News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৬ জানুয়ারী ২০১৮, মঙ্গলবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow মৃত্যু না হত্যাকাণ্ড?
মৃত্যু না হত্যাকাণ্ড? প্রিন্ট কর
আশরাফ আহমেদ. মেরিল্যান্ড   
বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক তথ্য-নির্ভর একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক কাহিনী

মাইকেল ব্রাউনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে আজ সন্ধ্যায়।
গতকাল সে অপিসে যায়নি। অথচ গতকাল ওর জন্যই অপিসের সবাই অপেক্ষা করছিল। মূল সিদ্ধান্ত ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটি মুলতবি করতে হয়েছিল। ওর কাজের যা ধরণ, তাতে সময় মত কাজে না আসা এমন অসম্ভব কিছু নয়। তবুও নিয়ম অনুযায়ী অপিস থেকে ওর সেলফোনে এবং বাড়ির নম্বরে কয়েকবার ফোন করা হয়েছিল। কোন সাড়া মেলেনি। সাড়া না পাওয়াও এমন অসম্ভব কিছু নয়। কাজেই ব্যপারটি নিয়ে ওর সহকর্মী বা বস কেউই কোন সন্দেহ করেনি। ব্যতিক্রম ছিল একজন। লোকটির বন্ধু ও সহকর্মী মুশতাক। বাংলাদেশের যে পরিবেশে সে মানুষ হয়েছে, সেখানে সৎচিন্তা বা পজিটিভ থিঙ্কিং এর বড়ই অভাব ছিল। ফলে অভ্যাস অনুযায়ী সে সব ঘটনারই দ্বিতীয় একটি কারণ আগাম চিন্তা করে রাখে। মাইককে তাই সে বারবার সাবধান করে দিয়েছিল। মাইক মুশতাকের সাবধান বানীকে কোন গুরুত্ব দেয়নি। বলেছিল, তোমাদের বাংলাদেশে এধরণের খুনখারাবি হতে পারে। আমেরিকার এই ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় আমি সে ভয় করি না। তাছাড়া আমাদের অপিস, বাসা, এবং প্রাত্যহিক যাতায়তের পথে অসংখ্য সিকিউরিটি ডিভাইস রাখা আছে। তুমি যে আততায়ীর কথা ভাবছো, তার সেসব অজানা থাকার কথা নয়। তবুও আমি সাবধান থাকবো।
টেক্সাস এ এন্ড এম ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকেই মাইকের সাথে মুশতাকের বন্ধুত্ব। মুশতাক উদ্ভিদ-প্রজনের ওপর পিএইচডি গবেষণা করছিল। মাইক ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ন্যানো টেকনোলজিতে। দুবছর আগে পড়া শেষ করে মাইক এফবিআই বা ফেডারেল বুরো অফ ইনভেস্টিগেশন নামের গোয়েন্দা সংস্থার চাকুরিতে যোগ দিয়েছিল। বিদেশি বলে মুশতাক যখন ভাল কোন চাকুরি পাচ্ছিল না, তখন মাইকই সুপারিশ করে ওকে এফবিআই-তে ঢুকিয়েছিল আঠারো বছর আগে। পদোন্নতি  হয়ে হয়ে মাইক হয়েছিল একজন স্পেশ্যাল এজেন্ট – বাইরে বাইরে কাজ। মাঝে মাঝে অপিসে আসতো। মুশতাকের কাজ ছিল শুধুই অপিসে। এন্যালিস্ট হিসেবে ওরও অনেক গুলো পদোন্নতি হয়ে এখন সে বেশ বড়সর একটি জাতীয় নিরাপত্তা ডেস্কের দায়িত্বে। গুপ্তচররা যেসব গোপনীয় ও সাংকেতিক তথ্য জোগাড় করে আনে মুশতাক সেসব ব্যবচ্ছেদ করে উর্ধতনের কাছে রিপোর্ট পাঠায়।      
পরদিন দুপুর পর্যন্ত কোন সংবাদ না পেয়ে অপিস থেকে পুলিশকে জানানো হলো। সন্ধ্যায় বাড়ির পেছনের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে মাইকের মৃতদেহ পাওয়া গেল। বসার ঘরের সোফায় এলিয়ে পড়া অবস্থায়। প্রাথমিক পরীক্ষায় মনে করা হচ্ছে হৃদপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা আগে। অর্থাৎ ১২ই জুন ভোর চারটায় ওর মৃত্যু হয়েছে।  
মাইকের শরীর এমনিতেই কিছুটা স্থুল ছিল। তার ওপর হৃদপিণ্ড-জনিত রোগ বা কার্ডিও ভাস্কুলার ডিজিজে আমেরিকায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় মাইকের মৃত্যুর কারণটিকে কেউ বিশেষ সন্দেহ করলো না। কিন্তু অপিসের কর্তা ব্যক্তিরা আশাহত হলেন অন্য কারণে। মাইকেল ব্রাউন আমেরিকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে রাশিয়ার চক্রান্ত উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছিল। সেই চক্রান্ত সম্পর্কে এপর্যন্ত যা যা জানা গেছে, তা গুপ্তচরবৃত্তিতে ওর বিশেষ পারদর্শিতার ফলেই সম্ভব হয়েছিল। ওর কাজটি ছিল অতি গোপনীয় বা টপ সিক্রেট। এফবিআই এর ছয় প্রধান ব্যক্তির বাইরে মাইকেল ব্রাউনের কাজের কথা আর কেউ জানে না। মুশতাক জানে মাইকের সাথে ওর ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণে। গতকালের মূলতবি সভায় মাইকের নতুন উদ্ঘাটন করা তথ্য জানানোর কথা ছিল। মাইকের মৃত্যুতে কর্তা ব্যক্তিদের জন্য কাজটি এখন বেশ পিছিয়ে পড়বে। সবকিছু প্রায় নতুন করেই শুরু করতে হবে।
পরদিন পোস্ট মর্টেম রিপোর্টেও হার্ট এটাককেই মাইকেল ব্রাউনের মৃত্যুর সাম্ভব্য কারণ হিসেবে বলা হলো। কিন্তু বর্তমানে আমেরিকান নাগরিক মুশতাক ঠিকই জানে যে প্রায় কুড়ি বছর আগে বাংলাদেশে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামের এক পদ্ধতিতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করে অনায়াসেই মানুষ মারা হয়েছে। কাজেই মাইকের মৃত্যুর অন্য কোন কারণ সে খুঁজতে লাগলো মনে মনে।
সে সহজেই মাইকের ‘মৃত্যুর কারণ সন্ধান কমিটি’তে স্থান করে নিয়েছিল। কাজেই পোস্ট মর্টেম এবং ফোরেনসিক রিপোর্ট দেখা, এবং বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন করা এবং পরামর্শ দিতেও ওর আর কোন অসুবিধা রইলো না।
মাইকের বাড়ির চারিপাশে যত ধরণের দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য সিকিউরিটি ডিভাইস আছে তাতে মাইক এবং মুশতাক ছাড়া গত তিন সপ্তাহ থেকে আর কোন মনুষ্য প্রাণীর আসা যাওয়া বা উপস্থিতি টের পাওয়া যায় নি। মৃতদেহের আশেপাশের কার্পেট বা সোফার নমুনা পরীক্ষা করেও তৃতীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতি প্রমাণ করা গেল না। কাজেই তদন্তকারীরা মৃত্যুটিকে হার্ট এটাকের বাইরে অস্বাভাবিক কিছু ভাবতে পারছে না। মোটামুটি এরকম একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়ার জন্য সবাই প্রস্তুত হয়ে আছে।
অপিসের প্রাত্যহিক কাজের ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে মুশতাক কমিটির সভা এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়ার অনুরোধ করলো। এক সপ্তাহ পর মুশতাক কমিটিকে জানালো যে মাইক হার্ট এটাকে মৃত্যুবরণ করে নাই। ওকে হত্যা করা হয়েছে।
কে, কোথায় ওকে হত্যা করেছে?
রাশিয়ার চরদের কেউ, মাইকের বসার ঘরের সোফায় যেখানে ওর মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
তা হলে সিকিউরিটি ক্যামেরায় ধরা পড়লো না কেন?
আমাদের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকলেও আমাদের ইলেক্ট্রনিক নেটওয়ার্কে রাশিয়ার এজেন্টরা ফাঁকি দিয়ে যেভাবে ঢুকে পড়েছিল, আমাদের সিকিউরিটি ক্যামেরাও তেমনি ভাবে অকার্যকর হয়ে থাকতে পারে। তবে এর কারণ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। একটি সাম্ভব্য কারণ হতে পারে এই, যে স্টিলথ প্রযুক্তিতে আকাশে অতিকায় যুদ্ধ বিমান অদৃশ্য এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, আততায়ী তেমন কোন অদৃশ্য আবরণ নিয়ে এসেছিল!
তা আততায়ী যে এসেছিল তার কী প্রমাণ? কী করে জানলে যে আততায়ী এসেছিল?
সেই প্রমাণ আমার কাছে আছে। কিন্তু প্রমাণের ব্যপারটি আমি এই মুহূর্তে কমিটির কাছে দিতে পারবো না। প্রমাণ সংগ্রহের অতি গোপনীয় পদ্ধতি ও প্রযুক্তিটির একটি বিরাট ব্যবসায়িক দিক আছে। আবিষ্কারক কোম্পানিটি পেটেন্ট এর জন্য দরখাস্ত প্রস্তুত করছে। সেই দরখাস্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট অপিস গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত আমি কারো কাছে তা প্রকাশ করতে পারবো না। প্রকাশ করলে যে কোম্পানি এই প্রযুক্তি ও পদ্ধতিটি আবিস্কার করেছে, তাদের পেটেন্ট রাইট থাকবে না। তবে শুধুমাত্র অনুসন্ধান কমিটি’র প্রধানের কাছে প্রকাশ করার উকিলের পরামর্শ আমি নিয়ে এসেছি। আপনারা যদি তাতে রাজি হোন, তবে আমি সেই আবিষ্কারক বিজ্ঞানীকে নিয়ে আসতে পারি।
পরদিন মুশতাক অপিসে এলো ওর এক বন্ধুকে সাথে  নিয়ে। ঢোকার পথে বন্ধুর পরিধেয় বস্ত্র ছাড়া হাতের ঘড়ি, চাবি, সেলফোন, টাকার খলতে বা মানিব্যাগ, কলম এবং কাগজপত্র,  সবকিছু নিরাপত্তা প্রহরীদের কাছে ছেড়ে আসতে হলো। কমিটি চেয়ারম্যান ওদের সাথে নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ ঘরে ঢুকে ইলেক্ট্রোনিক বোতাম টিপে দরজাটি বন্ধ করে দিলেন। বাইরে থেকে এখন আর কেউ ঢুকতে পারবে না। বেরোতে চাইলেও একই দরজা দিয়ে বা নিজ ইচ্ছায় রেরোনো যাবেনা। ঘর থেকে যেন কোন শব্দ বাইরে বেরোতে না পারে চেয়ারম্যান টেবিলের বোতাম টিপে তেমন ব্যবস্থাও করলেন।
মুশতাক বললো আমার বরাবরই সন্দেহ ছিল যে মাইককে হত্যা করা হয়েছে, এবং খুব সম্ভবতঃ ওর বাসাতেই। এই সন্দেহের প্রধান কারণ মাইক রাশিয়ার যেসব কারসাজির ওপর কাজ করছিল তার গোড়ায় ছিল প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত কয়েক বছরে রাশিয়ার যে ছয় হাই প্রোফাইল ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিরুদ্ধাচরণ করেছে বা যেসব ব্যাক্তির মুখ থেকে পুতিনের জড়িত থাকার কথা বের হতে পারে তাদের সবাইকে এমন সব অভিনব পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়েছে যে মনে হয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এই জন্য ‘ভ্লাদিমির পুতিন’-কে আমি বাংলায় অনুবাদ করেছি ‘ভাদাম্যার পুত’ হিসেবে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছিল যে আমাদের গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি বানচাল করার জন্য সে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছিল। আমাদের স্পেশ্যাল এজেন্ট মাইকেল ব্রাউন সম্ভবতঃ সেই তথ্যের হাতেনাতে প্রমাণ সংগ্রহ করে ফেলেছিল। তা প্রকাশ করার আগেই ওকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে অভিনব কোন পদ্ধতিতে।   
আমার ধারণা সত্যি হলে আততায়ী মাইকের বাসায় ঢোকার কোন না কোন আলামত থাকার কথা। অথচ আমাদের ফোরেনসিক বিভাগের কোন প্রযুক্তিই অন্য কারো উপস্থিতির নমুনা পাচ্ছিল না। হয়তো ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণেই আমিও ওর মৃত্যুটিকে মেনে নিতে পারছিলাম না। দুঃখে ও দুশ্চিন্তায় তাই নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছিলাম।
ঠিক সেই সময় এক সন্ধ্যায় আগে থেকে নির্ধারিত এক বন্ধুর বাসার পার্টিতে গেলাম। খাওয়ার টেবিলে সচরাচর যা হয়ে থাকে – নদীরপাড়ে মাছের দাম থেকে শুরু করে মঙ্গলগ্রহে মানুষ কবে বসতি স্থাপন করতে পারবে - একের পর এক সবই আলোচনা হলো।
মুশতাক এবার ওর সাথে থাকা বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললো, হঠাৎ লক্ষ করলাম আমাদের এই বন্ধু ডঃ নুর হাসান বিশেষ কথা বলছেন না। তিনি মেটাজেনোমিক্স পদ্ধতিতে হিউম্যান মাইক্রোবায়োম নিয়ে কাজ করেন। আজ চুপচাপ বসে শুধু সবার কথা শুনে যাচ্ছেন। তিনি মেটাজেনোমিক্স পদ্ধতিতে জীবানুর গবেষণা করে থাকেন। তাঁকে বললাম, হিউম্যান মাইক্রোবায়োম নিয়ে গবেষণায় আপনারা নতুন কী আবিষ্কার করলেন? তিনি মজার মজার অনেক তথ্য জানালেন। তাঁর আলোচনা থেকে আমার মাথায় এক বুদ্ধি এলো।
সেসব কথায় যাওয়ার আগে আপনাকে হিউম্যান মাইক্রোবায়োম সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেই। আপনি হয়তো এর অনেক কিছুই জানেন, তবুও আমি কীভাবে রাশিয়ার কোন আততায়ীকে সন্দেহ করছি তার জন্য ব্যকগ্রাউন্ড কিছু তথ্য দিচ্ছি। মানুষ এবং উচ্চতর সব প্রাণীর ত্বক, চুল, লোম, নাক, মুখ, কান, হাত, পা, হাঁটু, কনুই, মুখগহবর, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত, এবং বৃহদান্ত্র, সর্বত্রই অসংখ্য জীবানুতে ভর্তি। মানুষের বেলায় আমাদের শরীরের নিজস্ব জীবকোষ থেকে এই জীবানুকোষের সংখ্যা শতগুণ বেশি। এই সমস্ত জীবানুর সম্মিলিত আচরণ ও হজম বা মেটাবোলিজম একটি মানুষের শারিরীক স্বাস্থ্য তো বটেই, এমন কী, তার আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
কাজেই একটি লোকের সার্বিক ব্যক্তিত্ব শুধু সেই মানুষটির ওপরেই নির্ভর করে না। অনেকটাই নির্ভর করে সেই দেহটিতে বহন করা লক্ষকোটি জীবানুর সম্মিলিত আচরণের ওপর। মানুষের শরীরের এই জীবানুগোষ্ঠীকে বলা হয় হিউম্যান মাইক্রোবায়োম।
কমিটি চেয়ারম্যান অধৈর্য হয়ে বললেন, কিন্তু তাতে রাশিয়ার আততায়ী কীভাবে সনাক্ত হলো?
মুশতাক বললো, আমি সেটাই বলতে যাচ্ছি। আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়েও আমি সবসময় বাংলাদেশের কথা ভাবি বলে তোমরা আমাকে অনেক সময় মষ্করা করেছো। কিন্তু আশ্চর্যের কথা কি জান? শিশুদের নিয়ে গবেষণায় চার বছর আগে এই তোমাদের স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাই আবিষ্কার করেছেন যে বাংলাদেশে বাস করা লোকদের মাইক্রোবায়োম আমেরিকায় বাস করা লোকদের মাইক্রোবায়োম থেকে যথেষ্ঠ স্বতন্ত্র! আবার এই গতবছর ভারতের পূণা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন যে একজন ভারতীয় নাগরিকের মাইক্রোবায়োম একজন বাংলাদেশির মাইক্রোবায়োম এর খুব কাছাকাছি কিন্তু আমেরিকান মাইক্রোবায়োম থেকে যথেষ্ট আলাদা। ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিবেশি হওয়া ছাড়াও দুই দেশের আবহাওয়া, অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, খাদ্য, ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে খুবই নিকট। অর্থাৎ ভৌগলিক-আর্থ-সামাজিক সামঞ্জস্যের সাথে হিউম্যান মাইক্রোবায়োম এর সামঞ্জস্য আছে।  
অন্যদিকে প্রতিবেশী হয়েও সীমান্তের একপাশে রাশিয়ার শিশুদের মাইক্রোবায়োম সীমান্তের ওপাশের ফিনল্যান্ড এবং এস্টোনিয়ার শিশুদের মাইক্রোবায়োম থেকে সহজেই পার্থক্য করা যায়। তা থেকে আমার ধারণা হলো যে রাশিয়ার লোকদের মাইক্রোবায়োম-এ কি এমন কোন বিশেষ জীবানু আছে যা দিয়ে ওদের চিহ্নিত করা যায়?
এখানেই আমি আমার বন্ধুর নতুন গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। সেদিন সন্ধ্যায় আমার প্রশ্নের উত্তরে ডঃ নুর হাসান বলেছিলেন একজন মানুষের মাইক্রোবায়োম সে যা খায় এবং তার জীবনযাত্রা কেমন তার ওপর নির্ভরশীল। যেমন মেদবহুল শরীরে ফ্যাটি এসিড ভালবাসে এমন ব্যক্টেরিয়া বেশি থাকে। সাধারণতঃ একটি পরিবারের সব সদস্যের জন্য একই ধরণের খাবার রান্না করা হয়। সেই খাবারে প্রোটিন যেমন বেশি থাকতে পারে, তেমনি তৈলযুক্ত বা কার্বোহাইড্রেট এর প্রাধাণ্য থাকতে পারে। একই ধরণের খাবার খায় বলে সেই বাড়ির সব সদস্যের গায়ে সাধারণতঃ একই ধরণের মাইক্রোবায়োম থাকে।
আবার একজন ক্রীড়াবিদের শরীর থেকে বেশি ঘাম বের হয়, ফলে ওর চর্মে ল্যাক্টোব্যাসিলাস ধরণের ব্যক্টেরিয়ার আধিক্য থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি চেয়ার টেবিলে বসে সময় কাটায় এবং কম ঘামে, ওর ত্বকে ল্যাক্টোবেসিলাস ব্যক্টেরিয়া কম থাকে। মাইক্রোবায়োম এভাবে একেক পরিবারের সদস্যের একেক রকম হয়ে থাকে।
শুধু তাই নয়, মহিলাদের মাইক্রোবায়োম পুরুষদের মাইক্রোবায়োম থেকে আলাদা করে বোঝা যায়। উদাহরণ স্বরূপ মেয়েদের মুখে সাধারণতঃ ব্রণ হয়ে থাকে। সেই ব্রণের গোড়ায় এক বিশেষ ধরণের ব্যক্টেরিয়া বাসা বাঁধে।  
আবার একজন মানুষ যখন একটি ঘরে ঢোকে, তখন ওর অঙ্গ সঞ্চালনের সাথে সাথে অগণিত জীবানু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এক বাড়ির সদস্যদের প্রায় সবার গায়ে থাকে একই ধরণের জীবানু। অন্য বাড়ি থেকে কেউ এ বাড়িতে এসে যে চেয়ার বা সোফায় সে বসলো, অথবা যে ঘরে সে গিয়ে দাঁড়ালো, সেখানে অন্য বাড়ির বিশেষ বা সিগনেচার জীবানু ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই বাতাস অথবা আসবাবপত্র থেকে স্যাম্পল তুলে নিয়ে মেটাজেনোমিক্স পদ্ধতিতে জীবানুগোষ্টী কী তা বের করলেই বলে দেয়া যায় এই ঘরে অন্য বাড়ির লোক এসেছিল কি না, এবং সেই প্রবেশকারী পুরুষ, মহিলা, বা শিশু ছিল কিনা।
ঠিক সেই সময় মাইকের বাসায় কোন আততায়ী ঢুকে থাকলে তা ওর ঘরের বাতাস বা সোফার জীবানুগোষ্ঠী পরীক্ষা করে বের করা যায় কিনা সে চিন্তা আমার মাথায় এলো। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় সবার সামনে আমি ডঃ নুর হাসানকে তা বললাম না। চুপ রইলাম।
খাওয়ার পর এক ফাঁকে পানপাত্রটি হাতে নিয়ে আমি ডঃ নুর হাসানকে সাথে নিয়ে বাইরে বাগানে হাঁটতে বেরোলাম। তাঁকে বললাম হিউম্যান মাইক্রোবায়োম নিয়ে আপনি এতোক্ষণ যা বললেন তাতে ধারণা করি মেটাজেনোমিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে কোন ব্যক্তিটি ঢুকেছিল একদিন তাও বের করা যাবে।
তিনি বললেন হ্যাঁ তা হয়তো যাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা এখন কি আপনারা বলতে পারবেন ঘরে কোনো বাঙালি ঢুকেছিল কিনা?
তিনি অনেক্ষণ চুপ থেকে হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
আমার ঠিক মুখোমুখি হয়ে বললেন, দেখুন আমি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরি করি। আমাদের সব বৈজ্ঞানিক কাজই ব্যবসায়িক স্বার্থের সাথে জড়িত। আমাদের প্রতিযোগী অনেক। আপনি যদি পৃথিবীর আর দ্বিতীয় কোন প্রাণিকে না বলেন তবে এ নিয়ে আপনার সাথে এ নিয়ে আরো কথা বলতে পারি। আমি বললাম, কথা দিলাম কারো কাছে আমি মুখ খুলবো না।
ডঃ নুর হাসান বললেন এখন আপনাকে যা বলছি তা অত্যন্ত গোপনীয়। আমার এই আবিষ্কার নিয়ে আমাদের কোম্পানি মাল্টি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার মুখ দেখবে বলে আশা করছে। আমরা পেটেন্ট এর দরখাস্তের কাগজপত্র তৈরী করছি। পেটেন্ট পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের উকিল ছাড়া খবরটি আর কারো কাছে প্রকাশ করার কথা নয়। আপনি সমঝদার লোক বলে বলছি, কিন্তু খবরদার কারো কাছে এব্যপারে মুখ খুলবেন না।
হ্যাঁ, ঘরে কোন টিপিক্যাল বাঙালি ঢুকেছিল কিনা আমরা তা বলতে পারি। তেমনি বলতে পারি জাপানি বা কোরিয়ান বা চিনা ব্যক্তির উপস্থিতি। খাদ্য এবং আচরণগত বৈশিষ্টের জন্য প্রতিটি জাতির একটি সিগনেচার মাইক্রোবায়োম থাকে। ঠিক একই ভাবে আমরা দেখেছি ভদকা বেশি পান করার ফলে রাশিয়ার লোকদের শরীরে ভদকা পছন্দকারী এসিটোবেক্টার ব্যাক্টেরিয়ার একটি বিশেষ প্রজাতি বাসা বাঁধে। এই বিশেষত্ব অন্য কোন জাতির লোকের শরীরে পাওয়া যায় না বললেই চলে। এ ছাড়াও আরো কিছু বিশেষ বিশেষ ব্যাক্টেরিয়া শুধু রাশিয়ার লোকদের শরীরেই বাসা বাঁধে।
মুশতাক বললো ডঃ হাসানের মুখে এই কথা শুনে আমি মাইকের মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁর সাহায্য চাইলাম। তিনি আমাকে সাহায্য করতে রাজি হলেন এই শর্তে যে তদন্তের স্বার্থে ব্যবহার করলেও তাঁর সাহায্যের কথা এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা আমরা জনসমক্ষে বা কোর্ট কাছারিতে প্রকাশ করতে পারবো না। একবার তাদের কোম্পানির পেটেন্ট রাইট পাওয়া হয়ে গেলে তা প্রকাশ করতে কোন আপত্তি নেই।
এরপর ডক্টর নুর হাসান কমিটি প্রধানের কাছে ওর গোপন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। তিনি মাইকের বাড়ির দরজার হাতল, ঘরের বাতাস, সোফা, কার্পেট, রান্নাঘর, শোয়ার ঘর, পোষাক, ক্লোজেট সব স্থান থেকে স্যাম্পল বা নমুনা নিলেন। নিজের ল্যাবে গিয়ে তা থেকে মেটাজেনোমিক্স পদ্ধতিতে মাইক্রোবায়োম নির্ণয় করলেন। প্রাপ্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে কোনটি মাইকের মাইক্রবায়োম, আর কোনটি মুশতাকের মাইক্রবায়োম তা শনাক্ত করা গেল। এর বাইরেও যে এক ব্যাক্তির মাইক্রোবায়োম পাওয়া গেল তা ছিল শুধুমাত্র সদর দরজা থেকে শুরু করে যে সোফায় মাইককে মৃতাবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল সেখান পর্যন্ত। আর কোথাও সেই মাইক্রোবায়োম না পাওয়ার অর্থ হলো সেই ব্যাক্তিটি রান্নাঘর, শোবার ঘর, খাওয়ার ঘর, বাথরুম, বা বারান্দায় যায়নি। কাজ শেষ করে সদর দরজা দিয়েই চলে গিয়েছিল।
ডক্টর নূর হাসান বললেন বিশ্বজোড়া মানুষের ডাটাবেইজের সাথে মিলিয়ে দেখলাম সেই ব্যাক্তির মাইক্রোবায়োমের সাথে রুশ দেশীয় ব্যক্তির মাইক্রোবায়োমের ছিল অতি সুস্পষ্ট মিল! সময়ের সাথে সাথে একটি নির্দিষ্ট গতিতে বাতাসে মাইকোবায়োমের ঘনত্ব কমে যায়। মাইকের বাড়ির বাতাসে সেই মাইক্রোবায়োমের ঘনত্ব মেপে আরো জানতে পারলাম যে সেই ব্যাক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল মাইকের মৃত্যুর দুই-তিন ঘণ্টা আগে-পিছে। সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মাইকের নাকের চারিপাশে রাশিয়ান অনুপ্রবেশকারীর মাইক্রোবায়োমের নির্ভুল অস্তিত্ব।  
মৃত্যুর ঠিক আগে আগে ওর বাড়িতে এবং ঘরে যে রাশিয়ার কেউ ঢুকেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। এবং সেই সময়ে মাইক সম্ভবতঃ ঘুমে অচেতন ছিল।
এই প্রমাণ হাতে পেয়ে এফবিআই মাইকের মৃত্যুটিকে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করা শুরু করলো। এবং রাশিয়ার সাম্ভব্য আততায়ী খোঁজার দিকে মনোনিবেশ করলো।                        

১৩ই জুন, ২০১৭
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates