে বললেন।

বৃদ্ধা দেখতে খাটো, একটু কুজো, মাথা ভর্তি সাদা চুল, একটু লিকলিকে, মুখে অসংখ্য ভাজ। কৌতূহল আটকিয়ে রাখতে না পেরে বয়স জিজ্ঞাসা করতেই তিনি যে অঙ্কটা বললেন সেটা প্রায় আমার ভিমড়ি খাবার মতো। একশ পাঁচ বছরের বৃদ্ধা, তার উপর একা বসবাস করেন। এই বয়সেও সপ্তাহে অন্তত দুবার পাহাড়ে যান। ওখান থেকে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করেন আবার কখনো কখনো বন্য প্রাণী শিকার করেন। আমি আমার দেশের মানুষের গড় বয়সের কথা বলতেই উনি হাসিতে ফেটে পড়লেন। এত কম বয়সে আমরা মারা যাই শুনে উনি মৃত আত্মার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করলেন। আমি কোথায় উঠেছি জানতে চাইলেন। উত্তর দিতেই উনি বললেন ওই বাড়িটি প্রায় ১৪০ বছরের পুরনো। শুনে আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। বৃদ্ধা বললেন তাঁর বাড়িটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। বৃদ্ধা বললেন এখন অনেক রাত হয়েছে, সময় থাকলে কালকে সকালে যেন একবার আসি। আমি উঠতেই উনি টর্চ বাতি নিয়ে হাজির আমাকে পৌঁছে দেবার জন্য। মনে হলো এখন আমার বয়স বোধহয় তাঁর চেয়ে বেশি। এই ভেবে একটু অপমান বোধ করলাম।

নিজের রুমে ফিরে আসার পর ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। খালি পায়ে বেরিয়ে পরলাম। কচিঘাসের ওপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতে খুব ভালো লাগছিল। হঠাৎ করে বাবার কথা মনে পড়ল। শীতের সব ছুটিতে যখন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম তখন বাবা বলতেন খালি পায়ে শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের ওপর হাঁটলে নাকি ঠান্ডা লাগে না। এতে নাকি মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের পাতায় জমে থাকা শিশিরের বিন্দুর ওপর ভোরের সূর্যের আলোর প্রতিফলিত রূপের প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া আমাকে নতুন করে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর ওই বৃদ্ধার ঘরে হাজির হলাম। বৃদ্ধা খুব খুশি হলেন। আমাকে প্রায় অবাক করে দিয়ে তিনি নাস্তা নিয়ে হাজির হলেন। আমি এখনো জাপানিজ খাবারে অভ্যস্থ হতে পারিনি। কিন্তু না খেলে তিনি মন খারাপ করবেন ভেবে খেতে রাজি হলাম। বৃদ্ধার অনেক গল্প শুনলাম। বিশেষ করে তাঁর স্বামীর কথা। তাঁরা নিঃসন্তান দম্পতি ছিলেন। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তাঁর বাড়িতে আমি ছাড়া আর কোনো মানুষ আসেনি। আমি প্রায় আঁতকে উঠলাম কিভাবে উনি বেঁচে আছেন। মানুষের বেঁচে থাকার কি অদ্ভুত শক্তি ভাবতেই বিস্ময় লাগল। বৃদ্ধার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুমে ফিরে এলাম।

যখন ফিরলাম সবাই তখন ব্যাগ গুছাতে ব্যস্ত। আমিও তাদের দলে সামিল হলাম। কিছুক্ষণ পর প্রফেসর বললেন, এখন আমরা ব্যাগগুলো গাড়িতে রেখে শিকারে বের হব। সাইকে কিছু না কিছু শিকার করতে হবে। শিকারের জন্য পর্যাপ্ত রসদও পাওয়া গেল। আমি মাছ শিকারে বের হলাম। যদিও আমি পুরোপুরি অসফল হলাম কিন্তু অন্যদের শিকার করা মাছ কিংবা বন্য প্রাণী খেতে ভুললাম না। দুপুরে ঝলসানো খাবার খেতে অসাধারণ লাগছিল। বিশেষ করে ইউনা মাছের তুলনা হয় না। এর স্বাদ এখনো জিহ্বায় লেগে আছে। দুপুরের খাবারের পরেই গাড়িযোগে চলে গেলাম অদ্ভূত এক নদী মিয়াগাওয়ার প্রায় ৩০ মিটার নিচে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা সুড়ঙ্গ দেখতে। আমি তো ভাবতেই পারছিলাম না নদীর নিচে কিভাবে সুড়ঙ্গ আসলো। কি অদ্ভূত? জানতে পারলাম প্রায় এক হাজার বছর ধরে সম্পূর্ণভাবে মানুষের ছোয়া ছড়াই ক্রমাগতভাবে এই সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছে। ভেতরে এতো ঠান্ডা আর এতো অন্ধকার সত্যি আমাকে ভাদ্র বা শরতের গরম বা কটকটা রোদের কথা একদম ভুলিয়ে দিয়েছে।

এদিকে সূর্যের আলো প্রায় হেলে পড়েছে। ফিরে যাচ্ছি সেই পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে। আসার সময় পাহাড়গুলো আমাকে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছিল, তখন বোধ হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল মনখারাপ করে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। খুব খারাপ লাগছিল ফিরে যেতে। কিন্তু যেতে হবে। তবে আবার ফিরে আসব—এই কথাটিই মনের অজান্তে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল। আরও মনে হতে লাগলো ওই বৃদ্ধার একাকিত্ব জীবন আর শান্ত পাহাড়ের একাকিত্বর মধ্যে কোনো অমিল নেই।

মোহা. আশরাফুর রহমান

(এম.ফার্ম. ঢাবি)

পিএইচডি স্টুডেন্ট

তয়ামা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

সর্বশেষ আপডেট ( সোমবার, ১৪ জুলাই ২০১৪ )