মূলপাতা arrow খবর arrow দেশ arrow অমর একুশের বইমেলার উদ্বোধন
অমর একুশের বইমেলার উদ্বোধন প্রিন্ট কর
নিউজ-বাংলা ডেস্ক   
মঙ্গলবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১১

ফেব্রুয়ারি মাস। শুরু হলো আরেকটি বইমেলা। বছরের ১১টি মাসের অপেক্ষা মাসব্যাপী এ বইমেলার জন্য। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে বাংলা একাডেমী আয়োজিত মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১১ উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধন কালে প্রধানমন্ত্রী  বলেন  যে চেতনা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তা বাস্তবায়নে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্ঞানভিত্তিক উদার, গণতান্ত্রিক ও অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বই পাঠের অভ্যাস গঠন এবং প্রিয়জনকে বই উপহার দেয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।  বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন।

অমর একুশের বইমেলা
একুশের  বইমেলা আমাদের জাতীয় চেতনার উৎস-প্রেরণার উৎস। আমাদের নবজাগরণ । সংস্কৃতমনা বাঙালির নানা পার্বণকে ছাড়িয়ে এ বইমেলা আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে  গভীরভাবে মহান একুশের বইমেলা।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফসল ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠা। সে সময় থেকেই একাডেমী বাংলাভাষা ও সাহিত্যের পরিচর্যার কার্যক্রম গ্রহণ করে। একাডেমীর প্রকাশনা হিসেবে বাংলা একাডেমী পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে। বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ নিয়ে বাংলা একাডেমী এগোতে থাকে। যদিও আজ বাংলা একাডেমীর পরিচয় অনেকটাই কেন্দ্রীভূত হয়েছে অমর একুশের বইমেলা আয়োজন এবং  বিভিন্ন ধরনের অভিধান ও মননশীল প্রকাশনার কেন্দ্র হিসেবে। বাংলা একাডেমীর বইমেলার দিকপাল এ দেশের সৃজনশীল প্রকাশনার প্রাণপুরুষ মুক্তধারার কর্ণধার চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তধারার চিত্তবাবু চট বিছিয়ে বইয়ের পসরা সাজিয়েছিলেন লা একাডেমীর সামনের সড়কের ফুটপাতে। সেদিন যে বইমেলার বীজ রোপিত হয়েছিল তা আজ মহীরুহ হয়েছে। যদিও এর আগে ১৯৬৪ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তৎকালীন ন্যাশনাল বুক সেন্টার 'শিশু গ্রন্থমেলা'র আয়োজন করেছিল কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির চতলায় (বর্তমানে এ ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার)। এছাড়া ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলের উদ্যোগে বইমেলার আয়োজন করা হয় ময়মনসিংহে, উদ্যোক্তা ছিলেন বিশিষ্ট অনুবাদক ফখরুজ্জামান চেচৌধুরী।

আজ অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশ ভূখন্ডের মানুষের এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা_ আমাদের প্রাণের মেলা। এর মাধ্যমে লেখক-পাঠক-প্রকাশকের মেলবন্ধন তৈরি হয়। লের পরিক্রমায় একুশের বইমেলায় দিন দিন লাগছে আধুনিক উৎকর্ষের ছোঁয়া। গত কয়েক বছর ধরেই একুশের বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় প্রতিদিনের বইমেলার বুলেটিন, স্থাপিত হয় একুশের বইমেলার মিডিয়া সেন্টার, লেখক কর্নার। ইন্টারনেটের কল্যাণে প্রতিদিনের বইমেলার আপডেট প্রদান করা হয় পুরো বিশ্বজুড়ে। বইমেলার প্রাঙ্গণ থেকেই বইমেলার বিভিন্ন তথ্যাবলি সরাসরি সম্প্রচার করা হয় এফএম রেডিও চ্যানেলের মাধ্যমে। ভাষা শহীদ রফিক, ভাষা শহীদ শফিউর, ভাষা শহীদ সালাম, ভাষা শহীদ বরকত, ভাষা শহীদ জব্বারসহ বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা সাহিত্যিক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, বাংলা সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত, পল্লী কবি জসিমউদ্দীন, প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাস, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, নারী কবিদের পথ প্রদর্শক কবি বেগম সুফিয়া কামালসহ অনেকের স্মরণে বিভিন্ন কর্নার স্থাপন করা হয়। জাতির অস্তিত্বের প্রকাশক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, নজরুল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। মেলার একটি এলাকাজুড়ে লিটল ম্যাগ চত্বর যেখানে সারাদেশ থেকে প্রকাশিত ছোট কাগজের মেলা বসে। গত কয়েক বছর ধরে মেলাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। এখানে ছোট ছোট প্রকাশনা সংস্থা এবংবিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় বই প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি পিঠা-ফুচকা-চটপটি-বাদাম-ভাজাসহ বিভিন্ন প্রকার খাবার দোকানের সমাহার ঘটে। বইমেলা শুধু আজ বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন_ সন্ধানী, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাঁধন, ডক্টরস এন্ড মেডিকেল স্টুডেন্টস ফ্রম সাতক্ষীরা প্রভৃতির আয়োজনে চলে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। চলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য বার্তা আদান-প্রদান এবং স্বাস্থ্য সচেতন ও সতর্কীকরণ কর্মসূচি। অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে না পারা মৃত্যু পথযাত্রী রোগীদের জন্য চলে অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রম।

এভাবেই বইমেলা এগিয়ে চলে দিনের পর দিন। কখনো বা ২৮টি দিন আবার কখনো ২৯ দিন_ পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই। বইমেলায় ভাষ্যকর প্রতি মুহূর্তেই জানিয়ে দেন ওই দিনের প্রকাশিত গ্রন্থ ও এর রচয়িতার নাম। সঙ্গে সঙ্গে চলে বিভিন্ন ঘোষণা। নজরুল মঞ্চে প্রতি মুহূর্তেই এক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন লেগেই থাকে। মেলার মূল মঞ্চে সারা বিকেলজুড়েই চলে বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় সেমিনার। বইমেলার দিনগুলোর মাঝেই পড়ে পয়লা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিনগুলোতে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (শাহবাগ-দোয়েল চত্বর-শহীদ মিনার-নীলক্ষেত এলাকা) এলাকাই পরিণত হয় উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের সন্ত্রাসী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার দিনটি পালিত হয় বেশ জোরেশোরেই। জঙ্গিবাদ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে স্বাক্ষর সংগ্রহও চলে বইমেলায়। কয়েক বছর ধরেই মেলায় শুধু মুক্তিযুদ্ধের বই নিয়ে একটি বড় স্টল সবার দৃষ্টি কাড়ে। এক ছাদের নিচ থেকে সবাই খুব সহজেই মুক্তিযুদ্ধের বই সম্পর্কে ধারণা পান এবং প্রয়োজনে সংগ্রহ করতেও পারেন।
সব মিলিয়ে এ বইমেলা যেন হয়ে ওঠে পুরো জাতির এক অপূর্ব মিলনমেলা  আনন্দযজ্ঞ।  ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে একাত্তরের দগদগে ক্ষতের স্মৃতি, রক্তের দাগ তখনো শুকায়নি। এ সময়টাতে চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমীর বটতলায় বই নিয়ে বসেছিলেন। টেবিল-চেয়ারের আয়োজন ছিল না। তিনি বই সাজিয়েছিলেন
চটের ওপর। ১৯৭১ সালের মে মাসে কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন। কলকাতা তখন বাংলাদেশের বহু লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীর আশ্রয়শিবির। সেখানে তিনি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন। প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর ৩২টি বই। এ বইগুলো নিয়েই আয়োজন করা হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম বইমেলার। বাংলাদেশের বই প্রকাশনা ও বইমেলার শুরুটা হয়েছিল চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরেই। ১৯৪৩ সালে রামেন্দ্র হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৮ সালে চৌমুহনী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ঐতিহ্যগতভাবে তাদের পরিবার ছিল কাপড় ব্যবসায়ী। কিন্তু তিনি ঝুঁকে পড়েন বইয়ের প্রতি। চৌমুহনীতে একটি বইয়ের দোকান দিয়ে শুরু করেন পুস্তক ব্যবসা। ওই দোকানে প্রধানত স্কুলের পাঠ্যবই ও নোটবই বিক্রি হতো। কিছুকাল পরে বাসন্তী প্রেস নামে একটি ছাপাখানা কেনেন। তিনি এর নাম বদলে রাখেন 'ছাপাঘর'। পাশাপাশি গড়ে তোলেন 'বাঁধাই ঘর' নামে একটি পুস্তক বাঁধাই প্রতিষ্ঠানও। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ঢাকায় তার ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন 'ঢাকা প্রেস' নামে একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ও 'গ্রন্থঘর' নামে একটি বইয়ের দোকান। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন পাঠ্যপুস্তক ও নোট বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘর লিমিটেড। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে জমজমাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল পুঁথিঘর।
পুঁথিঘর ও মুক্তধারা এ দুটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা বইয়ের প্রকাশনা জগতের অনেক ইতিহাস। স্বাধীনতার আগে ও পরের সময়টাতে পুঁথিঘর ছিল স্কুলের পাঠ্যবই, নোটবই আর টেস্টপেপারের জন্য বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের লেখকদের সৃজনশীল বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল মুক্তধারা। এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রকাশনা ছিল 'বাংলাদেশ কথা কয়' ও 'রক্তাক্ত বাংলা' নামে দুটি সংকলন গ্রন্থ। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাংলা একাডেমী চত্বরে যে বইমেলার সূচনা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা, ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই সে মেলা চালিয়ে যান। পরে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন। ১৯৮৫ থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি এটি অনেকটা বারোয়ারি মেলার রূপ নেয়। উদ্যোগ নেয়া হয় আবার এটিকে শুধু বইয়ের মেলায় পরিণত করার। সে উদ্যোগ সফল হয়। ২০০২ সালে এ বইমেলার নাম হয় অমর একুশে বইমেলা। শুধু বাংলা একাডেমীর বইমেলা নয় মুক্তধারা বইমেলাকে নিয়ে গেছে জেলা পর্যায়েও। বিভিন্ন সময় ঢাকার বাইরের পাঠকদের জন্য বইমেলার আয়োজন করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি। পাঠকদের জন্য নানা পুরস্কারের আয়োজন করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। লেখকদের জন্য আয়োজন করেছিলেন মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯৭ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সেরা প্রকাশক স্বর্ণপদক, ১৯৮৮ সালে নাট্যসভা পুরস্কার, ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিদ্যাসাগর পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ২০০৫ সালে ভূষিত হন একুশে পদকে।
প্রকাশনা শিল্পে অবদানের জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাকে সংবর্ধনা দেয়। তবে বাংলাদেশের পাঠক ও সাহিত্য সমাজের কাছে চিরদিনের জন্য যে শ্রদ্ধার আসন পেয়েছেন তিনি সেটিই হয়তো তার জীবনের সেরা পুরস্কার। 

সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০১১ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates