News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, রবিবার      
মূলপাতা
চুমকি নয়, রুমকি চলেছে একা পথে প্রিন্ট কর
নাজমা রহমান, মেরিল্যান্ড   
মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

  
 গল্প কি কখনো সত্যি হয়?  কিংবা সত্যি কি কখনো গল্পের মতো শোনায়? সত্যি যদি গল্প না হয়, গল্প যদি সত্যি না হয় তবে বোঝা বড় দায় কী সত্যি আর কী গল্প।’—এডগার অ্যালানপো।
 রুমম!রুমকিইই!             
ওশেন ব্লু গাড়িটা পার্ক করতে না করতেই আজো আবার সেই অদ্ভুত ডাকটা শুনতে পেল রুমকি। চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকায় ও। কি জানি আছে ওই কণ্ঠস্বরে। শুনলেই গা  শীর শীর করে। ভারী কোন ধাতব বস্তুর মত ঝনঝন করে বাজে শব্দগুলো। কি আজব!
ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকায় ও।
আশ্চর্য! কোথাও কেউ নেই!
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মেইন ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আছে ও।   এখন অনেক সকাল। এতো সকালে ভিড় কম হয়। দ্রুত পায়ে পারকিং লট থেকে বেরিয়ে আসে ও। পলিটিক্যাল সাইন্স ডিপার্টমেন্টের ছয় তালা প্রকাণ্ড লাল বিল্ডিঙটা দেখা যাচ্ছে দূর থেকে। ওই দিকে ছুটতে থাকে রুমকি।  
ছোটার সময় চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখে নেয় ও আরেকবার। কেউ আসছেনাতো পিছন পিছন!      
না। তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছেনা।    
তবে ক্যাম্পাসটা আচমকা বদলে গেছে।
একথা ঠিক।
শীতের শূন্যতা বিলীন হয়ে কোন ফাঁকে যে বসন্ত উথলে উঠেছে বুঝতেই পারেনি।
 
এপ্রিল মাস।
স্প্রিং ইজ ইন দ্যা এয়ার।   
শীতের পত্রহীন অরণ্যে এখন সবুজ পাতার ঢল নেমেছে।   
নরম ঘাসের কার্পেটে মোড়া গোটা ক্যাম্পাস। মাঝে মাঝে ফুলের বেড। সেখানে কেউ যেন পেইন্টিং বক্সের সব রঙ উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে। লাল, নীল, হলুদ, কমলা, গোলাপি নানা রঙের ঢেউ উথলে উঠছে।   
এগুলোর আড়ালে কি কেউ দাঁড়িয়ে আছে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এখনো ওকে দেখছে?      
দেখলে দেখুক।
কি আর করা।  
এতসব ভাবার সময় নাই ওর। আঁটটা চল্লিশে ক্লাস। ডঃ ওয়াটকিনস টেইলার পড়ান ‘কম্প্যারেটিভ পলিটিক্স’
খটমট বিষয় কিন্তু নাকের ডগায় চশমাটা টেনে এমন মজার মজার সব উধাহরণ দেন ভদ্রলোক যে নীরস বিষয়টাও সরষ হয়ে যায়।   
ক্লাসটা মিস করা যাবেনা।
ক’দিন আগে রুমকি মা বাবার সাথে বাংলাদেশে গিয়েছিল। দাদার বাড়ি নানার বাড়ি মজা হয়েছে প্রচুর। আর সেই ফাঁকে ক্লাস মিস হয়েছে অনেকগুলি। এবার থেকে সিরিয়াস না হলে খবর আছে।      
কিন্তু সিরিয়াস হতে আর পারছে কই!
পারছেনা কারন ওই ধাতব কণ্ঠস্বরের মানুষটা। বেশ কিছুদিন ধরে ওর পিছনে নাছোড় বান্দার মত লেগে আছে।
কতবার ভেবেছে এই লোকটার কথা আর মোটেই ভাববেনা।     
কিন্তু ভাববোনা ভাবলেই কি আর ভাবনার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়?  
এতো সোজা!  
সারাক্ষণ মনের কোথায় জানি একটা ভয়ের কাঁটা বিঁধে থাকে। যখন তখন খচখচ করে উঠে। এই যেমন এখনো খোঁচাচ্ছে।
বার বার মনে হচ্ছে, কি এমন হোতো আর একটু অপেক্ষা করে চারপাশটা খুঁজে দেখলে!  রহস্যের একটা কিনারা হওয়াতো দরকার। চোখে দেখা যায়না অথচ সময়ে অসময়ে কে তাকে এমন করে ডাকে, জানতে হবেনা?
এমনেতোনা যে ব্যাপারটা আজকেই প্রথম। এর আগেও অনেকবার হয়েছে। তবে কলেজে এই প্রথম। এতদিন মানুষটা শুধু বাড়ির আশেপাশে হানা দিত। এখন দেখা যাচ্ছে কলেজ পর্যন্ত ধাওয়া করছে! মহা মুশকিলতো!   
মুশকিল আসান করার উপায় বের করতে হবে।
 
উপায় নিয়ে ভাবার আগেই ধাক্কা খেল রুমকি।
ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে দরজার সাথে।
হাতে ধরা গরম কফির কাপ থেকে চলকে পড়লো খানিকটা কফি। কাপের ঢাকনা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। অপ্রস্তুত রুমকি সামনে তাকায়। ডঃ ওয়াটকিনস কিছু একটা বলছেন আর পুরা ক্লাস হো হো করে হাসছে। ভালই হয়ছে কেউ ওকে লক্ষ্য করছেনা।  
ওর সিল্কের বেগুনি ফুলছাপ টপসটা ভিজে একাকার। জামা ঝাড়তে ঝাড়তে মনে হোল কেউ যেন কাপের ঢাকনাটা তুলে ওর হাতে গুঁজে দিল। তাকিয়ে দেখে ফ্লোরে পড়া কফির ধারাটাও নেই।
গেলো কই!
এক নিমেষে গায়ের রক্ত হীম হয়ে গেল রুমকির।   
এসব কি হচ্ছে?    
এরকম ভুতুড়ে ঘটনা ও শুধু মুভিতেই দেখেছে এতকাল।
আর আজ কিনা তার কপালে!    
    
লেকচার চলছে।
ডঃ ওয়াটকিনসের ভরাট কণ্ঠ গমগম করছে বিশাল লেকচার হল জুড়ে, It was only in the nineteenth century, however, that the comparative method was first formally proposed as a means for elevating political thought to the level of a science.... প্রোফেসরের পিছনের দেয়াল জোড়া স্ক্রিনে কিছু লেখা আর আঁকিঝুঁকি। সবাই চোখ বড় বড় করে সেদিকে তাকিয়ে আছে।  
ওর ব্যাপারটা কারোর নজরে আসেনি।
এও মন্দের ভালো।     
একপাশে একটা চেয়ারে বসে পড়ল রুমকি।
লেকচারের কিছুই ওর কানে ঢুকছেনা। প্রফেসার মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন। ন্যান্সি আর সোফিয়া সমানে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। ন্যান্সি মেয়েটার একটু সবজান্তা ভাব আছে। সেটা সে   দেখাতে ছাড়ছেনা। ডেইভ, অ্যালান আর মার্ক্সও কিছু বলতে চেষ্টা করছে। তবে ন্যান্সি ওদেরকে সেই সুযোগ দিলেতো! কাঁটাটা ওকে সমানে খোঁচাচ্ছে। দেড় ঘণ্টার ক্লাস, মনে হচ্ছে দেড় যুগ ধরে চলছে। শেষ হওয়া মাত্র দৌড়ে বেরিয়ে এলো রুমকি বাইরে।                  
লাল ব্যাগ খুলে সেলফোন বের করল।     
শাকিলকে ঘটনাটা বলতে হবে। মনে হয়না বিশ্বাস করবে, তারপরও একজন কাউকে বলা দরকার। একটা রিঙ হয়েই ম্যাসেজে চলে গেল...  
দূর ছাই!
মানুষটা এই অসময়ে ফোন বন্ধ করে বসে আছে। আর মাত্র ক’দিন পরে এই লোকটার সাথে ওর বিয়ে হবে। একেতো দরকারের সময় দেখা যাচ্ছে খুঁজেই পাওয়া যাবেনা।     
মন খারাপ করে বাড়ির পথ ধরল রুমকি।     
গাড়ির সিডিপ্লেয়ারে বেজে উঠল – চুমকি চলেছে একা পথে...  
মার পছন্দের গান। সেলিনা বেগম যখন তখন এই গানটা শোনেন, কেন কে জানে। তাও যদি চুমকি না বলে রুমকি বলত তাহলে নাহয়...... বন্ধ করে দিল গান রুমকি।     
তাতে লাভ হলনা।  
গানটা বেজে উঠলো ওর মাথার ভিতর। সেখানে বসে কেউ অবিরত গাইছে ... চুমকি চলেছে একা পথে ...     
তাইতো! সেওতো চলেছে একা পথে। কেউ একজন আড়াল থেকে যখন তখন তাকে নাম ধরে ডাকে। ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যায় নির্জন পাহাড়ের ঢালে। সেখানে আর কেউ থাকেনা। শুধু সে আর সেই অদৃশ্য মানব।     
কিন্তু কে সে? দেখতে কেমন? কেনইবা ডাকে?
কি রহস্য কে জানে!       
 
 
 
টুং করে একটা শব্দ হল।
ঘুম ভেঙ্গে গেল রুমকির।
চোখ মেলে তাকাল। জানালার পর্দার ফাঁক ফোকর গলিয়ে চাঁদের আলো লুটিয়ে পড়েছে গায়ের উপরের মাখন রঙা কম্ফোর্টারের উপর। ও উঠে বসতেই আলোটা এঁকেবেঁকে গেল। বিছানা ছেড়ে নামল রুমকি।
পায় পায় গিয়ে দাঁড়াল জানালায়। কাঁচের ওপারে রাতের অরোরা হিলস। আলো আঁধারিতে মায়াময়।   
এই জানালা দিয়ে বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডটা দেখা যায়।    
পিছনের বাগান ছাড়িয়ে ওই যে দূরে কালো অ্যাশফল্ট বিছানো দীর্ঘ পথ। বাঁক নিয়ে নেমে  গেছে পাহাড়ের ঢালু বেয়ে। পথের পাশে জ্বলন্ত ল্যাম্পপোস্ট। আলো ঠিকরে পড়ছে দু’পাশের সারি সারি চেরি গাছের উপর। ঝলমল করছে গোলাপি ফুলের রাশ।   
কিন্তু ওটা কি?  
চেরি ফুলের ঝোপড়া ডালের নিচে কি কেউ দাঁড়িয়ে আছে?  
তাইতো মনে হচ্ছে।      
নাহ! কেউ নেইতো!    
ওইযে, ওইতো সে!   
কোথায় গেল!  
নিজের মনে কথোপকথন শেষে তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল রুমকি। দোতালা থেকে একতালার মেইন ফ্লোরে। সেখান থেকে বেইসমেন্ট ফ্লোরের সিঁড়ি ধরতে গিয়েও ধরলনা।         
বেইসমেন্ট থেকে বাইরে বেরুবার দরোজার পাশেইতো ওই অদৃশ্য লোকটা এসে দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় প্রতিদিন। ওদিকে যাওয়া যাবেনা।
একতালার ফ্যামিলি ডাইনিং এর পাশের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো খোলা ডেকে। বেশ বাতাস দিচ্ছে। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। এখান থেকে নিচের ওয়াকআউট বেসমেন্ট আর বাগানটা দেখা যায়। কত রকমের ফুল ফুটেছে।      
রুমকির মা সেলীনা বেগমের ফুলের শখ।
শীত না ফুরাতেই হোম ডিপো থেকে কিনে আনেন হরেক রকমের চারাগাছ। রোজ বিকেলে নিয়ম করে গাছে পানি দেন। হৃষ্টপুষ্ট গাছগুলি ফুলের তুফান তুলে সারাক্ষণ ঢলঢলিয়ে হাসে।           
রুমম! রুমকিইই!
ওইতো!
সেই ঝন ঝন অদ্ভুত কণ্ঠ!
বেসমেন্ট থেকে বাইরে বেরুবার কাঁচের দরজার সামনে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। পরনে রুপালী পোশাক।
ডেকের সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচের বাগানে নেমে গেল রুমকি।
চারিদিকে চাঁদনী রাতের আলো আঁধারির ওড়না উড়ছে। দরজার সামনে কেউ নেই।
বাগান জুড়ে রঙিন ফুলের নকশা আর হু হু করে বয়ে যাওয়া বাতাসের ফিশ ফিশ কানাকানি।
 
 
কোথায় গেল সে?   
বাগানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রুমকি।  
সুনসান ব্যাকইয়ার্ড। বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে দূরে ঢেউ খেলানো ঘন সবুজ প্রান্তর। সাজানো গোছানো রঙিন ফুলের ল্যান্ডস্কেপ। কোথাওবা পাইন, ওক, বার্চ, অথবা হিকারির হালকা জঙ্গল। ফাঁকে ফাঁকে দু’চারটে বাড়ি ঘর।    
আঁকা বাঁকা পথের দু’পাশে জাপানী চেরি ফুলের উৎসব।         
বসন্তের প্রথম ঝাঁপটা লাগতেই ভোজবাজির মত সব গাছ একসাথে গোলাপি ফুলে ভরে গেছে। একটু জোর বাতাস এলেই উড়ে যায় পুস্পরাশি। হাওয়ায় ভাসতে থাকে অরোরা  হিলস।       
দৃশ্যটা রুমকির খুব প্রিয়।  
আর তা দেখার জন্য মাঝে মাঝে দোতালার বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ও। ফুলগুলো তাদের ছোট ছোট হাত তুলে ইশারায় ডাক দেয় ওকে।  
চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে আসে রুমকি।
কালো পথটা পায়ে পায়ে নিয়ে যায় তাকে অনেক দূর।  
উড়াল বাতাসে দুলতে থাকে গাছের শাখা। ঝরকে ঝরকে ঝরে পড়ে তাজা ফুল। রুমকির ওড়না আর খোলা চুল নিয়ে খেলা করে বাতাস। ভালো লাগার আবেশে কেঁপে উঠে ও। এরকমই চলছিল এতদিন।
কিছুদিন ধরে সব যেন কেমন বদলে গেছে।
অদ্ভুত সব ব্যাপার ঘটছে।
এই পথ ধরে একটু এগোলেই রুমকি টের পায় কেউ যেন ওর পিছনে পিছনে আসছে। কখনো কখনো খুব কাছে এসে দাঁড়ায় সে। কোমল বিহ্বল ধাতব গলায় নাম ধরে ডাক দেয়, রুমম! রুমকিইই!   
ডাকটা শুনতে পায় রুমকি। কিন্তু মানুষটাকে দেখতে পায়না।
এ কেমন কথা?
গলার স্বরটাইবা এমন কেন তার?    
 
মাকে বিষয়টা প্রথম দিনই বলেছিল রুমকি।   
এক বান্ধবীর কাছ থেকে ভাপা পিঠা বানানো শিখেছেন মা। মহা উৎসাহে চালের গুঁড়ির  ভিতর গুড় নারিকেলের পুর ভরছিলেন সেলিনা বেগম। রুমকির কথা আমলেই নিলেননা। পিঠা গুলি ভাপে দিতে দিতে বললেন, ইস! দিলিতো আমার হাত পুড়িয়ে।
আশ্চর্য! এতক্ষণ কি সে তাহলে হাওয়ার সাথে এতগুলি কথা বলছিল। যাহ! এই মহিলাকে সে আর কিছুই বলবেনা।  
গটগট করে নিজের রুমে ঢুকে মনের দুঃখে কাঁদতে বসল রুমকি।     
কাঁদতে কাঁদতেই উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু কাউকেতো বলতে হয়।     
কাকে বলা যায়?    
 
বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে টেলিভিশনে একটা থ্রিলার দেখছিলেন। রুমকি গিয়ে পিছনে দাঁড়ালো।
- কিছু বলবি মা?
- হ্যা বাবা।
- বল তাহলে। ‘ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড’ সিরিজটা চট করে পজ করে দিলেন তোফাজ্জল হোসেন। তার কাছে রুমকির প্রয়োজনটাই সবার আগে।  
এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে রুমকি পুরো ঘটনা বলে গেল।
তোফাজ্বল হোসেন একটু রাশভারি টাইপ মানুষ। কিন্তু এই কথা শুনে হেসে ফেললেন। হেসে তরল সুরে বললেন, দূর বোকা মেয়ে! এখানে কে আসতে যাবে এই নিঝুম পাহাড়ে? এই সমস্তই তোর কল্পনা মা। তুই ছোটবেলায় খুব ভূতের বই পড়তি, এখনো পড়িস নাকি?
বাবার কথার কি উত্তর দিবে রুমকি?   
ওর এখন হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।  
 
বিকাল বেলা টেলিফোন করল শাকিলকে। সে মনে হয় তখন টেলিফেনের কাছেই ছিল। মাত্র একটা রিং হতেই রিসিভার তুলে সাড়া দিল।
রুমকি এক নাগাড়ে সব কথা বলে থামল। থামতে না থামতেই শুনল রিসিভার কাঁপিয়ে হাসছে শাকিল। এরকম একটা সিরিয়াস কথায় হাসির কি হল? মেজাজ আর মন দুটোই গেল খারাপ হয়ে। ধপ করে রিসিভার রেখে দিল রুমকি।
না। এই ব্যাপারটা নিয়ে ও আর কারো সাথেই কথা বলবে না।
কেউ ওকে বুঝতে চাইছেনা।  
    
আজো সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।  
এখন গভীর রাত।   
এতোরাতে এখানে আসার কথা না ওর। তবু এসেছে। হটাৎ কেন যে ঘুম ভেঙ্গে গেল আর কেনইবা এতদুর চলে এল কে জানে!  
আজ মনে হয় পূর্ণিমা!   
চাঁদের আলোয় পাথরের কালো সিঁড়িগুলো চিকচিক করছে। জোর বাতাস দিচ্ছে। কিছুক্ষণ  আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাসে ভেজা শীতল ভাব।
রুমকির নীল শাড়ির আঁচল উড়ছে। উড়ছে পিঠের উপর লুটিয়ে পড়া খোলা চুলের রাশ।
সেই চুলের উপর কী কারো নিঃশ্বাস পড়লো?
কেঁপে উঠল রুমকি।
মূহুর্তেই বুঝে গেল সে এখানে একা না। আরো একজন কেউ আছে। যে কোমল পায়ে ওর সাথে সাথে সিঁড়ি ভাঙছে।
কে সে?
রুমম! রুমকিই!
সেই অদ্ভুত ডাক!   
যে ডাকছে সে পুরুষ মানুষ। গলার স্বর ভারী এবং মায়াবী। স্বরের মাঝে এক ধরনের বিষন্ন ধাতব ঝংকার আছে। শুনলেই সারা শরীরে বিদুৎতের তরঙ্গ খেলে যায়।
ভয়ে ভয়ে চারদিকে তাকায় নিশা।  
কোথায় লুকিয়ে আছে মানুষটা! যে করেই হোক আজকে জানতে হবে।  
কে তুমি? কথা বল!
রুমকির প্রশ্নগুলি উড়তে থাকে ভেজা বাতাসে।
উত্তর নেই।
কে তুমি আমার নাম ধরে ডাকছ?
রাত্রির স্তব্ধতায় প্রতিধ্বনি হয়ে বাজল শব্দগুলো। ধ্বনিটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই আবারও ভেসে এল সেই ডাক।
রুমম। রুমকিইই!   
বল।  
এখানে একটু বসবে?
কোথায়?  
এই সিঁড়িতে। ঠিক যেখানে তুমি এখন দাঁড়িয়ে আছো।
বাধ্য মেয়ের মতো বসে পড়ল রুমকি। একটু খশখশ শব্দ শোনা গেল। কেউ একজন ওর পাশেই বসল।
অন্য সময় হলে রুমকি ভয়ে মূর্ছা যেতো কিন্তু এখন কিছুই মনে হলোনা তার। হাসিমুখে বলল, তোমার নামটা এখনো বলনি কিন্তু - কী নাম তোমার?
পাশ থেকে কেউ উত্তর দিল - তুমি খুব শুন্দর রুমকিইই।
ভয় পেতে গিয়েও হেসে ফেলল রুমকি - এটাতো আমার প্রশ্নের উত্তর হলনা অদৃশ্য মানব। আমি জানতে চেয়েছি তোমার পরিচয় কি। আর তারো আগে বলো তুমি কোথায়।
আমি কোথায় জেনে তোমার কী লাভ?
ওমা! আমি কার সাথে কথা বলছি তাকে দেখবোনা?
কি করে দেখবে?
মানে?
আমিতো লুকিয়ে আছি।
তোমার কথার অর্থ বুঝতে পারছি না আমি।
না বোঝাই মঙ্গল।
কিন্তু তুমি লুকিয়ে আছ কেন?
তোমার ভয়ে।
আমার ভয়ে?
খিলখিলিয়ে হেসে উঠল রুমকি। তার হাসির শব্দে নাকি বাতাশের ঝাপটায় চেরি গাছের মাথাটা কেঁপে উঠল। গুচ্ছ গুচ্ছ তারার মতো ফুল মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
হালকা ধাতব কন্ঠ ঝনঝন করে বাজল - হ্যা তোমার ভয়ে।
তাহলে অভয় দিলাম। দেখা দাও।
আমাকে দেখা সম্ভব নয়।
কেন নয়?
আমিতো অদৃশ্য হয়ে আছি।
এসব কী উল্টাপাল্টা কথা বলছ। মানুষ আবার অদৃশ্য হয় কেমন করে?
আমিতো মানুষ না।
তাহলে তুমি কি? প্লিজ! আমাকে ভয় দেখিওনা। আমার কিন্তু সত্যিই ভয় লাগছে এবার।
ভয় নেই। আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না।  
তাহলে বল তুমি কে?
আমার নাম কিবা।  
 
তুমি কোথায় থাকো কিবা?  
ট্রস্নি।          
ট্রস্নি! সে আবার কি?
একটা গ্রহ। পৃথিবী থেকে বহু আলোক বর্ষ দূরে।
তাই! তাহলে এখান এলে কেমন করে তুমি?  
সে লম্বা কাহিনী রুমকিইই। খুব সংক্ষেপে বলি। আকাশযানে চড়ে।  
ফ্লাইং সসার?
তোমাদের ভাষায় হয়তো তাই। আমরা বলি ক্রিট।
ট্রস্নি গ্রহটা কোথায়? কতদূরে?
হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে। তোমাদের পৃথিবীর জ্যোর্তিবিজ্ঞানিরা আজো এর সন্ধান পায়নি। হয়তো পাবেওনা কোনদিন। তবু একই ছায়াপথে আছি আমরা। ছায়পথের প্রায় পনেরো হাজার কোটি তারার মাঝে আমরাও একটি।
তুমি কী একাই এসেছে পৃথিবীতে?
না। আমার সাথে আছে আমার সহকর্মী। ওর নাম তিংরা।
কেন এসেছ তোমরা?
পৃথিবী থেকে দুটা স্যাম্পল নিয়ে যেতে হবে। আমাদের গ্রহে পৃথিবীর মানব জাতী নিয়ে অনেক গবেষণা কাজ চলছে। কাজের জন্য মাঝে মাঝে আমরা স্যাম্পল নিতে আসি।  
কী রকম স্যাম্পল?
মানুষ। পুরুষ, নারী, শিশু সব রকম স্যাম্পলই দরকার হয়।
এর আগেও কী তোমরা পৃথিবীতে এসেছো?
আমি মাত্র একবার। একটা এরোপ্লেন চায়না থেকে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল। আকাশে উড়তে না উড়তেই আমি তার পথ পালটে দিলাম। প্লেনটাকে সাগরের জলে ডুবিয়ে দিয়ে যাত্রীদের নিয়ে চলে গেলাম আমাদের গ্রহে। তবে আমার সহযোগী তিংরা এসেছে এই নিয়ে মোট পাঁচবার।
তোমাদের স্যাম্পল সংগ্রহের কাজ কী শেষ হয়েছে?
আমার সহকর্মী ইতিমধ্যে তার দায়িত্ব পালন করে ফেলেছে। সে এখন অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
তোমার কী খবর?
আমার খবর ভালোনা। কাজ শেষ করতে পারিনি। করার ইচ্ছেও নেই। দেশে ফিরে গেলে এই জন্য আমাকে শাস্তি দেওয়া হবে। কী শাস্তি জানো?
কী?
সারা জীবন কারাবাস। একটি ধাতব নিঃসঙ্গ ঘরে।
তাহলে যেওনা ফিরে।
এখানে থাকলেও আমি আর বেশী দিন বাঁচবোনা। দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে আমার জীবনী শক্তি। পৃথিবীতে বাঁচার জন্য যে সব রসদ আর যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিলাম সবই প্রায় শেষ হওয়ার পথে।
তাহলে অপেক্ষা করছ কেন। অনেক আগেইতো ফিরে যেতে পারতে।
পারতাম না।
কেন?
তোমার জন্য।
আমার জন্য? আমি আবার কী করলাম তোমাকে!
কিছু করোনি আবার অনেককিছু করেছো। প্রথম যে দিন তোমাকে নাম ধরে ডাক দিয়েছিলাম সেই দিনই ছিল আমাদের ফিরে যাওয়ার দিন। যাওয়া হলনা।
কেন?
পৃথিবী থেকে একজন নারী ও একজন পুরুষ স্যাম্পল নিয়ে যাওয়ার কথা। নারী স্যাম্পলটি নেয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। আর আমার টার্গেট ছিলে তুমি।
আমি?
হ্যা।
তাহলে নিলেনা কেন আমাকে?    
জানিনা। হটাৎ মনে হোল, আমি তোমার এতবড় ক্ষতি করতে পারবোনা। তোমাকে ছেড়ে আমি আর কোথাও ফিরে যেতে চাইনা রুমকিইই।   
এসব তুমি কী বলছো কিবা?
তোমাকে যেদিন প্রথম দেখি সেদিনও তোমার পরনে ছিল এই  আসমানী রঙা শাড়ী। নীল আকাশের নিচে তুমি দাড়িয়েছিলে এক আকাশ পরীর মতো। আমি তোমাকে ধরতে এগিয়ে গেলাম। তুলে নিয়ে যাবো আমাদের আকাশযানে। কাজটা সহজ ছিল। নির্জন বন। কেউ জানবেনা কোনদিন কী হল তোমার।
কিন্তু আমার কি জানি হয়ে গেল সেদিন।
যতো তোমার কাছে যাই ততোই বদলে যাচ্ছিলাম আমি। একেবারে পাশে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম। তুমি হয়তো কিছু টের পেয়েছিলে। কেমন যেন ভীত অসহায় গলায় প্রশ্ন করলে কে? কে তুমি?
স্তব্ধ হয়ে গেল আমার বাড়ানো হাত। কাঁপা কাঁপা গলায় ডাক দিলাম –  রুমম!রুমকিইই!  
সেইতো শুরু। তারপর থেকে প্রতিদিন তোমাকে দেখব বলে আমি এই পাহাড়ে আসি।  
কী লাভ তাতে?
আমার সহযাত্রি তিংরাও তাই বলে। কিন্তু লাভ ক্ষতির হিসাবতো আমি করিনা। শুধু   জানি আমার মুগ্ধতার ঘোর সারা জীবনেও কাটবেনা। আমি তোমাকে ভালবাসি রুমকিইই।
এসব কি বলছো তুমি?
    
স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে রুমকি।
ভালোবাসাতো হয় মানুষে মানুষে। তাই বলে কোন অচেনা গ্রহের এক রহস্যময় প্রাণীর সাথে মানুষের ভালোবাসা! পৃথিবীতে এই কী প্রথম?  
রাত ক্রমান্বয়ে গাড় হচ্ছে। আকাশের পূব দিকে হেলে গেছে চাঁদ। অনেক্ষণ পর ও ধরা গলায় ডাক দেয় - কিবা!
বলো রুমকিইই।  
তোমার বন্ধু তিংরা এখন কোথায়?
এইতো আশে পাশেই আছে। আমাকে শেষবারের মতো বোঝাতে এসেছিল। লাভ হয়নি কিছু। আমিতো কোথাও যাচ্ছিনা। সে একটু পর তাই একাই ফিরে যাবে।
কিবা!
বল।
তোমাকে একটা কথা বলবো। রাখবেতো?
রাখব।
তুমি ফিরে যাও কিবা। আর সাতদিন পর আমার বিয়ে। যার সাথে বিয়ে তার নাম শাকিল। তাকে আমি ভালোবাসি। আমি চাইনা তোমার সাথে আর কখনো আমার দেখা হোক।
বেশ, তাই হবে। তোমার ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে রুমকিইই।         
রুমকির পাশ থেকে কেউ একজন উঠে দাঁড়াল।
রূপালী ধাতব পোষাক পরা একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ মানুষের আবছা একটা মূর্তি এক ঝলক দেখতে পেল রুমকি। খুব মৃদু একটা ঝনঝন শব্দ হোল। ব্যাপারটা ওর মনের কল্পনা কিনা বুঝতে পারলোনা ও।
কিবা শোন!   
বলো।
যাওয়ার আগে একবার তোমাকে দেখতে চাই।
থাকনা রুমকিইই। তোমার যেমন ইচ্ছা আমাকে তুমি কল্পনা করে নাও। আসল রূপ দেখলে কল্পনা বাঁধা পাবে।
তুমি না চাইলে জোর করবোনা। যাও তাহলে। তোমার বন্ধু অপেক্ষা করছে।
যাই কিন্তু তোমার কাছে আমার একটা শেষ অনুরোধ রুমকি।
কী?
তুমি আরো কিছুক্ষণ ঠিক এইভাবে বসে থাকো।। যেতে যেতে আমি দেখে যাবো শুধু আমারি জন্য এক অপরূপ রূপবতী মেয়ে একা একা রাতের পৃথিবীতে বসে আছে। বড় মায়াময় দৃশ্য। বসবেতো?
বসবো।
বিদায়।
 
কতোক্ষণ এভাবে বসেছিল খেয়াল নেই রুমকির।
অনেক্ষণ পর সে উঠলো।
রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে।
এতোরাতে এখানে এলো কেমন করে ও? কিছুই মনে পড়লোনা রুমকির।
দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠে এলো ও।
 
বিছানায় শুয়ে চোখ গেল খোলা জানালায়। দু’দিকে সরে গেছে বক সাদা নরম সিল্কের পর্দা। মাঝখানে আটকে আছে রাত্রি শেষের এক টুকরো আকাশ। নিভু নিভু জ্বলছে তারার প্রদীপ। নীলচে আকাশ জুড়ে ফিকে আলোর প্রথম পরশ।  
সেই দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখদুটো জ্বালা করছে। কি যেন কি হারানোর দুঃখে হু হু করে কেঁদে ফেলল রুমকি।
কিন্তু কিসের জন্য! কার জন্য!
জানলোনা ও।
 
নাজমা রহমান, মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র
সর্বশেষ আপডেট ( মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

লগইন বক্স






পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
সদস্য হতে চাইলে রেজিস্টার করুন

A professional services and  IT training firm.
 
  

 DETAILS 

 

 Details

Details 

Details 

 Click here for details

 

 Details 

  Details

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 অন্যান্য পত্রিকা



 


 

 

বাচিক শিল্পী কাজী আরিফের সাথে একটি অনন্য সন্ধ্যা


আমেরিকাতে এখন গ্রীষ্মের শেষ লগ্ন। হেমন্তের (ফল)এর আগমনীর প্রাক্কালে সেদিনের অপরাহ্নটি ছিল সিগ্ধ শ্যামল। গত ১১ই সেপ্টেম্বরের  এমনি এক সোনালী রোদেলা বিকেলে
ভার্জিনিয়া রাজ্যের  স্টারলিংস্থ সিনিয়র সিটিজেন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হল দেশ বরণ্য আবৃত্তি শিল্পী কাজী আরিফের আবৃত্তি সন্ধ্যা।

বিস্তারিত ...
 

২রা এপ্রিল শংকর চক্রবর্তীর মনোজ্ঞ সংগীত সন্ধ্যা


আগামী ২রা এপ্রিল  রবিবার  বিকেল চারটায় ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডস্থ কমফোর্ট ইন হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে  বরণ্য  নজরুল গীতি, গজল এবং হারানো দিনের আধুনিক বাংলা গানের গুনী  শিল্পী  শংকর চক্রবর্তীর একক  সংগীতানুষ্ঠান। সঙ্গত আর সংগীতের অসাধারণ ঐকতানে শংকর চক্রবর্তীর এই মনোজ্ঞ সংগীতের আসরটি  বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবে সাজানো হচ্ছে। দর্শক শ্রোতারা দারুন ভাবে উপভোগ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বিস্তারিত ...
 

কি কখন কোথায়


No events

মতামত জরিপ

Why do you visit News-Bangla
 
 
Free Joomla Templates