News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২৩ মে ২০১৩, বৃহস্পতিবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow ফিচার arrow মামা-ভাগ্নে উপাখ্যান
মামা-ভাগ্নে উপাখ্যান প্রিন্ট কর
সাবেদ সাথী   
সোমবার, ০৬ আগস্ট ২০১২

                               

“ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই।” -কবি জসীমউদ্দিনের সেই মামা বাড়ি মানেই মুক্ত স্বাধীন- আর মামার বাড়ির আবদার বলে কথা! আবার মামা ভাগ্নে যেখানে বিপদ নাই সেখানে। ‘মামাবাড়ি’ নাম শুনলেই মনের মধ্যে একটা রোমাঞ্চ অনুভূত হয়।

 পৃথিবীতে এমন স্বাধীন এবং মুক্ত জায়গা মনে হয় আর কোথাও নেই- যেখানে নেই কোনো শাসন- যেখানে খাওয়া-দাওয়া আর ঘুরাফেরা- কিন্তু ঘুরাফেরা সব যায়গায়ইতো করা যায়- কিন্তু ঐ যে মামার বাড়ির আবদার- এই আহলাদের স্বাধীন আবদার পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না- এবং ভাগ্নে যদি মামার কাছে আবদার করে থাকে- পৃথিবীর কোনো মামাই বিশেষ করে মামা যদি বাঙালি হন এবং সেই মামা যদি ভাগ্যক্রমে মুক্তিযোদ্ধা মামা হন- তাহলে সেই মামা ভাগ্নের আবদার ফেলতে পারবেন না- ভাগ্নের আবদার পূরণ না হয়ে যাবে কোথায়! তাই চলো সবাই মুক্ত স্বাধীন মামার বাড়ি বেড়াতে যাই।

আর তাইতো মামা বাড়ির মুক্ত-স্বাধীন আকর্ষণে মুক্তিযোদ্ধা মামার বাড়িতে- বুড়িগঙ্গা তীরের এক ভাগ্নী ছুটে এসেছেন আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে কানেকটিকাট নদীর কাছে রূপকথার স্বপ্নের দেশ ম্যানচেস্টারে। না, আমি কোনো রূপকথার কল্প-কাহিনী বলছিনা- এই ঘটনাটি রূপকথার মতো মনে হলেও- রূপকথা নয়- সত্যি ঘটনা। 

আদরের ভাগ্নী বুড়িগঙ্গার পার থেকে আটলান্টিক পাড়ের মুক্তিযোদ্ধা মামার কাছে ই-মেইল করছে, টেলিফোন করছে, টেক্সট মেসেজ পাঠাচ্ছে- মামা তুমি কবে আসবে- কতদিন দেখিনা! ভাগ্নীর উত্তরে মামা বলছেন- ‘এইতো সামার-এ আসবো’- ভাগ্নীর আনন্দ যে আর ধরে না- কিন্তু ‘এইতো সামার’ তো আর আসে না, এটা কেমন সামার সাত বৎসর হয়ে গেল ‘এইতো সামার’ আসতে আর কত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে! এই সামার কি কোনোদিন আসবে না! আসব আসব বলে মামার তবু আসা হয় না! অভিমানী ভাগ্নী বলে দিল তোমার আর আসতে হবে না মামা- এবার আমি নিজেই চলে আসবো মামা বাড়িতে- এবং মুক্তিযোদ্ধা মামাকে অবাক করে দিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দিয়ে একদিন হুট করে ভাগ্নী চলে আসলো- ব্র্যাডলি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে দূর থেকে মামাকে দেখে মামা! মামা! বলে চিৎকার করে লাগেজ-ব্যাগ ফেলে দিয়ে দৌড়ে মামার কাছে এগিয়ে এসে পায়ে ধরে সালাম করেই জড়িয়ে ধরে বলল, মামা তুমি কেমন আছ! -কাঁদছে মামা, কাঁদছে ভাগ্নে- মামা-ভাগ্নীর কান্ড দেখে বিমানবন্দরে উপস্থিত আশেপাশের অনেকেরই চোখ ভেজে আসে
 এবং অনেকেই সেল ফোনের ক্যামেরায় এই দুর্লভ মুহূর্তটি ক্যামেরা বন্দি করে রাখেন। ভাগ্নীকে পেয়ে মামা আনন্দে আত্মহারা- কতদিনের কত না বলা কথা জমে আছে মামা-ভাগ্নীর। 

কিন্তু কে এই মামা ভক্ত ভাগ্নী কী তার পরিচয়? -বুড়িগঙ্গা পাড়ের আদরের ভাগ্নী হলেন- ইশরাত নাসিমা হাবিব পুনম ওরফে আন্না পুনম। তুখর মেধাবী ছাত্রী পুনম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে মাস্টার ডিগ্রি নিয়েছেন এবং পরে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড এবং এমএড ডিগ্রি নিয়েছেন। বিদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। বর্তমানে থানা (ঢাকা মিরপুর জোন) শিক্ষা অফিসার হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে কর্মরত আছেন। লেখালেখি করে থাকেন- বোধের দায় থেকে লেখার চেষ্টা করেন। পুনমের মোট পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলা একাডেমির বইমেলায় তার সবগুলো বইয়েরই ভাল কাটতি ছিল। খুব শিঘ্রই ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে তার আরেকটি বই বের হচ্ছে। যৌথ সম্পাদনা ‘এই আলো’। পুনমের লেখা অন্যান্য বই- অনুবাদ গ্রন্থ শিশুতোষ গল্প মিঃ ম্যাজাইকা(২০০৯), ছড়ার বই ‘ছড়া হাসে ছড়া ভাসে’(২০১০), TWINKLE TWINKLE LITLE STAR (২০১১), ‘দুপুরের গল্প’ (২০১২), কাব্যগ্রন্থ ‘নেফারতিতির গান’ (২০১০)। তার স্বামী ডা. মোস্তফা মজুমদার একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তাদের একমাত্র কন্যা পিয়েতা তাসনিম ওয়াশিংটনে পড়ালেখা করছে। পুনমের বাবা মো. হাবিবুল্লাহ সচিবালয়ের যুগ্ন-সচিব হিসেবে অবসর নিয়েছেন। বাবার লেখা ইতালির ভ্রমণকাহিনী নিয়ে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। বাবা মহকুমা অফিসার এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক থাকা অবস্থায় পুনমের বাংলাদেশের অনেক জেলা ভ্রমণ করার এবং অনেক স্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। পুনমের মা সালেহা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী থাকা অবস্থায়ই ‘বেগম’ পত্রিকায় লেখালেখি করতেন- কিংবদন্তির কবি হেলাল হাফিজ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ছিলেন। পুনমের দাদা ছিলেন একটি সরকারি স্কুলের আদর্শবান প্রধান শিক্ষক। পুনমের নানা ছিলেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকোশলী। রুপোর চামচ মুখে নিয়ে আদরের পুনম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঢাকার কলাবাগান লেকসার্কাস ডলফিনের গলি- নানার বাড়িতে।

ঢাকার কলাবাগান লেকসার্কাস ডলফিন-এর গলির সেই ঐতিহাসিক বাড়ি- যেখানে একই বাড়িতে মামা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ এবং ভাগ্নী পুনম জন্মগ্রহণ করেছিলেন- এবং এই বাড়িতেই ’৭১-এর ২৩ মার্চ কিশোর ফারুক ওয়াহিদ বাংলাদেশের স্বর্ণালি মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের নতুন পতাকা উড়িয়েছিলেন।

 একাত্তরের স্বর্ণালি মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের নতুন পতাকা

 যে মামার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মামা-ভক্ত পুনম আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছেন- কে সেই কাঙ্ক্ষিত মামা? কীই বা তার পরিচয়? পুনমের সেই ‍প্রিয় মামা হলেন কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের গ্রামীণ আমেজে গড়া স্বপ্নের শহর ম্যানচেস্টার-এর বাসিন্দা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ। মামা ফারুক ওয়াহিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার ডিগ্রি লাভ করেন। পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি করে থাকেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই লেখালেখি শুরু করেন- তবে তাঁর লেখালেখির বিষয়বস্তু বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং বাঙালি তথা বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কিত- তাই পুনমের মামা ফারুক ওয়াহিদ সবসময় গর্ব করে বলেন, আমি একটুও নিরপেক্ষ নই- আমি একশত ভাগ মক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক এবং একশতভাগ খাঁটি বাঙালি- এতে কেউ কিছু মনে করলে আমার কিছুই আসে যায় না।  তাঁর অগনিত ছাত্র-ছাত্রী দেশে-বিদেশে নানান ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ‘এখন যৌবন যার ‍যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’- কিন্তু না, যৌবনে নয় কৈশোরেই কিশোর ফারুক ওয়াহিদ স্বাধীনতার ডাকে জীবন বাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং কলম ছুঁড়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তুলে নেন। প্রথমে আগরতলায় ও পরে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচর-এর লোহারবন ট্রেনিং ক্যাম্পে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে গেরিলা যুদ্ধের সশস্ত্র ট্রেনিং নিয়ে ২ নং সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ও মেজর হায়দার-এর অধীনে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধে আহতও হন।

 ’৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ

 গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মানীসহ এ্যাওয়ার্ড (award) প্রদান করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সসম্মানিত করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি বিএনপি-জামাত জোট সরকার মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ এর রাষ্ট্রীয় সম্মানী এবং এ্যাওয়ার্ড অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তখন তাকে জানায় ‘উপরের নির্দেশে’ এটা হয়েছে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে এই ‘উপরওয়ালা’ অনেক শক্তিশালী কিন্তু অদৃশ্যমান। তখন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ একান্ত বাধ্য হয়ে এই শক্তিশালী ‘উপরওয়ালা’র চেয়েও আরো মহাশক্তিশালী উপরওয়ালার স্মরণাপন্ন হন- অর্থাৎ তিনি তখন In the Supreme Court of Bangladesh-এর High Court Division-এ এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রীট পিটিশন করেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মহামান্য আদালত সবকিছু যাচাই করে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ-এর মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের রাষ্ট্রীয় সম্মান, রাষ্ট্রীয় এ্যাওয়ার্ড (award) এবং রাষ্ট্রীয় সম্মানী হালনাগাদ করে সসম্মানে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ফারুক ওয়াহিদের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। মহামান্য আদালতের এই রায়ে

মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ অত্যন্ত খুশি ও আশাবাদী হয়ে বলেন, আসলে বাংলাদেশে এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি- তাই বাংলাদেশটা এখনও টিকে আছে এবং ইনশাল্লাহ্ পৃথিবীর মানচিত্রে টিকে থাকবে- কারণ এদেশের স্বাধীনতা রক্ত দিয়ে কেনা- স্বাধীনতার জন্য এত রক্ত পৃথিবীর কোনো জাতি দেয়নি- আমি বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখি। পুনমের মামী শাহিনা করিম রিনি ম্যানেজমেন্ট-এ অনার্সসহ মাস্টারর্স করেছেন- ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং তিনিও একশত ভাগ মনে প্রাণে বাঙালি এবং একশত ভাগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক।

ভাগ্নী পুনম বার্তা সংস্থা বাংলা প্রেস’র এই প্রতিবেদককে রূপকথার মত সত্যি গল্প শোনান এবং তিনি  জানান, পুনমের রত্নগর্ভা নানী দশ মাস দশ দিন বাংলাদেশের মানচিত্রকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন- পুনম বললেন, আমি কিন্তু কোনো রূপকথার গল্প বলছিনা- সত্যি সত্যি আমার নানী বাংলাদেশের মানচিত্রকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন! পুনমের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বলি, আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না। উত্তরে পুনম বলে, কেন আমিতো বাংলায়ই বলছি। আমি বলি প্লিজ একটু বুঝিয়ে বলুন না। পুনম বলল আমার মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ মামা তাঁর শরীরে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন অর্থাৎ যেটাকে আমরা মায়ের পেটের জন্মের চিহ্ন বলে থাকি বা জন্মদাগ বলে থাকি। পুনম বললেন, জানেন আমার মনে হয় বাংলাদেশের ১৬ কোটি লোকের মধ্যে শুধু একজন এবং একজনই বাংলদেশের মানচিত্র নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন- তিনি হলেন আমার মুক্তিযোদ্ধা ফারুক মামা- তা ছাড়া ‘ওয়াহিদ’ অর্থইতো ‘এক’ তাই আমিতো একজনের কথাই বলছি। পুনমের কথা শুনে অবাক হয়ে যাই একি বলছে পুনম! পুনম এই প্রতিবেদককে আরো বললো- আমার এই মামা শুধু মামাই নন- আমার শিক্ষকও। পুনম বললো- জানেন আমি ক্লাসে হায়েস্ট নাম্বার পেতাম কিন্তু আমার মামা আধা নাম্বার কেটে আমাকে সবসময় সেকেন্ড হায়েস্ট বানিয়ে দিত- একবার এরজন্য ক্লাসে প্রতিবাদ করাতে মামা হুঙ্কার দিয়ে বললেন, এটা কি মামার বাড়ির আবদার পেয়েছো? উত্তরে আমি বলি মামাইতো- এতে ক্লাসে সবাই হো হো করে হেসে উঠে। মামা রেগে বলেন, এখানে এসব মামা-টামা চলবে না। পুনম বলল, আচ্ছা বলুনতো লিটারেচার এর কথা না হয় বাদই দিলাম কিন্তু বাংলা গ্রামার যদি শুদ্ধ হয় তাহলে কারো বাবার শক্তি আছে নাম্বার কাটার? তারপরও আমার মামা যে কোনো একটা অযুহাত দেখিয়ে আধা নাম্বার কেটে দিয়ে আমাকে সেকেন্ড হায়েস্ট বানিয়ে দিত। মামা একটু হেসে শুধু বলতো ‘এখন বুঝবি না’- এই ‘এখন বুঝবি না’ কথাটার অর্থ শতচেষ্টা করেও তখন বুঝি নাই- কিন্তু এখন লেখালেখির জগতে এসে ‘এখন বুঝবি না’ কথাটার অর্থ এতদিনে ঠিকই বুঝতে পারছি।

বাংলা প্রেস’র এই প্রতিবেদক ভাগ্নী পুনমের কাছ থেকে অনেক বিস্ময়কর কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধা মামা ফারুক ওয়াহিদের মুখোমুখি স্মরণাপন্ন হয়ে তাঁর শরীরে অঙ্কিত জন্মদাগ তথা বাংলাদেশের মানচিত্রের কথা দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করি- এটা কী করে সম্ভব হলো? উত্তরে ফারুক মামা বলেন- আমি সেটা কীভাবে বলবো? যেই মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং আমাকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন সেই মা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে তাঁকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন। আমিতো সেন্স হওয়ার পর থেকে আমার শরীরে বাংলাদেশের মানচিত্র দেখে আসছি- এটা কী করে হল আমি কী করে বলবো! মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের লোহারবন টেনিং সেন্টারে খালি গা খালি পা শুধু একটা হাফপেন্ট পড়তে দিত- তখন আমাদের ওস্তাদ অর্থাৎ শিখ সৈন্যরা আমার শরীরের বাংলাদেশের মানচিত্রটি দেখে ফেললে তখন তারা আমাকে খুশি হয়ে একটি খেতাব দিয়েছিল- ‘জয় বাংলা কা সাচ্চা আদমী’। ট্রেনিংয়ের সময় ভুল ভ্রান্তি হলে অনেক সময় তারা আমাদেরকে কঠিন শাস্তি দিত- কিন্তু এই মানচিত্রের জন্যই তারা খুশি হয়ে আমাকে কঠিন

 শাস্তি থেকে মাঝে মাঝে রক্ষা করে লঘু শাস্তি দিত।

‘পুনম এলো মামাবাড়ি ম্যানচেস্টার শহরে’ এই শিরোনামের ব্যানারে পুনম-এর সম্মানার্থে এক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয় এবং সেখানে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম শিল্পী কৌশলী ইমা। কৌশলী ইমা শুভসন্ধ্যা বলে পুনমের ম্যানচেস্টার তথা মামার বাড়ি আগমন উপলক্ষে সুস্বাগতম জানিয়ে বলেন, “পুনম তুমি এমন এক মামার বাড়িতে এসেছো- যে মামারা কিংবদন্তি তুল্য- যে মামারা বারবার আসেন না- তারা শুধু একবারের জন্য এ বসুন্ধরায় আসেন- শুধু একবারের জন্য। ওরে পুনম- ‘যে মামারা একাত্তরে ধরেছিলেন অস্ত্র, তুই চোখের জলে সেই মামারই ভিজাইল বস্ত্র।’ বছরের পর বছর কত মামা যাবে আসবে কিন্তু এই মামাদের স্মৃতি সবসময় মনে থাকবে। আগরতলার একটি ঘটনা নিয়ে তোমার মামার অশ্রু দিয়ে লেখাকে আমি গানে রূপ ‍দিয়েছি- আমি আজ সেটা গেয়ে শুনাব”- এই বক্তব্য দিয়ে কৌশলী ইমা ‘আগরতলার মাসি’ গানটি গেয়ে শোনান। গানটি পরিবেশনের সময় পুনমের চোখ ছলছল করছিল। এরপর প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশকে উপহার দেওয়া একটি গান- যে গানটি প্রতুল মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশে যখন এসেছিলেন তখন গেয়েছিলেন- কৌশলী ইমা আরো জানালেন গানটি একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া- ভারত তথা পশ্চিম বঙ্গ, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া এমনকি মধ্যপ্রাচ্য অর্থাৎ পৃথিবীর আর কোথাও একবারের জন্যও কোনো অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়নি। কৌশলী ইমা প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে গানটি শুরু করেন-

“দুইজনায় বাঙালি ছিলাম দেখো দেখি কান্ড খান,

তুমি এখন বাংলাদেশি আমারে কও ইন্ডিয়ান।

দুঃখ কিছু ছিল মনে দুঃখেরে কই যাওরে ভাই,

সাঝঁ বেলায় আদরের ডাকে কেমনে বলো মুখ ফিরাই … ।”

গানটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে গানপ্রিয় পুনম বলে বসলো- এই গান আপনি কোথায় পেলেন? কত গান শুনি এই ধরণের এত সুন্দর গানতো কোনোদিন শুনি নাই! উত্তরে কৌশলী বলল, ঘটনাতো আমি একটু আগেই বলেছি- আজ ১৫ জুলাই ’১২ রোববার দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের এই গানটির জন্য- আমি এখন এই উত্তর আমেরিকায় যেখানে যে অনুষ্ঠানে এই গানটি পরিবেশন করি না কেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তোমার কথাও বলব- কারণ তোমাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য এই প্রথম গানটি গাওয়া হল- যেটা বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও গাওয়া হয়নি। আর এই দুর্লভ গানটি কোথায় পেলাম? এই দুর্লভ গানটি সংগ্রহে আর কার থাকতে পারে? গানটি তোমার ফারুক মামাই তাঁর দুর্লভ সংগ্রহ থেকে প্রিয় শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়েরে এই গানটি উপহার হিসেবে আমাকে দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম শিল্পী কৌশলী ইমা মুক্তিযুদ্ধের উপর গাওয়া তার নিজের গানের সিডি এ্যালবাম উপহার দিচ্ছেন ভাগ্নী পুনমকে- ছবি: বাংলা প্রেস

এরপর গাওয়া হয়- ‘বাপ মরেছে একাত্তরে’ এবং তারপর ‘আমার রক্তে গড়া বাংলাদেশ’ এরপর ‘আমার সাধের গণতন্ত্র’। কিছুক্ষণের জন্য বিরতি। বিরতির সময় ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’ রবীন্দ্র সঙ্গীতটি স্পিকারে বেজে উঠার সাথে সাখে ভাগ্নী পুনম এবং কৌশলী ইমা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন- আর কোনোদিন হয়তো দেখা নাওতো হতে পারে এই ভেবে!

মুক্তিযুদ্ধের উপর গাওয়া গানে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে পুনম তারই লেখা ‘নেফারতিতির গান’ নামক কাব্যগ্রন্থ উপহার দিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম শিল্পী কৌশলী ইমাকে- ছবি বাংলা প্রেস

বিরতির পর গাওয়া হয় ‘আমার সাধের গণতন্ত্র’ এরপর ‘এখন সবার মুখ ফোটে কারো বুক ফোটে না’ এবং আরো কয়েকটি গান। তবে একটি গান পুনমের মনে বেশি দাগ কেটেছে- গানটি ভাল লাগায় পুনমের অনুরোধে সবশেষে ‘আমার রক্তে গড়া বাংলা

 

Comments  

 
#1 RE: মামা-ভাগ্নে উপাখ্যানannapunam 2012-08-09 10:05
Ai anuvuty vashay prokash kora jay na....
Quote
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates