| বঙ্গমেলা ২০১২- ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও’-শীর্ষক সেমিনার |
|
| মোহম্মদ আশরাফ হোসেন, মেরীল্যান্ড | |
| সোমবার, ০৬ আগস্ট ২০১২ | |
|
জুলাই ১৪ অপরাহ্নে বঙ্গমেলা ২০১২- এর স্লোগান ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও’-শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় মহানন্দা মঞ্চে। এই সেমিনারে দুই বাংলার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ প্রতিনিধিত্ব করেন ও বিবিধ বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা দূর করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সভাটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ভয়েস অব আমেরিকা- ওয়াশিংটন ডিসি’র আনিস আহমেদ। বিথী চট্টোপাধ্যায় বলেন- বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারা ও আবিস্কার বাঁধ ভাঙ্গার পক্ষে সহায়ক; আর তাই বিজ্ঞানের কল্যাণে জীবনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। স্বল্প পরিসরে তা আলোচনা করা যায় না; তবে, জন্মনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কেননা এর মাধ্যমে পুরুষতন্ত্রের বাঁধ ভেঙ্গেছে বহুলাংশে। তিনি আরো বলেন, বাঁধ ভাঙ্গা দুঃসাধ্য একটি কাজ- অনেকটা মাস্তানদের মোকাবিলা করার মত। এ প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কথা আসে। তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে চাষী-জমিদার দ্বন্দ্ব উপজীব্য; অথচ অবলা বসুকে লেখা পত্রে জমিদারদের পক্ষ নিয়ে হীরের দামে কাঁচ কেনা যায় না- এমন মন্তব্য করেন রবীন্দ্রনাথ। বঙ্গভঙ্গ রদের পক্ষে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ কিনতু বিতর্কের ঊর্ধে যেতে পারেননি। ইকবাল বাহার চৌধুরী বাংলাদেশে সাংবাদিকতা, অভিনয় ছাড়াও ভয়েস অব আমেরিকা- ওয়াশিংটন ডিসি’তে দীর্ঘকাল কর্ম অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ বিশেষ অনকূল না হলেও আব্বাসউদ্দিন, জসিমউদ্দিন, কাজী নজরুল ইসলাম ও আরো অনেকের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মের বিশেষ জনপ্রিয়তা ছিল। রবীন্দ্র-চর্চাও ছিল- এমনকি ভারতের সাথে সীমিত সংস্কৃতি বিনিময়ও হতো। যেমন, শাবিস্তান মঞ্চে কলকাতার নাট্যদলের একাধিক পরিবেশনা হয়েছিল। তবে কুসংস্কারের বাঁধ ভাঙতে বেগম রোকেয়ার নারী শিক্ষা ও দ্বায়িত্ব সচেতনতার উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- বলে মন্তব্য করেন। নবকুমার বসু, ব্রিটেনের শল্য-চিকিৎসক আর প্রতিষ্ঠিত লেখক ও গল্পকার নিজের মত করে বাঁধ ভাঙ্গা’র অর্থ বিশ্লেষণ করে বলেন, ভাঙ্গন শব্দটির নেতিবাচক অর্থ থাকলেও তা বস্তুতঃ জোড়া লাগানোর প্রয়াস। তিনি বলেন- প্রতিবন্ধকতা সরানো প্রয়োজন ঐক্যের লক্ষ্যে। আর বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সামনে এগুনো; মনে রাখা প্রয়োজন- উপলক্ষ যেন লক্ষ্যকে অতিক্রম না করে। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ-এর ‘কাবুলীওয়ালা’ কিংবা সমরেশ বসুর ‘আদাব’ এর চরিত্র থেকে আমরা বুঝতে পারি মানুষকে ভালবাসতে হলে সংকীর্ণতা ছেড়ে হৃদয়ের কাছাকাছি আসতে হয়। নাশিদ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় টিভি অনুষ্ঠানের সম্প্রচার সম্প্রসারিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় না। হিন্দীর চাকচিক্ইয়ের কারণে ভারত ছাড়াও বাংলাদেশে বাংলা সংস্কৃতি আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তিনি বলেন, তাঁর পিতামহ আব্বাসউদ্দিন ও কাজী নজরল ইসলাম বন্ধু ছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আব্বাসউদ্দিন-এর উৎসাহে লেখা নজরুলের একটি ধর্মীয় গানের দু-লাইন গেয়ে শোনান। তিনি বলেন, ভারতের কিছু প্রদেশে একুশে ফেব্রুয়ারী পালিত হয় জেনে তিনি গর্বিত বোধ করেন। এছাড়া বাংলাদেশী শিল্পীদের পশ্চিমবঙ্গে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য টিভি চ্যানেল ‘তারা মিউজিক’-এর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। রোকেয়া হায়দার বাংলাদেশে বেতার-টিভিতে সবাদ পাঠিকা ছিলেন; বর্তমানে ভয়েস অব আমেরিকা- ওয়াশিংটন ডিসি’র বাংলা বিভাগের প্রধান। সংবাদ মাধ্যমে সুদীর্ঘ কর্ম অভিজ্ঞতা থেকে বলেন- বেতার ও টিভি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপন ও প্ররযালোচনার মাধ্যমে তথ্যের প্রসার ছাড়াও ভৌগলিক সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অজ্ঞতার বাঁধ ভাঙতে পারে। ১৯৭১-এ স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশীরা বহুলাংশে নির্ভর করেছে বাতার মাধ্যমের উপর। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের আসন লাভে বেতারের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এ প্রসঙ্গে সঞ্চালক প্রমিত বাংলা চর্চার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে আধুনিকতার নামে শুদ্ধ বাংলা চর্চা কমে যাচ্ছে। ইংরেজি ও হিন্দীর আদলে বাংলার ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনে এমনকি বেতার-টিভিতেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভাষার সুস্থতার পরিপন্থী। সেলিম শাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাংলা ভাষার পক্ষে সোচ্চার। তিনি বলেন- ক্ষেত্রবিশেষে বাঁধের প্রয়োজন থাকলেও শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসার ও পাঠক-দর্শকদের মন-মানসিকতার উন্নতির লক্ষ্যে উদ্যোক্তা ও সংস্কৃতি কর্মীদের যাতায়াত সহজ হওয়া দরকার। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার জন্য ভিসা সমস্যার বাঁধ ভাঙা প্রয়োজন। জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, প্রাক্তন বাংলাদেশ সরকারের আমলা ও বিশ্ব ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা, বলেন, বিভিন্ন সময়ে তিনি ভারত ভ্রমন করেছেন। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, কোলকাতার চৌরঙ্গীতে এখন বাংলা বই পাওয়া যায় না, আর সেজন্য যেতে হয় কলেজ স্ট্রীটে। আবার কলেজ স্ট্রীটে বাংলাদেশী লেখকের বই খুব একটা পাওয়া যায় না। তাঁর মতে সরকারী বাধার কারণেই এমন হয়। বানিজ্য ক্ষেত্রে ভারতের রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির উপর নির্ভরশীল। আর তা বহুলাংশে অসঙ্গতিপূর্ণ- আর তাই ভারতে বাংলাদেশী বই বিক্রী হয় না। ‘বাঁধ ভেঙ্গে দাও’-শীর্ষক সেমিনার থেকে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয়, খোলা মন, উদার মানসিকতা, আর পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতি, বানিজ্য ও অন্যান্য বিষয়ে অসঙ্গতি দূর করা সম্ভব। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সিলভার স্প্রিং, মেরীল্যান্ড |
|
| সর্বশেষ আপডেট ( শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১২ ) |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|