News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২০ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow কিছু স্মৃতি-কিছু কথা
কিছু স্মৃতি-কিছু কথা প্রিন্ট কর
সেলিম রেজা নূর, নিউইয়র্ক   
শনিবার, ২৮ অক্টোবর ২০১৭


২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর – অক্টোবরে গেলাম আমার কাজে ওয়াশিংটনে। হঠাৎ আমার প্রোগ্রাম অফিসার একদিন বিকালে জানালেন পরেরদিনের কার্যসুচী কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে – ফলে আগের নির্ধারিত কর্মসুচী মেরীল্যান্ডের এক ইমাম সাহেবের সাথে বৈঠকের পরিবর্তে আমরা ওয়াশিংটন ডিসি’তেই ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট সংলগ্ন আই পি ইউ এস (ইন্সটিটিউট অফ পীস ইউনাইটেড ষ্টেটস)-এ বাঙলাদেশের উপর একটি কর্মশালা হবে আর সারাদিন ধরেই সেখানে শান্তির উপর অনুষ্ঠান চলবে যেখানে বিশ্বের বহু দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবে সেই অনুষ্ঠানে যেতে হবে।

 তবে বাঙলাদেশের দলের জন্য মুল আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে দূটি প্যানেল আলোচনা যেখানে স্বদেশের মৌলবাদের আশংকার উপর একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করবে যেখানে বাঙলাদেশ থেকে আগত কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থাকবে বলে জানানো হলো। ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে এই অনুষ্ঠানে উপিস্থিত থাকবার জন্য সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগের দিন সকাল-সন্ধ্যা শুধু ঈ-মেইল পেতে থাকলাম। সেই সব ঈ-মেইল থেকে জানলাম প্যানেল আলোচনায় মৌলবাদের সম্ভাবনা ও আশংকা বিষয়ক গবেষোনাধর্মী প্রতিবেদন উপস্থাপনার অন্যতম মূল ব্যক্তিত্ব শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বাঙলাদেশী শিক্ষাবিদ ও বর্তমানে উইড্রো উইলসন ইন্সটিটিউটের ফেলো অধ্যাপক আলী রিয়াজ!
আলী রিয়াজ আমাদের সিদ্ধেশ্বরী বিদ্যালয়ের ছাত্র আর ফাহীমের বন্ধু। সুতরাং সেই সুত্রে আমি ভালোভাবেই তাকে চিনি। আরো বিশেষভাবে আমার সাথে পরিচিতি আছে কারণ বছর দুয়েক আগে নিউ ইয়র্কে মুক্তধারার বইমেলায় এই মৌলবাদের উপর এক মুক্ত আলোচনায় আমি অংশ নিয়েছিলাম যেখানে আলী রিয়াজ আর বাঙলাদেশ থেকে আগত পত্রিকা সম্পাদক নাইমুল ইসলাম আমার সাথে সেই চক্রে উপস্থিত ছিলেন।

আমি উভয়ের বক্তব্যের বিরোধিতা করেই আমার কিছু কিছু বক্তব্য সেদিন রেখেছিলাম। এর পরপরই আমি একই কাজে সেবার ওয়াশিংটন গেলে বাঙলাদেশ দুতাবাসে শাহরিয়ার কবিরের একটি মুসলিম জেহাদ বিরোধী প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। আমি দল নিয়ে ভয়েস অব আমেরিকা দেখাতে নিয়ে গেলে বিভাগীয়
প্রধান রোকেয়া হায়দার আমাকে বলেন ‘সেলিম, আগামীকাল ওদের নিয়ে বাঙলাদেশ মিশনে এসো – এতে ওদের সবার ভাল লাগবে’। দেখলাম প্রতিনিধি দলের আগ্রহ আছে
বাঙলাদেশ মিশনে যাবার – শাহরিয়ার কবির ও অন্যদের সাথে মিশবার। আমি আমার প্রোগ্র্যাম অফিসারকে দিয়ে সেদিনের অনুষ্ঠানের জন্য গাড়ির বরাদ্দ করিয়ে
নিলাম এবং পরদিন গেলাম। অভ্যাগত অতিথিরা যথাসময়ে এলেও অনুষ্ঠান শুরুতে দেরি হচ্ছিল। আমি গিয়েই দেখলাম সেখানে আলী রিয়াজ আর শাহরিয়ার কবীর
উপস্থিত – তাদের সাথে সালাম বিনিময় করে কথা চালিয়ে গেলাম। এর ঠিক আট – দশ দিন আগে নিউ ইয়র্কে আমি আলী রিয়াজের সাথে মুক্ত আলোচনার টেবিলে বাহাস
করেছিলাম, ফলে এই সাক্ষাতে দুজনে বেশ ঘনিষ্টভাবে স্বদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা চালিয়ে গেলাম শাহরিয়ার কবীরসহ। এক সময় আলী রিয়াজকে জিজ্ঞেস
করলাম, ‘রিয়াজ ভাই, আপনি কি এখনো শিকাগো ইউনিভার্সিটেতে আছেন?’ – উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তিন বছরের জন্য ডেপুটেশনে ডিসিতে এসেছি – ফেলো
হিসেবে যোগ দিয়েছি উইড্রো উইলসন ইন্সটিটিউটে – এই কয়েক বছর ডিসিতে এলে আমাকে পেয়ে যাবে’! আমি বললাম – প্রতি বছররই আমার কয়েকবার ডিসি’তে আসা পড়ে
– অতএব, আপনার সাথে দেখা-সাক্ষাত চলতেই থাকবে’! দু’জনেই হেসে উঠলাম!

উইড্রো উইলসন ইন্সটিটিউট হচ্ছে মার্কিন থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। অত্যন্ত ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান যাদের চিন্তা-ভাবনা মার্কিন নীতি-নির্ধারণে ভীষণভাবে বিবেচনা করা হয় এবং কাজেও লাগানো হয়! বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা কোন প্রতিবেদন পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে – বা কংগ্রেস তাদের আইন প্রনয়নে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আলী রিয়াজ এবার সেখানে
মাথা ঢুকিয়েছে! অনেকের মনে থাকতে পারে এই গত বছর বাঙলাদেশের উপর মার্কিন কংগ্রেসে যে শুনানী হয় (হিয়ারিং) সেখানে এই উইড্রো উইলসন ইন্সটিটিউট থেকে
আলী রিয়াজ গিয়েছিল সাক্ষ্য দিতে! এদের কথা-বার্তার উপরেই মার্কিন কংগ্রেস – প্রশাসন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঠিক করে বাঙলাদেশ’কে কতটুকু টাইট দেয়া
হবে বা ছাড় দেয়া হবে। সুতরাং, আলী রিয়াজ আজ একটি ভাইট্যাল পজিশনে চলে গেছে একথা মানতেই হবে!

এরমধ্যে সেখানে উপস্থিত হলেন রোকেয়া হায়দার, ইকবাল বাহার চৌধুরী – সবার সাথে আমাদের দল ছবি তুলে গেলো আর আমরা খোশ গল্প চালিয়ে গেলাম। ইকবাল
বাহার চৌধুরী আমাকে দেখেই সালামের উত্তর দিতে দিতে বললেন, ‘সিরাজ ভাইয়ের একটা সুবিধা আছে – এতগুলি ছেলে যে যেখানেই যাই সেখানেই কাউকে না কাউকে
পাই – এবার বলো তুমি কয় নম্বর?’ – ইতিমধ্যে মেজদা, জাহীদ, তৌহীদ এদের সাথে উনার দেখা ও আলাপ হয়েছে সে কথা জানালেন। বললাম, ‘চাচা, আপনার একটা
সাক্ষাতকার চাই – আব্বার উপরে। আমার মনে আছে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে আপনি ইয়াহিয়া খানের সংবাদের আগে বঙবন্ধুর সংবাদ পাঠ করায়
সংবাদ শেষে ষ্টুডিও থেকে বেরিয়ে এলে পাক আর্মিরা আপনার উপর চড়াও হয় – রাইফেলের বাট দিয়ে আপনাকে আঘাত করে; আর তার প্রতিবাদে টিভির নিয়মিত
অনুষ্ঠান বন্ধ রেখে টিভি’র শিল্পী-কলা-কৌশলীরা রাস্তায় নেমে আসে এবং মিছিল নিয়ে আর কোথাও নয় দৈনিক ইত্তেফাক অফিসে যায় – এখন আমার প্রশ্ন হ’লো
এত যায়গা থাকতে – ইকবাল হল বা ধানমন্ডী ৩২ নম্বর ফেলে হাটখোলা রোডের ইত্তেফাক অফিসে গেলেন কেন?’ ইকবাল বাহার চৌধুরী একটু ভেবে বললেন, অনেক
দিনের কথা – হ্যাঁ – ঘটনাটা ওরকম ভাবেই ঘটেছিল যেভাবে তুমি বললে। হ্যাঁ, ইত্তেফাক অফিসে গিয়েছিলাম কারণ ইত্তেফাকই ছিল প্রধান সংবাদপত্র – আর আমরা
এই অন্যায়ের সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম – তাই ইত্তেফাকেই যেতে হয়েছিল’।  আমি বললাম, চাচা, আব্বার ব্যাপারে কিছু আপনার কাছ থেকে জানতে
আমি একটি সাক্ষাতকার নেবো অন্য এক সময়। উনি বললেন, ‘কেনো, আমি তো ঢাকায় তোমার এক ভাইকে সাক্ষাতকার দিয়েছি তো কিছুদিন আগে। আমি সেখানে যতটুকু
বলবার বলেছি। তবে সিরাজ ভাই’র সাথে আমার নয় – আমার আব্বার সম্পর্ক ছিল অনেক ঘনিষ্ঠ! সিরাজ ভাই অনেক জুনিয়র হলেও উনি ঐ মাপের লোক ছিলেন যে তার
চাইতেও বয়োজেষ্ঠ্যদের সাথে ওঠা-বসা করতেন। আমার মনে আছে একটা ঘটনাঃ আমার ফুফু মারা গেলে – শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন আমার ফুফু – আব্বা প্রথমেই
আমাকে বললেন জলদি সিরাজ সাহেবকে খবর দে। সিরাজ ভাই টেলিফোনে আমার কাছ থেকে সব খবর নিলেন – বাসায় এলেন। পরের দিনের ইত্তেফাকে দেখলাম প্রথম
পাতাতেই গুরুত্ব দিয়ে ফুফু’র মৃত্যু সংবাদ সিরাজ ভাই ছেপে দিয়েছেন – যেটি ঐ গুরুত্ব পাবার মত সংবাদ ছিলো না’।

যাই হোক, আসল কথায় ফিরে আসি, আলোচ্য দিন সকালের অন্যান্য কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে যথা সময়ে আমাদের দলকে নিয়ে আই-পি-ইউ-এস ভবনের সামনে এসে অপেক্ষা
করতে থাকলাম আমার প্রোগ্র্যাম অফিসার কার্লোস আরানাগা’র জন্য। যথাসময়ে প্রোগ্র্যাম অফিসার এসে আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলো। বেশ ভালো একটা লাঞ্চ হলো
– ওরা প্রায় পাঁচ-সাতশো জনের জন্য প্যাকেট লাঞ্চ সরবরাহ করে। লাঞ্চের টেবিলে আন্তুর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এক স্বনামধন্য অধ্যাপকের সাথে
বাঙলাদেশ দলের লাঞ্চ খেতে খেতে টেবিল ডিসকাশন চলে যেখানে স্টেট ডিপার্টমেন্টের উর্ধতন এক কর্মকর্তা মিঃ ড্যাফিও অংশ নেন।

এরপরের কার্যসুচি ছিল বাঙলাদেশ সংক্রান্ত প্যানেল আলোচনা। আমাদের প্রোগ্র্যাম অফিসার কার্লোস তাড়া দিল ঐ বাঙলাদেশের অনুষ্ঠানে যেতে। আমরা
দলবদ্ধভাবে একটু বিলম্বেই আলোচনাকক্ষে ঢুকলাম। আমাদের জন্য প্রথম সারিতে আসন বরাদ্দ ছিল। ফলে কার্লোসের নেতৃত্বে বক্তাদের টেবিল অতিক্রম করে যেতে
যেতে দেখলাম টেবিলের পাঁচজন বক্তার একেবারে শেষের জন আমাদের আলী রিয়াজ! আমার সাথে চোখা-চোখি হতেই আমি সালাম দিতেই সে দাঁড়িয়ে গেলো – আমি হাত
বাড়িয়ে দিলাম – দুজনে করমর্দন করে কুশল বিনিময় করলাম! বললাম, ‘রিয়াজ ভাই, ওয়াশিংটন এলেই আপনাকে পেয়ে যাই’! সে হেসে বললো, ‘তুমি দেখি খুব ঘুরে
বেড়াও!’ – আমি বললাম ‘ওটাই তো কাজ!” কার্লোস আমাদের দেখে একটু অবাক হ’লো – বললো ‘সেলিম – তুমি ওকে চেনো? – কিভাবে?’ – আমি হেসে বললাম, আমরা
দু’জনেই একই স্কুলের ছাত্র – সে আমার জেষ্ঠ্য তৃতীয় ভ্রাতার বন্ধু – আমরা বহুদিন ধরেই একে অপরকে চিনি!’ – কার্লোস অবাক হলো – আর নিশ্চিতভাবেই
ভাবলো সেলিম খুবই ভালো ছাত্র ছিলো জীবনে আর খুবই নামী-দামী স্কুলের ছাত্র ওরা দু’জনে! আমার ‘দাম’টা একটু বেড়েই গেলো আর কি!! আমি মনে মনে হাসলাম!!

আলী রিয়াজদের তত্বাবধানে বাঙলাদেশ সংক্রান্ত যে গবেষণা রিপোর্ট হাজির করা হলো আর যেটাকে আলী রিয়াজ ডিফেন্ড করার জন্য রেখে গেলো সেটি খুব বিতর্কিত
হয়ে উঠলো! এই গবেষণায় হাজার চারেক লোককে প্রশ্ন করা হয় এবং ৮০ শতাংশ লোক গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। আবার যখন মৌলবাদী শাসন চান কি-না এই
প্রশ্ন করা হয় তখন সেই একই সংখ্যক মানুষ মৌলবাদী শাসনকে সমর্থন দিচ্ছে এবং মেয়েরাও সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যক এই মৌলবাদী শাসনের প্রতি সমর্থন
জানিয়েছে বলে দাবী করা হয়। আলী রিয়াজদের সিদ্ধান্তঃ “বাঙলাদেশ মৌলবাদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে!” এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ
প্রতিবাদে ফেটে পড়লো! আলী রিয়াজকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে নাস্তা নাবুদ করে দিল বাঙলাদেশ থেকে আসা দলের সদস্য/সদস্যা যথাক্রমে ওয়াশিংটনস্থ
বাঙলাদেশের সাবেক রাস্ট্রদূত জনাব হুমায়ুন কবীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ডঃ ইমতিয়াজ আহমেদ; অধ্যাপিকা আমেনা
মোহসিন এবং উপস্থিত দর্শক, দেশী-বিদেশী!

গবেষক ও প্যানেলের আলোচনা ও বক্তব্য শেষ হলে দর্শকদের কাছ থেকে মন্তব্য ও প্রশ্ন আহবান করা হলে আমার মনে গুণগুনিয়ে ওঠে বিশেষ একটি প্রশ্ন, কিন্তু
ভাবছিলাম স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাজে এসে এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেয়াই শ্রেয়! তা-ই হাত তুললাম না। আশে-পাশে অনেক হাত উঠে গেলো। অনুষ্ঠানের
সঞ্চালক বিদেশী শিক্ষাবিদ সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর’কে মাইক্রো ফোন দিতে বললেন। জনাব কবীর যেন আমার মনের প্রশ্নটি কেড়ে নিয়েই ঠিক সেই
প্রশ্নটিই ছুঁড়ে দিলেনঃ “অন্যান্য শাসন ব্যবস্থাকে পাশে ঠেলে রেখে শুধু গণতন্ত্রের সাথে মৌলবাদকে জুড়ে দিয়েই গবেষনাটি করা হ’লো কেন এবং মৌলবাদ
তথা এই ধর্মীয় শাসন জিনিসটি কি সেটি কি প্রশ্নের সম্মুখীন লোকগুলি যে বুঝেই উত্তর দিয়েছে তার নিশ্চয়তাটি কি?’ – যাই হোক উপস্থিত দর্শকেরা
‘বাঙলাদেশ ধর্মীয় মৌলবাদের দ্বারপ্রান্তে’ – এই সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে – এবং টেকনিক্যালী গবেষণার পদ্ধতি-প্রক্রিয়াই যে ভ্রান্ত সে রায় দিয়ে আলী
রিয়াজের দলকে কোণঠাসা করে দেয়। আমেনা মোহসিন ও ডঃ ইমতিয়াজ এই গবেষণার বিভিন্ন ভ্রান্তিগুলি তুলে ধরেন। আমার মনে হ’লো সুযোগ পেলে রাস্ট্রদূত
হুমায়ুন কবীর সাহেবকে ধন্যবাদ জানাবো আমার প্রশ্নটা করে পুরো আলোচনাটা তাতিয়ে দেওয়ার জন্য আর সে সুযোগও পেয়ে গেলাম!

আলোচনার এই পর্ব শেষ হলে একটু চা-বিরতি দেওয়া হলো। আমরা বাইরে গেলাম। আমার সহকর্মী কাজি খুব উৎসাহী হলো ঢাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সাথে ছবি
তুলতে। সামনেই পেয়ে গেলাম ডঃ ইমতিয়াজকে! এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম, “স্যার, কেমন আছেন? – আপনার প্রশ্নগুলি খুব ভালো হয়েছে, এই গবেষণার
প্রতিবেদন তো দেশকে বিপদে ফেলে দেবে!’ – উনি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, এই গবেষণার কোন মানেই হয় না, এটা কোন গবেষণাই নয়। জানিনা আলী রিয়াজ কিভাবে
এটাকে ডিফেন্ড করছে!’ যাইহোক – আমাদের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়ে একটু ‘ডাঁট’ নিয়ে ছবি তুলবার আগ্রহ জানালাম! ডঃ
ইমতিয়াজ সাগ্রহে রাজী হলেন। আমার সহকর্মীকে নিয়ে ছবি তুলছি এমন সময় দেখি রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর ছবি তোলা হচ্ছে দেখে ক্যামেরা আর অতিক্রম না করে
দাঁড়িয়ে পড়লেন। দেখলাম এই তো সুযোগ! আমি জোরে বলে উঠলাম, ‘আরে – আপনাকেও তো চাই – আপনার সাথেও ছবি তুলতে চাই আমরা – আসুন, চলে আসুন, প্লীজ!’
জনাব কবীর হেসে চলে এলেন – আমরা ছবি তুললাম! আমি এরপর উনার দিকে ঘুরে আনুষ্ঠানিকভাবে সালাম বিনিময় করে করমর্দন করলাম! উনি আমার হাত ধরেই ছিলেন
– আমি আমাদের এখানে আসার কারণ ও কোথা থেকে এসেছি তা জানিয়ে বললাম, আপনাকে বিশেষভাবে একটা ধন্যবাদ দিতে চাই কারণ আমার মনের মধ্যে যে প্রশ্নটা ঢেউ
তুলেছিল আপনি একেবারে প্রথম প্রশ্নেই সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করে পুরো অনুষ্ঠানটিই জমিয়ে দিলেন! এই প্রশ্নটার ভীষণ দরকার মনে হচ্ছিল আমার –
আপনি সেটাই করেছেন। উনি হেসে দিয়ে বললেন, ‘ আরে, এটা কোন কথা হলো? গ্রামের মানুষদেরকে সরাসরি গিয়ে জিজ্ঞেস করছে ‘তোমরা ধর্মীয় শাসন চাও?’ –
এর উত্তরে ওরা “হ্যাঁ” ছাড়া অন্য কিছু কিভাবে বলবে? আর যে লোক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে – গণতন্ত্র চায় – সে লোক আবার মৌলবাদে বিশ্বাসী – এটা কোন
কথা হ’লো? – ওদের প্রশ্ন আর প্রশ্নের পদ্ধতি সবকিছুতে ভেজাল আছে’। আমি দেখলাম দ্বিতীয় পর্ব এখনই শুরু হবে তাই কবীর সাহেব আমার হাত ধরেই কথা
বলছিলেন, আমি বললাম, ‘আপনাকে আমার পরিচয়টি দিলে আমাকে ভালোভাবে চিনবেন চাচা, আমি দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক বার্তা-সম্পাদক শহীদ সাংবাদিক
সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে – আমি নিউ ইয়র্কে আছি’! আমার কথা শেষ হতেই জনাব হুমায়ুন কবীর আমার হাতটি আরো জোড়ে চেপে ধরলেন – অন্য হাতটি দিয়ে এবার
আমার হাত আরো জোরে ধরে টেনে নিলেন উনার দিকে এবং চোখ বড় বড় করে বললেন “I am honored, I am honored!! আলাপ করে খুব খুশি হলাম!” – এর মধ্যেই আমাদের
আলোচনা কক্ষে ফিরে যাবার ডাক পড়লো দ্বিতীয় পর্বের জন্য – অন্য এক গবেষণা নিয়ে আলোচনা চক্রে! আমরা দু’জনে এক সাথেই কক্ষে ঢুকলাম – জনাব কবীর উনার
সতীর্থদের সাথে গিয়ে বসলেন মাঝের সারিতে – আমরা ফিরে গেলাম আমাদের প্রথম সারিতে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল অভ্যাগতদের সম্বর্ধনা সেই সাথে আরেক প্রস্থ খাওয়া-দাওয়া! সবাই আবার বারান্দায় গিয়ে নিজ নিজ দলের সাথে বসে খাওয়া-দাওয়া – গল্প-গুজব চলছে। বাঙলাদেশের অতিথিরা অর্থাৎ শিক্ষকবৃন্দ ও
রাস্ট্রদূত সাহেব আমাদের থেকে একটু দূরে অন্য টেবিলে বসেছিলেন! অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল! যে যার মত বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। হুমায়ুন কবীর সাহেবের
টেবিলের লোকজন সব চলে যাচ্ছে দেখলাম। হঠাৎ দেখলাম জনাব হুমায়ুন কবীর সাহেব ঘুরে দাঁড়িয়ে কি যেন খুঁজছেন! হঠাৎ আমাকে দেখেই হাত উঠিয়ে এগিয়ে
আসতে গেলেন – সামনে একটা টেবিল পড়ায় বাঁধা পেলেন – আমিও উঠে দাঁড়ালাম। কবীর সাহেব বললেন, “ঠিক আছে, যাই – ভালো থাকবেন!” – আমি উনার এভাবে ফিরে
এসে আমার কাছ থেকে বিদায় নেবেন সেটা একেবারেই আশা করিনি – তাই ঘটনার আকস্মিকতায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি – আর তাড়াতাড়ি বলি ‘জ্বি, চাচা, ভাল
থাকুন!’
[নিউ ইয়র্ক নিবাসী সেলিম রেজা নূর একজন প্রাবন্ধিক এবং চিন্তাবিদ]

সর্বশেষ আপডেট ( শনিবার, ২৮ অক্টোবর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

পরে >

পাঠক পছন্দ

Free Joomla Templates