News-Bangla - নিউজ বাংলা - Bangla Newspaper from Washington DC - Bangla Newspaper

১৮ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার      
মূলপাতা arrow লেখালেখি arrow আগুনের পরশমণি- অ্যা রিঙ অফ ফায়ার
আগুনের পরশমণি- অ্যা রিঙ অফ ফায়ার প্রিন্ট কর
নাজমা রহমান, মেরিল্যান্ড   
বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭

আকাশের খামে মর্তলোকের চিঠি এসেছে। নীল এনভেলাপে কোমল মধুর কৃষ্ণবর্ণ চিঠি। সেই চিঠির কালো আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসছে অগ্নি পাথর খচিত জাফরানি রঙা এক আংটি। বুঝি এরি নাম আগুনের পরশমণি! অথবা - দ্যা রিঙ অফ ফায়ার!
কি আশ্চর্য! পরশমণির স্পর্শ পেয়েই নাকি আঁধার দেখে ভয় পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল টেনেসি রাজ্যের ন্যাশভীল শহরের সেন্টেননিয়েল পার্কের মাঠে চাদর পেতে বসা বাংলাদেশের মেয়ে রুনি ওরফে ডঃ রওশন আরা করীম।     

 
রুনির কান্নার ব্যাপারটা পরে খুলে বলছি। আগে বলি প্রারম্ভিক ঘটনাবলী। সেই যেখান থেকে সুরু করেছিলাম। আকাশের খামে মর্তলোকের চিঠি এসেছে।  তো চিঠিটা যথা সময়ে অর্থাৎ একুশে অগাস্ট ২০১৭ সোমবার দুপুর বেলা সরাসরি পৌঁছে গেল পৃথিবীর হাতে। আরো শুদ্ধ করে বলা যায় - উত্তর আমেরিকার ডাকবাক্সে। এ চিঠির শিরোনাম – ‘দ্যা গ্রেট আমেরিকান এক্লিপ্স’।  

আমি সেই দিনটির কথা বলছি। এবং সেই সময়টার কথা বলছি। ঠিক যখন আগুনের পরশমণি ছুঁয়ে গেল গোটা উত্তর আমেরিকা। আমেরিকার পঞ্চাশটি স্টেটের কেউ বলতে পারবেনা এর ভাগ পায়নি। সবাই কিছু না কিছু অংশ পেয়েছে। সম্পূর্ণ অথবা আংশিক।   
আমরা ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এলাকাবাসীরা পেয়েছি ৮০ ভাগ গ্রহণের দেখা। ২০ ভাগ সূর্যের আলোও একেবারে কম নয়। সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম।
ঠিক সেই সময়টায় আমি পিছনের বাগানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। একটু আগের ঝলমলে সোনালী দুপুরটা বদলে গেছে। আমার সামনে ধূসর আলোয় মোড়া কোমল এক পৃথিবী। এদিকে ওদিকে লেবুর ফালির মত তেরছা হয়ে শুয়ে আছে নরম সাদা সূর্যালোক। তাপমাত্রা নেমে গেছে অনেকখানি। শীতল হাওয়ায় দুলছে ক্রিসেন্থিমামের বেগুনি ঝাড়।  
তবে,      
টোট্যাল এক্লিপ্স এর কথা যদি তুলি। আংশিকের সাথে তার আকাশ  পাতাল ফারাক। সেটা দেখা গিয়েছে শুধুমাত্র ১৪ টি রাজ্যে।
এবং এই বিস্ময়কে নিজের চোখে দেখবে বলে হুড়োহুড়ি পড়ে  গিয়েছিল সারা আমেরিকার আকাশ প্রেমীদের মাঝে।
চারিদিক থেকে ওই অঞ্চলে ছুটে যাচ্ছিল অগণিত মানুষ। সেখানে জড় হয়েছিল প্রায় আশি লক্ষ পর্যটক।   
কানায় কানায় পূর্ণ ছিল সেই কালো ফিতার পথঘাট, হাট মাঠ,  পার্ক। হোটেল, রেস্টহাউস, গেস্টহাউস, আবাসস্থল সবই টইটম্বুর।  
এ যেন বাঁধভাঙ্গা বন্যার ঢল।
অথবা ভরা জোয়ারের মহাসাগর।
অগণিত উৎসুক মানুষের পদচারনায় মুখরিত পশ্চিম থেকে পূবের ১৪ টি রাজ্যের পথঘাট আকাশ বাতাস।     
  
দীর্ঘদিন ধরেই টোট্যালিটির পথ জুড়ে চলছিল হাজারো আয়োজন। বৈজ্ঞানিকদের কাছে পরম আকাঙ্ক্ষিত সময়। পরীক্ষা নিরীক্ষার এক সুবর্ণ সুযোগ।
মাটিতে ছিলো তাদের অসংখ্য পরিক্ষাগার। আধুনিকতম প্রযুক্তি আর কারিগরি কৌশল।
কিন্তু আকাশে!
সেখানেও কম নয়।  
আকাশে উড়াল দিলেন সত্তুরজন সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর এক অপরূপ নেকলেস। তারা পিছু নিয়েছেন তাদের মহা জ্ঞানী প্রফেশন্যাল অগ্রজদের।
উড়ছে বিশেষ ধরণের সারি সারি এরোপ্লেন ও স্যাটেলাইট। সবার লক্ষ্য এক। সূর্যকে পর্যবেক্ষণ! বুঝতে হবে এর পর্যায়ক্রমিক  পরিবর্তন। খুঁটিয়ে দেখতে হবে তার আগুনরঙা করোনা।      
শুধু কি আর আকাশযান!   
অথৈ সাগরে ভেসেছিল সেদিন জাহাজ, সাম্পান। এর কোনটায় শুধুই উৎসুক দর্শক। কোনটাতে বৈজ্ঞানিক, জ্যোতির্বিদের দল।   
নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে।
আছে অংকের হিসাব।
নাসার বৈজ্ঞানিক দল সূর্যের পিছু ধাওয়া করলেন এগারটি স্পেইসক্রাফট আর পঞ্চাশটি অবজরভেশন বেলুনে চেপে।
নতুন কোন তথ্যের অপেক্ষায়।  
তাদের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে -  
সবাইকে ধাঁধায় ফেলে –
শুরু হয়ে গেল যথা সময়ে EclipsPBS টেলিভিশনের ভাষায় ‘Nature’s ultimate sky show’      
সাগরের একূল হতে ওকূল।  
পশ্চিম থেকে পূবে।
অরিগনের সালেম থেকে সাউথ কেরোলিনার চার্লসটন পর্যন্ত ৭০ মাইল প্রশস্ত ও ২৫০০ মাইল দীর্ঘ এক করিডোর জুড়ে আচমকা  লুটিয়ে পড়ল গ্রহ তারকার বিস্ময়কর খেলা!   
‘দ্যা গ্রেট আমেরিকান এক্লিপ্স'।’
বিলীন হয়ে গেল বর্ণ ধর্ম, ছোট বড়, সকল ভেদাভেদ। অযুত নিযুত আকাশপ্রেমী মানুষ একসাথে উর্ধমুখী হোল। সবিস্ময়ে দেখল -   
"It is He who created the night and the day and the sun and the moon. All (the celestial bodies) swim along, each in its orbit." Qur'an 21:33
তখন,     
    
২১ শে অগাস্টের ভর দুপুরবেলা।
আপন আপন কক্ষপথে যথানিয়মে ঘুরতে ঘুরতে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চলে এলো চন্দ্র। এবং ক্রমেই এগিয়ে গেল পৃথিবীর কাছে। আরো কাছে। এতো কাছে যে তার ছায়া এসে পড়ল পৃথিবীর এই প্রান্তে।   
আর সেই চাঁদ!
শান্ত সুবোধ চাঁদ আচমকা ধরণীকে বিস্ময়ের অতলে তলিয়ে দিয়ে  সম্পূর্ণ আড়াল করে দিল সূর্যের মুখ।
শুধু একটি মুহূর্ত –
ভর দুপুরে দপ করে নিভে গেল দিনের আলো। আকাশ জুড়ে নেমে এলো রাত্রির আঁধার।   
আমেরিকার ১৪ টি স্টেট ডুবে গেল ঘন যামিনীর মাঝে।  
টোট্যাল সোলার এক্লিপ্স!  
কেউ জানেনা কি ঘটে গেল। কেমন করে ঘটল। শুধু জানে,  প্রতিদিনের আকাশে এমন কিছু হচ্ছে যা বর্ণনার অতীত। ভাষারও দুঃসাধ্য। এ শুধু চোখ মেলে দেখার আর মনে, প্রাণে, আত্মায়  ও অস্তিত্তে অনুভব করার।  
ততক্ষণে,
টোট্যাল এক্লিপ্সের ৭০ মাইল প্রশস্ত ও ২৫০০ মাইল দীর্ঘ এলাকার    আবহাওয়া নেমে গেছে ১০ ডিগ্রী নিচে। মাঠে ঘাটে, পথে, পার্কে, বিল্ডিঙের ছাদে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ অগণিত জনতাকে উদ্বেলিত শিহরিত করে বইছে মৃদু মন্দ শীতল হাওয়া। হাওয়ার রঙ প্রথমে নীল তারপর হয়ে গেল রজত শুভ্র।

‘দ্যা গ্রেট আমেরিকান এক্লিপ্সের’ চলার পথে পথে জড় হওয়া লক্ষ কোটি মানুষের দৃষ্টি একসঙ্গে উঠে গেল আকাশপাণে।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট একটি মুহূর্ত -   
তারপরই পুলকিত যামিনীর উলসিত জনতা ফেটে পড়ল হাজারো উচ্ছাসে। কেউ অস্ফুটে। কেউ সজোরে। কেউবা বাকহীন। স্থির অচঞ্চল। কেউবা রুদ্ধশ্বাস।  
অনুভূতির তীব্র আবেগে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল অনেকে। কেউবা ভেঙ্গে পড়লো হু হু কান্নায়। তীব্র আবেগময় এই মুহূর্তের চাপ অসহ্য রহস্যময়! অদ্ভুত! আচানক! অভূতপূর্ব! বিশ্ময়কর!  
আসলে ভাষারও অতীত!
    
ঠিক এরকম মুহূর্তেই ন্যাশভীল শহরের সেন্টেননিয়েল পার্কে বসে হু হু কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল আমাদের রুনি।  
কয়েক মিনিট পরেই ফেইসবুকের পাতায় ভেসে উঠল, ডঃ ফরহাদ করীমের উচ্ছ্বাসিত পোস্ট – “It is over. A totally out of this world experience. It got dark, birds and insects chirping and the ring around the sun.......” ইত্যাদি ইত্যাদি।   
সাথে একটা ভিডিও ক্লিপ।   
ক্লিপটা ওপেন করতেই শুনি রুনির উপচে পড়া আবেগ মধুর ফোঁপানো কান্না। আর ফরহাদ ভাইয়ের বিস্ময়াক্রান্ত উচ্ছ্বাস!      
শুধু কি আর উচ্ছ্বাস! ভিডিও ক্লিপটায় রাতের আঁধারে স্ক্রিনজোড়া অন্ধকার ঠিকই কিন্তু সেই অন্ধকার ফুঁড়ে শোনা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের উল্লসিত চিৎকার! এ যেন সাত সাগরের মাতাল ঢেউয়ের প্রচণ্ড নিনাদ। বিপুল জনতার বাধভাঙ্গা বিস্ময়ের জোয়ার! 

   
ওদেরকে ঘিরে তখন একের পর এক বিস্ময়ের খেলা।
 
পশ্চিম থেকে পূবের টানা টোট্যাল এক্লিপ্সের বিস্তৃত করিডোর জুড়ে অপেক্ষমাণ জনতা তখনো চেয়ে আছে অবাক করা এক আকাশের দিকে। এ আমাদের চিরচেনা আকাশ নয়। একে ওরা কেউ দেখেনি কখনো। আসমানের কালচে নীল জমিনে ফুটে আছে জ্বলজ্বলে ভেনাস! ছোট ছোট তারার ফুল্কি।   
দিনের বেলায় রাত!
আর,  আর,  এই সব কিছুর মধ্যখানে আকাশে ভেসে উঠেছে এক আশ্চর্য সোনার বলয়! অ্যা রিঙ অফ ফায়ার ! সরু রুপালী শিখা - সূর্যের মত তবু সূর্য সেতো নয়!   

 

ঘটনার আকস্মিকতায় চমকিত পক্ষীকুল, পোকা মাকড়, ঝিঁঝিঁ পোকার দল গুণগুনান ঝিন- ঝিন- রবে সরব হয়ে উঠেছে।  
মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট!     
হটাৎ থেমে গেল পাখির ডাক। ঝিঁঝিঁ পোকার ঐকতান।
ঘন যামিনীর হোল অবসান।
সরে গেছে চাঁদ।
ফিরে এলো ঝলমলে দিনের আলো।  
রৌদ্রকরজ্জল আসমান।
আড়াই মিনিটের মহার্ঘ ‘মিরাকল অফ দ্যা স্কাই’ শেষে আবারো সেই মধ্যদুপুর।
পুরো জিনিসটা অবিশ্বাস্য তবু পরম সত্য।
   
টোট্যাল সোলার এক্লিপ্স দেখে ওই দিনই টেনেসি থেকে কেনটাকি নিজের শহরে ফিরে গিয়েছিল রুনি আর ফরহাদ ভাই।
এইমাত্র টেলিফোনে কথা হোল রুনির সাথে।  
এখনো ঘোর কাটেনি তার।  
সেদিন মধ্য দুপুরের রুদ্ধশ্বাস ঘটনা স্বপ্ন নাকি বাস্তব বুঝতে এখনো কষ্ট হচ্ছে ওর। অনুভূতিটাকে যেন ঠিকমত ছুঁয়ে দেখা হয়নি। অস্ফুটে আরো কিছু কি লেখা ছিল ইথারে! যেন আরো কিছু বাকি ছিল পাবার।
শুধু মনে পড়ে মহামিলনের সেই আশ্চর্য মুহূর্ত, যখন ভেদাভেদ  ভুলে সকল মানুষ একসাথে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল। দেখেছিল সৃষ্টির অকল্পনীয় কারুকাজ!

এইমাত্র ডাকে আসা সেপ্টেম্বর সংখ্যা টাইম হাতে নিতেই দেখি  ‘গ্রেট আমেরিকান এক্লিপ্স’ নিয়ে লেখা একটি নিবন্ধের শিরোনাম,
“Totality   
Mother nature, the uniter, briefly eclipses the nations divisions.”  
আজকের বিভক্ত পৃথিবী মিলনেরই প্রত্যাশী।  
এক্লিপ্স যেন এ কথাটাই বলে গেল।  


 

সর্বশেষ আপডেট ( বুধবার, ৩০ আগস্ট ২০১৭ )
 

Add comment


Security code
Refresh

< পূর্বে   পরে >
Free Joomla Templates