News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

২০ নভেম্বর ২০১৭, সোমবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow প্রবাসে জুতাপলিশ
প্রবাসে জুতাপলিশ প্রিন্ট কর
ডঃ শোয়েব সাঈদ ,মন্ট্রিয়ল থেকে :   
বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

 টরেন্টো প্রবাসী স্বনামধন্য কম্পোজার টুলু আশিকুজ্জামান ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেখলাম স্থানীয় লবিস্ট জনৈক এরশাদ মিয়ার নেম/বিজনেস কার্ডের ক্রেডেনশিয়ালে পদবির জায়গায় শুধু লিখা আছে “সৎ সাহসী, বিশিষ্ট বড় বড় লোকের সাথে সম্পর্ক”। চরম বিনোদনের সাথে হঠাৎ মনে হল ঐ এরশাদ মিয়াদের নিশ্চয় বাংলাদেশের বিশিষ্ট বড় বড় মানুষ, কবি সাহিত্যকদের সাথে সম্পর্ক আছে, তাই বিদেশে এসে জুতাপলিশ করতে হয় না।  জুতাপলিশের কথা মনে হতেই মনে পড়ল আশির দশকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হল শাহজালাল হলের কথা। ঐ হলে এক জুতাপলিশার হল অফিসের সামনে বসে ছাত্রদের স্বপেশায় সেবা দিতেন। একদিন এক ইরানী ছাত্র জুতাপলিশ করে কম পয়সা দেওয়াতে পলিশওয়ালা খুব মন খুলে হারামি বলে ছাত্রটিকে গালি দিল। পলিশওয়ালার ধারণা ছিল এটা বাংলা শব্দ, ইরানী ছাত্র তা বুঝবে না। কিন্তু ঘটনা হল অন্যরকম, ইরানী ছাত্রের মারের হাত থেকে বাঁচাতে অবশেষে আমাদের এগিয়ে আসতে হয়েছিল। আমাদের সমাজে, আমাদের চারপাশে “মানুষ ঠকানোর মানুষের” সংখ্যা অনেক। এই ঠকবাজি মানসিকতা শুধু আর্থিকখাতে নয়ই, মানুষকে অসন্মান করা, পেশাকে অসন্মান করার মত বুদ্ধিবৃত্তিক নোংরামি বা হীনমন্যতাকেও উৎসাহিত করে।

শিল্প-সাহিত্য জগতের সাথে জড়িত মানুষদের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশাটা সম্ভবত রুচির; কি বাচনভঙ্গিতে, কি লেখনিতে। যে দেশের অর্থনীতির মূল শক্তিটাই রেমিটেন্স নির্ভর, প্রবাসীদের পেশাকে ব্যঙ্গ করার মাঝে রুচির সঙ্কটটা মূলত খুব ফালতু মানসিকতার পরিচায়ক। জুতাপলিশের গালিটি আক্ষরিক অর্থে শুধু জুতাপলিশই নয়, বরং ব্লু কালার জব অর্থাৎ প্রবাসে গাঁয়ে-গতরে খেটে খাওয়া সকল মানুষকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। প্রবাসে বাংলাদেশিদের সংখ্যার তুলনায় আরও ভাল অবস্থানে থাকা হয়তো উচিত ছিল তারপরেও বিশ্বের কসমোপলিটান শহরগুলো থেকে রিমোট অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা আলোকিত বাংলাদেশীদের সংখ্যা খুব কম নয়। প্রবাসীদের পরিশ্রমের রেমিট্যান্সে বাংলাদেশের সমাজটাই ক্রমশ পলিশ বা চকচকে হচ্ছে। কত অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে রেমিট্যান্সের কারণে। বোনের বিয়ে, ভাইবোনের পড়াশুনা, বাবা-মার চিকিৎসা চলছে জুতাপলিশওয়ালাদের কষ্টার্জিত হালাল উপার্জনে। প্রবাসীদের অবদানের এই সহজ সরল সমীকরণটুকু মালিশ করে কিছু একটা বাগাবার সংস্কৃতিতে নিমগ্ন মানুষেরা বুঝেননা তা কিন্তু নয়, সমস্যাটা মূলত ব্যাক্তিত্বের আর রুচির। দেশের দুর্নীতির টাকা দিয়ে বিদেশে জমিদারের মত যারা থাকেন তাঁদের বিষয়ে কথা না বলে হঠাৎ প্রবাসী খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয়টি অবাক করেছে বৈকি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মনমানসিকতার এই দৈন্যদশা অবাক করারই বিষয়। পাট, চা, গার্মেন্টস আর চামড়া রপ্তানীর মত আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ যে জুতাপলিশার রপ্তানী শুরু করেছে সম্প্রতি জাতি প্রথমবারের মত জানতে পারল কোন এক অপরিপক্ক মস্তিকজাত রাগান্বিত ধারণা থেকে।

বিদেশে জুতাপলিশওয়ালা হবার জন্যেও কিন্তু যোগ্যতা লাগে? বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরে যারা জুতাপলিশ করেন তাঁদের শুধু পেশাটায় ভাল করে প্রশিক্ষিত হওয়া নয় বরং কমিনিকেশন দক্ষতা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ধাপগুলো অতিক্রম করার সক্ষমতায় যোগ্য হতে হয়। মন্ট্রিয়ল বা টরেন্টো এয়ারপোর্টে যারা জুতাপলিশ করেন তাঁদের গড়পড়তা বার্ষিক আয় প্রায় বিশ লক্ষ টাকা। তাঁরা ট্যাক্স দেন, পসরা সাজাবার ভাড়া দেন। জুতাপালিশ ওয়ালাদের ট্যাক্সের টাকা কিন্তু ওয়েলফেয়ার দেশগুলোতে সরকারী ভাতার সেফটি নেটে সত্যিকার অর্থে শারীরিক বা মানুষিক কারণে কিছু করে খেতে অক্ষম বা চেষ্টার করেও কাজ যোগার করতে পারছেন না এমন মানুষদের অন্নসংস্থান সহ মৌলিক চাহিদা পূরণে কন্ট্রিবিউট করে। ওয়েলফেয়ার দেশগুলোর সরকারী ভাতার সেফটি নেটের অপব্যবহারে কতিপয় ধান্ধাবাজ/ফাঁকিবাজদের আরামে থাকবার অনৈতিক খায়েসে কবিরাও কিন্তু বাদ যান না।
বিশ্বের অনেক নামীদামী ব্যাক্তি কিন্তু একসময় জুতাপলিশের কাজ করতেন। ওনারা গদ্যে, পদ্যে, লেখিনীতে কতটা  দক্ষ ছিলেন জানিনা, তবে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন যোগ্যতায় জ্বলে উঠার ক্ষেত্রে জুতাপলিশারের অভিজ্ঞতাটুকুইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বৈকি।

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা সিলভা, পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট টলেডো,  যুক্তরাষ্ট্রের   ইলিনোইসের সাবেক গভর্নর  রড  ব্লাগোজেভিচ, সানফ্রান্সিকোর সাবেক মেয়র ষ্টেট এসেম্বলির স্পীকার   উইলি ব্রাউন, সিঙ্গার  জেমস ব্রাউনের মত বহু সেলিব্রেটি  জীবনের একটা সময় জুতাপলিশের কাজ করেছেন।

জুতাপলিশ করে হয়তো কবি হওয়া যায় না কিন্তু কবি হয়ে জুতাপলিশ করা দোষের কিছু নেই, রুজিটা কিন্তু হালাল এবং নৈতিক। দেশের রাজনৈতিক,সামাজিক  অস্থিরতার কারণে  সময় সময় লেখক, কবিদের  বিদেশমুখী হতে হয়, তখন হয়তো জুতাপলিশ মার্কা একটা কাজ অসময়ের একান্ত বিশ্বস্ত বন্ধু।  অতএব, ধীরে বৎস ধীরে!
সর্বশেষ আপডেট ( বৃহস্পতিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >

পাঠক পছন্দ

Free Joomla Templates