News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৬ জানুয়ারী ২০১৮, মঙ্গলবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow ভুল পথে আনন্দের যাত্রা
ভুল পথে আনন্দের যাত্রা প্রিন্ট কর
পাপিয়া শারমীন   
শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭

ভার্জিনিয়ার ভ্যালিফল্‌সে লেখকআমেরিকায় আসার পর থেকে অনেকটাই জিপিএস নির্ভর হয়ে পড়েছি। নতুন দেশে সবকিছুই নতুন। ঘুরতে যাওয়ার সাহসও করি জিপিএসের ওপর ভরসা করেই। বাঙালি মুসলমান পরিবারের মেয়ে হওয়ায় বাবা-মা একা ঘুরতে যাওয়ার বিরোধী। কিন্তু প্যাকেজ ট্যুরে গেলে বাবা-মা আর বাধা দেয় না। আমিও ট্যুর প্যাকেজ পছন্দ করি, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প খরচ ও অল্প সময়ে বেশ ভালোই গাইড করে। তো এভাবে একবার গেলাম ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্ট শহরে। তবে একা যাওয়ার লোভটা সামলাতে পারিনি। বাবা-মা যেহেতু ট্যুর প্যাকেজে ভরসা করে, তাদেরকে মিথ্যা বলে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া আবিষ্কারে। ফেয়ারমন্টকে শহর বললে ভুল হবে। বলা যায় অজপাড়া গাঁ। প্রধান আকর্ষণ ভ্যালিফল্‌স স্টেট পার্ক বা জলপ্রপাত। প্রথম দিন সবকিছুই ঠিক ছিল। নির্বিঘ্নে পৌঁছলাম ফেয়ারমন্ট। পরদিন খুব ভোরে ট্যাক্সি কল করে চললাম জলপ্রপাত দেখতে। গাড়িচালকের বয়স ষাটের বেশি। গাড়ি চলছে, কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম গাড়ি ভুল পথে যাচ্ছে। ভুল পথে অনেক দুর চলে এসেছি ততক্ষণে। এতক্ষণে চালক বললেন, আমি সব পথ ভালোভাবে চিনি না। আমার বউ সব চেনে। মনে ভয় ভয় করছিল, তবু রেগেমেগে বললাম, আগে কেন বলেননি? আমার সময় নষ্ট করলে কেন? আমি আপনার ভাড়া দেব না, আমাকে এখানেই নামিয়ে দিন। চালক দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, আগের ভাড়া নেবেন না, তবে এখান থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর টাকা নেবেন। এবার আমি বললাম, ঠিক আছে, তাহলে আমি জিপিএস দেখে বলছি, আপনি সেভাবে চলেন। চালক রাজি হলেন।
আমি এবার চালকের পাশের আসনে বসলাম আর রাস্তার দুপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে জলপ্রপাতের দিকে এগোলাম। একপর্যায়ে দেখলাম, জিপিএস দেখাচ্ছে আর এক মিনিটের পথ। আমি নেমে পড়লাম। চালক যাওয়ার আগে আমাকে তাঁর ফোন নম্বর দিয়ে গেলেন। আমি বিরক্তির সঙ্গে তাঁর নম্বর নিতে নিতে বললাম, এরপর তোমার বউকে পাশে রেখো। রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল, গা ছমছম করছিল। জিপিএস আমাকে একবার দুই মিনিট ডানে হাঁটিয়ে আবার তিন মিনিট বামে যেতে বলছে। কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম আমার মোবাইলে নেটওয়ার্কই নেই। রাস্তায় একটা মানুষও নেই। প্রথম ১০/১৫ মিনিট আশপাশের প্রকৃতি, পাহাড়ের ঢালে সাজানো ঘরবাড়ি, সবুজ ঘাসে বাতাসের ঢেউ, সব মিলে এক অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। একটু পরে সংবিৎ ফিরল, আমি জলপ্রপাতে যাব কীভাবে? হোটেলই বা ফিরব কীভাবে? ওই সড়কে কোনো গণপরিবহনও দেখছি না। এবার বেশ দুশ্চিন্তা শুরু হল আমার। হঠাৎ ভাবলাম কারও কাছে লিফট নিতে পারি কি না।
যেই ভাবা সেই কাজ, ইশারা দিয়ে একটা গাড়ি থামিয়ে সব খুলে বললাম। লোকটা স্থানীয়, তাঁর কথায় হতাশা আরও বেড়ে গেল। লোকটা বললেন, জলপ্রপাত এখান থেকে ৩০ মিনিট ড্রাইভিং। হেঁটে গেলে দুই ঘণ্টার মতো লাগবে, কিন্তু পুরো পথটাই বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। গাড়ি ছাড়া যাওয়া বোকামি। আমি লিফট চাইলে লোকটি বললেন, তিনি কাজে যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে। আমাকে সাহায্য করার মতো তাঁর সময় নেই। মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক নেই, প্রচণ্ড ভয় কাজ করছে। মনে মনে ভাবছি, বাসায় মিথ্যা বলার ফল পাচ্ছি। ছবি তুলতে তুলতে হাঁটছি, ভাবছি কীভাবে হোটেলে ফিরব? আর জীবনেও বাসায় মিথ্যা বলব না। ২০ মিনিট সামনের দিকে হাঁটার পর মুঠোফোনে একটু একটু নেটওয়ার্ক দেখতে পাচ্ছিলাম। সময় নষ্ট না করেই চালককে ফোন দিলাম। চালক বললেন, তার আসতে ৪০ মিনিট সময় লাগবে।
আমি এবার একটু আশার আলো পেয়ে গ্রামটা আরও একটু ঘুরে দেখলাম। চালক আসলে বললাম, আমি আর ঘুরব না, আমাকে হোটেলে নিয়ে চলেন। চালক চিন্তা না করে এবার বললেন, ‘আমি স্ত্রীর কাছে শুনে এসেছি। আমি তোমাকে জলপ্রপাতে নিয়ে যাব। অবশেষে ভ্যালিফল্স স্টেট পার্কে পৌঁছালাম। চালকের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি। কারণ সেদিন তিনি আমাকে নিতে না আসলে জিপিএসের ভুলের কারণে ভুল জায়গা থেকে কীভাবে ফিরতাম?
সর্বশেষ আপডেট ( শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates