News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার      
মূলপাতা arrow খবর arrow প্রবাস arrow শিল্প ও সংস্কৃতি ছায়াছন্দ ও আবেগের গল্প
শিল্প ও সংস্কৃতি ছায়াছন্দ ও আবেগের গল্প প্রিন্ট কর
সজল জাহিদ   
বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭

সময়টা ১৯৯৪ বা ৯৫ সাল হবে। সেই সময়ে কোন গ্রামে একটি টিভি থাকা মানেই, সেই গ্রামের শুধু নয়, পুরো গ্রামের মানুষদের মর্যাদাই অন্য রকম ছিল। অন্য টিভিহীন গ্রামের মানুষের কাছে। আর যাদের বাড়িতে টিভি আছে তারা নিজেদেরকে সেই গ্রামসহ অন্যান্য টিভিহীন গ্রামের মানুষদের কাছে শোষক শ্রেণী হিসেবে পরিচিত পেত! দাপট, আত্ন-অহংকার আর দাম্ভিকতা এমন পর্যায়ের থাকতো! নাহ, সব ক্ষেত্রে নয়, শুধু মাত্র টিভি দেখার ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে থাকতো, আরও বিশেষভাবে বললে, যেদিন টিভিতে বিশেষ আর অনেক আকর্ষণীও বা প্রতীক্ষার কোন অনুষ্ঠান থাকতো। বিশেষ করে শুক্রবার দুপুরের পরে সিনেমা, রবিবার রাত ১০ টার সংবাদের পরে ছায়াছন্দ বা সোমবার রাত ৯ টায় প্যাকেজ নাটক!

আচ্ছা, টিভি যে গ্রামে আছে সেই গ্রামের মানুষদের যদি এই মনোভাব হয়, তবে যাদের ঘরে টিভি থাকতো, তাদের আচরণটা কেমন হত?

সেটা কি আর বলতে, তারা তো নিজেদেরকে মুঘল আমলের জমিদার শ্রেণীর মনে করতো! আর শুধু তারা নিজেরা কেন, সেই বাসায় বা বাড়িতে যারা টিভি দেখতে আসতো, তারা সবাই তাদেরকে মনিব হিসেবে বিবেচনা করতো! যেন ওরা যেটা বলবেই, সেটাই শেষ কথা! ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ কোন কথা বলতে সাহস পেতনা! অন্তত প্রিয় সেই অনুষ্ঠান দেখা পর্যন্ত, গ্রামের অন্যান্য টিভিহীন মানুষ আর যাদের টিভি ছিলনা তাদের মধ্যে এমন একটা নীরব, অস্বীকৃত কিন্তু বাস্তব সম্পর্ক বিরাজ করতো!

এক রোববার। শীতের রাত। কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে জুবুথুবু হয়ে, রাতের খাবার খেয়ে সবাই জড়ো হতে লাগলো, টিভি যাদের বাড়িতে আছে সেই বাড়িতে। টিভিটা বারান্দায় বের করে জানালার সাথে টেবিলের উপরে রাখা হয়েছে। বাইরের উঠানে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেই পাটি বিছানো হয়েছে। তার পিছনে বস্তা ও শুকনো পাতা দিয়ে বিছানার মত, এর পিছনে বেঞ্চ পেতে রাখা হয়েছে। আর যাদের নিজেদের চেয়ার আছে, তারা নিজ নিজ চেয়ার পেতে চারদিকে বসেছে।

মোটামুটি সবাই সেট হয়েছে বসেছে, শীতের কাপড় আর অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে।
দুইপাশে আর পিছনে শুকনো খড়কুটা আর পাতা দিয়ে আগুন জালানো হয়েছে। একটু উষ্ণতার জন্য। টিভিতে রাত ১০ টার সংবাদ শুরু হল, ২০/২৫ মিনিটের সংবাদ। সবাই বেশ উত্তেজনা নিয়ে বসে আছে, সংবাদ শেষ হলেই শুরু হবে সুরে আর ছবিতে ভেসে যাওয়া ছায়াছন্দ!

আহা! কিসব গান, শাবান, রোজিনা, চম্পা আর হালের মৌসুমি বা একেবারেই নবাগত শাবনুর! আর নায়কদের মধ্যে হট ফেভারিট তরুন সালমান শাহ্‌। আর আলমগির বা রাজ্জাক তো ছিলই। সে যাই হোক, কিছু নাচ-গান দেখা আর শোনা হবে, সবাই বেশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে। খবরের মাঝের বিরতি দেয়া হল, তার মানে আর ১০ মিনিট পরেই খবর শেষ হবে, আর তারপরেই সেই প্রত্যাশিত ক্ষণ ছায়াছন্দ শুরু হবে।

সংবাদ শেষ। সবাই একটু নড়ে চড়ে বসলো। সংবাদ শেষে শুরু হল বিজ্ঞাপন, যেটা সব সময়ই হয়ে থাকে। বিজ্ঞাপন একটার পর একটা আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু ঘোসিকা আর আসেনা, সবাই উসখুস করছে। ফিসফিস করে দুই একটি কথাও যেন টিভি যাদের তাদের কানে না যায়, তাহলে আবার উঠিয়ে দিতে পারে সেই ভঁয়ে!

বেশ অনেকক্ষণ বিজ্ঞাপন হবার পরে ১০:৪৫ এর দিকে বেশ সুন্দরী এক ঘোসিকা এলেন, দারুণ সাজুগুজু করে। এসেই একটি মিষ্টি হাসি দিলেন, যেটা সব সময়ই দিয়ে থাকে। সবাই এবার বেশ সরব। দুই একজন শিশও দিলো বোধয়! কয়েকজন হাততালি উত্তেজনায়, আর কেউ কেউ উঠে দাড়িয়ে গেল অতিরিক্ত আনন্দে, যদি আর একটু সামনে গিয়ে আর একটু বেশী করে দেখা যায়! সেই আশায়।

ঘোষিকা তার সেই মিষ্টি হাসি ধরে রেখেই ঘোষণা দিচ্ছেন,

“এবার আপনাদের জন্য রয়েছে…… (সবাই তার কান খাড়া করে রেখেছে..!)

নজরুল সঙ্গীতের অনুষ্ঠান, সূর লহরী……!!”

সূর লহরীর ঘোষণা যেন নয়, এক একজনের মাথায় বাজ পড়লো! দুঃখে-কষ্টে আর যন্ত্রণায় কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছেনা। পারলে চেয়ার ভেঙে ফেলে কেউ-কেউ!

গ্রামের সেই শীতের রাতে, কনকনে ঠাণ্ডায় সেই রাত ৯ টা থেকে বসে ছিল সবাই। হায়! কি দুঃখটাই না সবাই পেয়েছিল সেদিন, দেখতে না পেয়ে প্রিয় ছায়াছন্দ আর প্রিয় কিছু গান।

আর আজকাল এমনই দিন এলো, যে একসাথে আর টিভিই দেখা হয়না, সিনেমা বা গান তো দূরের কথা। ওসব তো এখন সবার মোবাইলেই আছে ভুরিভুরি। যার যখন আর যেটা খুশি দেখতে পারে।

তবে সেই দিনের কথা মনে পড়লে আজও সেইসব মানুষ আর মুহূর্তের জন্য কেন যেন দুঃখ হয়, কত অল্পতেই তখন সবাই খুশি হত, কত অল্পতেই আবার দুঃখ পেত আর কত অল্প আনন্দের জন্য সবাই এক হত!

প্রযুক্তি আমাদের অনেক অনেক আনন্দ আর উপলখ্য দিয়েছে কিন্তু সত্যিকারের আবেগ আর ভালোবাসাটা কেড়ে নিয়েছে।
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates