৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবস। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনের আয়োজন করে ব্রিটিশ উপনিবেশের শৃঙ্খল ছিঁড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে 'স্বাধীনতা ঘোষণা' করেন। যুক্তরারাষ্ট্র জুড়ে প্রতি বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ নেচে-গেয়ে, জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে, জাতীয় পতাকা উড়িয়ে, প্যারেড ও রাতে চোখ ঝলসানো আতশবাজির খেলায় আনন্দে কাটাবে বিশেষ এই দিনটিতে।
এ উপলক্ষে নিউইয়র্ক সিটির হাডসন নদীতের পাড়ে, ওয়াশিংটন ডিসি সংলগ্ন পটমেক নদীর ধারে, লাসভেগাস, ডিজনিওয়াল্ড, আটলান্টিক সিটিসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্র জূড়ে আতশবাজির বর্ণাঢ্য উৎসব হবে। সাম্প্রতিক ঝড়ের কারনে বৈদ্যুতিক অব্যবস্থার জন্য মেরিল্যান্ডে এবার অনুষ্ঠানিক ভাবে আতশবাজি উৎসব হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সংকট সত্ত্বেয় লাখো আমেরিকানের সমাগমের মাঝে বর্নাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়েই পালিত হবে স্বাধীনতা বার্ষিকী। আনুষ্ঠানিকভাবে 'স্বাধীনতা ঘোষণা'র রাজ্য ফিলাডেলফিয়ার মুক্তি ঘণ্টা বাজানোর মধ্য দিয়ে প্রত্যুষে শুরু হবে হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচী। এরপর সারা দেশের ছোট-বড় গির্জায় একসঙ্গে ঘণ্টা বাজিয়ে শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটে দিবসটির। স্বাধীণতার প্রাক্কালে এই ১৩টি উপনিবেশ একসঙ্গে ইংল্যান্ডের রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করে। ভার্জিনিয়া উপনিবেশের জর্জ ওয়াশিংটন ছিলেন প্রধান সেনাপতি। এরই মধ্যে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে উপনিবেশগুলোর বিজয়ের প্রাক্কালে ১৭৭৬ সালের ২ জুলাই দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে ভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর পর পাঁচজনের একটি কমিটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করে। টমাস জেফারসন, জন অ্যাডামস, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন এ কমিটির অন্যতম সদস্য। টমাস জেফারসন ছিলেন মূল লেখক। রচিত ঘোষণাপত্রটি নিয়ে কংগ্রেসে তর্ক-বিতর্ক হয় এবং পরিশেষে ঘোষণাপত্রটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ঘোষণাপত্রটি কংগ্রেসের অনুমোদন পায় ৪ জুলাই ১৭৭৬ সালে। ব্রিটিশদের অরাজকতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য 'প্রতিটি মানুষই সমান এবং একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি' এই বাণীকে সামনে রেখে থমাস জেফারসন লিখলেন স্বাধীনতার বাণী। শুধু ভৌগোলিকই নয়, ভেঙে গেল সব পরাধীনতার শৃঙ্খল, বাকস্বাধীনতা, পত্রিকা ও প্রকাশনার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, এমনকি কোনো আইন পরিবর্তনের জন্যও সরকারের কাছে আবেদন করার স্বাধীনতা সবার, আমেরিকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের। নিজেকে প্রকাশ করার যে স্বাধীনতা, সংবাদপত্র, রেডিও-টেলিভিশন তথা গোটা মিডিয়ার যে স্বাধীনতা আছে আমেরিকায়, পৃথিবীর বহু দেশেই এতটা স্বাধীনতা থাকে না মানুষের। আর ধর্ম? রাষ্ট্র কখনোই কোনো ধর্ম পালনে কাউকে বাধ্য বা নিষেধও করবে না। যে যার ধর্ম পালন করবে। যদিও অধিকাংশ জনগণই ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাসী এখানে। কেউ যদি কোনো ধর্মই পালন করতে না চায়, এমনকি ঈশ্বরকেও বিশ্বাস করতে না চায়, সে অধিকারও আছে তার। আছে নিরশ্বরবাদ নিয়ে কথা বলার, বই লেখার সব অধিকার। এ জন্য তাকে দেশান্তরিত হতে হয় না। নিজ ধর্ম পালনের অবাধ স্বাধীনতার কথা ভেবেই ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড থেকে বহু লোক আমেরিকায় এসেছিল। এখনো নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম পালনের জন্য এটিই একমাত্র ভূমি। কত ধর্ম-বর্ণের মানুষ! কি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু ঘোষণার পরপরই এতসব সুফল চলে এসেছে তা নয়। স্বাধীনতার এ ঘোষণার পর গ্রেট ব্রিটেন থেকে উপনিবেশগুলো বেরিয়ে এসে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণাকালে ছিল ১৩টি রাষ্ট্র। কিন্তু এই রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য ঠিক রাখা মোটেও সহজ ছিল না। একটা না একটা ঝামেলা লেগেই থাকত। ১৮৬১ সালের গৃহযুদ্ধে ফেডারেল বাহিনী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে জয়লাভ করে। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিরতরে বিলোপ হয় দাসপ্রথা। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীরা সেখানে গিয়ে দেশটির কৃষি, খনিজ, অরণ্য সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলে। ১৭৮৭ সালে আসে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত সংবিধান। শুরু হলো এক নতুন সরকার পদ্ধতি, যা এখনো বিদ্যমান। প্রয়োজনে এর ছোটখাটো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার অনুমতিরও ইতিহাস রয়েছে, যাকে বলে অ্যামেন্ডমেন্ট। চার বছর পর পর নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কৃষিপ্রধান সমাজে কৃষকদের সুবিধার কথা ভেবেই এটি লেখা হয়েছিল ১৮৪৫ সালে। কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই শতবর্ষ ধরে চলছে এ নিয়ম। ছয় বছর পর পর সিনেটরদের নির্বাচিত করা হয়। তারা জনগণের প্রতিনিধি। বিভিন্ন স্টেট বা অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তারা সংসদে যান এবং সত্যিকার অর্থেই তা করেন। এখন বিশ্বের এক নম্বর দেশের শিরোপা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। ৫১টি রাষ্ট্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গঠিত। প্রত্যেকটি রাষ্ট্র স্বায়ত্তশাসিত। শুধু মুদ্রা, দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে ফেডারেল সরকার। একজন জননির্বাচিত প্রেসিডেন্ট একমাত্র প্রধান নিয়ামক। তাকে কেন্দ্র করেই শাসনক্ষমতা পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা করে দুটি সভা- কংগ্রেস ও সিনেট। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশটির স্বাধীনতা দিবস হোক গৌরবের, এমন প্রত্যাশা সবার। |