News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৮ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow মতামত arrow ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদ – শিল্প-সংস্কৃতির এক পৃষ্ঠপোষক
ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদ – শিল্প-সংস্কৃতির এক পৃষ্ঠপোষক প্রিন্ট কর
আশরাফ আহমেদ. মেরিল্যান্ড   
বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

সেদিন এক ইফতার পার্টিতে দেখা হতে শুনলাম ডক্টর ফখরুদ্দিন তাঁর বাড়িটি বিক্রি করে দেয়া মনস্থ করেছেন। বাড়ি তো নয়, সার্বিক অর্থেই সেটি ছিল ছোটখাট একটি মিউজিয়াম। একবছরেরও আগে সেখান থেকে ফিরেই ভেবেছিলাম বাড়িটি নিয়ে কিছু লিখবো। কী কী লিখবো তারও একটা ফিরিস্তি মনে মনে এঁকে রেখেছিলাম। বিভিন্ন কাজে ও অকাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় লেখা আর হয়ে ওঠে নি। সময়ের ব্যবধানে তার অনেক কিছু ভুলেও গেছি। কিন্তু এখন বিক্রি করে দিচ্ছেন শুনে কিছুটা দুঃখ পেলাম। এতো সুন্দর ও সাজানো বাড়িটি আর দেখা হবে না! সেদিন বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে ভার্জিনিয়ার এডামস সেন্টারের দৃষ্টিনন্দন ও সুবৃহৎ ভবনের স্থপতি আনোয়ার ইকবাল বাইরের ল্যান্ডস্কেপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন তাও কানে বাজছে।
ডঃ ফখরুদ্দিন আহমেদ এর নাম শুনি আমি সেই ১৯৮৩ সালে এনআইএইচ-এ পোস্টডক হয়ে এদেশে আসার পরপরই। তিনি বিশ্বব্যাংকে উচ্চপদে চাকুরি করতেন। তখন এই এলাকায় বাংলাদেশের কেউ ছিল কিনা জানতাম না, পরিচয় হওয়া তো দুরের কথা। এক শনিবারে এপার্টমেন্টের কাছাকাছি ব্রাডলি’স নামে একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। একজনের সাথে পরিচয় হতে দেখা গেল তিনি শুধু বাঙালিই নন, আমার ফুপাত ভাই! কিন্তু আমার সাথে এই প্রথম দেখা ও পরিচয়। ডাকনাম সুরুজ, ভালনাম গোলাম কিবরিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি-তে বিশ্বব্যাংকে অলটারনেট ডিরেক্টর হয়ে এসেছেন। তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী, আমার আরেক ফুপাত বোন নাদেরা আপার কাছেই ডঃ ফখরুদ্দিন আহমেদ এবং মিসেস নিনা ফখরুদ্দিন দম্পতির নাম শুনেছিলাম সজ্জন লোক হিসেবে। সম্ভবত সুরুজ ভাই-নাদেরা আপার বাসাতেই তাঁদের প্রথম দেখলামও। ফখরুদ্দিন ভাইকে চিনেছিলাম স্বল্প ও মৃদুভাষী এবং আত্মপ্রচারহীন হিসেবে। সেই থেকেই তাঁরা আমাদের মনে এক সম্মানের আসনে স্থান নিয়েছিলেন।

এর বছর দুয়েক পর, ১৯৮৫ সালে ঢাকা থেকে আমার বড়দুলাভাই বেড়াতে এলে তাঁকে নিয়ে এক মলে ঘুরতে গেলাম। পাশ দিয়ে হন হন করে হেঁটে যাওয়া একজনকে দেখতে পেয়ে দুলাভাই সপ্রসংস দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। বললেন, এঁকে চেন? এঁর নাম ফখরুদ্দিন না? আমাদের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ছিল। ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট, এবং বিএ, ও এমএ-তেও প্রথম হয়েছিল!

তখন থেকে সামাজিক কোন অনুষ্ঠান বা কারো বাসায় তাঁকে মাঝে মাঝে দেখেছি। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন প্রদত্ত সম্মাননা নিতে স্টেজে তাঁর পাশেও দাঁড়িয়েছি। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তাঁর ছেলে ফাহিম আহমেদের পক্ষে ক্রেস্টটি গ্রহন করছিলেন। হার্ভার্ডে যাওয়ার আগে ফাহিম এসএটি পরীক্ষায় ১৬০০ নম্বরের মাঝে ১৬০০ই পেয়েছিল! বিস্তারিত আমি জানি কারণ তখন এই এলাকার ‘প্রতিধ্বনি’ নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে বাঙালির এই গর্বের খবরটি আমিই পরিবেশন করেছিলাম। এর বাইরে কখনো কোথাও দেখা হলে ফখরুদ্দিন ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটি স্লামুয়ালাইকুম, কেমন আছেন, ভাল আছির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল।   

এক সময়ে বিশ্বব্যাংকের চাকুরি শেষে ২০০১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর হয়ে তিনি ঢাকা চলে যান। এরপর বাংলাদেশের পল্লী কর্ম সহায়ক সংস্থা বা পিকেএসএফ এর প্রধানের দায়িত্বও পালন করছিলেন। ২০০৬ সালের শেষ থেকে ২০০৭ সালের প্রথম দিকে দেশে রাজনৈতিক নৈরাজ্যতা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে হঠাৎ শুনতে পেলাম ডঃ ফখরুদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের অস্থায়ী তত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় যারা তাঁকে চিনতাম, এই সংবাদটিতে আমরা সবাই অতিশয় আনন্দিত হয়েছিলাম, এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যত সম্পর্কেও আশান্বিত হয়েছিলাম। কারণ, আমাদের জানামতে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, উচ্চশিক্ষিত, কৃতকার্যের সাথে বৃহৎ সংস্থা পরিচালনায় অভিজ্ঞ, ভাল মানুষ ও সৎ চরিত্রের লোক।

তাঁকে নিয়ে পরের দুই বছরের বৃত্তান্ত আমার লেখার প্রয়োজন নেই। প্রথমবারের মত বাংলাদেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়ষ্ক লোকের পরিচয়পত্র প্রদান এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করে যে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা তিনি পালন করেছিলেন নিষ্ঠা ও সাফল্যের সাথে। যারা দেশের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত, তাদের কারো কারো ক্ষোভ থাকলেও আমার মত অনেকেই তাঁর সেই সময়ের কার্যকলাপকে সফল এবং ইতিবাচক হিসেবেই দেখে এসেছি। দেশের সরকার প্রধানের মত ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার পরও আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, সিকি শতাব্দি আগে দেখা যে সজ্জন ব্যক্তিটির ছবি মনে এঁকে রেখেছিলাম, ফিরে আসার পর এখনও ঠিক তাই-ই আছেন। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে তাঁকে দেখলাম অন্য এক রূপে। এই এলাকার পরপর কয়েকটি উন্নতমানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থেকে তা গভীর আগ্রহের সাথে উপভোগ করেছেন। আবার সময় হলে নামাজ পড়তেও উঠে যাচ্ছেন। ব্যস্ততা মোটেই নেই দেখে অনেকের মত এগিয়ে গেলে আগেকার সেই অমায়িক ভাবেই কথা বলেছেন। অনুরোধ করতেই পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে সানন্দে রাজিও হয়েছেন।

তাঁর এই সাস্কৃতিক রুচির পরিচয় পেয়ে মনে হলো তাঁকে দিয়ে আমার বইয়ের প্রকাশনা উৎসবটি উন্মোচন করালে কেমন হয়? সাথে সাথে মনে হলো তাতে আমি কারো কারো বিরাগভাজনও হতে পারি। ফখরুদ্দিন ভাই বাংলাদেশের তত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন আট বছর আগে। তাঁকে অপছন্দ করার যে ব্যক্তিটির কথা প্রথম মনে হলো সে আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধু, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। সেই আধা সামরিক তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহুদিন একনাগাড়ে রিমান্ডে ও জেলে থেকে ভুগেছিলেন। অত্যাচারের ব্যপারটি তিনি মুখে স্বীকার করেন না। কিন্তু হয়ে যে ছিলেন তা সে সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁর নাকমুখ ফোলা ছবি দেখে কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না, অসুবিধা হয় না তাঁর প্রকাশিত বই পড়ে। কাজেই ডঃ ফখরুদ্দিনের ব্যপারে কারো যদি আপত্তি থাকে তিনি অধ্যাপক আনোয়ারের চেয়ে বেশি আর কে হতে পারে? তাই আনোয়ার ভাইকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন ‘ডঃ ফখরুদ্দিন এর মত গুণীজনকে আনতে পারলে তোমার বইয়ের মান অনেক বেড়ে যাওয়া উচিত। তাঁর আমলে আমাকে রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তাতে তাঁর কোন হাত ছিল না। বরং বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাস যখন লেখা হবে তাঁর নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। তত্বাবধায়ক আমলে সামরিক বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হয়েছিল তাঁর মত লোক ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন বলেই। তিনি রাজি হলে অবশ্যই তাঁকে আনতে পার, নিশ্চিন্তে তাঁকে নিমন্ত্রণ জানাতে পার’।
 

তখন আমার বইয়ের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করতে গত বছরের মার্চের মাঝামাঝি ফোন করতেই বললেন আমরা দুজনেই আসবো কিন্তু আমি এখনই তোমাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। তোমার ক্যালেন্ডারটি দেখে আমাকে জানাও তোমার অনুষ্ঠানের আগের দিন অর্থাৎ এপ্রিলের তিরিশ তারিখ তোমরা ফ্রি আছ কি না। সেই সন্ধ্যাটি স্ত্রীসহ যদি আমাদের সাথে কাটাতে পার তবে খুবই খুশি হব। এক্ষনি জানাতে হবে না, এক দুই সপ্তাহের মাঝে ইমেইল করে জানালেই চলবে। তবে দয়া করে জানিও।

তাঁর বাড়িটি আমার বাড়ি থেকে মোটে পাঁচ মাইল দূরে। দরজায় ঘণ্টা বাজাতে কেউ দরজা খুলে অভ্যর্থনা জানিয়ে নীচ তলায় নিয়ে গেল। ফখরুদ্দিন ভাই সেখানে আমাদের আগে আগত অতিথিদের সংগ দিচ্ছিলেন। তাঁর স্বাগতম আহবানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যেতে বিশাল সেই ঘরটির অনেকটাই পাড়ি দিতে হলো। চারিপাশের দেয়ালে টাঙানো বিশাল সব চিত্রকর্মের দিকে বারবার চোখ আটকে যেতে থাকায় পাড়ি দেয়াটা অনেক দীর্ঘায়িত হয়ে গেল। শুধু আমরা নই, লক্ষ করলাম অন্য যেসব অতিথি নীচে নেমে আসছিলেন, তাঁরা সবাই দেয়ালের দিকে ওপর নীচ এবং ডানে বাঁয়ে মাথাটি ঘুরিয়ে সেদিনের বকেয়া ঘাড়ের ব্যয়ামটি সেরে নিচ্ছিলেন। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতি, বিজ্ঞানী, এবং অর্থনীতিবিদ সহ পনেরোটির মত বিভিন্ন পেশাজীবি দম্পতি। এতো ভিন্নতা সত্ত্বেও অতিথিদের মাঝে তিনটি ব্যপারে খুব মিল ছিল। সবাই শিল্প-সাহিত্যের সমঝদার, কাছাকাছি বয়সের এবং আমার পূর্ব পরিচিত। কাজেই পরিবেশটি হয়ে উঠেছিল বেশ উপভোগ্য। একহাতে স্ন্যাক অন্যহাতে পানীয়ের গ্লাস হাতে অনেকেই এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।    

এক সময় খাওয়ার জন্য ওপরে ডাক পড়লো। লক্ষ করলাম ওপরে এলেও কারো খাবার নেয়ার তাড়া নেই। কারণ সবাই ছড়ানো ছিটানো এবং নিখুঁতভাবে সাজানো বিশাল বিশাল চারটি বসা ও খাওয়ার ঘরের সৌন্দর্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। কিন্তু মিসেস নিনা ফখরুদ্দিন তাড়া দেয়াতে খাবার হাতে নিতে হলো। খেতে বসে ফখরুদ্দিন ভাইকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যপারে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না আমি অথবা ভয়েস অফ আমেরিকার আনিস আহমেদ। কারণ লক্ষ করেছি একান্ত প্রয়োজন না হলে তিনি তা নিয়ে কথা বলেন না। তাই আমরা আমেরিকার রাজনীতি এবং তাঁর আর্ট সংগ্রহের ব্যপারে আলোচনা করলাম। বললেন কর্মজীবনের শুরু থেকে যখনই সুযোগ পেয়েছেন সংগ্রহ করেছেন। খাওয়ার পর প্রতিটি ঘরে গিয়ে কোনটি কখন সংগ্রহ করা এবং কার আঁকা তা আগ্রহ ভরে বললেন। অনেকগুলোই ছিল অরিজিনাল বা মূল চিত্র। কিবরিয়া, কামরুল হাসান, কাইউম চৌধুরি, এস এম সুলতান, শাহাবুদ্দিন, এবং কনকচাঁপা সহ বাংলাদেশের এবং পশ্চিমা অনেক নামজাদা চিত্রকরের।

ডেজার্ট নিতে রান্নাঘর সংলগ্ন খাবার ঘরে আবার আসতে হলো। এখন লক্ষ করলাম এই ঘরে একদিকের দেয়ালে ছোটবড় অসংখ্য বাঁধানো ছবি। ফখরুদ্দিন ভাই তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান থাকার সময় বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানের সাথে তোলা। আর এক দিকের দেয়ালের প্রায় পুরোটা জুড়ে বাংলাদেশের কোন এক স্বাধীনতা বা বিজয় দিবস উদযাপনের সময়কার একটি প্যানোরমিক ছবি। ঐতিহাসিক দলিল বলে এই দেয়াল দুটো অনেক অতিথিরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আমার মত অনেকেই এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুললো তাঁদের সাথে।

হঠাৎ দেখা গেল অনেকে ভেতরদিকে কাঁচের দেয়ালে একাংশ খুলে বাইরে যাচ্ছে এবং আবার ফিরে আসছে। ব্যপার কি? আমার স্ত্রী বললো ভেতরের চাইতে বাইরের বাগানটি আরো সুন্দর। এক নজর দেখার জন্য সবাই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।  

সবাই একবার করে জিজ্ঞেস করলো, মিউজিয়ামের মত বিশাল এই বাড়িটি কবে কিনেছেন? প্রতিবারই ফখরুদ্দিন ভাই বা ভাবি বললেন তৈরি বাড়ি কেনেননি। ১৯৯৪ সালে নিজেদের পছন্দমত ডিজাইনে ফরমাস দিয়ে সাত হাজার বর্গফুটের পটোম্যাক শহরের এই বাড়িটি তৈরী করিয়েছিলেন। বেথেসডা’র পুরনো বাড়িটি ভাড়া দিয়ে এখানে চলে এসেছিলেন। ২০০১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর হয়ে চলে যাওয়াতে এটি খালি পড়েছিল দীর্ঘদিন। ২০০৯ সালে ফিরে এসে আবার এই বাড়িতে থাকা শুরু করেছেন। বাংলাদেশের কোন কোন পত্র পত্রিকায় তাঁর কন্যার নামে আরেকটি বাড়ি থাকার খবরটি একেবারেই ভিত্তিহীন। তাঁদের কোন কন্যা সন্তান নেই। জীবিত একটিই পুত্র সন্তান – বৌমা ও নাতনি সহ নিউইয়র্কে বাস করে।      

সুস্বাদু ডিনারের প্রশংসা করলে মিসেস নিনা ফখরুদ্দিন জানালেন এর সবই তিনি বাসায় নিজে রান্না করেছেন, কোনটাই কেনা নয়। আমার স্ত্রী দিনা মিসেস ফখরুদ্দিনের গুণগ্রাহী অনেক আগে থেকেই, তিনিও তাঁকে খুব পছন্দ করেন। সে জিজ্ঞেস করলো ঐ ঘরে সুন্দর করে সাজানো মূল্যবান অলংকারগুলো কি আপনার? তিনি বললেন না, সেগুলোর সবই তাঁর স্বর্গীয় মায়ের। পারিবারিক ঐতিহ্য হয়ে এখন সেসব তাঁর হাতে এসেছে। তাই তিনি এগুলো সাজিয়ে রেখেছেন। একথা শুনে আমি আবার সেই ঘরে গেলাম। ছোট শোকেসের মত কাঠের ফ্রেমে কাঁচের একটি আদুরে আলমারি। এটি ডঃ ফখরুদ্দিনের স্বর্গীয় মা-বাবার যৌথ জীবনের প্রথমদিককার বানানো, যখন ফখরুদ্দিন ভাইয়ের জন্মও হয়নি। আলমারির দরজা দুটো যেন অবহেলায় খুলে আছে। ভেতরের কাঁচের তাকগুলোতে ছড়ানো ছিটানো মনিমুক্তা খচিত কানের দুল, হাতের বালা, টিকলি; গলার মালা যেন অযত্নে আলমারি থেকে বাইরে ঝুলে পড়ছে। কিন্তু খেয়াল করে সেদিকে তাকালে বুঝতে কষ্ট হয় না যে অবহেলা বা অযত্ন নয়, সেগুলো ফেলে আসা দিনের নিঃশ্বাসের ইঙ্গিত দিতেই ওভাবে রাখা হয়েছে। দুটি ভিন্ন পরিবারের অনেক স্মৃতি, ঐতিহ্য ও অনেক হাসি-কান্না একাকার হয়ে কাঁচের দরজা খুলে উঁকিঝুঁকি মারছে যেন।

মিসেস ফখরুদ্দিন যে একজন গুণী মহিলা তার প্রমাণ পেয়েছিলাম তাঁর এক বক্তৃতা শুনে। ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান ইকবাল বাহার চৌধুরীর স্ত্রী ও মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীতে ইংরেজিতে দেয়া সেই বক্তৃতার ভাষা ও ডেলিভারি কোন শ্রোতারই দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে নি। কয়েকমাস আগে হঠাৎ করে পরলোকে যাওয়া তাঁর এক বান্ধবীর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে তিনি যে ছোট্ট এক রচনা লিখেছিলেন, আমাদের অধিকাংশই এমন শৈল্পিক ভাষায় তা প্রকাশ করতে পারি না। পুরনো লোকদের কাছে শুনেছি, ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মিসেস ফখরুদ্দিন গান পরিবেশন করতেন। শুধু তাই নয়,  মা হিসেবেও তাঁর স্বার্থকতার পরিচয় পেলাম সেদিন। মাস কয়েক আগে অসুস্থ হয়ে পড়লে রোডস বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষিত বিবাহিত পুত্র চাকুরি ফেলে রেখে পুরোটা সময় হাসপাতালে মায়ের পরিচর্যায় কাটিয়ে গেছে!

সেই সন্ধ্যায় দেখা গেল দরজার দিকে যাওয়ার অপেক্ষাকৃত সরু পথটিতে বেশ ভিড়। সেখানে লম্বা টেবিলে অনেকগুলো বাঁধানো পারিবারিক ছবি সাজানো। কোনটি কার এবং কখন তোলা তা মিসেস ফখরুদ্দিন বুঝিয়ে দিচ্ছেন। একটি ছবি অকাল-প্রয়াত কলেজ-ছাত্র তাঁর বড় ছেলের। আরেকটি ফ্রেমে দুটো ছবি প্রায় একই রকমের। একটি পুরনো, একটি নতুন। ঢাকা শহরে একই দালানকে পেছনে রেখে দাঁড়ানো এবং বসা অবস্থায় দুই সারিতে প্রায় জন বিশেক লোকের ছবি। একটি ছবি অপরটি থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে তোলা। প্রথমটি যখন নিনা ভাবি ঐ সরকারী বাড়িতে বাস করতেন তাঁর বাবা, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার স্বর্গীয় গিয়াসউদ্দিন আহমেদ এর সাথে। দ্বিতীয়টি ২০০৭ সালে যখন মিসেস ফখরুদ্দিন বাস করতেন বাংলাদেশ সরকারের তত্বাবধায়ক সরকার-প্রধান স্বামীর সাথে।

এবার বিদায় নেবার পালা। ফখরুদ্দিন ভাইকে বললাম, আপনার মত বর্ণাঢ্য জীবন যাপন করা খুব কম লোকেরই সুযোগ হয়। তাই আপনার অভিজ্ঞতাগুলো আমার মত অনেকেই শুনতে ও জানতে আগ্রহী। কাজেই দয়া করে এবার তা জীবনী হিসেবে লেখা শুরু করুন। পরদিন আবার আমার বইয়ের অনুষ্ঠানে দেখা হবে জানিয়ে দরজায় বিদায় দিলেন দুজন।

গাড়িতে উঠে তাঁর বাড়ির একটি ছবি তুললাম। রাত তখন অনেক।
       
ডঃ ফখরুদ্দিন আহমেদ এর জীবনী যখন লেখা হবে, একজন সফল অর্থনীতিবিদ এবং সরকার প্রধান ছাড়াও তাতে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী শিল্প-সংস্কৃতির উঁচুদরের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বেঁচে থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস।

পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড
২রা জুলাই, ২০১৭
সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates