News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, শনিবার      
মূলপাতা
পিরু ও আদেল হকের নিউইয়র্ক শহর প্রিন্ট কর
জামাল সৈয়দ, মিনেসোটা,   
বুধবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৭

রাত পৌনে দুইটা বাজে। নিউইয়র্কে জ্যামাইকার বাংলাদেশি পাড়ায় ফুটপাত দিয়ে পিরু হাঁটছে। ঘুম আসে না। তাই সিগারেট খেতে বের হয়েছে। ফুটপাত দিয়ে সে চার কি পাঁচ ব্লক হাঁটবে। ঘুম না আসলে প্রায়ই সে এভাবে হাঁটে। জ্যামাইকাতে কিছু বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আর দোকান সারা রাত খোলা থাকে। সারা রাতই কাস্টমার আসে যায়। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি ক্যাব ড্রাইভার। আবার অনেকে জেএফকে এয়ারপোর্টে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শিফটে কাজ করে। নিউইয়র্কের ট্র্যাফিক পুলিশ ও এয়ারপোর্টে এখন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করে। রাত ১২টা কি ১টার দিকে তাদের শিফট শেষ হয়। দিনের ক্লান্তি শেষে এখানে এসে কুশলাদি করে কিছুটা সময় কাটায়। তারপর যে যার মতো সটকে পড়ে। এই শহরের বাসাবাড়িতে আড্ডা মারার সুযোগ কম। বসার জায়গা নাই। তাই রেস্টুরেন্টই ভরসা।
এ এক আজব শহর। আজব সব মানুষের জীবিকা ও জীবন। পিরুর চলাফেরা এই সব আজব মানুষদের সঙ্গে। তাদের জীবনযাত্রা ও চলাফেরা তথাকথিত ও অফিসগামী সফল ব্যক্তিদের চাইতে ভিন্ন। ভিন্ন মানুষদের সংস্পর্শ সে খুব উপভোগ করে। সিগারেট শেষে পিরু এক কাপ চা নিয়ে মান্নান গ্রোসারির সামনের দিকে এগুলো।
আধো আলো আর আধো ছায়াতে হঠাৎ একটা ময়লা হাতের পাঁচ আঙুল তার পথ রোধ করে দিল। হাতের ওপাশে চোখ মেলতেই সে আদেল সাহেবের মুখ দেখল। কিছুটা ঝাঁকুনি খেয়ে ত্বরিত নিজেকে সামলে নিল। বেশ কয়েক মাস হয় পিরু তাকে দেখেনি। আগে সে এই এলাকায় থাকত। তখন সে প্রায়ই তাকে রাতের খাবার কিনে দিত। মাস কয়েক হয় সে নিখোঁজ। আজ হঠাৎ দেখেছে বলে কিছুটা হোঁচট খেল।
আদেল হকের পরিচয় তিনি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি হোমলেস। বাংলাদেশ হলে বলা হতো বাস্তুহারা । বয়স ৫০ কি ৫৫। খুব সম্ভবতা পিরুর দেখা প্রথম বাংলাদেশি হোমলেস। দেশে থাকলে ইতিমধ্যেই নির্ঘাত তার নাম হয়ে যেত আদেল পাগলা। আর আধ্যাত্মিক কিছু গুণ আর পোশাকআশাকের বালাই না থাকলে হয়তো বাবা খেতাবও পেতেন। তবে আমেরিকান সোসাইটি রাস্তাঘাটে বা পাবলিক প্লেসে লেংটা মানুষ বরদাশত করে না। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এখানকার বাসে-ট্রেনে, ফেরিতে উঠতে গেলে লেখা থাকে নো শার্ট, নো সু, নো রাইড।
আদেল হক তখনো হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। নির্ঘাত তিনি পয়সা চান। সিগারেট আর ঘামের সংমিশ্রণে তার শরীর থেকে উদ্ভট গন্ধ বের হচ্ছে। বড়বড় দুটো মাতাল চোখে অপলক দৃষ্টিতে পিরুর দিকে তাকিয়ে আছেন।
হয়তো বলছে, হ্যালো জনাব, কিছু দিলে এক্ষুনি দেন, সারা দিন কিছু খাই নাই, একটু তাড়া আছে। শেল্টারের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাকে না দিলেন, এই পাখিটাকে দেন। ও কিছু খায় নাই। এত গরমের মধ্যেও তিনি মোটা ব্লেজার পরে আছেন। ব্লেজারের বুকে ও হাতুনিতে সোনালি বোতাম লাগানো। লাইটের আলোতে চিকচিক করেছে। তার কাঁধের ওপর একটা তোতা পাখি। পিরু অন্ধকারে আগে খেয়াল করেনি। তার সঙ্গে সঙ্গে পাখিও হোমলেস। যদিও পাখির বাসা আর মানুষের বাসা আলাদা। এত রাতে পাখিও ঘুমহীন।
এস্ট্রোরিয়াতে পিরু আরেক আমেরিকান হোমলেসকে দেখেছিল যার এই রকম একটা তোতা ছিল। হোমলেসের সেই তোতা ছিল তার ভিক্ষাবৃত্তির প্রধান উপকরণ। ফুটপাতে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেই তোতা বলে উঠত, হাই স্ট্রেঞ্জার, হাউ আর ইউ। পথচারীরা খুশি হয়ে টাকা-পয়সা ছুড়ে দিত। বেশি উৎসুকেরা আবার পাখির সঙ্গে সেলফি তুলে নিত। তবে কি আদেল হক সেই তোতার মালিক হয়ে গেল। ওই আমেরিকান হোমলেসই বা কোথায় গেল? পিরুর মাথায় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আদেল হকের সঙ্গে পিরুর কখনো দুই-একটা শব্দ ছাড়া বেশি কথা হয়নি। সেগুলো ছিল ইংরেজিতে। তবে তিনি বাংলা জানেন এ ব্যাপারে পিরু নিশ্চিত।

 
 বছর দুয়েক আগে পিরুর এক বন্ধু আদেল হক সমন্ধে একবার কিছু তথ্য দিয়েছিল। আদেল হকের জন্ম ঢাকায়। শৈশব ও কৈশোর ঢাকাতেই। শিক্ষিত। একসময় শিক্ষিতা ও সুন্দরী স্ত্রী ছিল। বাংলাদেশে থেকে এসেছিলেন যৌবনকালে। পড়ালেখা আমেরিকাতে। ব্যাংকার হিসেবে ম্যানহাটনের বড় কোম্পানিতে বেশ কয়েক বছর চাকরিও করেছিলেন। অর্থবিত্তের খুব একটা অভাব ছিল না। তবে দুই হাতে খরচ করতেন। তারপর তাসের ঘরের মতো সবকিছু ভেঙে পড়ে। যদিও আগে থেকেই তার কিছুটা পানীয় নেশা বা অ্যালকোহল সমস্যা ছিল। তবে বিয়ের পর সেই সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেতে পেরেছিলেন। আসল সমস্যা তৈরি হয় সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে। চার বছর সংসার করার পর একদিন তার স্ত্রী দরজায় চিঠি ঝুলিয়ে দিয়ে ঘর ছাড়েন। পরকীয়ায় আটকে পড়া অন্য পুরুষের আমন্ত্রণে।
দুই মাস পর বাসায় আসে অফিশিয়াল ডিভোর্স লেটার। নিঃসঙ্গতা কাটাতে রঙিন পানির গ্লাস আবার আদেল হকের সঙ্গী হয়ে ওঠে। প্রতিদিন অফিস থেকে এসে মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকতেন। আশপাশের পরিচিতদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন। কারও ফোন বা ইমেইলের উত্তর দিতেন না। প্রথম প্রথম কিছু আত্মীয় ও পরিচিতজনেরা সাহায্যের হাত বাড়ালেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তারাও বুঝে নিল প্রয়োজন শেষ। নিজের বেড়াজালে নিজেকে পুরোপুরি আবদ্ধ করলেন। একদিন ঘুমের ঘোরে ব্রেন স্ট্রোক। তখন জীবনমরণ সমস্যা।
নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে তার মস্তিষ্কের কোনো বড় অংশে অপারেশন হয়। ভাগ্যিস চাকরিসূত্রে তখনো তার হেলথ ইনস্যুরেন্স ছিল। শুধু জীবনটা রক্ষা করেছে। তাতেই বা কম কীসের। সেই অপারেশনের পর থেকে হাসপাতাল তাকে অফিশিয়ালি হ্যান্ডিক্যাপ টাইটেল দিল। অর্থাৎ তিনি আর পুরোপুরি স্বাভাবিক বা সুস্থ ব্যক্তি নন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত টাইটেলে তিনি চাকরি হারান। প্রথমে স্ত্রী, তারপর সুস্থতা, পরে চাকরি। তার ওপর আবার ফিরে আসা নেশার অভ্যাস। আমেরিকার মতো সোসাইটিতে যদি কেউ এক সঙ্গে মানসিক, দৈহিক ও আর্থিক সংগতি হারান সেই ব্যক্তির পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ভয়াবহ ব্যাপার। একলাফে যে কেউ গর্তে পড়তে পারেন, কিন্তু এক লাফে সেখান থেকে থেকে উঠে আসা অসম্ভব। আদেল হকও পারেননি। উপরন্তু তার অবস্থা আরও তলিয়ে যেতে থাকে। এই জীবনে সাগরের গভীরও অতল থেকে আদেল হক আদৌও ওপরে উঠতে পারবেন কিনা সন্দেহ।
পিরু হাত দেখিয়ে আদেল হককে ঘরোয়া রেস্টুরেন্টের দিকে যেতে বলল। এই মুহূর্তে নেশাগ্রস্তকে কিছু ডলার দিয়ে কেটে পড়ার মানে হচ্ছে নেশার বুদবুদিকে আরও উজ্জীবিত করা। বরং তাকে পেট পুরে কিছু খাইয়ে দিলেও নিজের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধের একটু সান্ত্বনা আসবে। আদেল হক পিরুর ভাষা বুঝতে পারলেন। দ্রুত হেঁটে তিনি ঘরোয়া রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন। কাউন্টারে দাঁড়ানো তরুণ ক্যাশিয়ারকে পিরু ইশারায় বুঝিয়ে দিল আগন্তুকের সব বিল সে পরিশোধ করবে।
পিরু এক কাপ চা নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসল। অন্যমনস্ক হয়ে টেবিলে রাখা বাংলা পত্রিকার পাতা উল্টাল। ওপরে বড় করে লেখা বিজ্ঞাপন পাতা। একটা বিজ্ঞাপনে পিরুর চোখ আটকাল—‘আমার শিক্ষিতা ও সুন্দরী বোনের জন্য ৩০-৩২ বয়সী বামপন্থী চাকরিজীবী পাত্র চাই’। তার নিচে আরেকটা বিজ্ঞাপন—‘জিন ও তদবিরের মাধ্যমে জীবনের জটিল সমস্যার সমাধান করা হয়। যোগাযোগ করুন’। পিরুর একবার মনে হলো আদেল হকের জন্য জিন ও তদবিরের সমাধান হয়তো কাজে লাগবে। কিন্তু যার সমস্যা তিনি তো কোনো সমস্যার কথা বলেন নাই। কারও কাছে অর্থ, খাবার বা ভিক্ষা চাওয়ার মানে এই নয় যে, ওই ব্যক্তি সমস্যায় আছেন।
ইতিমধ্যে আদেল হক শোকেসের ভেতর সাজানো খাবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন তিনি কি খেতে চান। তারপর অন্য একটা টেবিলে গিয়ে বসলেন। পিরুর সঙ্গে তিনি বসবেন না। টেবিলে খাবার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করলেন। তোতা পাখি তার কাঁধে এক পা তুলে ঝিমাচ্ছে। পিরুর একবার মনে হলো আদেল হকের সঙ্গে কিছু আলাপচারিতা করতে। কীভাবে তিনি পাখি পেলেন, এখন তিনি কোথায় যাবেন, কোথায় থাকেন, এই সব ব্যাপারে। কিন্তু প্রশ্ন করা থেকে সে নিজেকে নিবৃত্ত রাখল। কি দরকার একজন মানুষের গভীরে যাওয়ার। সে তো আর আদেল হকের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তা ছাড়া রাতও তো অনেক হয়েছে। একটু ঘুমঘুমও পাচ্ছে। সকালেও অনেক কাজ। আদেল হক খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। দ্রুত দরজা পর্যন্ত গিয়ে একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে পিরুকে দেখে নিলেন। তারপর লাইটের আলোতে ছায়া ফেলতে ফেলতে রাস্তার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

লগইন বক্স






পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
সদস্য হতে চাইলে রেজিস্টার করুন

A professional services and  IT training firm.
 
  

 DETAILS 

 

 Details

Details 

Details 

 Click here for details

 

 Details 

  Details

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 অন্যান্য পত্রিকা



 


 

 

বাচিক শিল্পী কাজী আরিফের সাথে একটি অনন্য সন্ধ্যা


আমেরিকাতে এখন গ্রীষ্মের শেষ লগ্ন। হেমন্তের (ফল)এর আগমনীর প্রাক্কালে সেদিনের অপরাহ্নটি ছিল সিগ্ধ শ্যামল। গত ১১ই সেপ্টেম্বরের  এমনি এক সোনালী রোদেলা বিকেলে
ভার্জিনিয়া রাজ্যের  স্টারলিংস্থ সিনিয়র সিটিজেন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হল দেশ বরণ্য আবৃত্তি শিল্পী কাজী আরিফের আবৃত্তি সন্ধ্যা।

বিস্তারিত ...
 

২রা এপ্রিল শংকর চক্রবর্তীর মনোজ্ঞ সংগীত সন্ধ্যা


আগামী ২রা এপ্রিল  রবিবার  বিকেল চারটায় ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডস্থ কমফোর্ট ইন হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে  বরণ্য  নজরুল গীতি, গজল এবং হারানো দিনের আধুনিক বাংলা গানের গুনী  শিল্পী  শংকর চক্রবর্তীর একক  সংগীতানুষ্ঠান। সঙ্গত আর সংগীতের অসাধারণ ঐকতানে শংকর চক্রবর্তীর এই মনোজ্ঞ সংগীতের আসরটি  বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবে সাজানো হচ্ছে। দর্শক শ্রোতারা দারুন ভাবে উপভোগ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বিস্তারিত ...
 

কি কখন কোথায়


No events

মতামত জরিপ

Why do you visit News-Bangla
 
 
Free Joomla Templates