| হুমায়ুন আহমেদ : সাহিত্যে অনবদ্য চরিত্র নির্মাতা |
|
| আনিস আহমেদ, | |
| সোমবার, ৩০ জুলাই ২০১২ | |
|
এক. হুমায়ুন আহমেদ লিখছেন চারদশক ধরে কিন্তু পরিহাসের বিষয় সাহিত্যের অন্দরমহলে যাঁরা উদয়াস্ত নান্দনিক বিশ্লেষণে ব্যতিব্যস্ত থাকেন এবং সাহিত্য-কর্মটিকে যাঁরা ধ্রুপদী মাপকাঠিতে বিচার বিশ্লেষণ করে রায় প্রদানের চেষ্টা করেন , তাঁদের দৃষ্টি কাড়তে পারেননি এই সব্যসাচী লেখক। তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস নিয়ে সাহিত্য-আলোচনা যে খুব বেশি একটা হয়েছে , সে কথা আমার জানা নেই, তাঁকে নিয়ে সাহিত্যধর্মী বইও লেখা হয়নি বোধ করি তেমন একটা । এ কথা অবশ্য প্রযোজ্য আমাদের অধিকাংশ শিল্পি সাহিত্যকদের ক্ষেত্রেই , যাঁদের সঠিক মূল্যায়নে আমাদের ব্যর্থতা আমাদেরকেই লজ্জিত করে। আজ যখন সর্বত্র শুনি হুমায়ুন আহমেদের জয়জয়কার , তখন নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয় এ কথা ভেবে যে আগে কেন লিখিনি তাঁকে নিয়ে যেমনটি লিখছি এখন। এখনতো কেবল আমাদের এই অক্ষমতার জন্য ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই । স্বীকার করতেই হবে যে পাঠক-প্রশংসিত এই লেখকের অবস্থান , সাহিত্যিক হিসেবে যেন অনেকটা প্রান্তিক; কেউ কেউ এ কথা বলেছেন যে হুমায়ুন আহমেদের সব লেখা সাহিত্যের মানদন্ডে উত্তীর্ণ নয়। কিন্তু এ কথাতো সত্যি সব লেখকের ক্ষেত্রেই। কোন একজন লেখকের সব লেখাই কী আর উচ্চাঙ্গের হয়েছে! কিন্তু সাহিত্যের যে শাব্দিক সংজ্ঞা , সেই যে সহিতের ভাব , পাঠকের সঙ্গে লেখকের , সেই সংজ্ঞায়তো হুমায়ুন আহমেদ উত্তীর্ণ হয়েছেন সেই কবে, নন্দিত নরকে কিংবা শঙ্খনীল কারাগার লেখার সেই প্রারম্ভিক যুগেই। তা সত্বেও হুমায়ুন আহমেদকে সাহিত্যিক হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দিতে কোথায় যেন এক ধরণের মৌলবাদি কার্পণ্য লক্ষ্য করি। দুই. হুমায়ুন আহমেদ অবশ্য এ সবকিছুকে তেমন একটা তোয়াক্কা করেননি। বরঞ্চ নিজের পৃথক পথ সন্ধান করেছেন অন্যত্র, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের কাছাকাছি পৌঁছেছেন আরও দ্রুত । তাঁর গল্প-উপন্যাস এবং নাটক ও চলচ্চিত্র পরস্পরের পরিপূরক হয়ে দেখা দিয়েছে এবং অতএব পাঠক ও দর্শক সেখানে একাকার হয়ে গেছেন। কিন্তু এই যে হুমায়ুন আহমেদ বিশুদ্ধ লেখালেখির পাশাপাশি নাটক ও চলচ্চিত্রেও নিজস্ব প্রতিভার ছাপ রাখলেন, তাতে তাঁর লেখাকে খাটো করে দেখার কোনই অবকাশ নেই। হুমায়ুন আহমেদকে , তাঁর মৃত্যুর পর সর্বত্রই সম্প্রতি নন্দিত লেখক বলে উল্লেখ করা হচ্ছে , সম্ভবত দুটি কারণে প্রথমত তিনি সত্যিই নন্দিত লেখক ছিলেন , ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে , আর দ্বিতীয়ত তাঁর নন্দিত নরকে উপন্যাসটির নাম থেকে যেন আমরা চট করে চুরি করে নিয়েছি এই নন্দিত শব্দটি। নন্দিত তিনি বটেই , সে প্রশংসিত অর্থে নয় শুধু বরঞ্চ কাকতালীয় ভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে নান্দনিক অর্থেও বটে। অথচ হুমায়ুন আহমেদকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ আলোচনাই তাঁর অসামান্য জনপ্রিয়তার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। তিনি যে জনপ্রিয় তাতে বিন্দুমাত্র ও সংশয়ের অবকাশ নেই কিন্তু সমান্তরালে এ কথাও সত্যি যে তিনি সাহিত্যের এক নিপুণ কারিগর। জনপ্রিয়তার কারণেই প্রধানত এ সময়কার আরেক সাহিত্যক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হুমায়ুন আহমেদের তূলনা করেছেন শরৎচন্দ্রের সঙ্গে। এই সরল রৈখিক তূলনাকে অতিক্রম করে গেছেন হুমায়ুন আহমেদ এবং বলতে দ্বিধা বোধ করিনা যে অন্তত দুটি দিক থেকে তিনি শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন , প্রথমত তাঁর চরিত্রের গভীরতা নির্মাণে এবং দ্বিতীয়ত তাঁর সুক্ষ রসবোধে। শরৎচন্দ্রে কাহিনীর বিস্তার আছে কিন্তু চরিত্রের সুক্ষ গভীরতা নেই এমনকী তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রদ্বয় দেবদাস এবং পার্বতীও মেলোড্রামাটিক হয়ে ওঠে আজকের পাঠকদের সামনে। দেবদাস-পার্বতীর বিচ্ছেদ বেদনায় আজকের তরুণ-তরুনীর চোখ কতটা ভিজবে জানিনা কিন্তু মন যে মজবে না , সেকথা বলাই বাহুল্য। বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশে বিচলিত হয়ে পড়েন ক্ষুদে পর্দার দর্শকরা। টেলিভিশন নামের সেই জাদুর বাক্স থেকে বাকের ভাই বেরিয়ে আসেন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে। কাহিনী নির্মাণে কিংবা চরিত্র-চিত্রণে শরৎচন্দ্র বৃত্তাবদ্ধ ছিলেন নিজের সময়ের মধ্যে । রবীন্দ্রনাথ সেই বৃত্তকে ভেঙ্গে বেরিয়ে এসছেন বলেই দেবদাস-পার্বতীর চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও বহুমাত্রিক অমিত এবং লাবণ্য। সত্যবটে হুমায়ুন আহমেদও বৃত্তাবদ্ধ অনেকখানি তাঁর নিজের যুগে , হয়ত আজি হতে শতবর্ষ পরে তাঁর বহু লেখাই বিস্মৃত হবে। তিন. তবে এ কথাও সত্যি যে তিনি তাঁর চরিত্র নির্মাণে কিছু সুক্ষ গভীরতাকে তুলে ধরেছেন, যা যেমন বাস্তব , তেমনি নান্দনিক ও বটে। হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্যের বহু চরিত্রই মনে হতে পারে কমিক চরিত্র , লোকিপ্রিয়তার কারণেই যেন তিনি সেগুলো নির্মাণ করেছেন কিন্তু বিষয়টি ঠিক তা নয়। আমরা যারা সাহিত্যিক নই তারা বুঝতেই পারি না যে মিসির আলী কিংবা বাকের ভাই অথবা আজকে জরির বিয়ে নাটকের চরিত্রগুলোর মতো মানুষ রয়েছে আমাদেরই চারপাশে। অতএব তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো বাহ্যত স্থূল মনে হলেও, মূলত সেগুলো সুক্ষ এবং অতি অবশ্যই বু্দ্ধিদীপ্ত। মানুষের স্বভাবের ভাল ও মন্দ দিকগুলিকে নিপুণ কারিগরের মতো সযত্নে নির্মাণ করেছেন এবং ইংরিজিতে যাকে বলা হয় idiosyncrasy এই বিষয়টিকে তিনি তুলে ধরেছেন স্পষ্ট করে। তাঁর চরিত্রগুলো নির্দিষ্ট বৈশিষ্টের অধিকারি , ঐ নির্দিষ্ট আচরণ ঐ বিশেষ চরিত্রে যেন পাঠকের জন্য প্রত্যাশিত সদর্থক ও নঞর্থক উভয় ভাবেই। চরিত্রের এই খুঁটিনাটি বিষয়টি তিনি যেন বিজ্ঞানির গবেষণার মতো আবিস্কার করেন নান্দনিক বৈশিষ্টে , রসায়নের এই অধ্যাপক যেন পৌছে যান চরিত্রের Chemistry তেও। সম্ভবত এ কারণেও তাঁর ধারাবাহিক নাটকগুলো কোন বিরক্তি সৃষ্টি করেনি কখনও , কাহিনীকে তিনি টেনে বিস্তৃত করেন না , কাহিনীর প্রয়োজনে চরিত্র নির্মিত হয় না হুমায়ুনে , চরিত্রের প্রয়োজনেই কাহিনী গড়ে ওঠে। আর রসবোধ , হুমায়ুনে কৌতুক নয় কেবল , চরিত্রেরই অবিচ্ছোদ্য বৈশিষ্ট যেন বা। অতএব বিস্তৃতি নয়, গভীরতাই হুমায়ুন আহমেদকে দিয়েছে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান। তাঁর জনপ্রিয়তার বহুল উচ্চারিত প্রসঙ্গে কিংবা তাঁর বহুমাত্রিক ভুমিকায় যেন তাঁর সাহিত্য প্রতিভাকে খর্ব না করি আমরা। লেখক পরিচিতি: আনিস আহমেদ: বর্তমানে ওয়াশিংটনে কর্মরত বেতার সাংবাদিক , প্রাক্তন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
| < পূর্বে | পরে > |
|---|