| হুমায়ূননামা - দুর্ভাগ্যের অসহায় বাদশা |
|
| আশরাফ আহমেদ, ম্যারীল্যান্ড থেকে | |
| শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১২ | |
|
শিরোনামটি হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, “নন্দিত নরক” থেকে নেয়া। লেখক মারা যাওয়ার পর তাঁর কবর কোথায় দেয়া হবে তা নিয়ে মতানৈক্যের কথা সবাই জানি। ইদানিং আবার তাঁর সাড়ে তিন শতাধিক বই, অর্ধ ডজন সিনেমা, শতাধিক নাটক, টেলিফিল্ম এবং ঢাকা সহ সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্থাবর সম্পত্তি, বিশেষ করে নুহাস পল্লীর মালিকানা নিয়ে পারিবারিক কলহের সম্ভাবনা নিয়েও লেখা হচ্ছে। সাতদিন অপেক্ষা করে করে আমরা দেখলাম যেখানে তিনি চাননি, ঠিক সেই নুহাস পল্লীতেই তাঁর কবর হয়েছে। চল্লিশ দিন খোলা থাকার পর কবরটি ভক্তদের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কেউ কেউ সেই আশঙ্কা করছেন! অথচ এটা হওয়ার কথা ছিলনা! কিন্তু হয়েছে। প্রশ্ন হোল কেন হয়েছে? হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার হয়েছিল। শুনেছি নিউইয়র্কের ডাক্তাররা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন এখনই সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে তিনি আরো তিন-চার বৎসর বাঁচতে পারবেন। অর্থাৎ তিনি জানতেন তাঁর আয়ু অত্যন্ত সীমিত। তা জেনেও তিনি কেন নিজের কবর কোথায় হবে বা রেখে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার কে হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন দলিল রেখে যাননি? প্রশ্নটি এই জন্যই উঠছে যে তিনি সাধারণ কোন মানুষ ছিলেন না। তাঁর মেধা, শিক্ষা, পরিবেশ, এবং সাহচর্য তাঁকে অসাধারণত্ব দিয়েছিল। সর্বোপরি মানব চরিত্রের দোষত্রুটি দেখতে ও বুঝতে পারার ক্ষমতা যে অসীম ছিল তা তাঁর অসংখ্য লেখনী ও নাটক-সিনেমার মাঝে সে স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সেইসব লেখা ও সৃষ্টির মাঝেই তিনি কিছু কিছু ঘটনা বা চরিত্র রহস্যের মোড়কে মুড়ে দিয়ে পাঠকের চিন্তার খোরাক হিসেবে রেখে গেছেন। তেমনি নিজের মৃত্যুর মাঝেও জীবন নাটকের পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী কিছু রেখে গেছেন কি? প্রৌঢ়ত্বের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে “সবাই গেছে বনে” বই এর আমিন সাহেব যে মুহুর্তে উপলব্ধি করলেন যে তাঁর মৃত্যু নিকটবর্তী, ঠিক তখনই তিনি গৃহবধু স্ত্রীকে তাঁর অবর্তমানে আমেরিকার সমাজে একা, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। শিশু-কৈশোর কাটানো “অচিনপুর” গ্রামে নিজ নানাজানের আদলে (আমার ধারণা) সৃষ্ট সরফরাজ খান চরিত্রটি তাঁর মৃত্যুর নিকটবর্তিতা আগাম ঘোষণা করেই, কবরের যায়গা ঠিক করে দামি কাফনের কাপড় ও কবর পাকা করার ইট আনিয়ে রেখেছিলেন। আর দুয়ারে বিড়ালের বেশে নিজ মৃত্যুদূতকে দেখতে পেয়েছিলেন বলে বৈজ্ঞানিক মহামান্য ফিহা পৃ্থিবীকে “তোমাদের জন্য ভালবাসা”য় মহাজাগতিক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অঙ্ক কষে যাচ্ছিলেন। কৃ্তজ্ঞতাসরূপ পৃ্থিবীর মানুষ ফিহা’র মৃতদেহটিকে স্বচ্ছ বাক্সের ভেতর শুইয়ে তা একটি কৃ্ত্রিম উপগ্রহ দিয়ে এড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে পাঠিয়ে দিয়েছিল। লক্ষ কোটি মাইল দূর থেকে আজো আমরা “নক্ষত্রের রাত” এলেই তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। হূমায়ূন আহমেদ কি ভেবেছিলেন যে বাংলা সাহিত্যে অবদানের কথা স্মরণ করে আমরা নিজ থেকেই তাঁর দেহটিকে এড্রোমিডায় না হোক, কাঁচের বাক্সে পুরে চাঁদে পাঠিয়ে দেবো? আর সব “...রুপালী রাত্রি”র ‘ঘর পালানো জ্যোৎস্না’য় চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকবো যেমনটি তাঁর হিমু সবসময়েই করতো? তাই যদি মনে থেকে থাকতো তবে তিনি ভুল করেছিলেন। মনুষ্যত্বের সৌন্দর্যে মুগ্ধ থাকায় মানুষের অন্য রূপটিকে বড় করে দেখতে ফুসরত তাঁর হয়নি। অথচ মালিকের অবর্তমানে ‘অচিনপুরের’ রহিম শেখের একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে কখনো কখনো জিতে যাওয়ার কাহিনিতো তিনিই আমাদের শুনিয়ে গেছেন। “বহুব্রীহি” নাটকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে “তুই রাজাকার” গালি শেখানোর পরও কি রাজাকারদের বিচার নির্বিঘ্ন করতে পেরেছেন? “জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প” বইতে সুবিধাবাদী রাজাকার-সাংবাদিক-কবি কলিমুল্লাহ ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে অবলীলায় স্ত্রীর লাল ও সবুজ শাড়ি কেটে, বাংলাদেশের পতাকা বানিয়ে খুব সহজেই দেশপ্রেমিক (মুক্তিযোদ্ধা) বনে যাবার উদাহরণ তিনিই রেখে গেছেন। তারপরও কি তিনি কল্পনা করতে পারেননি যে তাঁর মৃত্যুর পর আমরাও আমাদের অবস্থান বদল করতে পারি? তাঁর “লেখায় গভীরতা নেই”, “লেখা পড়তে ঘরে লুঙ্গি পরে থাকার মত আরাম, কিন্তু তা নিয়ে বাইরে ড্রয়িং রুমে যাওয়া যায়না” এইসব অপবাদ বেঁচে থাকতেই শুনতে হয়েছিল তাঁরই মত অন্যান্য লেখকের মুখে। মৃত্যুর পরও যে প্রিয়জনরা অনাকাংখিত কিছু ঘটাতে পারে তা কি তিনি একটুও আঁচ করতে পারেননি? তাঁর মৃত্যু-আলোচনার স্রোতে যেহেতু কোন ভাটা পড়ছেনা, কয়েকদিন থেকে মনে হচ্ছে শুধু আঁচ নয়, তিনি খুব ভাল করেই জানতেন যে নিজ অবর্তমানে তাঁকে নিয়ে কি কি ঘটতে পারে। যেমন মৃত্যুর কয়েকমাস আগে একটি ইণ্টারভিউতে তিনি বলছিলেন তেরোই নভেম্বর ও একুশে ফেব্রুয়ারীতে তাঁর কবরটি গুলিস্তান এর মত লক্ষ মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে। নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে কি ঘটতে যাচ্ছে তা হিমুর মত আলৌকিক শক্তিবলে তিনি প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর আগেই দেখেছিলেন। “নক্ষত্রের রাত” নাটকে দেখা যায়, শাওন অভিনীত বস্তি থেকে উঠে আসা বারো-তেরো বছর বয়সের চরিত্রটি ধীরে ধীরে তার থেকে তিন-চারগুণ বয়সের বড়, আসাদুজ্জামান নূর অভিনীত ‘হাসান ভাইয়ের’ ওপর মানসিকভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। একই সময়ে শাওনের বন্ধু, হুমায়ূন আহমেদের মেঝমেয়ে শীলা অভিনীত চরিত্রটিও ‘হাসান মামা’রূপী আসাদুজ্জামানকে “আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ” ধরণের শ্রদ্ধামাখা ভালবাসা জানিয়ে চিঠি শেষ করে। শুধু তাই নয়, মা সারা জাকের শীলার বয়সে নিজেও চাইতেন যেন তাঁর চেয়ে অনেক বড়, আবুল হায়াত অভিনীত দূর সম্পর্কের ‘ভাইজানের’ খুব জ্বর হয় কারণ সেই সুযোগে তিনি সেই প্রিয়জনের কপালে হাত রাখতে পারবেন! বহুবছর পরে ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদ কর্তৃক শাওনকে বিয়ে করার জীবন-নাটকের মধ্য দিয়ে এই কাহিনির একটি পর্বের সমাপ্তি হয়। এই নাটকের মা-মেয়ের জবাবদিহিতামূলক বাক্যালাপে আরো শুনতে পাই, ‘তুমি কেন বাবাকে ছেড়ে চলে এসেছো?’, ‘না আমি চলে আসিনি, তোমার বাবাই এক স্প্যানিশ মেয়েকে বিয়ে করে চলে গিয়েছে’। এই শেষ বাক্যালাপের প্রতিধ্বনি আমরা আবারো শুনতে পাই গুলতেকিনের জবানীতে (আমার ধারণা) এবছর প্রকাশিত “তালাক” নামক একটি অনুলিখন বইতে। “দারুচিনি দ্বীপ” বইতে বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কহীন যুবককে তার বাবা জীবনে ‘কি করলে কি ফল পাওয়া যাবে’ তার শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন ব্যকরণ বইয়ের সংজ্ঞা অনুযায়ী। ভবিষ্যৎদ্রষ্টার এরূপ উদাহরণ হয়েও তিনি কি কারণে নিজের কবর কোথায় ও কিভাবে হবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গেলেন না? অবস্থার পরিপাকে মনমানসিকতা বদলায় বলেই এযুগে যে শুধু মুখের কথায় কোন কাজ হয়না তা তো তিনি খুব ভাল করেই জা্নতেন। “হিমুর রুপালী রাত্রি”তে খালুজান তাই খালার জ্ঞানের বাইরে ইয়াকুব নামের এক লোককে মালিবাগের বাড়ি আর দশলক্ষ টাকা উকিল সাক্ষী করে উইল লিখে হঠাৎ করেই মরে গিয়েছিলেন। আবার “সবাই গেছে বনে” বইতে মৃত্যু হাতছানি দিচ্ছে বুঝতে পেরে আমিন সাহেব স্ত্রীকে রেখে যাওয়া সম্পদ দেয়ার ইচ্ছায় আগের উইল বদলে তাড়াতাড়ি নতুন উইল করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। তাহলে নিজের মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ছলনাটি হুমায়ূন আহমেদ কেন করলেন? নাটকীয়তা তিনি খুব পছন্দ করতেন, পছন্দ করতেন রহস্যময়তা। “নক্ষত্রের রাত” নাটকে সত্যবাদী হাসান ভাই আবলীলায় ‘ভাইয়া মারা গেছে’ এই একটি মিথ্যা অভিনয় করে নায়িকা শমী কায়সার অভিনীত মণিষাকে প্রচণ্ড দুঃখে অনেক্ষণ কাঁদালেন। সেই সাথে কাঁদালেন অগণিত দর্শককে। পরে বললেন “আমি এটা করলাম এই জন্যে যে আপনি যেন বুঝতে পারেন কোনটা আসল কষ্ট আর কোনটা মেকি কষ্ট”! তার ওপর রয়েছে অনেক নাটকের জনপ্রিয় চরিত্রকে কোন না কোন স্বাভাবিক উপায়ে মেরে ফেলা। এভাবে বাস্তবতাকে নিষ্ঠুরভাবে উপস্থাপন করতে হুমায়ূন আহমেদের মত নিখুঁত কারিগর আর ক’জন জন্মেছিলেন? তাহলে এও কি সম্ভব যে মানুষের চরিত্রের দুর্বলতা বুঝতে পারতেন বলেই মৃত্যু অত্যাসন্ন জেনেও নিজের কবরের স্থান এবং সম্পদের উত্তরাধিকার প্রশ্নে কোন লিখিত নির্দেশ তিনি রেখে যাননি? তাঁর মৃতদেহ নিয়ে টানাটানি হবে জেনেই কি তিনি কোন নির্দেশ দিয়ে যাননি? বেঁচে থাকতে তাঁর অসংখ্য লেখার মত নিজ মৃত্যুর পরও কি তিনি মানুষের মনের বিচিত্র অনুভুতির প্রকাশ দেখাতে চেয়েছিলেন? তাঁর সৃষ্ট মানবিক এবং অতিপ্রিয় চরিত্রকে জনমত উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি মেরে ফেলতেন, নিজেও কি একইভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেননি? না কি নাটকের সেই দুর্ভাগা চরিত্রগুলো সুযোগ পেয়ে তাদের সৃষ্টিকর্তার ওপর এবার প্রতিশোধ নিল? ৪ঠা আগষ্ট, ২০১২ মেরিল্যাণ্ড, আমেরিকা লেখকের পুরো নাম সৈয়দ আশরাফউদ্দিন আহমেদ, বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাজ্যে |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|
Comments
RSS feed for comments to this post