News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৬ জানুয়ারী ২০১৮, মঙ্গলবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow লেট ইট স্নো! লেট ইট স্নো! লেট ইট স্নো!
লেট ইট স্নো! লেট ইট স্নো! লেট ইট স্নো! প্রিন্ট কর
নাজমা রহমান, মেরিল্যান্ড   
বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

মোমের মত নরম আলোয় ডোবা একটি প্রভাত। আকাশটা ঘোলাটে নীল। আর সেই নীল ছুঁয়ে ভেসে আসছে শুভ্র সুন্দর তুষারের ফুল। হাজার লক্ষ কোটি। ওরা দল বেঁধে ঢলে পড়ছে সবুজ ঘাসের জমিনে। আলগোছে বিছিয়ে দিচ্ছে ফিনফিনে কাশফুল রঙা চাদর। ঢেকে দিচ্ছে ঘর বাড়ির বাঁকা ছাদ। পথ ঘাট, খোলা  প্রান্তর। চটুল হাতে সাজিয়ে দিচ্ছে বৃক্ষ লতার থরথর কম্পিত অবয়ব।  
জানালায় হাত রেখে আমি অপলক চেয়ে আছি। বছরের প্রথম তুষারপাত। বাড়ির পিছনের পত্রহীন ধু ধু করা বাগানটা চোখের পলকে বদলে গেছে। শুষ্ক বিবর্ণ বৃক্ষডালে এখন লহরির পর লহরি মুক্তো মালার সাজ! যেন ওরা সবাই রাজ রাজেশ্বরী। অপার্থিব একটি দৃশ্য! স্বপ্নের মতো তবু এতো স্বপ্ন নয়। দেখছি আর আবেশে আবেগে বিহ্বল আমি গত বছরের আরেকটি দিনের কথা ভাবছি। সেদিনও তুষার ঝরছিল। আজকের মত মিষ্টি হালকা চালে নয়। সে একেবারেই অন্যরকম, দুরন্ত দুর্বিনীত অবিশ্রান্ত, অন্তহীন তুষারপাত।   
তাঁর রূপে মুগ্ধ বিহ্বল আমি, তুষার কন্যা, তোমাকে একটি  চিঠি লিখেছিলাম সেদিন। খোলা চিঠি। তখন ফেব্রুয়ারি মাস -  
প্রিয় স্নো ফ্লেক্স,
ভালবাসা নিও। আচ্ছা তুমি কি জান, আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম সেই ডিসেম্বর থেকে? অপেক্ষা ঠিক নয় আসলে আমি তোমার প্রতীক্ষায় ছিলাম। ভালবাসার অধীর অপেক্ষার নাম প্রতীক্ষা। কিন্তু এই তুমি কি সেই তুমি!    
 
আর মাত্র ক’টা দিন। তারপরই আমি ঢাকায় যাচ্ছি। একটু লম্বা থাকব। ফিরে আসতে আসতে তুমি যাবে পালিয়ে। তাই যাওয়ার আগে তোমার সাথে দেখা হবেনা এ আমি ভাবতেই পারিনা। কিন্তু এ তুমি কি করলে স্নো ফ্লেক্স!

এবার তুমি তোমার চিরাচরিত রূপে এলেনা। তুমি এলে ঝড় হয়ে। এমন এক ঝড় যা পূর্বাঞ্চলের মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি। দেখবেইবা কি করে, গত একশত বছরেওতো তুমি এমন ভয়াল তুফান তুলে আসোনি।   

শীত এসেছে সেই কবে!
গাছগাছালির রঙতো হেমন্তেই গেছে মুছে। তরুলতায় একটি  পাতাও অবশিষ্ট নেই। ন্যাড়া গাছের সারি শুকনো খটখটে ডালপালা মেলে প্রাণহীন দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ফাঁকে ফাঁকে কিছু এভারগ্রীন গাছ অবশ্য আছে। একটুখানি মায়ার অঞ্জন চোখে  পরাবে বলে। ভুবন ভোলানো রঙের এই দেশে এখন আর কোন রঙই অবশিষ্ট নেই। শীতের উত্তরীয় উড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে  গোটা পৃথিবী তাপস বেশে।  
শুধু তোমারি অপেক্ষায়। ওরা জানে তুমি আসবে। হয়তো তুষারের ফুল হয়ে। নয়তো আসমানের দরোজা খুলে অমল ধবল স্নোবলের মত ভেসে ভেসে এই ধরিত্রীর বুকে। একটি দুটি নয়, হাজার, লক্ষ, কোটি স্নোবল। শুভ্র সুন্দর শব্দহীন অহঙ্কারে।
হীম চূর্ণ গায়ে মেখে। কি কোমল কি নরম তোমার শরীর। যেন বাস্তব নও। যেন ঘুমোঘোরে দেখা কোন স্বপ্ন। টোকা দিলেই উড়ে যাবে। মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়।    
    
তুমি ধরণীতে এসেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সবুজ ঘাসের বুকে। তৃণকুল এখনো বেঁচে আছে শুধু তোমারই পরশ তরে। তুমি এলেই ওদের ছুটি। ওরা ঘুমোবে দীর্ঘ শীত জুড়ে।
তোমায় দেখে মৃতপ্রায় কঙ্কালসার গাছ গুলি বাতাসের উল্লসিত ঘূর্ণিতে খট খট করে কেঁপে উঠবে। পাইন, ফার আর হেমলক ট্রিগুলোর শীর্ণ শুষ্ক ডাল তুমি ভরে দিবে শ্বেত শুভ্র ফুলে। আলতো হাতে জড়িয়ে দিবে মুক্তোর মালা। ঝুলিয়ে দিবে মণি-মাণিক্য কাঞ্চন ঝরোকা। যেন ওরা সবাই রাজ রাজ্যেশ্বরী।  

আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখব আকাশের শব্দহীন কারুকাজ। কি শান্ত উদার হাতে সে পাঠাচ্ছে তুষার পালক। একের পরে এক।     
আর সেই পালক হয়ে আসছ তুমি!  
তুমি নীরবে নিঃশব্দে সাদা চাদরের ভাজে ভাজে মুড়ে দিবে মাঠ  ঘাট, গাছ পালা, বাড়ি ঘর, পথ প্রান্তর। রঙহীন পৃথিবী সেজে উঠবে চোখ ধাঁধানো সাদা রঙে। যে রঙের কাছে হার মেনে যাবে রমাধনুকের সাতটি রঙ।  
 
ওসব কথা থাক এখন।
তুমিতো তোমার চেনা সেই রূপে আসনি এবার। এবারের তোমাকে নিয়েই নাহয় দু’কথা বলি। শীতের শুরু থেকে যে প্রতীক্ষা ছিল প্রকৃতি ও মানুষের তার অবসানে তুমি এলে।  
তোমার আসার আগে থেকেই কতো কতো সাবধান বানী শুনছিলাম আমরা।
তাই স্নো শুরু হওয়ার আগের দিন গ্রোসারি স্টোর থেকে ব্রেড বাটার ইত্যাদি সব উধাও হয়ে গেলো।    
হবেইতো। মানুষজন পিঁপড়ার সারির মত ছুটেছে দুর্দিনের খাবার সঞ্চয় করতে। সাবধানবানী ছিল বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটতে পারে। লাইট পানি চুলা হিটার চলে যেতে পারে। সব কিছুর জন্যই তৈরি ছিলাম আমরা।    
     
২২ ষে জানুয়ারী, শুক্রবার দুপুর থেকে তুমি এলে।   
তোমার নাম দেয়া হয়েছে ‘জোনাস’। বলা হোল গত একশত বছরেও নাকি আমরা তোমার এই রূপ দেখিনি। তুমি কতোটা ভয়াল হতে পার তাও বলা হোল বারে বারে। আমরা যেন সাবধান থাকি। আমরা সাবধানই ছিলাম।
এবং নিজের চোখে দেখলাম এবার আর আগের মত নরম আলতো পায়ে নয়, তুমি এলে বড় বেশী বেপরোয়া। বড় বেশী খামখেয়ালী হয়ে। প্রথমে মৃদু তারপর ক্রমেই বেড়ে গেল তোমার তীব্রতা। ক্ষিপ্র বেগে নেমে এলে। তুষারের তুলতুলে বল নয়, তীক্ষ্ণ ফলা হয়ে।      

আহাহা! তবু তুষার বলেইনা কথা। সে তুমি বল হও আর  ফলাই হও, তুষার মানেইতো কোমলতা। রেনু রেনু মুগ্ধতা!  
আমি কি অস্বীকার করতে পারি যে এতকিছুর পরও আমি বা আমরা মুগ্ধ চোখে জানালায় দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখিনি!
ফেইসবুকের পাতা ভরে গেলো তোমার ভয়ঙ্কর সুন্দর ছবিতে।
আর তুমিতো চিরকালই নিঃশব্দে চলাফেরা কর। আমরা স্তব্ধ হয়ে আবারো দেখলাম, আকাশ বেয়ে অবিশ্রান্ত নেমে আসছে শুভ্র সুন্দর তুষার। শব্দহীন শুভ্রতায় ঢেকে দিচ্ছে বিশ্ব চরাচর।    
 
শুক্র গেল, শনিবার এল। সকাল, দুপুর, রাত পেরিয়ে তবে তুমি ক্ষান্ত হলে। ততক্ষণে তুষারের স্তূপের অতলে তলিয়ে গেল উত্তরপূর্ব ও মিড-আটলান্টিকের শহরগুলি।  
তোমার অবিরল বর্ষণে নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট   আর ওয়াশিংটনে স্থবির হয়ে গেল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশ থেকে চল্লিশ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষার পড়েছে নানা জায়গায়।  

ঝড় শেষ হতেই দুয়ার খুলে বেরিয়ে দেখি, ওমা একি কাণ্ড!   এ যে দেখছি দুনিয়া জোড়া তুষার! যেদিকে চোখ যায় সবই ধবধবে সাদা। দিগন্ত বিস্তৃত তুষার দেখে আমরা মেট্রোবাসীরা অভ্যস্ত। প্রতি শীতেই বার কয়েক তোমার দেখা পাই। কিন্তু এবারের দৃশ্যটা ভিন্ন। কারন এর উচ্চতা কয়েক ইঞ্চি নয়। কয়েক ফুট।
ভয়ঙ্কর সুন্দরের এই বিষম পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ঘরের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কার! তবে ভাগ্য ভাল এতো ঝড়েও অন্তত আমাদের এই ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো (ডিসি, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়া) এলাকার কোথাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া যায়নি।

 
বিদ্যুৎ বিভ্রাট হোক বা না হোক স্নোজিলার কবলে পড়ে গৃহবন্দী হয়ে গেলাম আমরা সবাই।
হাইওয়ে গুলিতে স্নো স্টোর্মের মাঝেও স্নো-ট্রাক ঘুরছে অবিরত। তুষার ক্লিন করছে। কমিউনিটির ভিতরের রাস্তাগুলিতে স্নোট্রাক আসতে শুরু করলো ঝড় থামার পরে।   
 
রবিবার সকাল।
আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। আকাশে সোনার বরণ সূরুজ। কি তার তেজ! কি যে কিরণ! শীতকালের সূর্যে আগুনের রেনু ছোটে। সেই সোনালী কিরণ বরফের ধবধবে সাদা চাদরে প্রতিফলিত হয়ে ঠিকরে উঠছে রামধনুকের   জ্যোতি। ঝলমলিয়ে জ্বলছে চতুর্দিক।    
ছুটির দিন। বেলা করে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয়ে গেলো যার যার ড্রাইভওয়ে ক্লিন করার ধুম।      
স্নো পড়া শেষ হলে শীতও যায় কমে। আরামদায়ক আবহাওয়া। শিশু কিশোররা স্নোবল আর স্নোস্কেটিং করতে নেমে গেছে। বাতাসে ভাসছে তাদের হাসি আনন্দ উচ্ছাস।
শীতের সময় বর্ণ গন্ধের মতই ধ্বনিও প্রখর হয়। ওদের হাসির হিহি! হাহা! তরঙ্গ তাই দূর থেকেও স্পর্শ করা যাচ্ছে।
 
ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এরিয়া জুড়ে স্নো পড়েছে প্রায় চৌত্রিশ ইঞ্চি(ওয়াশিংটন পোস্ট)। শাবল ঠুকে ঠুকে সেই বরফ সরানো কি আর চাট্টিখানি কথা!      
তারপরও সবাই এই কঠিন কাজটা করছে এবং হাসি মুখেই। ফেইসবুকের কল্যানে তাদের হাসি মুখের ছবিগুলোও আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম। কার ড্রাইভওয়ে কখন পরিষ্কার হোল তাও জানা হয়ে যাচ্ছে।      
আমাদের উল্টো দিকের বাসার মাঝ বয়সী জুলি আর এড অনেক ক্ষণ ধরে শোভেল করছিল। মাঝে মাঝে ব্লোয়ার দিয়ে বরফ কুঁচি উড়াচ্ছে। একসময় দেখি তুষারের নিচে থেকে বেরিয়ে এলো তাদের সুরমা আর কালো রঙের দু’খানা গাড়ি। হাতের গ্লাভস থেকে বরফ কুঁচি ঝাড়তে ঝাড়তে ওরা দুজন হা হা করে এমন জোরে হেসে উঠলো যেন সাগর তলা থেকে এইমাত্র টাইটানিক উদ্ধার করে ফেলেছে।        
    
সোমবার রাতের বেলা গ্রোসারি স্টোরে যাওয়ার পথে একটু  শহর তথা বরফ দেখতে বের হলাম। বেরিয়েতো অবাক!   
যেদিকে দু’চোখ যায় শুধু ধবধবে সাদা পুঞ্জীভূত তুষার আর তুষার। এতটুকু ফাঁক নেই। অরণ্য জোড়া গাছগুলো তুষার ফুলে ফুলে ছাওয়া।

আদিগন্ত বিস্তীর্ণ সেই সাদা প্রান্তরের বুক চিরে চলে গেছে ঝাঁ  ঝকঝকে পিচঢালা কালো পথ। পথের দুপাশে খাড়া বরফের উঁচু প্রাচীর। প্রাচীরের দুই পার শুভ্র সমুজ্জ্বল।
রাত্রির আলো আঁধারীতে সবকিছু বড় মায়াবী লাগছে! আহ! কি ভয়ঙ্কর সুন্দর!

আকাশের দিকে চোখ গেল, শীতার্ত পৃথিবীর তারারা আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলছে আর নিভছে। চন্দ্রিমায় ঝরছে আলোর শিহরণ। আমি জানি এই রকম সময়ে ঝরনা আর লেকের জল তরল রূপো হয়ে যায়।  
ছোট ছোট গাছের ঝাড়ে বরফের ঝুলন্ত ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি দুলছে। শাণিত কচকচে শীতের বাতাস।
 
এরি মাঝে হটাৎ দেখি বরফ ডোবা পথের ধারে বাঁকা ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘকায় যুবক ঝনঝনিয়ে ইলেকট্রিক গিটারে সুর তুলে গাইছে – ওহ! দ্যা ওয়েদার আউটসাইড ইজ ফ্রেইটফুল/ বাট দ্যা ফায়ার ইজ সো ডিলাইটফুল/ অ্যান্ড সিন্স উই হ্যাভ নো প্লেস টু গো/ লেট ইট স্নো! লেট ইট স্নো! লেট ইট স্নো ......। ডিন মারটিনের অমর সঙ্গীত।
আমরা কেউই এই মুহূর্তে আর বাড়তি স্নো চাইনা। কিন্তু  তারপরও গানটা শুনতে অদ্ভুত ভালো লাগছে।
 
 
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates